Thursday, June 12, 2014

উন্মাদনায় ফুটবল বিশ্বকাপ

উন্মাদনায় ফুটবল বিশ্বকাপ
রায়হান ফরাজী
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় ভাসছে দেশ। আকাশে বাতাসে এখন বিভিন্ন দেশের পতাকা। বাড়ির ছাদ যেন হয়ে গেছে এক একটা দেশের প্রতীক। সাদা-কালো টিভিতে আগে যখন বিশ্বকাপ খেলা দেখতাম, তার জন্য থাকত বিশেষ প্রস্তুতি। খাবার আর আড্ডার ছলে সেই খেলা দেখা হয়ে উঠত পরিবারের আনন্দের অংশ। কথাগুলো বলছিলেন পঞ্চাশোর্ধ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক জন শিক্ষিকা দেলোয়ারা খানম। শিক্ষার্থী এবং সেই সঙ্গে গৃহিণী নাইমা হক মুক্তি বলেন, ফুটবল খেলা খুব একটা দেখা হয় না, নিজের লেখাপড়া সংসার সামলিয়ে যথাসময়ে টিভির সামনে বসে খেলা এই বার দেখব, কারণ মেসি আমার প্রিয় খেলোয়াড়। সরকারী অডিটর সরিফুন নেসা রুমীর ভাষ্য মতে, ঢাকা যেন এখন পতাকাময়, যেখানে যাই বিভিন্ন রঙের পতাকায় বেশ ভালই লাগে, তাই নিজেও ব্রাজিলের একটা পতাকা কিনেছি। তবে বেশি ভাল লাগত বাংলাদেশ যদি ফুটবল বিশ্বকাপ খেলতে পারত।
ফুটবল বিশ্বকাপের আসল জোয়ারটা বোঝা যায় শিশু-কিশোরদের ভেতর। ক্লাস নাইনের ছাত্র রাফিকে জিজ্ঞেস করতেই আবেগী উত্তেজনায় জানাল, জার্মান ছাড়া অন্য কোন দেশ আমি চিন্তাই করতে পারি না, মার্কো রয়েস আমার হিরো। তবে আম্মু রাত জেগে খেলা দেখতে দেবে না বলে জানিয়েছে, সেই সঙ্গে পড়ার চাপ তো আছেই। বিশ্বকাপ তো বার বার আসে না, চার বছর পর পর আসে, যে করেই হোক এই খেলা আমাকে দেখতেই হবে। এই হচ্ছে আমাদের দেশে ফুটবল উত্তেজনা।
খেলাধুলা মানেই যে এখন আর ছেলেদের বিষয় না তা বোঝা যাচ্ছে বেশ ভালভাবেই। ধানম-ির বাসিন্দা নাসরিন জানান, এরই মাঝে আমার দুই মেয়েকে তাদের প্রিয় দলের জার্সি কিনে দিয়েছি, আমি নিজেও খেলা দেখার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, আসলে ফুটবল খেলাটা বোঝা অনেক সহজ। তিনি আরও জানান, একটা বিষয় আমার খুব খারাপ লাগে, অন্য দেশের পতাকা কে কত বড় আকারের বানাতে পারে তার একটা প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়, অথচ বাংলাদেশের অনেক বড় কোন পতাকা আমাদের কোন জাতীয় দিবসে কেউ উৎসাহ নিয়ে বানিয়ে তা তার বাড়িতে টানিয়েছে এ রকম আজও শুনিনি। এটুকু বাদ দিলে বিশ্বকাপ ফুটবল আমাকে আজও সমভাবে নারা দেয়, যা ছোটবেলায় হতো।
কাদা মাখা মাঠে, দুরন্ত কিশোররা এখন আর খেলতে যায় না, তার স্থলে স্থান করে নিয়েছে কম্পিউটার গেমস। এখানেই আমাদের সন্তানেরা তাদের প্রিয় দলের সমর্থনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে থাকে। মাঠের অভাব, সামাজিক নিরাপত্তার অজুহাতে আমরাই আমাদের সম্ভাবনাকে ভার্চুয়াল করে ফেলছি। যার ফলস্বরূপ ফুটবল হারাচ্ছে তার নিজ গৌরব, এখন আর আবাহনী-মোহামেডানের খেলা নিয়ে আমরা কেউ মেতে থাকি না, ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের যে খবরাখবর আমরা যানি, নিজ দেশের ফুটবল খেলা নিয়ে সে খবর আমরা রাখি না আবার বলা যায় খবর রাখার মতো কোন খবর তৈরিও হয় না।
একটা কর্পোরেট হাউজের এ্যাকাউন্ট অফিসার, সাজেদীন আরা বললেন- হিন্দী সিরিয়াল আর খেলাকে পাশাপাশি রাখলে সিরিয়ালের প্রতিই আগ্রহ বারবে। তাই আমাদের ক্রিকেটের মতো পরিকল্পনা করে ফুটবলকে এগিয়ে নিতে হবে। আসল কথা নিজের দেশ সংশ্লিষ্ট খেলায় না থাকলে, তার প্রতি আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন ব্যাপার।
খেলা আমাদের চিত্তকে সজীব করে, মন ও শরীর দুই প্রফুল্ল রাখে। সজীব চিত্ত এবং প্রফুল্ল মন এক হয়ে শুধু মঙ্গল কাজ করা সম্ভব, যা এই দেশে এখন অপ্রতুল। আমাদের স্বার্থে খেলাধুলাকে প্রমোট করতে হবে, নারী-পুরুষ সবার জন্য, দেশের ভালর জন্য।

No comments:

Post a Comment