গ্লোবাল সামিট লন্ডন একাত্তরের নৃশংসতার কথা পৃথিবীকে জানাতে হবে
নিঝুম মজুমদার
২০০৮ সালে ব্রিটিশ জার্নাল দি ইকোনমিস্টে ‘এ ইয়ার অব এ্যাকাউন্টিবিলিটি’ শীর্ষক প্রবন্ধে জোলি লিখেছিলেন কিছু অবাক করে দেয়ার মতো কথা। জোলি টঘঐজ-এর গুড উইল এ্যাম্বাসেডর হিসেবে মধ্য আফ্রিকার দেশ শাদের পূর্বাঞ্চলে গিয়েছিলেন শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শনে। শাদ এই শরণার্থীরা এসেছিলেন সুদান থেকে। ২০০৩ থেকে সুদানের লিবারেশন মুভমেন্ট আর্মি এবং জাস্টিস এ্যান্ড ইকুয়ালিটি মুভমেন্ট দুইটি গেরিলা দল অস্ত্র তুলে নেয় সরকারের বিরুদ্ধে। সরকারের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ অসংখ্য। বঞ্চনা, ডিস্ক্রিমিনেশন, নির্যাতন, দীর্ঘদিনের অবহেলা, সবকিছু মিলে দক্ষিণ সুদানের অধিবাসীরা চাইল স্বাধীন দক্ষিণ সুদান আর শুরু হলো যুদ্ধ। যুদ্ধ হলে সাধারণত যা হয় তাই হলো। অসংখ্য নিরীহ মানুষকে খুন হতে হয়, নারী-শিশুরা হয় ধর্ষিত, লক্ষ-কোটি মানুষ হয় ঘরহারা, স্বপ্নহারা, পথহারা। সুদানের রাষ্ট্রপতি ওমর আল বশির এই বিদ্রোহ মেনে নিতে চাইলেন না আর শুরু হলো সেই অঞ্চলের মানুষদের ওপর গণহত্যা। ঠিক এমন করেই দক্ষিণ সুদানের অসংখ্য মানুষ তাঁদের সীমান্ত নিকটবর্তী দেশ শাদে আশ্রয় নিলেন। এঞ্জেলিনা জোলি সেই শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন শেষেই ইকোনমিস্টে সেই প্রবন্ধটি লেখেন। যেখানে তিনি বলেনÑ
টঘঐজ-এর প্রতিনিধি হিসেবে সাম্প্রতিক এক মিশনে আমার শাদের শরণার্থী ক্যাম্পে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এই শরণার্থী ক্যাম্প সুদানের সীমান্তের নিকটবর্তী। একদল শরণার্থীদের সঙ্গে যখন আমি বসে কথা বলছিলাম তখন আমি তাঁদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে তাদের কী লাগবে। এই শরণার্থীরা হচ্ছেন তাঁরা যাঁরা নিজের চোখে দেখেছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যদের কী করে মেরে ফেলা হয়েছিল, তাঁরা দেখেছেন প্রতিবেশীদের ধর্ষিত হতে, পুরো গ্রাম জ্বলতে আর লুটপাট হতে, আর দেখেছেন তাদের পুরো একটি কমিউনিটিকে কী করে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল তাঁদেরই নিজের ভূমি থেকে। সুতরাং আমি মোটেই অবাক হতাম না যদি এই শরণার্থীরা আমার কাছে এমন কিছু চাইত যেগুলো দিতে তাঁদের জীবন মানের সামান্য হলেও উন্নতি হয়। অনেকে চাইলও তাই। একজন ভাল তাঁবু চাইল, একজন আবার চাইল ভাল মেডিক্যাল ব্যবস্থা। কিন্তু সেই শরণার্থীদের মধ্যে এক কিশোর দাঁড়িয়ে সরল অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘নৌস ভোলন্স উন প্রসেস’, আমরা বিচার চাই।’
জোলির সেই প্রবন্ধের এই অংশটুকু আসলে নীরবে অনেক কথাই বলে। মনে করিয়ে দেয় অসংখ্য স্মৃতি, অসংখ্য কথা। আফ্রিকান দেশগুলো যুগের পর যুগ এমন যুদ্ধের সহিংসতায় জ্বলছে নিরবধি। রুয়ান্ডাতে ১৯৯৪ সালে হুতু জনগোষ্ঠী তাদেরই দেশের তুতসী আর ‘মডারেট’ হুতু জনগোষ্ঠীর ওপর চালায় ভয়াবহ গণহত্যা, যে বর্বর গণহত্যা বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দিয়েছে। আফ্রিকা এই রক্ত বড় বেদনায় বিদীর্ণ হয়ে বহন করে চলেছে। এই রুয়ান্ডার গণহত্যা যখন কিছুটা থেমে গেল, যখন জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে বিচার হলো হুতু নেতাদের এবং যারা যারা পালিয়ে গেল পৃথিবীর নানান দেশে তার কিছুদিন পরেই আবার গণহত্যা শুরু হলো কঙ্গোতে। রুয়ান্ডার ঠিক পাশের দেশ কঙ্গোতে অসংখ্য হুতু পালিয়ে নিজেদের আবাসন তৈরি করেছিল এবং সেখানে গিয়েও তারা শুরু করেছিল যুদ্ধ, গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ইংল্যান্ডের বিখ্যাত সাংবাদিক রস কেম্প তাঁর ‘এক্সট্রিম ওয়ার্ল্ড’ নামক টিভি সিরিজে কঙ্গোকে নিয়ে একটি পর্ব তৈরি করেছিলেন। এই পর্বটির কথা আমি আসলে লিখে বলা যায় না, ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। কেবল নিজস্ব অনুভূতিতে জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার হতে হয় অবিরত। অহর্নিশ। রস কেম্পের সেই পর্বটিতে ডক্টর ডেনিস মিকিউয়েগের কয়েকটি কথা বাংলায় অনুবাদ এখানে খুব প্রাসঙ্গিক। ডক্টর ডেনিস সেই যুদ্ধে হতাহত নারী ও শিশুদের জন্য যেই হাসপাতালটি তৈরি করেছেন সেই হাসপাতালে আসা নারীদের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘নারীদের ধর্ষণ করার পর তাদের যোনিদ্বারে আগুন দিয়ে দেয়া হয়েছে, ছুরি দিয়ে কেটে কেটে তাদের যোনিদ্বার টুকরো টুকরো করা হয়েছে, সেখানে ঢোকানো হয়েছে গরম লোহার রড কিংবা বন্দুকের নল।
রুয়ান্ডা কিংবা কঙ্গো ছাড়াও আফ্রিকার কেনিয়া, সিয়েরা লিওনসহ অনেক দেশে এমন জাতিগত দাঙ্গায় লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যুদ্ধে নারীরা হয়েছেন সবচাইতে বর্বরতার শিকার। এছাড়াও কম্বোডিয়া, সার্বিয়া, শ্রীলঙ্কার গণহত্যার কথা সকলের জানা।
উপরে যে অত্যাচার, অবিচার, গণহত্যা তথা নৃশংসতার বর্ণনা দিয়েছি সেগুলো যতবার আমি নিজে জেনেছি ততবার আমি ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে গিয়েছি একাত্তরের নৃশংসতার চিত্রে। মুক্তিযুদ্ধকালে আমার জন্ম হয়নি কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালীন পরবর্তী সময়ে আমাদের প্রজন্ম এই যুদ্ধের ভয়াবহতার যে চিত্র দেখে, পড়ে কিংবা জেনে বড় হয়েছি সেটিই আমাদের কাছে মূর্ত হয়ে রয়েছে। হোটেল রুয়ান্ডাতে যে নির্যাতিত নারীদের দেখানো হয়েছে কিংবা রস কেম্পের টিভি সিরিজে ডক্টর ডেনিসের বয়ানে নারীদের ওপর যে নৃশংসতার কথা বলা রয়েছে, ঠিক তেমনই ইতিহাস আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালের। পাকিস্তানী আর্মি ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ওপর যে অত্যাচার, অবিচার, নির্যাতনের উৎসবে মেতে উঠেছিল সেই সব ঘটনার সঙ্গে আজকের রুয়ান্ডা, সুদান কিংবা কঙ্গোর ঘটনা একেবারেই আলাদা কিছু নয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রের ৮ম খণ্ড যেটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হয়েছে সেই বইয়ের ৪৪ পৃষ্ঠা থেকে আমি চুন্নু ডোমের কিছু কথা বলতে চাই। চুন্নু ডোম ২৯ মার্চ ১৯৭১ সালে তাঁর ইন্সপেক্টর ইদ্রিস সাহেবের নির্দেশে ঢাকার মিডফোর্ট হসপিটালে যান। সেখান থেকে তিনি অসংখ্য নারী-পুরুষের পচা, গলা, বিকৃত লাশ ক্রমাগত ট্রাকে ওঠাতে থাকেন তাঁর সঙ্গে থাকা অনেক ডোমের সঙ্গে। সেই লাশ ওঠানোর কাহিনী বড় মর্মান্তিক, বড় যন্ত্রণার। আমি কেবল চুন্নু ডোমের বর্ণনায় উঠে আসা নারীদের লাশের বর্ণনা দিচ্ছি এই অংশে। চুন্নু ডোম বলেন, ‘আমরা লাশ ঘরে প্রবেশ করে বহু যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ, শিশু, কিশোরের স্তূপীকৃত লাশ দেখলাম। আমি এবং বদলু ডোম লাশ ঘর থেকে লাশের পা ধরে টেনে ট্রাকের সামনে জড়ো করেছি। আর গণেশ, রঞ্জিত (লাল বাহাদুর) এবং কানাই লোহার কাঁটা দিয়ে বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে পচা, গলিত লাশ ট্রাকে তুলেছে। প্রতিটি লাশ গুলিতে ঝাঁজরা দেখেছি, মেয়েদের লাশের কারও স্তন পাই নাই, যোনিপথ ক্ষতবিক্ষত এবং পেছনের মাংস কাটা দেখেছি। মেয়েদের লাশ দেখে মনে হয়েছে তাদের হত্যা করার পূর্বে তাদের স্তন সজোরে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, যোনিপথে লোহার রড কিংবা বন্দুকের নল ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। যুবতী মেয়েদের যোনিপথের এবং পেছনের মাংস যেন ধারালো চাকু দিয়ে কেটে এ্যাসিড দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে।
গত ১০ জুন থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত লন্ডনের ডকল্যান্ডের এক্সেল এক্সিবিশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গ্লোবাল সামিট-২০১৪। এই সামিটের হোস্ট ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ আর টঘঐজ-এর বিশেষ দূত এঞ্জেলিনা জোলি এই সামিটে এসেছিলেন অতিথি হয়ে। যুদ্ধকালে নারীদের ওপর নানাবিধ যৌন নির্যাতন বন্ধ করার সঙ্কল্পে তথা এই ব্যাপারে পৃথিবীব্যাপী একটি বৈশ্বিক জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই গ্লোবাল সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সামিটের মূল লক্ষ্যগুলো হচ্ছে-
1) To improve investigations/ documentation of sexual violence in conflict;
2) To provide greater support and assistance and repraration for survivors, including child survivors, of sexual violence;
3) To ensure sexual and gender based violence responses and the promotion of gender equality are fully integrated in all pease and security efforts, including security and justice sector reform; and
4) To improve international strategic co-ordination.
জাতিসংঘের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য রাষ্ট্র এই উদ্যোগের প্রেক্ষিতে গৃহীত প্রকল্পে স্বাক্ষর করে এই ইনিশিয়েটিভের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। পুরো পৃথিবী থেকে প্রায় ৬০ মন্ত্রী এবং প্রায় ২৩০ জন সরকারী কর্মকর্তা এই সামিটে যোগ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ থেকেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী, ইউনাইটেড নেশন্সের কর্মকর্তা মুনা তাসনীম বাংলাদেশের হাইকমিশনার মিজারুল কায়েসসহ অনেকেই। ২০১৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের উদ্যোগে সকল সিগনেটোরি রাষ্ট্রের সম্মতিক্রমে স্বাক্ষরিত হয় একটি ডিক্লারেশন অব কমিটমেন্ট। যেই কমিটমেন্ট পত্রে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখিত ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে নারীদের ওপর সহিংসতা বন্ধের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব এবং যাঁরা এরই মধ্যে নির্যাতিত হয়েছেন তাঁদের পুনর্বাসনের ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় এবং অপরাধীদের শনাক্তকরণ পরবর্তী বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।
কিন্তু সবচাইতে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এই পুরো সম্মেলনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ওপর এই ভয়াবহ নির্যাতনের ওপর কোন আলোকপাত হয়নি। অনুষ্ঠানে শত শত উন্মুক্ত অনুষ্ঠান যেমন নাটক, ডিস্কাশন, চলচ্চিত্র, ডকুমেন্টারি, সাক্ষাতকার ইত্যাদি থাকলেও উপেক্ষিত ছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সরকারীভাবে এই অনুষ্ঠানকে নিয়ে কোন আয়োজন না থাকায় ইতিহাসের এত বড় গণহত্যা ও বিভীষিকার কথা অনেকটা অজানাই থেকে গিয়েছিল বিশ্ববাসীর কাছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বড় আকারে ১৯৭১ সালেই মূলত সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের সব চাইতে বড় বর্বরতম গণহত্যা। যেই গণহত্যায় ৩০ লাখেরও বেশি মানুষকে মেরে ফেলেছিল পাকিস্তানী আর্মি এবং এই যুদ্ধে নির্যাতিত হয়েছিল প্রায় দুই লাখ মা-বোন। এমনই একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতায় এই ধরনের সম্মেলনে বাংলাদেশের এমন অনুপস্থিতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে।
সম্মেলনের এক অংশে বিভিন্ন দেশের স্টল সজ্জিত ছিল। যেসব স্টলে ওই সব দেশ যেমন রুয়ান্ডা, কঙ্গো, সিয়েরা লিওন, কেনিয়া তাঁদের নিজেদের দেশে হয়ে যাওয়া গণহত্যার বর্ণনা করেছেন, লিফলেট দিয়েছেন, নির্যাতিত নারীদের হাতে তৈরি হ্যান্ডিক্রাফট, ছবিসহ নানান শিল্প কর্ম সেখানে সজ্জিত ছিল। সাধারণ মানুষ যেসব স্টলে গিয়ে গিয়ে জেনেছেন বিভিন্ন যুদ্ধে সহিংসতার শিকার নারীদের শোকগাথা।
বাংলাদেশের উপেক্ষার ফলশ্রুতিতে যুক্তরাজ্য গণজাগরণ মঞ্চ সম্মেলনের এই চারদিনে নানান ধরনের কর্মসূচী নিয়ে সামনে এগিয়ে আসে। সম্মেলনের প্রধান ফটকের সামনে মানববন্ধন, প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনী, লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন ডিস্কাশন অনুষ্ঠানের কক্ষে গিয়ে তাদের কর্মীদের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ উত্থাপন করা এসব কর্মসূচীর ভেতর ছিল। বিতরণকৃত লিফলেটে ছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে নারীদের ওপর পাকিস্তানী আর্মিদের অত্যাচার করার ইতিহাস আর তার সকল বর্ণনা। এই লিফলেটে বাংলাদেশকে উপেক্ষার ব্যাপারে প্রতিবাদও জানানো হয়।
সম্মেলনের চারটি দিনেই ব্রিটেনের বাংলাদেশী অনেক সংগঠন থেকে (ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, ইউকে, গণজাগরণ মঞ্চ, ইউকে সিপিবি, বাসদ, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, নারী অধিকার সংগঠন নারী দিগন্ত, নারী চেতনা, সাংস্কৃতিক সংগঠন-অনুশীলন) একটি মেমোরান্ডাম এই সামিটের আয়োজক ফরেন এ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসে (ঋঈঙ) পাঠানো হয়। এই মেমোরান্ডামে বাংলাদেশ বিষয়ে সামিটের আশ্চর্যজনক নীরবতার প্রতিবাদ জানানো হয় এবং সেই সঙ্গে সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি জানানো হয়। গণজাগরণ মঞ্চ যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে এই চার দিনে প্রচুর লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে সামিটে আগত ইন্টারন্যাশনাল ব্লগার, সাংবাদিক মানবাধিকার কর্মীসহ বিদেশী অতিথিদের মধ্যে। সম্মেলনে আগত সাধারণ মানুষ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের এই লিফলেট বিতরণকালে জেনেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যার বিষয়ে, কতটা পাশবিকভাবে বাংলাদেশের নারীরা নির্যাতিত হয়েছিলেন, কী করে নারীদের ওপর নেমে এসেছিল যৌন সহিংসতা সে সবের আদ্যোপান্তও সম্মেলনে আসা হাজার হাজার মানুষ জেনেছেন। এই সম্মেলন উপলক্ষে যুক্তরাজ্য গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা প্রায় দুই হাজার লিফলেট বিতরণ করেন। চারদিনব্যাপী এই সম্মেলনে যুক্তরাজ্য গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছিলেন ব্রিটেনের স্বাধীনতার পক্ষের অনেক মানুষ।
যে নারীরা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানী আর্মিদের বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, যাঁরা দেশের জন্য দিয়েছেন সব, যাঁরা হারিয়েছেন জীবনের সকল রং, আলো আর ভালবাসা, প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ তাদের কিছুই দিতে পারেনি।
স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও যদি আমরা শুধু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করি, কী দিতে পেরেছি এই সব নির্যাতিত সব হারানো মা আর বোনকে? হয়ত সঠিক উত্তর হবে নীরবতা। আমরা হয়ত থমকে গিয়ে উত্তরই দিতে পারব না, কেননা আমাদের উত্তর দেয়ার কিছু নেই। মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পরে পরেরই একটি চিত্র তুলে ধরছি নীলিমা ইব্রাহিমের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ থেকে-
বীরাঙ্গনা রীনা লেখক নীলিমা ইব্রাহিমকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী স্মৃতি থেকে বলেন-
বাঙ্কার থেকে আমাকে যখন ভারতীয় বাহিনীর এক সদস্য অর্ধ উলঙ্গ এবং অর্ধমৃত অবস্থায় টেনে তোলে তখন আশপাশের দেশবাসীর চোখে মুখে যে ঘৃণা ও বঞ্চনা আমি দেখেছিলাম তাতে দ্বিতীয়বার আর চোখ তুলতে পারিনি। জঘন্য ভাষায় যেসব মন্তব্য আমার দিকে তারা ছুড়ে দিচ্ছিল, ভাগ্যিস বিদেশীরা আমাদের সহজ বুলি বুঝতে পারেনি।
প্রশ্ন এসেই যায় স্বাভাবিকভাবে আমরা কি আদৌ আমাদের এই তৃতীয় শ্রেণীর মানসিকতা থেকে বের হতে পেরেছি? উত্তরটা সোজা। আমরা পারিনি। আর পারিনি বলেই স্বাধীনতার এতটা বছর পর মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত, নিগৃহীত, নিষ্প্রেষিত, অবহেলিত নারীদের কথা আমরা না পেরেছি দেশের মানুষকে সঠিকভাবে জানাতে, বোঝাতে, উপলব্ধি করাতে। না পেরেছি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে।
নীলিমা ইব্রাহিমের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ বই থেকে আরও জানা যায়, বীরাঙ্গনা শেফা নীলিমা ইব্রাহিমকে রাজাকার ফারুকের স্বাধীনতা-পরবর্তী অবস্থান বর্ণনা করেন এভাবে- ‘ফারুক এখন জজ সাহেব। আর কখনও হাফ হাতা শার্ট পরে না। কেউ হাতের দাগ দেখে ফেললে বলে মুক্তিযুদ্ধে আহত হয়েছিল বেয়োনেট চার্জে’
এই ফারুক হচ্ছে তো সেই ফারুক যে কিনা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী বর্বর সৈন্যদের কাছে তুলে দিয়েছিল শেফাকে। যেই হাতের দাগ হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বেয়োনেট চার্জে, সেই হাত যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে হয়ে গিয়েছে মুক্তিযোদ্ধার হাত। সেই হাতের ক্ষত এসেছে অন্য ইতিহাস হয়ে। বলা হয়েছে ফারুক মুক্তিযুদ্ধ করতে গিয়ে আহত হয়েছে। ঘরের ভেতর মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস, স্বাধীনতাবিরোধীদের সন্তানরা সব ঘিরে ফেলেছে আর ফেলছে ক্রমাগত, আন্তর্জাতিকভাবে এখনও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিগণিত হয় সিভিল ওয়ার হিসেবে। আজও পৃথিবীর মানুষ জানে না আমাদের মায়েদের ওপর পাকিস্তানী আর্মি আর তাদের এই দেশীয় দোসরদের সহায়তায় কী করে অত্যাচার করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধকালে। আজও এই অধ্যায়টি বড় বেশি অস্পষ্ট, ধোঁয়াশে, অন্ধকারাচ্ছন্ন।
লন্ডনের এই যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতা বন্ধে যে সম্মেলন হয়ে গেল সেখানে বাংলাদেশ সরকার ব্যর্থ হলেও হয়নি গণজাগরণ মঞ্চ। যে আশার প্রদীপ তাঁরা জ্বালিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের প্রতিটি স্থানে সেই আশার প্রদীপ যুক্তরাজ্যের গণজাগরণ মঞ্চের মাধ্যমে ছড়িয়েছে এবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও।
রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে হয়ত এভাবে জেগে ওঠে মানুষ। সাধারণ জনতা। এভাবেই তারা সত্য ছড়িয়ে দেয়।
লেখক : টঘঐজ প্রতিনিধি
টঘঐজ-এর প্রতিনিধি হিসেবে সাম্প্রতিক এক মিশনে আমার শাদের শরণার্থী ক্যাম্পে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এই শরণার্থী ক্যাম্প সুদানের সীমান্তের নিকটবর্তী। একদল শরণার্থীদের সঙ্গে যখন আমি বসে কথা বলছিলাম তখন আমি তাঁদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে তাদের কী লাগবে। এই শরণার্থীরা হচ্ছেন তাঁরা যাঁরা নিজের চোখে দেখেছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যদের কী করে মেরে ফেলা হয়েছিল, তাঁরা দেখেছেন প্রতিবেশীদের ধর্ষিত হতে, পুরো গ্রাম জ্বলতে আর লুটপাট হতে, আর দেখেছেন তাদের পুরো একটি কমিউনিটিকে কী করে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল তাঁদেরই নিজের ভূমি থেকে। সুতরাং আমি মোটেই অবাক হতাম না যদি এই শরণার্থীরা আমার কাছে এমন কিছু চাইত যেগুলো দিতে তাঁদের জীবন মানের সামান্য হলেও উন্নতি হয়। অনেকে চাইলও তাই। একজন ভাল তাঁবু চাইল, একজন আবার চাইল ভাল মেডিক্যাল ব্যবস্থা। কিন্তু সেই শরণার্থীদের মধ্যে এক কিশোর দাঁড়িয়ে সরল অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘নৌস ভোলন্স উন প্রসেস’, আমরা বিচার চাই।’
জোলির সেই প্রবন্ধের এই অংশটুকু আসলে নীরবে অনেক কথাই বলে। মনে করিয়ে দেয় অসংখ্য স্মৃতি, অসংখ্য কথা। আফ্রিকান দেশগুলো যুগের পর যুগ এমন যুদ্ধের সহিংসতায় জ্বলছে নিরবধি। রুয়ান্ডাতে ১৯৯৪ সালে হুতু জনগোষ্ঠী তাদেরই দেশের তুতসী আর ‘মডারেট’ হুতু জনগোষ্ঠীর ওপর চালায় ভয়াবহ গণহত্যা, যে বর্বর গণহত্যা বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দিয়েছে। আফ্রিকা এই রক্ত বড় বেদনায় বিদীর্ণ হয়ে বহন করে চলেছে। এই রুয়ান্ডার গণহত্যা যখন কিছুটা থেমে গেল, যখন জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে বিচার হলো হুতু নেতাদের এবং যারা যারা পালিয়ে গেল পৃথিবীর নানান দেশে তার কিছুদিন পরেই আবার গণহত্যা শুরু হলো কঙ্গোতে। রুয়ান্ডার ঠিক পাশের দেশ কঙ্গোতে অসংখ্য হুতু পালিয়ে নিজেদের আবাসন তৈরি করেছিল এবং সেখানে গিয়েও তারা শুরু করেছিল যুদ্ধ, গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ইংল্যান্ডের বিখ্যাত সাংবাদিক রস কেম্প তাঁর ‘এক্সট্রিম ওয়ার্ল্ড’ নামক টিভি সিরিজে কঙ্গোকে নিয়ে একটি পর্ব তৈরি করেছিলেন। এই পর্বটির কথা আমি আসলে লিখে বলা যায় না, ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। কেবল নিজস্ব অনুভূতিতে জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার হতে হয় অবিরত। অহর্নিশ। রস কেম্পের সেই পর্বটিতে ডক্টর ডেনিস মিকিউয়েগের কয়েকটি কথা বাংলায় অনুবাদ এখানে খুব প্রাসঙ্গিক। ডক্টর ডেনিস সেই যুদ্ধে হতাহত নারী ও শিশুদের জন্য যেই হাসপাতালটি তৈরি করেছেন সেই হাসপাতালে আসা নারীদের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘নারীদের ধর্ষণ করার পর তাদের যোনিদ্বারে আগুন দিয়ে দেয়া হয়েছে, ছুরি দিয়ে কেটে কেটে তাদের যোনিদ্বার টুকরো টুকরো করা হয়েছে, সেখানে ঢোকানো হয়েছে গরম লোহার রড কিংবা বন্দুকের নল।
রুয়ান্ডা কিংবা কঙ্গো ছাড়াও আফ্রিকার কেনিয়া, সিয়েরা লিওনসহ অনেক দেশে এমন জাতিগত দাঙ্গায় লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যুদ্ধে নারীরা হয়েছেন সবচাইতে বর্বরতার শিকার। এছাড়াও কম্বোডিয়া, সার্বিয়া, শ্রীলঙ্কার গণহত্যার কথা সকলের জানা।
উপরে যে অত্যাচার, অবিচার, গণহত্যা তথা নৃশংসতার বর্ণনা দিয়েছি সেগুলো যতবার আমি নিজে জেনেছি ততবার আমি ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে গিয়েছি একাত্তরের নৃশংসতার চিত্রে। মুক্তিযুদ্ধকালে আমার জন্ম হয়নি কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালীন পরবর্তী সময়ে আমাদের প্রজন্ম এই যুদ্ধের ভয়াবহতার যে চিত্র দেখে, পড়ে কিংবা জেনে বড় হয়েছি সেটিই আমাদের কাছে মূর্ত হয়ে রয়েছে। হোটেল রুয়ান্ডাতে যে নির্যাতিত নারীদের দেখানো হয়েছে কিংবা রস কেম্পের টিভি সিরিজে ডক্টর ডেনিসের বয়ানে নারীদের ওপর যে নৃশংসতার কথা বলা রয়েছে, ঠিক তেমনই ইতিহাস আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালের। পাকিস্তানী আর্মি ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ওপর যে অত্যাচার, অবিচার, নির্যাতনের উৎসবে মেতে উঠেছিল সেই সব ঘটনার সঙ্গে আজকের রুয়ান্ডা, সুদান কিংবা কঙ্গোর ঘটনা একেবারেই আলাদা কিছু নয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রের ৮ম খণ্ড যেটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হয়েছে সেই বইয়ের ৪৪ পৃষ্ঠা থেকে আমি চুন্নু ডোমের কিছু কথা বলতে চাই। চুন্নু ডোম ২৯ মার্চ ১৯৭১ সালে তাঁর ইন্সপেক্টর ইদ্রিস সাহেবের নির্দেশে ঢাকার মিডফোর্ট হসপিটালে যান। সেখান থেকে তিনি অসংখ্য নারী-পুরুষের পচা, গলা, বিকৃত লাশ ক্রমাগত ট্রাকে ওঠাতে থাকেন তাঁর সঙ্গে থাকা অনেক ডোমের সঙ্গে। সেই লাশ ওঠানোর কাহিনী বড় মর্মান্তিক, বড় যন্ত্রণার। আমি কেবল চুন্নু ডোমের বর্ণনায় উঠে আসা নারীদের লাশের বর্ণনা দিচ্ছি এই অংশে। চুন্নু ডোম বলেন, ‘আমরা লাশ ঘরে প্রবেশ করে বহু যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ, শিশু, কিশোরের স্তূপীকৃত লাশ দেখলাম। আমি এবং বদলু ডোম লাশ ঘর থেকে লাশের পা ধরে টেনে ট্রাকের সামনে জড়ো করেছি। আর গণেশ, রঞ্জিত (লাল বাহাদুর) এবং কানাই লোহার কাঁটা দিয়ে বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে পচা, গলিত লাশ ট্রাকে তুলেছে। প্রতিটি লাশ গুলিতে ঝাঁজরা দেখেছি, মেয়েদের লাশের কারও স্তন পাই নাই, যোনিপথ ক্ষতবিক্ষত এবং পেছনের মাংস কাটা দেখেছি। মেয়েদের লাশ দেখে মনে হয়েছে তাদের হত্যা করার পূর্বে তাদের স্তন সজোরে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, যোনিপথে লোহার রড কিংবা বন্দুকের নল ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। যুবতী মেয়েদের যোনিপথের এবং পেছনের মাংস যেন ধারালো চাকু দিয়ে কেটে এ্যাসিড দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে।
গত ১০ জুন থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত লন্ডনের ডকল্যান্ডের এক্সেল এক্সিবিশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গ্লোবাল সামিট-২০১৪। এই সামিটের হোস্ট ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ আর টঘঐজ-এর বিশেষ দূত এঞ্জেলিনা জোলি এই সামিটে এসেছিলেন অতিথি হয়ে। যুদ্ধকালে নারীদের ওপর নানাবিধ যৌন নির্যাতন বন্ধ করার সঙ্কল্পে তথা এই ব্যাপারে পৃথিবীব্যাপী একটি বৈশ্বিক জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই গ্লোবাল সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সামিটের মূল লক্ষ্যগুলো হচ্ছে-
1) To improve investigations/ documentation of sexual violence in conflict;
2) To provide greater support and assistance and repraration for survivors, including child survivors, of sexual violence;
3) To ensure sexual and gender based violence responses and the promotion of gender equality are fully integrated in all pease and security efforts, including security and justice sector reform; and
4) To improve international strategic co-ordination.
জাতিসংঘের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য রাষ্ট্র এই উদ্যোগের প্রেক্ষিতে গৃহীত প্রকল্পে স্বাক্ষর করে এই ইনিশিয়েটিভের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। পুরো পৃথিবী থেকে প্রায় ৬০ মন্ত্রী এবং প্রায় ২৩০ জন সরকারী কর্মকর্তা এই সামিটে যোগ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ থেকেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী, ইউনাইটেড নেশন্সের কর্মকর্তা মুনা তাসনীম বাংলাদেশের হাইকমিশনার মিজারুল কায়েসসহ অনেকেই। ২০১৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের উদ্যোগে সকল সিগনেটোরি রাষ্ট্রের সম্মতিক্রমে স্বাক্ষরিত হয় একটি ডিক্লারেশন অব কমিটমেন্ট। যেই কমিটমেন্ট পত্রে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখিত ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে নারীদের ওপর সহিংসতা বন্ধের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব এবং যাঁরা এরই মধ্যে নির্যাতিত হয়েছেন তাঁদের পুনর্বাসনের ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় এবং অপরাধীদের শনাক্তকরণ পরবর্তী বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।
কিন্তু সবচাইতে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এই পুরো সম্মেলনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ওপর এই ভয়াবহ নির্যাতনের ওপর কোন আলোকপাত হয়নি। অনুষ্ঠানে শত শত উন্মুক্ত অনুষ্ঠান যেমন নাটক, ডিস্কাশন, চলচ্চিত্র, ডকুমেন্টারি, সাক্ষাতকার ইত্যাদি থাকলেও উপেক্ষিত ছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সরকারীভাবে এই অনুষ্ঠানকে নিয়ে কোন আয়োজন না থাকায় ইতিহাসের এত বড় গণহত্যা ও বিভীষিকার কথা অনেকটা অজানাই থেকে গিয়েছিল বিশ্ববাসীর কাছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বড় আকারে ১৯৭১ সালেই মূলত সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের সব চাইতে বড় বর্বরতম গণহত্যা। যেই গণহত্যায় ৩০ লাখেরও বেশি মানুষকে মেরে ফেলেছিল পাকিস্তানী আর্মি এবং এই যুদ্ধে নির্যাতিত হয়েছিল প্রায় দুই লাখ মা-বোন। এমনই একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতায় এই ধরনের সম্মেলনে বাংলাদেশের এমন অনুপস্থিতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে।
সম্মেলনের এক অংশে বিভিন্ন দেশের স্টল সজ্জিত ছিল। যেসব স্টলে ওই সব দেশ যেমন রুয়ান্ডা, কঙ্গো, সিয়েরা লিওন, কেনিয়া তাঁদের নিজেদের দেশে হয়ে যাওয়া গণহত্যার বর্ণনা করেছেন, লিফলেট দিয়েছেন, নির্যাতিত নারীদের হাতে তৈরি হ্যান্ডিক্রাফট, ছবিসহ নানান শিল্প কর্ম সেখানে সজ্জিত ছিল। সাধারণ মানুষ যেসব স্টলে গিয়ে গিয়ে জেনেছেন বিভিন্ন যুদ্ধে সহিংসতার শিকার নারীদের শোকগাথা।
বাংলাদেশের উপেক্ষার ফলশ্রুতিতে যুক্তরাজ্য গণজাগরণ মঞ্চ সম্মেলনের এই চারদিনে নানান ধরনের কর্মসূচী নিয়ে সামনে এগিয়ে আসে। সম্মেলনের প্রধান ফটকের সামনে মানববন্ধন, প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনী, লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন ডিস্কাশন অনুষ্ঠানের কক্ষে গিয়ে তাদের কর্মীদের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ উত্থাপন করা এসব কর্মসূচীর ভেতর ছিল। বিতরণকৃত লিফলেটে ছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে নারীদের ওপর পাকিস্তানী আর্মিদের অত্যাচার করার ইতিহাস আর তার সকল বর্ণনা। এই লিফলেটে বাংলাদেশকে উপেক্ষার ব্যাপারে প্রতিবাদও জানানো হয়।
সম্মেলনের চারটি দিনেই ব্রিটেনের বাংলাদেশী অনেক সংগঠন থেকে (ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, ইউকে, গণজাগরণ মঞ্চ, ইউকে সিপিবি, বাসদ, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, নারী অধিকার সংগঠন নারী দিগন্ত, নারী চেতনা, সাংস্কৃতিক সংগঠন-অনুশীলন) একটি মেমোরান্ডাম এই সামিটের আয়োজক ফরেন এ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসে (ঋঈঙ) পাঠানো হয়। এই মেমোরান্ডামে বাংলাদেশ বিষয়ে সামিটের আশ্চর্যজনক নীরবতার প্রতিবাদ জানানো হয় এবং সেই সঙ্গে সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি জানানো হয়। গণজাগরণ মঞ্চ যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে এই চার দিনে প্রচুর লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে সামিটে আগত ইন্টারন্যাশনাল ব্লগার, সাংবাদিক মানবাধিকার কর্মীসহ বিদেশী অতিথিদের মধ্যে। সম্মেলনে আগত সাধারণ মানুষ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীদের এই লিফলেট বিতরণকালে জেনেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যার বিষয়ে, কতটা পাশবিকভাবে বাংলাদেশের নারীরা নির্যাতিত হয়েছিলেন, কী করে নারীদের ওপর নেমে এসেছিল যৌন সহিংসতা সে সবের আদ্যোপান্তও সম্মেলনে আসা হাজার হাজার মানুষ জেনেছেন। এই সম্মেলন উপলক্ষে যুক্তরাজ্য গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা প্রায় দুই হাজার লিফলেট বিতরণ করেন। চারদিনব্যাপী এই সম্মেলনে যুক্তরাজ্য গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছিলেন ব্রিটেনের স্বাধীনতার পক্ষের অনেক মানুষ।
যে নারীরা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানী আর্মিদের বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, যাঁরা দেশের জন্য দিয়েছেন সব, যাঁরা হারিয়েছেন জীবনের সকল রং, আলো আর ভালবাসা, প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ তাদের কিছুই দিতে পারেনি।
স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও যদি আমরা শুধু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করি, কী দিতে পেরেছি এই সব নির্যাতিত সব হারানো মা আর বোনকে? হয়ত সঠিক উত্তর হবে নীরবতা। আমরা হয়ত থমকে গিয়ে উত্তরই দিতে পারব না, কেননা আমাদের উত্তর দেয়ার কিছু নেই। মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পরে পরেরই একটি চিত্র তুলে ধরছি নীলিমা ইব্রাহিমের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ থেকে-
বীরাঙ্গনা রীনা লেখক নীলিমা ইব্রাহিমকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী স্মৃতি থেকে বলেন-
বাঙ্কার থেকে আমাকে যখন ভারতীয় বাহিনীর এক সদস্য অর্ধ উলঙ্গ এবং অর্ধমৃত অবস্থায় টেনে তোলে তখন আশপাশের দেশবাসীর চোখে মুখে যে ঘৃণা ও বঞ্চনা আমি দেখেছিলাম তাতে দ্বিতীয়বার আর চোখ তুলতে পারিনি। জঘন্য ভাষায় যেসব মন্তব্য আমার দিকে তারা ছুড়ে দিচ্ছিল, ভাগ্যিস বিদেশীরা আমাদের সহজ বুলি বুঝতে পারেনি।
প্রশ্ন এসেই যায় স্বাভাবিকভাবে আমরা কি আদৌ আমাদের এই তৃতীয় শ্রেণীর মানসিকতা থেকে বের হতে পেরেছি? উত্তরটা সোজা। আমরা পারিনি। আর পারিনি বলেই স্বাধীনতার এতটা বছর পর মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত, নিগৃহীত, নিষ্প্রেষিত, অবহেলিত নারীদের কথা আমরা না পেরেছি দেশের মানুষকে সঠিকভাবে জানাতে, বোঝাতে, উপলব্ধি করাতে। না পেরেছি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে।
নীলিমা ইব্রাহিমের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ বই থেকে আরও জানা যায়, বীরাঙ্গনা শেফা নীলিমা ইব্রাহিমকে রাজাকার ফারুকের স্বাধীনতা-পরবর্তী অবস্থান বর্ণনা করেন এভাবে- ‘ফারুক এখন জজ সাহেব। আর কখনও হাফ হাতা শার্ট পরে না। কেউ হাতের দাগ দেখে ফেললে বলে মুক্তিযুদ্ধে আহত হয়েছিল বেয়োনেট চার্জে’
এই ফারুক হচ্ছে তো সেই ফারুক যে কিনা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী বর্বর সৈন্যদের কাছে তুলে দিয়েছিল শেফাকে। যেই হাতের দাগ হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বেয়োনেট চার্জে, সেই হাত যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে হয়ে গিয়েছে মুক্তিযোদ্ধার হাত। সেই হাতের ক্ষত এসেছে অন্য ইতিহাস হয়ে। বলা হয়েছে ফারুক মুক্তিযুদ্ধ করতে গিয়ে আহত হয়েছে। ঘরের ভেতর মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস, স্বাধীনতাবিরোধীদের সন্তানরা সব ঘিরে ফেলেছে আর ফেলছে ক্রমাগত, আন্তর্জাতিকভাবে এখনও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিগণিত হয় সিভিল ওয়ার হিসেবে। আজও পৃথিবীর মানুষ জানে না আমাদের মায়েদের ওপর পাকিস্তানী আর্মি আর তাদের এই দেশীয় দোসরদের সহায়তায় কী করে অত্যাচার করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধকালে। আজও এই অধ্যায়টি বড় বেশি অস্পষ্ট, ধোঁয়াশে, অন্ধকারাচ্ছন্ন।
লন্ডনের এই যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতা বন্ধে যে সম্মেলন হয়ে গেল সেখানে বাংলাদেশ সরকার ব্যর্থ হলেও হয়নি গণজাগরণ মঞ্চ। যে আশার প্রদীপ তাঁরা জ্বালিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের প্রতিটি স্থানে সেই আশার প্রদীপ যুক্তরাজ্যের গণজাগরণ মঞ্চের মাধ্যমে ছড়িয়েছে এবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও।
রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে হয়ত এভাবে জেগে ওঠে মানুষ। সাধারণ জনতা। এভাবেই তারা সত্য ছড়িয়ে দেয়।
লেখক : টঘঐজ প্রতিনিধি
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
No comments:
Post a Comment