Thursday, June 12, 2014

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণা গ্রন্থ মিল্টন বিশ্বাস

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণা গ্রন্থ
মিল্টন বিশ্বাস
মানুষ জন্মগতভাবেই স্বাধীনতাকামী। এই সহজাত স্বাধীনতার স্পৃহাই ধীরে ধীরে মানুষকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য দান করেছে। এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বোধই কখনও কখনও নৃতাত্ত্বিক কিংবা জাতিগত ঐক্যের সূত্র ধরে সামষ্টিক চেতনায় উদ্ভাসিত হয়েছে। সুগম করেছে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পথ। তবে পৃথিবীতে রাষ্ট্র সৃষ্টির ইতিহাস লোমহর্ষক ও রক্তাক্ত। স¦াধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ও ব্যতিক্রম কোন ঘটনা নয়। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ বিভাগের ভ্রান্তি, পূর্ব-বাংলার মানুষকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার মধ্যে নিপতিত করেছিল। পূর্ব-বাংলা পরিণত হয়েছিল পাকিস্তানের উপনিবেশে। ‘১৯৫২-৭১’র নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও আন্দোলন-পর্ব পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ এক অনিবার্য ব্যাপার। তাই ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জীবনে সবচেয়ে গৌরবান্বিত ঘটনা। এটিকে বলা চলে এক মহাকাব্যিক আলেখ্য। একটি জাতির ভবিষ্যতের পথ-নির্দেশনার বাতিঘররূপে অনুপ্রেরণার রসদ যুগিয়ে চলে এমন বীরগাথা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও কর্মে-জীবনে, শিল্পে-সাহিত্যে প্রতিনিয়ত অফুরান প্রাণশক্তি সঞ্চার করে চলেছে। বাংলাদেশের সাহিত্যেও নানা শাখা যেমন; গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক প্রভৃতিও সমৃদ্ধ হয়েছেÑমুক্তিযুদ্ধের বিবিধ অনুষঙ্গকে উপজীব্য করে। এ ক্ষেত্রে উপন্যাসে প্রতিফলিত মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিকতা ও ব্যাপকতা থেমে নেই। এই ধারা ভবিষ্যতেও প্রবহমান থাকবে।
‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের উপন্যাস’-গ্রন্থটি ড. মোহাম্মদ আনোয়ার সাঈদ রচিত একটি অসাধারণ গবেষণাকর্ম। উল্লিখিত গ্রন্থে ‘১৯৭১-৯৯’ কালসীমার মধ্যে মোট ২৪ জন ঔপন্যাসিকের ৫৭টি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের নিবিড় পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত বিষয় ও প্রবণতা শনাক্তকরণে প্রয়াসী হয়েছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের বহির্বাস্তবতা ও অন্তর্বাস্তবতা রূপায়নে ঔপন্যাসিকের সীমাবদ্ধতা নির্দেশে ও বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন মুন্সিয়ানা। মুক্তিযুদ্ধ যে কেবল একমুখী ভাবাবেগের বিষয় নয়; তার যে বিশালায়তনিক ও বহুবিধ পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে, লেখক সেটি নিপুণভাবে আলোকপাত করেছেন। গ্রন্থটিকে তিনি ৪টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করেছেন। সুশৃঙ্খলভাবে প্রবণতা অনুযায়ী আবার ৪টি দশকে বিভাজনের মাধ্যমে কালানুক্রমিকতা বহাল রেখেছেন। ফলে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ-পরিস্থিতির পট-পরিক্রমা, তার প্রবাহ ও তার পরিবর্তনকে সুস্পষ্টভাবে পরিদৃশ্যমান করেছেন। প্রথম অধ্যায়টির শিরোনাম দিয়েছেন ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ : ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত’-যাতে ব্রিটিশ-শাসনের প্রভাব এবং ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত কাল-পরিক্রমায় ভারতবর্ষে বিরাজমান ভূ-রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিত ও ঘটনা-প্রবাহ বিশ্লেষিত হয়েছে এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের অনিবার্যতার বিষয়টিও চমৎকারভাবে উঠে এসেছে এতে। এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ধারাবাহিক ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা, লেখকের ইতিহাস, ঐতিহ্যপ্রীতি, নিবিড় পাঠ ও দক্ষতার স্বাক্ষর বহন করে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম দেয়া হয়েছে ‘সত্তর দশক : যুদ্ধকালীন বাস্তবতা ও সমর্পিত মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনালেখ্য।’ এই অধ্যায়ে ‘১৯৭১-১৯৭৯’ সময়সীমায় রচিত সতেরোটি উপন্যাস সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। যুদ্ধকালীন সময়ে মধ্যবিত্ত-মানসের দ্বিধাবিভক্তি, পলায়নপর মনোবৃত্তি, আদর্শিক টানাপোড়েন এই দশকের প্রধান প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়নি।
তৃতীয় অধ্যায়টি ‘আশির দশক : যুদ্ধোত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার রূপায়ণ’ নামে সন্নিবেশিত হয়েছে। এই দশকের মোট ২০টি উপন্যাস আলোচিত হয়েছে এতে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা ও তাৎপর্যকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা, গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার বদলে সামরিক শাসন এবং তার প্রভাবে সৃষ্ট অভিঘাতে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানুষের জীবন ও স্বপ্নকে কিভাবে বিপন্ন করে তুলেছিল; তার বিশ্লেষণে লেখকের নিবিড় পর্যবেক্ষণ শক্তির ছাপ সহজেই চোখে পড়বে পাঠকের দৃষ্টিতে। উপন্যাসে প্রতিফলিত ও উপেক্ষিত দিকগুলো নির্দেশে লেখকের সর্বাঙ্গীণতা দাবির প্রসঙ্গটি উঠে এসেছে।
চতুর্থ ও গ্রন্থটির সর্বশেষ অধ্যায়টি খুবই তাৎপর্যবাহী। যার শিরোনাম ‘নব্বইয়ের দশক : মূল্যবোধের অবক্ষয় ও তরুণ প্রজন্মের হতাশামিশ্রিত ক্ষোভ।’
এই অধ্যায়ে নব্বইয়ের দশকে রচিত মোট সতেরোটি উপন্যাস আলোচিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নপূরণের ব্যর্থতা ক্রমে জীবনে যে হতাশা, ক্লান্তি, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের বিপর্যয় এবং সর্বস্তরে চেতনাগত যে বিপর্যয় ও নৈরাজ্য, নৈরাশ্য ও ভারসাম্যহীনতাÑতা বিশ্লেষিত হয় এ অধ্যায়ে। পুরো জাতিকে টালমাটাল করে দেয় তা। প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার অসামাঞ্জস্য ঔপন্যাসিকদের আত্মসমালোচনাপ্রবণ করে তোলে। স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের উত্থান ও প্রতিক্রিয়াশীলতার দ্বন্দ্বে জাতি আজ শুধু দ্বিধাবিভক্ত নয়, বহুধা বিভক্ত। মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্যিক সর্বাঙ্গসুন্দর যে অণুপ্রেরণা এবং মুক্তিযুদ্ধের সকল দিক নিয়ে প্রকৃত অর্থে কোন উপন্যাস যে এখনও লিখিত হয়নি; ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের উপন্যাস’-গ্রন্থে ড. সাঈদ অত্যন্ত অনুসন্ধিৎসার সঙ্গে এসব গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও বক্তব্য সংযোজন করেছেন। যা কেবল আলোচিত উপন্যাসের গ-ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিষয় ও প্রবণতা বিশ্লেষণে লেখকের প্রাজ্ঞতা ও বাংলাদেশের উপন্যাস সম্পর্কে সমাজতাত্ত্বিক, মনস্তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক তথা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment