নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ॥ ৭১ কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হচ্ছে
শোকজ একচল্লিশটিকে, লাইসেন্স বাতিল একটির
নিখিল মানখিন ॥ অবশেষে নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনের দায়ে ৭১টি ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করেছে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর। অদৃশ্য কারণে গত দু’বছর সময়ক্ষেপণের পর বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের নির্দেশে ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে মিস্টিক ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড নামে একটি কোম্পানির লাইসেন্স সাময়িকভাবে বাতিল করে এর ওষুধ উৎপাদন, মজুদ, বিক্রয় ও বিতরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ৪১টি কোম্পানিকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়া হয়েছে। ১৭টিতে পুনর্পরিদর্শন চলছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম জনকণ্ঠকে বলেন, জনস্বাস্থ্যবিরোধী কোন ধরনের অসাধুতা সহ্য করা হবে না। কোন অবস্থাতেই অভিযুক্ত ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা থেকে পিছ পা হবে না সরকার।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এবং মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে ৭১টি ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে নিম্নমানের জনস্বাস্থ্যবিরোধী ওষুধ উৎপাদনের তথ্যপ্রমাণসহ রিপোর্ট দিয়ে শাস্তির সুপারিশ করেছে দুই বছর আগে। অদৃশ্য কারণে গত দুই বছর এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এই সময় কোম্পানিগুলো নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত অব্যাহত রেখেছিল। বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম দায়িত্ব নিয়ে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। মন্ত্রীর নির্দেশের পর ওই সব অভিযুক্ত ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। ব্যবস্থা গ্রহণের আগে প্রথমে ৪১টি ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করেছে ওষুধ প্রশাসন। সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে কোম্পানিগুলোর লাইসেন্স বাতিল করা হবে। ইতোমধ্যে মিস্টিক লিমিটেডকে কারণ দর্শানোর নোটিস জারির পর সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারায় তাদের লাইসেন্স সাময়িক বাতিল করা হয়েছে।
ওষুধ প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, আদালতের স্থগিতাদেশ থাকার কারণে ১৪টির বিরুদ্ধে আপাতত ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। অভিযুক্ত অপর ১৭টি কোম্পানি পুনর্পরিদর্শনের কাজ চলছে। পরিদর্শন শেষে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অভিযোগ উঠেছে, সাময়িক লাইসেন্স বাতিল ও শোকজ নোটিসপ্রাপ্ত কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ বানচাল করতে নানাভাবে উঠেপড়ে লেগেছে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন মহলে দেনদরবার চালাচ্ছে তারা। তবে চূড়ান্তভাবে অভিযুক্ত ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। তিনি জনকণ্ঠকে জানান, তদন্ত কমিটির দু’দফা পরিদর্শন এবং কমিটির দেয়া শাস্তির সুপারিশ কার্যকর করতে সময়ক্ষেপণ হওয়ার পেছনে নিহিত কারণসমূহ খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত কমিটির দ্বারা অভিযুক্ত মিস্টিকের লাইসেন্স ইতোমধ্যে সাময়িক বাতিল করা হয়েছে। ৭১টি ওষুধ কোম্পানির মধ্যে অধিকাংশ কোম্পানিকে ইতোমধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়া হয়েছে। আর যেসব কোম্পানি কৌশলে আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে রেখেছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনী উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিরোধী কোন ধরনের অসাধুতা সহ্য করা হবে না। কোন অবস্থাতেই অভিযুক্ত ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা থেকে পিছ পা হব না বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।
ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক গোলাম কিবরিয়া ৪১ কোম্পানিকে নোটিস পাঠানোর খবরটি নিশ্চিত করে বলেন, ৪১টি কোম্পানিকে নোটিস পাঠানো হয়েছে। কোম্পানিগুলোকে ১৫ দিনের মধ্যে নোটিসের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এটা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রথম ধাপ। নোটিসের জবাব পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও জানান, যে ১৪ কোম্পানিকে শোকজ করা যায়নি, তাদের ইতোপূর্বে কারখানা বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে আসে। আর অভিযুক্ত অপর ১৭টি কোম্পানি পুনর্পরিদর্শনের কাজ এখনও শেষ হয়নি। একটি কোম্পানি শুধু ভেটেরিনারি আইটেম উৎপাদন করবেÑ এ শর্তে কাজ চালাতে পারবে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে তদন্ত কমিটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত সরকারের আমলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এবং মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি ইতোপূর্বে দু’দফা পরিদর্শন শেষে ২০১২ সালে মোট ৭১টি কোম্পানিকে নিম্নমানের হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তির সুপারিশ করেছিল। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি প্রায় দু’বছর আটকে থাকায় অভিযুক্ত কোম্পানিগুলো নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ও বিপণনের সুযোগ পেয়েছে। দুই তদন্ত কমিটির সুপারিশে শাস্তির তাগিদ থাকলেও সেটা বাস্তবায়নে রহস্যজনক কারণে প্রায় দু’বছর গড়িমসি করেছে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর। এর আগে ২০০৯ সালের আগস্ট মাসে রিড ফার্মাসিউটিক্যালসের উৎপাদিত বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে কিডনি বিকল হয়ে ২৫ শিশুর করুণ মৃত্যু ঘটে। ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে সারাদেশের ওষুধ কারখানা সরেজমিন পরিদর্শনের লক্ষ্যে সাবেক সংসদ সদস্য নাজমুল হাসান পাপনকে প্রধান করে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ৮ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কমিটি গঠনের তিন মাসের মধ্যে সারাদেশ সরেজমিন ঘুরে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করার কথা বলা হয়। ঢাকঢোল পিটিয়ে সব মিডিয়ার কর্মীকে ডেকে এ ঘোষণা দিয়েও শুরু হয় সময়ক্ষেপণ। প্রায় দু’বছর পর কমিটির সদস্যরা সারাদেশে পরিদর্শনের কাজ শেষ করেন। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে নানা টালবাহানা শুরু হয়। তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা যায়, ওই সময় দেশের ২৪৭টি এ্যালোপ্যাথি ওষুধ কারখানার মধ্যে কমিটির সদস্যরা ২শ’টি সরেজমিন পরিদর্শন করেন। ওই সময় তাঁরা অধিকাংশ কমিটির কারখানার ওষুধ উৎপাদন পদ্ধতি, মান ও পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। পরিদর্শনের সময় কমিটির সদস্যরা তাঁদের অসন্তুষ্টির কথা কারখানা মালিকদের সামনেই প্রকাশ করেন। দেশে বর্তমানে ৫০টি ওষুধ কোম্পানি তাদের মান বজায় রেখে ওষুধ প্রস্তুত ও বাজারজাত করছে বলে প্রকাশ পায়। এর বাইরে ১২০টি কোম্পানির ওষুধ মাঝারি মানের। বাকি ৫০টি কোম্পানি ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন করে বলে জানা গেছে। এমন প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়ার পরও পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সময়ক্ষেপণ হয়ে গেল আরও দু’বছর।
নিম্নমানের ওষুধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এবং ডক্টরস অব হেলথ এ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই-মাহাবুব জনকণ্ঠকে জানান, দেশে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। বাড়াতে হবে মনিটরিং কার্যক্রম। পরীক্ষার আওতার বাইরে থাকা ওষুধগুলো অবশ্যই জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। পাশাপাশি ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের জনবল ও কার্যদক্ষতাও বাড়াতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ জনকণ্ঠকে জানান, যে কোন ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ গ্রহণ করাই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মান ঠিক না থাকলে গ্রহণকারীর মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এ ধরনের ওষুধ ব্যবহারকারীরা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এমনকি তাঁদের কেউ কেউ মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়তে পারেন। মানবহির্ভূত ওষুধ এড়িয়ে চলার জন্য জনসাধারণকে পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ।
ফার্মাসিউটিক্যালস সোসাইটির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক জনকণ্ঠকে জানান, ভেজাল রোধ করতে হলে নিয়মিত মনিটরিংয়ের বিকল্প নেই। যে কোনভাবে মনিটরিং ব্যবস্থা সচল রাখতে হবে। জেলা পর্যায়ে সম্ভব না হলেও বিভাগীয় পর্যায়ে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি গড়ে তুলতে হবে। শুধু গড়ে তুললেই হবে না, জনবল ও পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি দিয়ে ল্যাবরেটরিগুলো গতিশীল করে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে যথাযথ সরকারী সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা থাকতে হবে। কোম্পানিগুলোকে সঠিক মানের ওষুধ বানাতে বাধ্য করতে হবে। শুধু তাই নয়, ওষুধ প্রশাসনের লোকজন যাতে প্রভাবিত না হতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিকে স্বায়ত্তশাসিত ক্ষমতা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ল্যাব হবে পুরোপুরিভাবে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানকে সকল ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব ও হুমকি থেকে মুক্ত রাখতে হবে। তিনি বলেন, দেশে এখনও ভাল ওষুধ কোম্পানির সংখ্যাই বেশি। তবে কিছু কিছু দেশীয় কোম্পানি মানহীন ওষুধ তৈরি করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
মানবহির্ভূত ওষুধ নিয়ন্ত্রণে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের ভূমিকায় সন্তুষ্ট নন বিশেষজ্ঞরা। পরিদফতর থেকে অধিদফতরে রূপ নেয়ার এক বছর পরও খুব একটা গতিশীল হতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। জনবল, যন্ত্রপাতি ও অভিযান সহায়ক যানবাহনের অবস্থাও আগের মতোই রয়ে গেছে। ঘোষণা দিয়েও তারা ভেজাল ওষুধবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারছে না। অধিদফতরের এমন দুর্বলতার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে ভেজাল ওষুধ। দেশে প্রায় ২শ’টি ওষুধ কোম্পানি নিম্নমানের ওষুধ বাজারজাত করছে। এর মধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের আবেদন করেই ওষুধ প্রস্তুত করে চলেছে। এর মধ্যে রয়েছে ওষুধ আদালতের সীমাবদ্ধতা। সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত না থাকায় ওই সব অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না ওষুধ আদালতও। ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে জনস্বাস্থ্যের বিপর্যয় ঘটবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এবং মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে ৭১টি ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে নিম্নমানের জনস্বাস্থ্যবিরোধী ওষুধ উৎপাদনের তথ্যপ্রমাণসহ রিপোর্ট দিয়ে শাস্তির সুপারিশ করেছে দুই বছর আগে। অদৃশ্য কারণে গত দুই বছর এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এই সময় কোম্পানিগুলো নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত অব্যাহত রেখেছিল। বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম দায়িত্ব নিয়ে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। মন্ত্রীর নির্দেশের পর ওই সব অভিযুক্ত ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। ব্যবস্থা গ্রহণের আগে প্রথমে ৪১টি ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করেছে ওষুধ প্রশাসন। সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে কোম্পানিগুলোর লাইসেন্স বাতিল করা হবে। ইতোমধ্যে মিস্টিক লিমিটেডকে কারণ দর্শানোর নোটিস জারির পর সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারায় তাদের লাইসেন্স সাময়িক বাতিল করা হয়েছে।
ওষুধ প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, আদালতের স্থগিতাদেশ থাকার কারণে ১৪টির বিরুদ্ধে আপাতত ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। অভিযুক্ত অপর ১৭টি কোম্পানি পুনর্পরিদর্শনের কাজ চলছে। পরিদর্শন শেষে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অভিযোগ উঠেছে, সাময়িক লাইসেন্স বাতিল ও শোকজ নোটিসপ্রাপ্ত কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ বানচাল করতে নানাভাবে উঠেপড়ে লেগেছে। এ ব্যাপারে বিভিন্ন মহলে দেনদরবার চালাচ্ছে তারা। তবে চূড়ান্তভাবে অভিযুক্ত ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। তিনি জনকণ্ঠকে জানান, তদন্ত কমিটির দু’দফা পরিদর্শন এবং কমিটির দেয়া শাস্তির সুপারিশ কার্যকর করতে সময়ক্ষেপণ হওয়ার পেছনে নিহিত কারণসমূহ খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত কমিটির দ্বারা অভিযুক্ত মিস্টিকের লাইসেন্স ইতোমধ্যে সাময়িক বাতিল করা হয়েছে। ৭১টি ওষুধ কোম্পানির মধ্যে অধিকাংশ কোম্পানিকে ইতোমধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়া হয়েছে। আর যেসব কোম্পানি কৌশলে আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে রেখেছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনী উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিরোধী কোন ধরনের অসাধুতা সহ্য করা হবে না। কোন অবস্থাতেই অভিযুক্ত ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা থেকে পিছ পা হব না বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।
ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক গোলাম কিবরিয়া ৪১ কোম্পানিকে নোটিস পাঠানোর খবরটি নিশ্চিত করে বলেন, ৪১টি কোম্পানিকে নোটিস পাঠানো হয়েছে। কোম্পানিগুলোকে ১৫ দিনের মধ্যে নোটিসের জবাব দিতে বলা হয়েছে। এটা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রথম ধাপ। নোটিসের জবাব পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও জানান, যে ১৪ কোম্পানিকে শোকজ করা যায়নি, তাদের ইতোপূর্বে কারখানা বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে আসে। আর অভিযুক্ত অপর ১৭টি কোম্পানি পুনর্পরিদর্শনের কাজ এখনও শেষ হয়নি। একটি কোম্পানি শুধু ভেটেরিনারি আইটেম উৎপাদন করবেÑ এ শর্তে কাজ চালাতে পারবে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে তদন্ত কমিটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত সরকারের আমলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এবং মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি ইতোপূর্বে দু’দফা পরিদর্শন শেষে ২০১২ সালে মোট ৭১টি কোম্পানিকে নিম্নমানের হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তির সুপারিশ করেছিল। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি প্রায় দু’বছর আটকে থাকায় অভিযুক্ত কোম্পানিগুলো নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন ও বিপণনের সুযোগ পেয়েছে। দুই তদন্ত কমিটির সুপারিশে শাস্তির তাগিদ থাকলেও সেটা বাস্তবায়নে রহস্যজনক কারণে প্রায় দু’বছর গড়িমসি করেছে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর। এর আগে ২০০৯ সালের আগস্ট মাসে রিড ফার্মাসিউটিক্যালসের উৎপাদিত বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে কিডনি বিকল হয়ে ২৫ শিশুর করুণ মৃত্যু ঘটে। ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে সারাদেশের ওষুধ কারখানা সরেজমিন পরিদর্শনের লক্ষ্যে সাবেক সংসদ সদস্য নাজমুল হাসান পাপনকে প্রধান করে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ৮ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কমিটি গঠনের তিন মাসের মধ্যে সারাদেশ সরেজমিন ঘুরে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করার কথা বলা হয়। ঢাকঢোল পিটিয়ে সব মিডিয়ার কর্মীকে ডেকে এ ঘোষণা দিয়েও শুরু হয় সময়ক্ষেপণ। প্রায় দু’বছর পর কমিটির সদস্যরা সারাদেশে পরিদর্শনের কাজ শেষ করেন। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে নানা টালবাহানা শুরু হয়। তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা যায়, ওই সময় দেশের ২৪৭টি এ্যালোপ্যাথি ওষুধ কারখানার মধ্যে কমিটির সদস্যরা ২শ’টি সরেজমিন পরিদর্শন করেন। ওই সময় তাঁরা অধিকাংশ কমিটির কারখানার ওষুধ উৎপাদন পদ্ধতি, মান ও পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। পরিদর্শনের সময় কমিটির সদস্যরা তাঁদের অসন্তুষ্টির কথা কারখানা মালিকদের সামনেই প্রকাশ করেন। দেশে বর্তমানে ৫০টি ওষুধ কোম্পানি তাদের মান বজায় রেখে ওষুধ প্রস্তুত ও বাজারজাত করছে বলে প্রকাশ পায়। এর বাইরে ১২০টি কোম্পানির ওষুধ মাঝারি মানের। বাকি ৫০টি কোম্পানি ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন করে বলে জানা গেছে। এমন প্রতিবেদন প্রকাশ পাওয়ার পরও পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সময়ক্ষেপণ হয়ে গেল আরও দু’বছর।
নিম্নমানের ওষুধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এবং ডক্টরস অব হেলথ এ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই-মাহাবুব জনকণ্ঠকে জানান, দেশে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। বাড়াতে হবে মনিটরিং কার্যক্রম। পরীক্ষার আওতার বাইরে থাকা ওষুধগুলো অবশ্যই জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। পাশাপাশি ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের জনবল ও কার্যদক্ষতাও বাড়াতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ জনকণ্ঠকে জানান, যে কোন ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ গ্রহণ করাই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মান ঠিক না থাকলে গ্রহণকারীর মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এ ধরনের ওষুধ ব্যবহারকারীরা নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এমনকি তাঁদের কেউ কেউ মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়তে পারেন। মানবহির্ভূত ওষুধ এড়িয়ে চলার জন্য জনসাধারণকে পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ।
ফার্মাসিউটিক্যালস সোসাইটির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক জনকণ্ঠকে জানান, ভেজাল রোধ করতে হলে নিয়মিত মনিটরিংয়ের বিকল্প নেই। যে কোনভাবে মনিটরিং ব্যবস্থা সচল রাখতে হবে। জেলা পর্যায়ে সম্ভব না হলেও বিভাগীয় পর্যায়ে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি গড়ে তুলতে হবে। শুধু গড়ে তুললেই হবে না, জনবল ও পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি দিয়ে ল্যাবরেটরিগুলো গতিশীল করে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে যথাযথ সরকারী সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা থাকতে হবে। কোম্পানিগুলোকে সঠিক মানের ওষুধ বানাতে বাধ্য করতে হবে। শুধু তাই নয়, ওষুধ প্রশাসনের লোকজন যাতে প্রভাবিত না হতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিকে স্বায়ত্তশাসিত ক্ষমতা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ল্যাব হবে পুরোপুরিভাবে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানকে সকল ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব ও হুমকি থেকে মুক্ত রাখতে হবে। তিনি বলেন, দেশে এখনও ভাল ওষুধ কোম্পানির সংখ্যাই বেশি। তবে কিছু কিছু দেশীয় কোম্পানি মানহীন ওষুধ তৈরি করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
মানবহির্ভূত ওষুধ নিয়ন্ত্রণে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের ভূমিকায় সন্তুষ্ট নন বিশেষজ্ঞরা। পরিদফতর থেকে অধিদফতরে রূপ নেয়ার এক বছর পরও খুব একটা গতিশীল হতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। জনবল, যন্ত্রপাতি ও অভিযান সহায়ক যানবাহনের অবস্থাও আগের মতোই রয়ে গেছে। ঘোষণা দিয়েও তারা ভেজাল ওষুধবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারছে না। অধিদফতরের এমন দুর্বলতার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে ভেজাল ওষুধ। দেশে প্রায় ২শ’টি ওষুধ কোম্পানি নিম্নমানের ওষুধ বাজারজাত করছে। এর মধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের আবেদন করেই ওষুধ প্রস্তুত করে চলেছে। এর মধ্যে রয়েছে ওষুধ আদালতের সীমাবদ্ধতা। সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত না থাকায় ওই সব অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না ওষুধ আদালতও। ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে জনস্বাস্থ্যের বিপর্যয় ঘটবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
http://www.dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=15&dd=2014-06-02&ni=174706
No comments:
Post a Comment