সিডনির মেলব্যাগ ॥ সিডনির সুধী সমাবেশ ও বিশ্বকাপ কড়চা
অজয় দাশ গুপ্ত
গত সপ্তাহে সিডনির একটি সুধী সমাবেশে যাবার সুযোগ হয়েছিল। সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক আলোচনাসভা বলাই শ্রেয়। আগেও লিখেছি প্রয়োজন আছে কি নাই তারচেয়ে বড় কথা প্রবাসে বাংলাদেশ ও তার রাজনীতি চলমান। যারা প্রয়োজন নাই নাই বলে গলা ফাটায় হাস্যকরভাবে আলাপের সিংহভাগজুড়ে দেশ, দেশের রাজনীতি চলমান বাস্তবতা নিয়েই মুখর তারা। এই অনুষ্ঠানটি প্রীতিভোজ হলেও দেশের রাজনৈতিক সামাজিক বাস্তবতাতেই ডুবেছিলাম আমরা। দেশ থেকে আগত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মীজানুর রহমানকে কেন্দ্র করে আড্ডার তুফানে জমায়েত সুধীদের কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ আর হতাশার সুর। ম্যাকুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ড. রফিকের সূত্রপাতে আড্ডায় চলে আসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ। বলা উচিত বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বকরণ ও শাস্তিদানে সময়ক্ষেপণ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন তিনি। আইনের দুঁদে শিক্ষক বিশ্বব্যাপী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার তূল্যমূল্য বিশ্লেষণ দেখিয়ে দিলেন কোথায় আওয়ামী রাজনীতি ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। গণজাগরণ মঞ্চ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, নারায়ণগঞ্জ হত্যাকা-, নোয়াখালীতে অপমৃত্যু সব মিলিয়ে এখন যা অবস্থা তাতে হতাশ হবার বিকল্প নাই। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সততা, আদর্শবোধ নেতৃত্বের বলিষ্ঠতার পরও আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা হারানোর দৌড়ে এগিয়ে থাকাটা এখন মাথা ব্যথার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে, প্রবাসী বাংলাদেশীরা যে কতটা বিষণœ ও চিন্তিত প্রীতিভোজটিতে না গেলে বুঝতে পারতাম না। অনেকে মনে করেন, এ হচ্ছে অতি আবেগ, কারো মতে মায়ের চেয়ে খালা বা মাসির দরদ বেশি, যে যাই মনে করুক মূলত দূর থেকে স্পষ্ট দেখতে পাওয়া স্বদেশ এখন নানাভাবে ফুলে ফসলে ভরে উঠলেও সংশয়হীন থাকতে দিচ্ছে না। সে রাতে জমায়েত প্রবাসীদের সবাই যার যার ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। কেউ শিক্ষাবিদ, কেউ আইনবিদ, কেউ লেখক কেউ বা অস্ট্রেলিয়ান মূলধারার রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার পথে, মানতে হবে আজকের দিনে পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতায় বাংলাদেশ একা চলতে পারবে না। বাংলাদেশের সৌভাগ্য তার একা চলতেও হবে না, এক বিশাল মেধাবী ও সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠী অপেক্ষমাণ, এরা দেশের রাজনৈতিক নোংরামি কাদা ছোড়াছুড়িসহ যাবতীয় অপকর্মের বাইরে থাকা দেশপ্রেমী, বিশাল সংখ্যার এসব মানুষের মতামত উপেক্ষা করা যাবে না। তাঁরা চাইছেন, আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তিদানে অপরাজনীতির আশ্রয় নেবে না, কাকে ছাড়তে হবে, কাকে ফাঁসিতে যেতে হবে তার ভার আইনের হাতে। আইন চলবে নিজস্ব নিয়মে। এমনিতেই গোলাম আযম ও সাঈদী সাহেবের প্রশ্নে লীগের অবস্থান নিয়ে জনমনে হতাশা বিরাজমান, গুরুত্ব ও শর্টলিস্ট করার ব্যাপারে এমন হচপচ অবস্থা কোন দেশে দেখা যায় না। রাজনৈতিক গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় না রেখে হঠাৎ ক্রোধান্বিত, হঠাৎ আপোস কোনভাবেই শান্তি আনতে পারে না। আওয়ামী লীগের সবচে বড় দুর্বলতা নিজেদের যুক্তি বা পজেটিভ দিক তুলে ধরতে ব্যর্থ হওয়া, প্রবাসীরা দূর থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেখেন পক্ষে হাজারো বলিষ্ঠ যুক্তি আর পয়েন্ট থাকার পরও গুছিয়ে কথা বলতে না পারা আর অসংগঠিত মতামতের কারণে আসিফ নজরুল বা পিয়াস করিমের মতো কথিত সুশীলরাই দৃষ্টি কেড়ে নেয়। চূড়ান্ত সত্য ও বাস্তবতাকে মিথ্যা বানিয়ে রাজনীতি করতে করতে বিএনপি ক্ষমতা পর্যন্ত চলে যেতে পেরেছে, বিরোধী দলে না থাকার পরও সর্বক্ষেত্রে আলোচিত আর হিসেবে রাখার প্রধান দল। তাদের থাকা না থাকার জায়গাটাও ক্রমেই বড় করে তুলছে ক্ষমতাসীনরা। প্রবাসীদের আলাপ আলোচনায় আমি যে শঙ্কা ও ভয় দেখেছি তার সঙ্গে পঁচাত্তর আর কোন সময়ের তুলনা চলে না। জামায়াত বিএনপি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আপাতত ব্যর্থ হলেও আশঙ্কা যায়নি। সে হতাশা দূরীকরণে উদ্বিগ্ন প্রবাসীরা সমালোচনা করছিল বটে, মনেপ্রাণে এরাই শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শুভাকাক্সক্ষী, কিন্তু মুশকিল হলো বড় দলের ভেতর ঢুকে পড়া বড় দৈত্য আর ছোট ছোট উৎপাত। এরাই সব অর্জন খেয়ে ফেলছে, আম আমরা সংশয় আর দ্বিধার সীমানা ডিঙ্গাতে ব্যর্থ হবার কারণও তাই। ওসমান পরিবার, ছাত্রলীগ, সন্ত্রাস, গুম, খুন মিলে যে পরিস্থিতি ও ধোঁয়াশা সেটাই আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। বাংলাদেশ ও তার অগ্রযাত্রায় আওয়ামী লীগের বিকল্প না থাকার পরও আজ তার অর্জন আক্রান্ত। তার সুনাম আক্রান্ত, আক্রান্ত তার চেতনা, প্রবাসীদের সোজাসাপটা কথা- জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত করা চলবে না, সাপের সঙ্গে বসবাসের ফল দংশন, সেটা মনে রাখতে না পারলে কেঁদেও জীবন বাঁচানো যায় না। সিডনি প্রবাসীরা শেখ হাসিনার বলিষ্ঠতা ও গণতান্ত্রিকতার পক্ষে বলিষ্ঠ, ঐক্যবদ্ধ, সেটাই জানা গেল সে রাতে।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
No comments:
Post a Comment