পর্দা উঠছে বিশ্বকাপের
০ উদ্বোধনী ম্যাচে রাত ২টায় মুখোমুখি ব্রাজিল-ক্রোয়েশিয়া
০ নেইমারদের হেক্সা জয়ের মিশন শুরু
০ মহারণে শামিল হচ্ছে ফুটবলবিশ্ব
০ নেইমারদের হেক্সা জয়ের মিশন শুরু
০ মহারণে শামিল হচ্ছে ফুটবলবিশ্ব
মজিবর রহমান, ব্রাজিল থেকে ॥ ‘উই আর ওয়ান’- আমরা সবাই এক। আর গোটাবিশ্বকে এক সুতোয় গাঁথতে ‘ওয়ান রিদম’ স্লোগান দিয়ে শুরু হচ্ছে ময়দানী লড়াই। আর নয় অপেক্ষা- দেখতে দেখেতেই যেন এসে গেল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বত্রিশ দেশ ৬৪ ম্যাচ-ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দৌড়ে কোন্ দল এগিয়ে পরীক্ষা শুরু। ফুটবল মানেই ব্রাজিল। আর ব্রাজিলের মাটিতেই আজ থেকে শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ নামক বিশ্ব ফুটবলের মহাযজ্ঞ। ফুটবলারদের পায়ে-বলের নজরকাড়া জাদু, এখানেও আরেকটা লড়াই। এবার কার পায়ে মাতবে বিশ্ব? মুখিয়ে আছেন বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী মানুষ তা উপভোগ করতে। গোটাবিশ্বের ক্রীড়াপ্রেমী মানুষের চোখ এখন নেইমারের দেশ ব্রাজিলের ওপর। এ তো গেল খেলার খবর! স্বাগতিক ব্রাজিল ও ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচ দিয়ে ময়দানী লড়াই শুরুর আগে ২৫ মিনিটের মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান। যাঁর অন্যতম আকর্ষণই যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত পপসঙ্গীতশিল্পী যুগল পিটবুল ও জেনিফার লোপেজের কোমর দোলানো ‘থিম সং।’ সঙ্গে থাকছেন ব্রাজিলের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্প ক্লদিয়া লেইতে।
সময়ের বিবর্তনে এবারের বিশ্বকাপে থাকছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির চমক। পাক্কা চার বছর পর চলে আসা বিশ্বকাপের মান বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ফিফা এবার ফুটবলের ময়দানে ব্যবহার করবে একাধিক প্রযুক্তি। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ‘গোললাইন টেকনোলজি’- যার বদৌলতে রেফারির চোখ এড়ানোর উপায় নেই ব্রাজিল বিশ্বকাপের বল ব্রাজুকা কোথায় কী করছে। গোললাইনে থাকবে কিছু সেন্সর আর ম্যাচ রেফারির হাতে থাকবে বিশেষ এক ঘড়ি। বল গোললাইন অতিক্রম করা মাত্রই সেন্সর সঙ্কেত পাঠাবে রেফারির হাতের ঘড়িতে। রেফারি পরিষ্কারভাবে গোল হতে না দেখতে পেলেও বল গোললাইন পার করলে সেন্সর কখনই ওই সঙ্কেত পাঠাতে ভুল করবে না। ফলে অতীতের মতো এবারের বিশ্বকাপে গোল নিয়ে গোলমাল থাকবে না বললেই চলে। আছে ‘ভ্যানিশিং স্প্রে’-যার মাধ্যমে ফ্রি-কিকের নির্ধারিত স্থান, কোন্ জায়গা থেকে নিতে হবে কিক, প্রতিপক্ষ ফুটবলাররা কোন পজিশনে নিয়ম অনুযায়ী দেয়াল সৃষ্টি করতে পারবেন তা নির্দিষ্ট করে দেবে এই রাসায়নিক স্প্রে। খেলা শুরুর আগে মাঠের স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে ছিটিয়ে দেয়া হবে। কয়েক মিনিটের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পরিবেশবান্ধব এই স্প্রে। যা ম্যাচ চলাকালীন রেফারিকে ফ্রি-কিক নেয়ার স্থান নির্ধারণে সহায়তা করবে। দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় শহর সাও পাওলো। সবচেয়ে বেশি মানুষের বসবাস এ শহরে। আর এখানেই অনুষ্ঠিত হবে উদ্বোধনী ম্যাচ, যে লড়াইয়ে সবার আগে মাঠে নামছে স্বাাগতিক ব্রাজিল। এ্যারেনা কোরিন্থিয়ান্স-সাও পাওলোর বিখ্যাত এই স্টেডিয়ামেই স্বাগতিক ব্রাজিল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে বিশ্বকাপ নামক বিশ্বকাঁপানো ফুটবলের ময়দানী লড়াই। বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় শুরু হবে ম্যাচ। তার আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই ফুরিয়ে গেল সময়। শুরু হয়ে যাচ্ছে ফুটবলের মহারণ। মাঠের যুদ্ধ তো আছেই। এর বাইরেও বর্ণিল এক আয়োজন। মহাযজ্ঞ মাতিয়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত পিটবুল ও জেনিফার লোপেজের যুগল সঙ্গীতের সুরের মূর্ছনার সঙ্গে উদ্যাম নৃত্য। আর ব্রাজিলের ঐহিত্য চোখ ধাঁধানো সাম্বা। তবে এখানেও থাকছে আরেকটা লড়াই। যে লড়াইয়ে গত দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকে পিছিয়ে পড়েছে ব্রাজিল। এটা কারও মনগড়া কথা নয়। খোদ ব্রাজিলিয়ানরাও স্বীকার করছেন ‘কলম্বিয়ার প্রখ্যাত পপ সঙ্গীতশিল্পী সাকিরার সেই ওয়াকা ওয়াকা... গানের কাছে ম্লান এবারের বিশ্বকাপের ‘থিমসং’ ওলে ওলা...। সাকিরার সুরেলা কণ্ঠই শুধু নয়। হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়ে ছিল ‘সেক্সি’ পোশাকে কোমর দোলানো নৃত্য। এবার সাকিরাকে মিস করবে ফুটবল বিশ্ব-তাঁর অগণিত ভক্ত বিশ্বকাপের মঞ্চে। তবে ফুটবলের সঙ্গে থাকছেন জনপ্রিয় এই শিল্পী ঘরণী হয়ে, দর্শক হিসেবে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের তারকা ফুটবলার জেরার্ড পিকের জীবনসঙ্গী সাকিরা ব্রাজিল বিশ্বকাপের খেলা দেখবেন সন্তান কোলে দর্শক হয়ে। তবে জেনিফার লোপেজ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকছেন না বলে জানা গেছে। তবে মাইকে তাঁর কণ্ঠ থাকবে পিটবুলের সঙ্গে। তবে আরেক আকর্ষণ ব্রাজিলের সবচেয়ে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী সুদর্শনা ক্লদিয়া লেইতেকে দেখা যাবে পিটবুলের পাশে বাহারি পোশাকে।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ড্রেস রিহার্সেল। মাইকের গর্জনে ক্ষণিক প্রকম্পিত হয়ে উঠছিল এ্যারেনা কোরিন্থিয়ান্স। কিন্তু অনুষ্ঠান ম্লান করে দেয় একটি দুর্ঘটনা। তার পরও প্রস্তুত আয়োজক ব্রাজিল। ২৫ মিনিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিখ্যাত দুই কণ্ঠশিল্পীর সঙ্গে মাঠে থাকবে ছয় শতাধিক পারফর্মার। এ ছাড়া যথারীতি উপস্থিত থাকবেন আয়োজক ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রোওসেফ, বিশ্ব ফুটবলের শাসক সংস্থা ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটারসহ বিভন্ন দেশ থেকে আগত আমন্ত্রিত অতিথি। তবে ব্রাজিলের আবহাওয়া ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা কখন যে কালো হয়ে আকস্মিক বৃষ্টি হয়ে ঝরবে বলা যায় না। আর বৃষ্টি মানেই তাপমাত্রার ওঠানামা। ফলে সাধারণ পোশাকের সঙ্গী হিসেবে সঙ্গে রাখতে হয় শীতবস্ত্র।
তবে বিশ্বকাপের অপার সৌন্দর্য রং ধরাতে পারেনি ব্রাজিলের মানুষের মনে। এটা কি অভিমান না চরিত্র বোঝা মুশকিল। ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের ৮৩ বছরের ইতিহাসে ১৯৫০ সালের পর এবার দ্বিতীয়বারের মতো স্বাগতিক হয়েছে ব্রাজিল। মাঝে দীর্ঘ একটা সময়। খেলার মাঠে ব্রাজিল তার চিরাচরিত রাজত্ব, দাপট অব্যাহত রাখলেও আয়োজক হিসেবে দেখার অভিজ্ঞতা আমাদের বয়সী মানুষের কাছে অজানা। অবশ্য এবার দেখলাম, জানলাম। আর স্বাগতিক দেশের চিত্র দেখে ব্রাজিলকে পাস মার্ক দিতে পারলাম না। কারণ শুধু খেলা নয়-খেলার বাইরেও যে উত্তেজনা সেই অপরূপ মুহূর্তগুলোর সঙ্গী হওয়ার যে আশা-আকাক্সক্ষা নিয়ে ব্রাজিল আসা, সেই স্বপ্নের সমাধি ইতোমধ্যে ঘটে গেছে। ব্রাজিলকে বলা হয় ফুটবলের দেশ। সেই ফুটবলের দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে পৃথিবীর ক্যানভাসে সার্থক, সুন্দর ছবি আঁকতে আয়োজক দেশে উন্মাদনার যে ঢেউ ওঠার কথা, তা চোখে পড়ল না। এটা ব্রাজিলিয়ানদের জন্য লজ্জা, নাকি চরিত্রই এ রকম- তাঁরাই ভাল বলতে পারবেন।
বিশ্বকাপ ফুটবল হচ্ছে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’- খেলাধুলার সবচেয়ে বড় আয়োজন। যার সঙ্গে তুলনা চলে না অন্য কোন ক্রীড়া আসরের। স্বাগতিক ব্রাজিল তো সবচেয়ে আলোচিত, ভক্ত, সমর্থক ছাড়াও অনেকে ধারণা করছেন কাপ এবার ব্রাজিলই জিতবে। এ ছাড়া অপার সৌন্দর্যের বিশ্বকাপ ফুটবলের ময়দানী লড়াইয়ে ব্রাজিলের পরই ফেবারিটের তালিকায় রয়েছে মেসির আর্জেন্টিনা। তবে কাপ লাতিন আমেরিকায় রাখতে এ দু’দলের বাইরে অন্য কারও সামর্থ্য নেই জোর দিয়েই বলা যায়। উরুগুয়ে, চিলি, কলম্বিয়াকে নিয়ে কিছুটা নাচানাচি হলেও লাভ নেই। আকস্মিক ঝড় তুললেও বিলীন হয়ে যাবে ‘শিরোপা’ নামক মহানায়ককে স্পর্শ করার অনেক আগেই। একইভাবে আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে ক্যামেরুন, ঘানা, নাইজিরিয়াও দু-একটি ম্যাচে তাক লাগিয়ে বা শিরোপা প্রত্যাশী প্রতিপক্ষ দলের বারোটা বাজিয়ে নিজেরাও ঝরে পড়বে একপর্যায়ে এসে। আর এশিয়া- একজন এশিয়াবাসী হিসেবে বলতে কষ্ট হলেও নির্জলা বাস্তব, বিশ্বকাপে বাজির ঘোড়া হতে আরও সময় লাগবে। তবে এগোচ্ছে কোরিয়া-জাপান। সঙ্গত কারণে বলতে হচ্ছে মূল লড়াইটা আসলে আমেরিকা আর ইউরোপের মধ্যেই এখনও সীমাবদ্ধ। এবারও ব্যত্যয় ঘটার কথা নয়। যদিও পণ্ডিতরা বলে থাকেন ‘গোলের খেলা ফুটবলে কোনকিছুই অসম্ভব নয়।’ হ্যাঁ, সেটার নির্ধারিত একটা সময়ও আছে। গ্রুপ পর্ব থেকে বড়জোর কোয়ার্টার ফাইনাল, এর পর আর অঘটন বলে কিছু থাকে না। এই দৌড়ে এশিয়াকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু শিরোপা জয়ের জন্য যে ওজন দরকার তা ইউরোপ-আমেরিকার বাইরের কোন দল এখনও অর্জন করতে পারেনি। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয়, নামীদামী ঘরোয়া লীগ ইউরোপেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আর এ কারণে লাতিন আমেরিকার চেয়ে শিরোপার দাবিদার ইউরোপেই বেশি। যদিও সর্বাধিক পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। এবার ‘হেক্সা মিশনে’ (ষষ্ঠ শিরোপা) বাজির দরে এখনও পর্যন্ত সবার উপরে ব্রাজিল। কিন্তু চারবার কাপ জিতে ব্রাজিলের ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে ইতালি। ইউরোপের পরিণত এই দলটির সামনে এবার ব্রাজিলকে স্পর্শ করার সুযোগ। তিনবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকেই বা পেছনে ফেলা কেন? শিরোপা জয়ের জন্যই জার্মানরা মাঠে নামে বিশ্বকাপের প্রত্যেক আসরে। সেই সামর্থ্য এবারও জার্মানদের রয়েছে। গত দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে প্রথমবার ফাইনালে উঠেই বাজিমাত করা স্পেনেরও শ্যেনদৃষ্টি শিরোপায়। টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ড গড়তে ইউরোপের পরাশক্তি তারকাসমৃদ্ধ স্পেন বড় হুমকি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার জন্য। এ তালিকায় ‘সি আর সেভেন’-এর পর্তুগালও লড়বে কাপ জয়ের জন্য। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর দলটির অন্যতম আকর্ষণ। গতবারের রানার্সআপ রবিন ভ্যান পার্সি-রোবেনের হল্যান্ড এবারও অনেক দূর যাবে। এ ছাড়া ইউরোপ থেকে শিরোপা জয়ের সামর্থ্য রাখে ইংল্যান্ড-ফ্রান্স। তাক করা এত ইউরোপীয় ‘মিসাইল’ মোকাবেলা করেই শিরোপা জয়ের স্বাদ মেটাতে কোন সন্দেহ নেই কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে। এ তো গেল সুপার পাওয়ারদের কথা। ইউরোপ থেকে এবার ব্রাজিলে খেলতে এসেছে ভয়ঙ্কর এক বেলজিয়াম। গোলপোস্ট, রক্ষণ, মাঝমাঠ, আক্রমণভাগে তারকায় ঠাসা বেলজিয়াম এবার ইতিহাস গড়ে ফেললে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
সময়ের বিবর্তনে এবারের বিশ্বকাপে থাকছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির চমক। পাক্কা চার বছর পর চলে আসা বিশ্বকাপের মান বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ফিফা এবার ফুটবলের ময়দানে ব্যবহার করবে একাধিক প্রযুক্তি। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ‘গোললাইন টেকনোলজি’- যার বদৌলতে রেফারির চোখ এড়ানোর উপায় নেই ব্রাজিল বিশ্বকাপের বল ব্রাজুকা কোথায় কী করছে। গোললাইনে থাকবে কিছু সেন্সর আর ম্যাচ রেফারির হাতে থাকবে বিশেষ এক ঘড়ি। বল গোললাইন অতিক্রম করা মাত্রই সেন্সর সঙ্কেত পাঠাবে রেফারির হাতের ঘড়িতে। রেফারি পরিষ্কারভাবে গোল হতে না দেখতে পেলেও বল গোললাইন পার করলে সেন্সর কখনই ওই সঙ্কেত পাঠাতে ভুল করবে না। ফলে অতীতের মতো এবারের বিশ্বকাপে গোল নিয়ে গোলমাল থাকবে না বললেই চলে। আছে ‘ভ্যানিশিং স্প্রে’-যার মাধ্যমে ফ্রি-কিকের নির্ধারিত স্থান, কোন্ জায়গা থেকে নিতে হবে কিক, প্রতিপক্ষ ফুটবলাররা কোন পজিশনে নিয়ম অনুযায়ী দেয়াল সৃষ্টি করতে পারবেন তা নির্দিষ্ট করে দেবে এই রাসায়নিক স্প্রে। খেলা শুরুর আগে মাঠের স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে ছিটিয়ে দেয়া হবে। কয়েক মিনিটের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পরিবেশবান্ধব এই স্প্রে। যা ম্যাচ চলাকালীন রেফারিকে ফ্রি-কিক নেয়ার স্থান নির্ধারণে সহায়তা করবে। দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় শহর সাও পাওলো। সবচেয়ে বেশি মানুষের বসবাস এ শহরে। আর এখানেই অনুষ্ঠিত হবে উদ্বোধনী ম্যাচ, যে লড়াইয়ে সবার আগে মাঠে নামছে স্বাাগতিক ব্রাজিল। এ্যারেনা কোরিন্থিয়ান্স-সাও পাওলোর বিখ্যাত এই স্টেডিয়ামেই স্বাগতিক ব্রাজিল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে বিশ্বকাপ নামক বিশ্বকাঁপানো ফুটবলের ময়দানী লড়াই। বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় শুরু হবে ম্যাচ। তার আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই ফুরিয়ে গেল সময়। শুরু হয়ে যাচ্ছে ফুটবলের মহারণ। মাঠের যুদ্ধ তো আছেই। এর বাইরেও বর্ণিল এক আয়োজন। মহাযজ্ঞ মাতিয়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত পিটবুল ও জেনিফার লোপেজের যুগল সঙ্গীতের সুরের মূর্ছনার সঙ্গে উদ্যাম নৃত্য। আর ব্রাজিলের ঐহিত্য চোখ ধাঁধানো সাম্বা। তবে এখানেও থাকছে আরেকটা লড়াই। যে লড়াইয়ে গত দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান থেকে পিছিয়ে পড়েছে ব্রাজিল। এটা কারও মনগড়া কথা নয়। খোদ ব্রাজিলিয়ানরাও স্বীকার করছেন ‘কলম্বিয়ার প্রখ্যাত পপ সঙ্গীতশিল্পী সাকিরার সেই ওয়াকা ওয়াকা... গানের কাছে ম্লান এবারের বিশ্বকাপের ‘থিমসং’ ওলে ওলা...। সাকিরার সুরেলা কণ্ঠই শুধু নয়। হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়ে ছিল ‘সেক্সি’ পোশাকে কোমর দোলানো নৃত্য। এবার সাকিরাকে মিস করবে ফুটবল বিশ্ব-তাঁর অগণিত ভক্ত বিশ্বকাপের মঞ্চে। তবে ফুটবলের সঙ্গে থাকছেন জনপ্রিয় এই শিল্পী ঘরণী হয়ে, দর্শক হিসেবে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের তারকা ফুটবলার জেরার্ড পিকের জীবনসঙ্গী সাকিরা ব্রাজিল বিশ্বকাপের খেলা দেখবেন সন্তান কোলে দর্শক হয়ে। তবে জেনিফার লোপেজ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকছেন না বলে জানা গেছে। তবে মাইকে তাঁর কণ্ঠ থাকবে পিটবুলের সঙ্গে। তবে আরেক আকর্ষণ ব্রাজিলের সবচেয়ে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী সুদর্শনা ক্লদিয়া লেইতেকে দেখা যাবে পিটবুলের পাশে বাহারি পোশাকে।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ড্রেস রিহার্সেল। মাইকের গর্জনে ক্ষণিক প্রকম্পিত হয়ে উঠছিল এ্যারেনা কোরিন্থিয়ান্স। কিন্তু অনুষ্ঠান ম্লান করে দেয় একটি দুর্ঘটনা। তার পরও প্রস্তুত আয়োজক ব্রাজিল। ২৫ মিনিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিখ্যাত দুই কণ্ঠশিল্পীর সঙ্গে মাঠে থাকবে ছয় শতাধিক পারফর্মার। এ ছাড়া যথারীতি উপস্থিত থাকবেন আয়োজক ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রোওসেফ, বিশ্ব ফুটবলের শাসক সংস্থা ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটারসহ বিভন্ন দেশ থেকে আগত আমন্ত্রিত অতিথি। তবে ব্রাজিলের আবহাওয়া ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা কখন যে কালো হয়ে আকস্মিক বৃষ্টি হয়ে ঝরবে বলা যায় না। আর বৃষ্টি মানেই তাপমাত্রার ওঠানামা। ফলে সাধারণ পোশাকের সঙ্গী হিসেবে সঙ্গে রাখতে হয় শীতবস্ত্র।
তবে বিশ্বকাপের অপার সৌন্দর্য রং ধরাতে পারেনি ব্রাজিলের মানুষের মনে। এটা কি অভিমান না চরিত্র বোঝা মুশকিল। ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের ৮৩ বছরের ইতিহাসে ১৯৫০ সালের পর এবার দ্বিতীয়বারের মতো স্বাগতিক হয়েছে ব্রাজিল। মাঝে দীর্ঘ একটা সময়। খেলার মাঠে ব্রাজিল তার চিরাচরিত রাজত্ব, দাপট অব্যাহত রাখলেও আয়োজক হিসেবে দেখার অভিজ্ঞতা আমাদের বয়সী মানুষের কাছে অজানা। অবশ্য এবার দেখলাম, জানলাম। আর স্বাগতিক দেশের চিত্র দেখে ব্রাজিলকে পাস মার্ক দিতে পারলাম না। কারণ শুধু খেলা নয়-খেলার বাইরেও যে উত্তেজনা সেই অপরূপ মুহূর্তগুলোর সঙ্গী হওয়ার যে আশা-আকাক্সক্ষা নিয়ে ব্রাজিল আসা, সেই স্বপ্নের সমাধি ইতোমধ্যে ঘটে গেছে। ব্রাজিলকে বলা হয় ফুটবলের দেশ। সেই ফুটবলের দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে পৃথিবীর ক্যানভাসে সার্থক, সুন্দর ছবি আঁকতে আয়োজক দেশে উন্মাদনার যে ঢেউ ওঠার কথা, তা চোখে পড়ল না। এটা ব্রাজিলিয়ানদের জন্য লজ্জা, নাকি চরিত্রই এ রকম- তাঁরাই ভাল বলতে পারবেন।
বিশ্বকাপ ফুটবল হচ্ছে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’- খেলাধুলার সবচেয়ে বড় আয়োজন। যার সঙ্গে তুলনা চলে না অন্য কোন ক্রীড়া আসরের। স্বাগতিক ব্রাজিল তো সবচেয়ে আলোচিত, ভক্ত, সমর্থক ছাড়াও অনেকে ধারণা করছেন কাপ এবার ব্রাজিলই জিতবে। এ ছাড়া অপার সৌন্দর্যের বিশ্বকাপ ফুটবলের ময়দানী লড়াইয়ে ব্রাজিলের পরই ফেবারিটের তালিকায় রয়েছে মেসির আর্জেন্টিনা। তবে কাপ লাতিন আমেরিকায় রাখতে এ দু’দলের বাইরে অন্য কারও সামর্থ্য নেই জোর দিয়েই বলা যায়। উরুগুয়ে, চিলি, কলম্বিয়াকে নিয়ে কিছুটা নাচানাচি হলেও লাভ নেই। আকস্মিক ঝড় তুললেও বিলীন হয়ে যাবে ‘শিরোপা’ নামক মহানায়ককে স্পর্শ করার অনেক আগেই। একইভাবে আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে ক্যামেরুন, ঘানা, নাইজিরিয়াও দু-একটি ম্যাচে তাক লাগিয়ে বা শিরোপা প্রত্যাশী প্রতিপক্ষ দলের বারোটা বাজিয়ে নিজেরাও ঝরে পড়বে একপর্যায়ে এসে। আর এশিয়া- একজন এশিয়াবাসী হিসেবে বলতে কষ্ট হলেও নির্জলা বাস্তব, বিশ্বকাপে বাজির ঘোড়া হতে আরও সময় লাগবে। তবে এগোচ্ছে কোরিয়া-জাপান। সঙ্গত কারণে বলতে হচ্ছে মূল লড়াইটা আসলে আমেরিকা আর ইউরোপের মধ্যেই এখনও সীমাবদ্ধ। এবারও ব্যত্যয় ঘটার কথা নয়। যদিও পণ্ডিতরা বলে থাকেন ‘গোলের খেলা ফুটবলে কোনকিছুই অসম্ভব নয়।’ হ্যাঁ, সেটার নির্ধারিত একটা সময়ও আছে। গ্রুপ পর্ব থেকে বড়জোর কোয়ার্টার ফাইনাল, এর পর আর অঘটন বলে কিছু থাকে না। এই দৌড়ে এশিয়াকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু শিরোপা জয়ের জন্য যে ওজন দরকার তা ইউরোপ-আমেরিকার বাইরের কোন দল এখনও অর্জন করতে পারেনি। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয়, নামীদামী ঘরোয়া লীগ ইউরোপেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আর এ কারণে লাতিন আমেরিকার চেয়ে শিরোপার দাবিদার ইউরোপেই বেশি। যদিও সর্বাধিক পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। এবার ‘হেক্সা মিশনে’ (ষষ্ঠ শিরোপা) বাজির দরে এখনও পর্যন্ত সবার উপরে ব্রাজিল। কিন্তু চারবার কাপ জিতে ব্রাজিলের ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে ইতালি। ইউরোপের পরিণত এই দলটির সামনে এবার ব্রাজিলকে স্পর্শ করার সুযোগ। তিনবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকেই বা পেছনে ফেলা কেন? শিরোপা জয়ের জন্যই জার্মানরা মাঠে নামে বিশ্বকাপের প্রত্যেক আসরে। সেই সামর্থ্য এবারও জার্মানদের রয়েছে। গত দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে প্রথমবার ফাইনালে উঠেই বাজিমাত করা স্পেনেরও শ্যেনদৃষ্টি শিরোপায়। টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ড গড়তে ইউরোপের পরাশক্তি তারকাসমৃদ্ধ স্পেন বড় হুমকি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার জন্য। এ তালিকায় ‘সি আর সেভেন’-এর পর্তুগালও লড়বে কাপ জয়ের জন্য। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর দলটির অন্যতম আকর্ষণ। গতবারের রানার্সআপ রবিন ভ্যান পার্সি-রোবেনের হল্যান্ড এবারও অনেক দূর যাবে। এ ছাড়া ইউরোপ থেকে শিরোপা জয়ের সামর্থ্য রাখে ইংল্যান্ড-ফ্রান্স। তাক করা এত ইউরোপীয় ‘মিসাইল’ মোকাবেলা করেই শিরোপা জয়ের স্বাদ মেটাতে কোন সন্দেহ নেই কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে। এ তো গেল সুপার পাওয়ারদের কথা। ইউরোপ থেকে এবার ব্রাজিলে খেলতে এসেছে ভয়ঙ্কর এক বেলজিয়াম। গোলপোস্ট, রক্ষণ, মাঝমাঠ, আক্রমণভাগে তারকায় ঠাসা বেলজিয়াম এবার ইতিহাস গড়ে ফেললে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
No comments:
Post a Comment