জাতীয়তাবাদের আলোছায়ায় ইয়েটস
সাজিদ উল হক খান আবির
“বহুদিন হলো আমি এই পাণ্ডুলিপিখানা সঙ্গে নিয়ে ঘুরছি, রেলস্টেশনে বসে, বাসে চেপে বা রেস্টুরেন্টে, যখনই সুযোগ পাচ্ছি কিছু কিছু কবিতা পড়ছি এবং পড়া শেষে পাণ্ডুলিপিখানা বন্ধ করে রাখছি- যাতে আমাকে এতটা আলোড়িত অবস্থায় দেখে আশপাশের মানুষজন শঙ্কিত হয়ে ব্যস্ত হয়ে না পড়ে।”
পঙক্তিটি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের। আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে ভূমিকা লিখে দেন তিনি। আজ ১৩ জুন, ২০১৪ ইয়েটসের ১৪৯তম জন্মবার্ষিকীতে এসে সর্বাগ্রে বাংলাভাষীদের মনে পড়ার কথা কবিগুরুর প্রতি, তথা বাংলা ও বাঙালী ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি আধুনিক ইংরেজি কবিতার পুরধা ব্যক্তিত্ব ইয়েটসের সে হৃদ্যপূর্ণ ব্যবহার।
অপরদিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ “আমার জীবনানন্দ আবিষ্কার ও অন্যান্য”-এ ইংরেজি সাহিত্যের আরেক পুরোধা আধুনিক কবি টিএস এলিয়টের সঙ্গে তার সাক্ষাত রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ আসতেই এলিয়টের অনাগ্রহের কথা উল্লেখ করেন। এলিয়ট কবিগুরুর প্রসঙ্গ উঠতেই স্মিত হেসে বলে দিয়েছিলেন- “নট মাই কাপ অফ টি”।
আধুনিক ইংরেজি কবিতার মুখপাত্র দুই ‘প্রায় সমসাময়িক’ ইংরেজ কবির কণ্ঠে রবিঠাকুরের কবিতা নিয়ে সম্পূর্ণ দুই মেরুর মন্তব্য আমাদের ভাবিয়ে তোলে। কেন ইয়েটস রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির ভূমিকায় ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে জিওফ্রে চসারের ত্রয়লাস অ্যান্ড ক্রেসিদার মতোই বহুল পঠিত হবে কবিগুরুর কবিতা, যেখানে এলিয়ট এক কথায় অস্বীকার করে বসলেন কবিগুরুকে?
এ প্রশ্নের নানাবিধ উত্তর আছে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উত্তরটি হচ্ছে দুজনেই ব্রিটিশ রাজের অধীনে পরাধীন রাজ্যের কবি হওয়ায় ইয়েটস বোধ করেছিলেন রবিঠাকুরের প্রতি তার স্বাভাবিক ভ্রাতৃত্ববোধ। পরবর্তীতে নানা গোলমালে তাদের সে সুসম্পর্ক আর টেকেনি।
যাই হোক, এটা আমাদের আজকের বিষয় নয়। আজকের উপজীব্য বিষয়- ইয়েটসের জীবনে, ইয়েটসের কবিতায় তার আইরিশ জাতীয়তাবাদের প্রভাব।
আয়ারল্যান্ডের ওপর ইংরেজদের দখলদারীর ইতিহাস অনেক পুরনো। রানী প্রথম এলিজাবেথ বা অলিভার ক্রমওয়েলের সময় থেকেই ইংরেজরা আইরিশদের ন্যায্য দাবিদাওয়া দমিয়ে রেখেছিল সহিংস দমন-পীড়নের দ্বারা। সে ইতিহাস আইরিশ জনসাধারণ এবং আইরিশ সাহিত্য সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত কেউ কখনো ভুলতে পারেনি, পারেননি ইয়েটসও। ইয়েটসের পূর্বপুরুষেরা দু’ শ’ বছর ধরে আয়ারল্যান্ডের বাসিন্দা। ইয়েটসের ধমনীতে প্রবাহিত ছিল সহজাত আইরিশ রক্ত। তাই আইরিশ সভ্যতা, সংস্কৃতি, আয়ারল্যান্ডের ইতিহাস ইয়েটসের কবিতায় দখল করে নেয় একটি শক্ত অবস্থান।
সাহিত্যে ইয়েটসের ছেলেবেলার হিরোরাও ছিলেন সব কট্টর আইরিশ ন্যাশনালিস্ট ব্যক্তিত্ব, যেমন রাজনীতিক এডমুন্ড বার্ক, গেলিভারস ট্র্যাভেলসের প্রখ্যাত রচয়িতা জনাথন সুইফট, কবি, নাট্যকার অলিভার গোল্ডস্মিথ এবং দার্শনিক বিশপ বার্কলে। তাদের কথা ঘুরেফিরে, নামে অথবা ছদ্মনামে, বারবার এসেছে ইয়েটসের কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে।
ইতিহাসের পশ্চাতে যা থাকে, তা-ই কিংবদন্তি আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিংবদন্তির দালিলিক প্রমাণ না থাকলেও তাতে সাহিত্য রচনার রসদ থাকে যথেষ্টই, আর তার গভীরে থাকে জাতীয় চিন্তা চেতনার প্রতিফলন। ইয়েটস নিজের আইরিশ জাতীয়তাবাদ সম্বন্ধে সচেতন থাকলেও প্রথম দিককার কবিতায় আইরিশ রাজনীতির বদলে ব্যবহার করেছেন আইরিশ মিথ, গাঁথা এবং আইরিশ ফোকলোর। ইয়েটসের বই “অটোবায়োগ্রাফিস”-এ ইয়েটসের সহজ স্বীকারোক্তি “পৃথিবীর সব জাতিই সর্বপ্রথম একাত্মবোধ করে নিজ অঞ্চলের পৌরাণিক গাঁথা ও কিংবদন্তির সঙ্গে, যা একজন মানুষের সঙ্গে তার দেশের মাটির আত্মিক যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করে”।
ইয়েটসের কাব্য চর্চার প্রথম পর্বে, যা ‘কেল্টিক টোয়েলাইট’ নামে পরিচিত, ছোট-বড় বিবিধ যে কবিতাগুলো রচনা করেন তাতে তিনি আইরিশ ফোকলোর গ্রহণ করেছেন দু’হাতে। মুকুটে শোভিত হীরকখণ্ডের মতো সে মিথ তিনি তাঁর কবিতায় সাজিয়েছেন বহু যতেœ, একটি একটি করে। ১৮৮৯ সালে প্রকাশিত তার দীর্ঘ ন্যারেটিভ কবিতা “দা ওয়ান্ডারিংস অফ ওশিন”-এ তিনি তুলে আনেন আইরিশ নায়ক ওশিনের গাঁথা, যিনি আয়ারল্যান্ডে খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক হিসেবে সমাদৃত। এছাড়াও, কবি জীবনের শুরুতে লেখা অসাধারণ সুন্দর সব লিরিক ধাঁচের কবিতা, যেমন- ‘দা স্টোলেন চাইল্ড’, ‘ডাউন বাই দা সেলি গার্ডেনস’, ‘দা রোজ অফ দা ওয়ার্ল্ড’, ‘লেক আইল অফ ইন্সফ্রি’ অথবা “দা ম্যান হু ড্রেমড অফ ফেয়ারিল্যান্ড” তার অন্যতম রোমান্টিক কবিতাগুলোর অন্তর্ভুক্ত, এইসব কবিতায় আয়ারল্যান্ডের বিবিধ ঐতিহাসিক স্থান, কিংবদন্তি এবং জাতীয় গর্বের বিষয়বস্তুগুলো উঠে এসেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
প্রথমার্ধের কবিতায় আইরিশ মিথ এবং আয়ারল্যান্ডের বিবিধ ঐতিহাসিক স্থানের উল্লেখের পাশাপাশি কবিতার সহজ সরল ভাব ও ভাষা- একটি প্রণিধানযোগ্য দিক। ইয়েটসের পরিণত বয়সে লেখা “দা সেকেন্ড কামিং”, “সেইলিং টু বাইজেন্টিয়াম” অথবা “বাইজেন্টিয়াম” ইত্যাদি কবিতার বিষয়বস্তু তুলনা করলে বোঝা যায় ইয়েটস তার প্রথম যুগে কি সহজ ভাষায় কবিতা লিখতেন।
কেন লিখতেন এতটা সহজ করে? কারণ ইয়েটস চাইতেন যে মানুষ তার কবিতা পড়ুক, বুঝুক এবং আইরিশ ট্র্যাডিশনে মুগ্ধ হোক। আইরিশ মিথ, বৃহদার্থে আইরিশ জাতীয়তাবাদ ইয়েটসের কবিতার স্টাইলে প্রভাব বিস্তার করেছিল একদম গোড়া থেকেই। ইয়েটস পরে অবশ্য অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে তার কবিতার স্টাইল এবং বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন আনেন, এ নিয়ে তার ছোট কিন্তু অসাধারণ একটি কবিতা ও আছে “এ কোট” নামে। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।
ইয়েটসের জীবনে দুই নারীর অত্যন্ত প্রভাবশালী উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। প্রথমজন হলেন থিয়েটার অভিনেত্রী এবং উগ্র আইরিশ জাতীয়তাবাদী, “ডাবলিন বিউটি” খ্যাত মডগন। ইয়েটস তার আত্মজৈবনিক রচনা “মেমোরিস”-এ এই অপরূপ রূপসী মহিলাকে প্রথম দেখার স্মৃতিচারণ করেন-“আমার বয়স তখন তেইশ মাত্র, যখন আমি এই মহাদুর্যোগে পতিত হই”। ইয়েটস এই দুর্যোগে পতিত হওয়া যে উপভোগ করেছিলেন তা বলাই বাহুল্য! ইয়েটসের পূর্বপর প্রচুর কবিতায় মডগনের উপস্থিতি তো আছেই, কবি ইয়েটসকে নাট্যকার বানিয়ে তোলার পেছনেও তার জীবনের প্রথম এ প্রেম ও প্রেমিকার ভূমিকা অপরিসীম।
মডগনকে নায়িকার চরিত্রে রেখে ১৮৯১ সালে ইয়েটস রচনা করেন “কাউন্টেস ক্যাথলিন” নাটিকা, যেখানে নায়িকা ক্যাথলিন হচ্ছেন একজন সম্ভ্রান্ত এ্যাংলো-আইরিশ মহিলা, যিনি শয়তানের কাছে নিজের আত্মা বিক্রি করেন আইরিশ জনসাধারণের মুক্তির বিনিময়ে। বলাই বাহুল্য, এই নাটিকা সম্পূর্ণ আইরিশ ভাবাবেগ এবং আইরিশ কিংবদন্তির রেফারেন্সে পরিপূর্ণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে মডগন এই নাটিকা অভিনয় করতে পারেননি। ইয়েটস ১১ বছর পর, ১৯০২ সালে “ক্যাথলিন নি হলিহান” নাটিকা রচনা করলে মডগন তাতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেন।
ইয়েটসের জীবনে আরেক প্রভাবশালী নারী হচ্ছেন আইরিশ লেখিকা এবং আইরিশ সংস্কৃতির প্রচারক লেডি গ্রেগরি। ওনার খামার বাড়িতে ইয়েটস প্রচুর বেড়াতে গিয়েছেন। ইয়েটসের বেশকিছু কবিতার জন্মস্থল এই খামারবাড়ি। লেডি গ্রেগরির উৎসাহে ১৮৯৯ সালে ইয়েটস প্রতিষ্ঠা করেন আইরিশ ন্যাশনাল থিয়েটার।
এই থিয়েটারের ব্যস্ততা ইয়েটসকে জড়িয়ে ফেলে নানামুখী ব্যস্ততায় যার বেশিরভাগই ছিল ইয়েটসের কবি প্রতিভার অপচয় এবং অযথা কালক্ষেপণ। অভিনেতা যোগাড় করা, তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, হল ভাড়া, সেন্সর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ছাড়পত্র পাওয়া এইসবে একদম ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেন ইয়েটস।
তাও চলত যদি থিয়েটারে ইয়েটস পেতেন নিজের সৃষ্টিশীলতাকে লাগামছাড়া উড়তে দেবার সুযোগ। ডাবলিনের দর্শকশ্রোতারা ইয়েটসের প্রতিভার প্রতি সুবিচার করেনি, তারা বলতে গেলে মুখই ফিরিয়ে নেয় ইয়েটসের বহুকষ্টের একেকটা প্রোডাকশন থেকে। “হাউন্ডিং অফ পারনেল”, “দা প্লেবয় অফ দা ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড”(১৯০৭) এবং “দা লেন পিকচারস”(১৯১৩) রোমান ক্যাথলিক মধ্যবিত্তশ্রেণীর দর্শকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। ক্ষুব্ধ, বিরক্ত, অপমানিত ইয়েটস আয়ারল্যান্ড ছেড়ে পাড়ি জমান লন্ডনে। পরবর্তীতে স্বাধীন আয়ারল্যান্ডে সেনেটর হিসেবে ফেরত এসে কাজ করেন ১৯২২ সাল থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত, কিন্তু রোমান ক্যাথলিকদের কাছে পাওয়া সে অপমান তিনি ভুলতে পারেননি। তার রাজনৈতিক কার্যকলাপ ছিল মূলত আইরিশ প্রোটেস্টান্টদের উন্নয়ন ঘিরে।
মধ্যবিত্ত ক্যাথলিক আইরিশদের মধ্যে দেশপ্রেমের চাইতে আত্মপ্রীতিই ছিল বেশি। তাই তারা ইয়েটসের নাটকগুলোকে ধর্মীয় গোঁড়ামির ছাদনাতলায় এনে ইচ্ছেমতো ছুরিকাঁচি চালিয়েছিল। ইয়েটস তার আবেগের স্থলে এ রকম আঘাত সইতে পারেননি। তিনি তীব্র ক্ষোভে রচনা করেন তার কবিতা “এ কোট”। কবিতাটিতে তিনি আইরিশ জাতীয়তাবাদ এবং মিথকে তিনি শার্টের ওপর শোভাবৃদ্ধিকারী কোটের সাথে তুলনা করেন। একদা যে কোট তিনি পরিধান করতেন (অর্থাৎ কবিতায় যে আইরিশ মিথ ও ভাবাবেগ তিনি ব্যবহার করতেন) এখন সবাই তার দাবিদার বনে যাওয়ায় তিনি ঘোষণা দেন, শতছিন্ন কদর্য এই সাজপোশাক পরিধানের বদলে তিনি বরং নগ্নাবস্থায় চলেফিরে বেড়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন।
‘ইস্টার ১৯১৬’ তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি রাজনৈতিক কবিতা, যা ১৯১৬ সালে আইরিশ জাতীয়তাবাদীদের ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পটভূমিতে রচিত। ইয়েটস সে অভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন যারা তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বারবার ব্যবহার করেন বিখ্যাত সে পঙতি- ‘এ টেরিবল বিউটি ইজ বর্ন”। ইয়েটসের ভাষ্যে ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের জন্ম হয়েছে তাদের এ আত্মত্যাগে। কিন্তু শক্তিশালী ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে এ অপরিকল্পিত আক্রমণ ও জীবনদান কতটুকু যৌক্তিক, কবিতার শেষে সুকৌশলে তিনি সে প্রশ্নও ছুড়ে দেন।
এটা ছাড়াও “সেপ্টেম্বর-১৯১৩”, “অ্যাট দা অ্যাবি থিয়েটার”, “এ হাউস শেকেন বাই ল্যান্ড এজিটেশন”, “দা পিপল অ্যান্ড দা নিউ ফেইস” ইত্যাদি কবিতায় তিনি কট্টর আইরিশ ভাবাদর্শবাদীদের সমালোচনা করেন।
গণতন্ত্রের প্রতি ভক্তি চলে যাওয়া ইয়েটস কালক্রমে আরও বেশি ঝুঁকে পড়েছিলেন তীব্র ডানপন্থী মতবাদের দিকে। ইতোপূর্বে জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিখ নীটশের প্রভাব তার চিন্তাধারায় বিরাজমান ছিল ভালভাবেই। একই সঙ্গে তার সখ্য ছিল ইউরোপিয়ান ফ্যাসিস্টদের সঙ্গেও, যেমন সখ্য ছিল আরেক বিখ্যাত আধুনিক কবি এজরা পাউন্ডের। ইতালির মুসোলিনি, স্পেনের জেনারেল ফ্রাঙ্কো এবং আয়ারল্যান্ডের ও’ ডাফের শাসনের প্রতি ছিল তার শক্তিশালী সমর্থন। ইয়েটসের ভক্তরা পারতপক্ষে ইয়েটসের এই ব্যক্তিগত দিকগুলো চাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করেন, কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শের অনেকেই ইয়েটসকে মোটেও ছাড় দিতে চাননি এই ইস্যুতে। “এ্যানিমেল ফার্ম” এবং “১৯৮৪”-এর মতো বিশ্বখ্যাত উপন্যাসের রচয়িতা জর্জ অরওয়েলের “ইয়েটসের চিন্তাধারায় ফ্যাসিজমের অপচ্ছায়া” নামক একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ১৯৪৩ সালে, যা পুস্তকাকারে পুনর্মুদ্রিত হয় ১৯৬৩তে।
ডব্লিউ এইচ অডেন বামপন্থীধারার কবি হলেও ছিলেন ইয়েটসের প্রতি বিশেষ অনুরাগী। তিনি তার এক প্রবন্ধ “প্রচলিত জনমত ও মিঃ উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস”-এ ইয়েটসের পক্ষ নেন এবং প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে ইয়েটস ধনিক শ্রেণীর যে প্রশংসা করেছেন, তা ন্যায্য প্রশংসা এবং শ্রমিক শ্রেণীর যে খুঁত দেখিয়েছেন তাও প্রকৃত অর্থেই খুঁত।
সমাপ্তিতে এসে এই বলা যায়, ইয়েটসের কবিতায় এবং জীবনে আইরিশ জাতীয়তাবাদ যতটা না এসেছে রাজনৈতিক কারণে তার থেকে বেশি এসেছে কবিসুলভ অনুভূতির তাড়নায়। তাই যখনই তার সঙ্গে অন্যান্য আইরিশ জাতীয়তাবাদীদের মতাদর্শের পার্থক্য ঘটেছে, তিনি রাজনীতিকদের মতো আপোস করেননি, দেশান্তরী হয়েছেন। এত কিছুর পরেও জন্মভূমিকে আর ভুলতে পারলেন কোথায়? “এ প্রেয়ার ফর মাই ডটার” কবিতায় যে ইয়েটস তীব্র কণ্ঠে আইরিশ বুদ্ধিজীবীদের মুণ্ডুপাত করে বলছেন “বুদ্ধিবৃত্তিক ঘৃণা সবচেয়ে নিম্নস্তরের” , সেই ইয়েটসই তো আবার জীবনের সায়াহ্নে এসে “দা সার্কাস এ্যানিম্যালস ডেসার্টশন” কবিতায় দুঃখ করছেন আইরিশ মিথ ব্যবহারে তার সহজাত দক্ষতা হারানোর বেদনায়।
তাই আমরা আজও ইয়েটসে মুগ্ধ, যতটা না তার কবিতার রাজনৈতিক সচেতনতায়, তার থেকে অনেকগুণ বেশি তার কবিতায় অঙ্কিত লিরিক্যাল-স্বপ্নিল এবং দুর্বোধ্য সৌন্দর্যের আকর্ষণে।
পঙক্তিটি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের। আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে ভূমিকা লিখে দেন তিনি। আজ ১৩ জুন, ২০১৪ ইয়েটসের ১৪৯তম জন্মবার্ষিকীতে এসে সর্বাগ্রে বাংলাভাষীদের মনে পড়ার কথা কবিগুরুর প্রতি, তথা বাংলা ও বাঙালী ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি আধুনিক ইংরেজি কবিতার পুরধা ব্যক্তিত্ব ইয়েটসের সে হৃদ্যপূর্ণ ব্যবহার।
অপরদিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ “আমার জীবনানন্দ আবিষ্কার ও অন্যান্য”-এ ইংরেজি সাহিত্যের আরেক পুরোধা আধুনিক কবি টিএস এলিয়টের সঙ্গে তার সাক্ষাত রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ আসতেই এলিয়টের অনাগ্রহের কথা উল্লেখ করেন। এলিয়ট কবিগুরুর প্রসঙ্গ উঠতেই স্মিত হেসে বলে দিয়েছিলেন- “নট মাই কাপ অফ টি”।
আধুনিক ইংরেজি কবিতার মুখপাত্র দুই ‘প্রায় সমসাময়িক’ ইংরেজ কবির কণ্ঠে রবিঠাকুরের কবিতা নিয়ে সম্পূর্ণ দুই মেরুর মন্তব্য আমাদের ভাবিয়ে তোলে। কেন ইয়েটস রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির ভূমিকায় ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে জিওফ্রে চসারের ত্রয়লাস অ্যান্ড ক্রেসিদার মতোই বহুল পঠিত হবে কবিগুরুর কবিতা, যেখানে এলিয়ট এক কথায় অস্বীকার করে বসলেন কবিগুরুকে?
এ প্রশ্নের নানাবিধ উত্তর আছে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উত্তরটি হচ্ছে দুজনেই ব্রিটিশ রাজের অধীনে পরাধীন রাজ্যের কবি হওয়ায় ইয়েটস বোধ করেছিলেন রবিঠাকুরের প্রতি তার স্বাভাবিক ভ্রাতৃত্ববোধ। পরবর্তীতে নানা গোলমালে তাদের সে সুসম্পর্ক আর টেকেনি।
যাই হোক, এটা আমাদের আজকের বিষয় নয়। আজকের উপজীব্য বিষয়- ইয়েটসের জীবনে, ইয়েটসের কবিতায় তার আইরিশ জাতীয়তাবাদের প্রভাব।
আয়ারল্যান্ডের ওপর ইংরেজদের দখলদারীর ইতিহাস অনেক পুরনো। রানী প্রথম এলিজাবেথ বা অলিভার ক্রমওয়েলের সময় থেকেই ইংরেজরা আইরিশদের ন্যায্য দাবিদাওয়া দমিয়ে রেখেছিল সহিংস দমন-পীড়নের দ্বারা। সে ইতিহাস আইরিশ জনসাধারণ এবং আইরিশ সাহিত্য সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত কেউ কখনো ভুলতে পারেনি, পারেননি ইয়েটসও। ইয়েটসের পূর্বপুরুষেরা দু’ শ’ বছর ধরে আয়ারল্যান্ডের বাসিন্দা। ইয়েটসের ধমনীতে প্রবাহিত ছিল সহজাত আইরিশ রক্ত। তাই আইরিশ সভ্যতা, সংস্কৃতি, আয়ারল্যান্ডের ইতিহাস ইয়েটসের কবিতায় দখল করে নেয় একটি শক্ত অবস্থান।
সাহিত্যে ইয়েটসের ছেলেবেলার হিরোরাও ছিলেন সব কট্টর আইরিশ ন্যাশনালিস্ট ব্যক্তিত্ব, যেমন রাজনীতিক এডমুন্ড বার্ক, গেলিভারস ট্র্যাভেলসের প্রখ্যাত রচয়িতা জনাথন সুইফট, কবি, নাট্যকার অলিভার গোল্ডস্মিথ এবং দার্শনিক বিশপ বার্কলে। তাদের কথা ঘুরেফিরে, নামে অথবা ছদ্মনামে, বারবার এসেছে ইয়েটসের কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে।
ইতিহাসের পশ্চাতে যা থাকে, তা-ই কিংবদন্তি আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিংবদন্তির দালিলিক প্রমাণ না থাকলেও তাতে সাহিত্য রচনার রসদ থাকে যথেষ্টই, আর তার গভীরে থাকে জাতীয় চিন্তা চেতনার প্রতিফলন। ইয়েটস নিজের আইরিশ জাতীয়তাবাদ সম্বন্ধে সচেতন থাকলেও প্রথম দিককার কবিতায় আইরিশ রাজনীতির বদলে ব্যবহার করেছেন আইরিশ মিথ, গাঁথা এবং আইরিশ ফোকলোর। ইয়েটসের বই “অটোবায়োগ্রাফিস”-এ ইয়েটসের সহজ স্বীকারোক্তি “পৃথিবীর সব জাতিই সর্বপ্রথম একাত্মবোধ করে নিজ অঞ্চলের পৌরাণিক গাঁথা ও কিংবদন্তির সঙ্গে, যা একজন মানুষের সঙ্গে তার দেশের মাটির আত্মিক যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করে”।
ইয়েটসের কাব্য চর্চার প্রথম পর্বে, যা ‘কেল্টিক টোয়েলাইট’ নামে পরিচিত, ছোট-বড় বিবিধ যে কবিতাগুলো রচনা করেন তাতে তিনি আইরিশ ফোকলোর গ্রহণ করেছেন দু’হাতে। মুকুটে শোভিত হীরকখণ্ডের মতো সে মিথ তিনি তাঁর কবিতায় সাজিয়েছেন বহু যতেœ, একটি একটি করে। ১৮৮৯ সালে প্রকাশিত তার দীর্ঘ ন্যারেটিভ কবিতা “দা ওয়ান্ডারিংস অফ ওশিন”-এ তিনি তুলে আনেন আইরিশ নায়ক ওশিনের গাঁথা, যিনি আয়ারল্যান্ডে খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক হিসেবে সমাদৃত। এছাড়াও, কবি জীবনের শুরুতে লেখা অসাধারণ সুন্দর সব লিরিক ধাঁচের কবিতা, যেমন- ‘দা স্টোলেন চাইল্ড’, ‘ডাউন বাই দা সেলি গার্ডেনস’, ‘দা রোজ অফ দা ওয়ার্ল্ড’, ‘লেক আইল অফ ইন্সফ্রি’ অথবা “দা ম্যান হু ড্রেমড অফ ফেয়ারিল্যান্ড” তার অন্যতম রোমান্টিক কবিতাগুলোর অন্তর্ভুক্ত, এইসব কবিতায় আয়ারল্যান্ডের বিবিধ ঐতিহাসিক স্থান, কিংবদন্তি এবং জাতীয় গর্বের বিষয়বস্তুগুলো উঠে এসেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
প্রথমার্ধের কবিতায় আইরিশ মিথ এবং আয়ারল্যান্ডের বিবিধ ঐতিহাসিক স্থানের উল্লেখের পাশাপাশি কবিতার সহজ সরল ভাব ও ভাষা- একটি প্রণিধানযোগ্য দিক। ইয়েটসের পরিণত বয়সে লেখা “দা সেকেন্ড কামিং”, “সেইলিং টু বাইজেন্টিয়াম” অথবা “বাইজেন্টিয়াম” ইত্যাদি কবিতার বিষয়বস্তু তুলনা করলে বোঝা যায় ইয়েটস তার প্রথম যুগে কি সহজ ভাষায় কবিতা লিখতেন।
কেন লিখতেন এতটা সহজ করে? কারণ ইয়েটস চাইতেন যে মানুষ তার কবিতা পড়ুক, বুঝুক এবং আইরিশ ট্র্যাডিশনে মুগ্ধ হোক। আইরিশ মিথ, বৃহদার্থে আইরিশ জাতীয়তাবাদ ইয়েটসের কবিতার স্টাইলে প্রভাব বিস্তার করেছিল একদম গোড়া থেকেই। ইয়েটস পরে অবশ্য অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে তার কবিতার স্টাইল এবং বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন আনেন, এ নিয়ে তার ছোট কিন্তু অসাধারণ একটি কবিতা ও আছে “এ কোট” নামে। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।
ইয়েটসের জীবনে দুই নারীর অত্যন্ত প্রভাবশালী উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। প্রথমজন হলেন থিয়েটার অভিনেত্রী এবং উগ্র আইরিশ জাতীয়তাবাদী, “ডাবলিন বিউটি” খ্যাত মডগন। ইয়েটস তার আত্মজৈবনিক রচনা “মেমোরিস”-এ এই অপরূপ রূপসী মহিলাকে প্রথম দেখার স্মৃতিচারণ করেন-“আমার বয়স তখন তেইশ মাত্র, যখন আমি এই মহাদুর্যোগে পতিত হই”। ইয়েটস এই দুর্যোগে পতিত হওয়া যে উপভোগ করেছিলেন তা বলাই বাহুল্য! ইয়েটসের পূর্বপর প্রচুর কবিতায় মডগনের উপস্থিতি তো আছেই, কবি ইয়েটসকে নাট্যকার বানিয়ে তোলার পেছনেও তার জীবনের প্রথম এ প্রেম ও প্রেমিকার ভূমিকা অপরিসীম।
মডগনকে নায়িকার চরিত্রে রেখে ১৮৯১ সালে ইয়েটস রচনা করেন “কাউন্টেস ক্যাথলিন” নাটিকা, যেখানে নায়িকা ক্যাথলিন হচ্ছেন একজন সম্ভ্রান্ত এ্যাংলো-আইরিশ মহিলা, যিনি শয়তানের কাছে নিজের আত্মা বিক্রি করেন আইরিশ জনসাধারণের মুক্তির বিনিময়ে। বলাই বাহুল্য, এই নাটিকা সম্পূর্ণ আইরিশ ভাবাবেগ এবং আইরিশ কিংবদন্তির রেফারেন্সে পরিপূর্ণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে মডগন এই নাটিকা অভিনয় করতে পারেননি। ইয়েটস ১১ বছর পর, ১৯০২ সালে “ক্যাথলিন নি হলিহান” নাটিকা রচনা করলে মডগন তাতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেন।
ইয়েটসের জীবনে আরেক প্রভাবশালী নারী হচ্ছেন আইরিশ লেখিকা এবং আইরিশ সংস্কৃতির প্রচারক লেডি গ্রেগরি। ওনার খামার বাড়িতে ইয়েটস প্রচুর বেড়াতে গিয়েছেন। ইয়েটসের বেশকিছু কবিতার জন্মস্থল এই খামারবাড়ি। লেডি গ্রেগরির উৎসাহে ১৮৯৯ সালে ইয়েটস প্রতিষ্ঠা করেন আইরিশ ন্যাশনাল থিয়েটার।
এই থিয়েটারের ব্যস্ততা ইয়েটসকে জড়িয়ে ফেলে নানামুখী ব্যস্ততায় যার বেশিরভাগই ছিল ইয়েটসের কবি প্রতিভার অপচয় এবং অযথা কালক্ষেপণ। অভিনেতা যোগাড় করা, তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, হল ভাড়া, সেন্সর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ছাড়পত্র পাওয়া এইসবে একদম ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেন ইয়েটস।
তাও চলত যদি থিয়েটারে ইয়েটস পেতেন নিজের সৃষ্টিশীলতাকে লাগামছাড়া উড়তে দেবার সুযোগ। ডাবলিনের দর্শকশ্রোতারা ইয়েটসের প্রতিভার প্রতি সুবিচার করেনি, তারা বলতে গেলে মুখই ফিরিয়ে নেয় ইয়েটসের বহুকষ্টের একেকটা প্রোডাকশন থেকে। “হাউন্ডিং অফ পারনেল”, “দা প্লেবয় অফ দা ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড”(১৯০৭) এবং “দা লেন পিকচারস”(১৯১৩) রোমান ক্যাথলিক মধ্যবিত্তশ্রেণীর দর্শকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। ক্ষুব্ধ, বিরক্ত, অপমানিত ইয়েটস আয়ারল্যান্ড ছেড়ে পাড়ি জমান লন্ডনে। পরবর্তীতে স্বাধীন আয়ারল্যান্ডে সেনেটর হিসেবে ফেরত এসে কাজ করেন ১৯২২ সাল থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত, কিন্তু রোমান ক্যাথলিকদের কাছে পাওয়া সে অপমান তিনি ভুলতে পারেননি। তার রাজনৈতিক কার্যকলাপ ছিল মূলত আইরিশ প্রোটেস্টান্টদের উন্নয়ন ঘিরে।
মধ্যবিত্ত ক্যাথলিক আইরিশদের মধ্যে দেশপ্রেমের চাইতে আত্মপ্রীতিই ছিল বেশি। তাই তারা ইয়েটসের নাটকগুলোকে ধর্মীয় গোঁড়ামির ছাদনাতলায় এনে ইচ্ছেমতো ছুরিকাঁচি চালিয়েছিল। ইয়েটস তার আবেগের স্থলে এ রকম আঘাত সইতে পারেননি। তিনি তীব্র ক্ষোভে রচনা করেন তার কবিতা “এ কোট”। কবিতাটিতে তিনি আইরিশ জাতীয়তাবাদ এবং মিথকে তিনি শার্টের ওপর শোভাবৃদ্ধিকারী কোটের সাথে তুলনা করেন। একদা যে কোট তিনি পরিধান করতেন (অর্থাৎ কবিতায় যে আইরিশ মিথ ও ভাবাবেগ তিনি ব্যবহার করতেন) এখন সবাই তার দাবিদার বনে যাওয়ায় তিনি ঘোষণা দেন, শতছিন্ন কদর্য এই সাজপোশাক পরিধানের বদলে তিনি বরং নগ্নাবস্থায় চলেফিরে বেড়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন।
‘ইস্টার ১৯১৬’ তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি রাজনৈতিক কবিতা, যা ১৯১৬ সালে আইরিশ জাতীয়তাবাদীদের ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পটভূমিতে রচিত। ইয়েটস সে অভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন যারা তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বারবার ব্যবহার করেন বিখ্যাত সে পঙতি- ‘এ টেরিবল বিউটি ইজ বর্ন”। ইয়েটসের ভাষ্যে ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের জন্ম হয়েছে তাদের এ আত্মত্যাগে। কিন্তু শক্তিশালী ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে এ অপরিকল্পিত আক্রমণ ও জীবনদান কতটুকু যৌক্তিক, কবিতার শেষে সুকৌশলে তিনি সে প্রশ্নও ছুড়ে দেন।
এটা ছাড়াও “সেপ্টেম্বর-১৯১৩”, “অ্যাট দা অ্যাবি থিয়েটার”, “এ হাউস শেকেন বাই ল্যান্ড এজিটেশন”, “দা পিপল অ্যান্ড দা নিউ ফেইস” ইত্যাদি কবিতায় তিনি কট্টর আইরিশ ভাবাদর্শবাদীদের সমালোচনা করেন।
গণতন্ত্রের প্রতি ভক্তি চলে যাওয়া ইয়েটস কালক্রমে আরও বেশি ঝুঁকে পড়েছিলেন তীব্র ডানপন্থী মতবাদের দিকে। ইতোপূর্বে জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিখ নীটশের প্রভাব তার চিন্তাধারায় বিরাজমান ছিল ভালভাবেই। একই সঙ্গে তার সখ্য ছিল ইউরোপিয়ান ফ্যাসিস্টদের সঙ্গেও, যেমন সখ্য ছিল আরেক বিখ্যাত আধুনিক কবি এজরা পাউন্ডের। ইতালির মুসোলিনি, স্পেনের জেনারেল ফ্রাঙ্কো এবং আয়ারল্যান্ডের ও’ ডাফের শাসনের প্রতি ছিল তার শক্তিশালী সমর্থন। ইয়েটসের ভক্তরা পারতপক্ষে ইয়েটসের এই ব্যক্তিগত দিকগুলো চাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করেন, কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শের অনেকেই ইয়েটসকে মোটেও ছাড় দিতে চাননি এই ইস্যুতে। “এ্যানিমেল ফার্ম” এবং “১৯৮৪”-এর মতো বিশ্বখ্যাত উপন্যাসের রচয়িতা জর্জ অরওয়েলের “ইয়েটসের চিন্তাধারায় ফ্যাসিজমের অপচ্ছায়া” নামক একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ১৯৪৩ সালে, যা পুস্তকাকারে পুনর্মুদ্রিত হয় ১৯৬৩তে।
ডব্লিউ এইচ অডেন বামপন্থীধারার কবি হলেও ছিলেন ইয়েটসের প্রতি বিশেষ অনুরাগী। তিনি তার এক প্রবন্ধ “প্রচলিত জনমত ও মিঃ উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস”-এ ইয়েটসের পক্ষ নেন এবং প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে ইয়েটস ধনিক শ্রেণীর যে প্রশংসা করেছেন, তা ন্যায্য প্রশংসা এবং শ্রমিক শ্রেণীর যে খুঁত দেখিয়েছেন তাও প্রকৃত অর্থেই খুঁত।
সমাপ্তিতে এসে এই বলা যায়, ইয়েটসের কবিতায় এবং জীবনে আইরিশ জাতীয়তাবাদ যতটা না এসেছে রাজনৈতিক কারণে তার থেকে বেশি এসেছে কবিসুলভ অনুভূতির তাড়নায়। তাই যখনই তার সঙ্গে অন্যান্য আইরিশ জাতীয়তাবাদীদের মতাদর্শের পার্থক্য ঘটেছে, তিনি রাজনীতিকদের মতো আপোস করেননি, দেশান্তরী হয়েছেন। এত কিছুর পরেও জন্মভূমিকে আর ভুলতে পারলেন কোথায়? “এ প্রেয়ার ফর মাই ডটার” কবিতায় যে ইয়েটস তীব্র কণ্ঠে আইরিশ বুদ্ধিজীবীদের মুণ্ডুপাত করে বলছেন “বুদ্ধিবৃত্তিক ঘৃণা সবচেয়ে নিম্নস্তরের” , সেই ইয়েটসই তো আবার জীবনের সায়াহ্নে এসে “দা সার্কাস এ্যানিম্যালস ডেসার্টশন” কবিতায় দুঃখ করছেন আইরিশ মিথ ব্যবহারে তার সহজাত দক্ষতা হারানোর বেদনায়।
তাই আমরা আজও ইয়েটসে মুগ্ধ, যতটা না তার কবিতার রাজনৈতিক সচেতনতায়, তার থেকে অনেকগুণ বেশি তার কবিতায় অঙ্কিত লিরিক্যাল-স্বপ্নিল এবং দুর্বোধ্য সৌন্দর্যের আকর্ষণে।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
No comments:
Post a Comment