Tuesday, June 10, 2014

কায়সারের নির্দেশে চা শ্রমিক হিরামনিকে নির্যাতন করে দুই পাকসেনা যুদ্ধাপরাধী বিচার

কায়সারের নির্দেশে চা শ্রমিক হিরামনিকে নির্যাতন করে দুই পাকসেনা
যুদ্ধাপরাধী বিচার
স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোঃ কায়সারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের বিংশতম সাক্ষী আব্দুল মোতালেব জবানবন্দীতে বলেছেন, সৈয়দ কায়সারের নির্দেশে হবিগঞ্জের চান্দপুর ছাগল বাজার এলাকার চা শ্রমিক হিরামনি সাঁওতালকে নির্যাতন করে দুই পাকিস্তানী সেনা। তখন হিরামনি সাঁওতাল অসুস্থ ছিল। হিরামনির বাড়ির বেড়ার আড়াল থেকে এ সময় আমি হিরামনির চিৎকার এবং কান্না শুনতে পেয়েছি। জবানবন্দী শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবী সাক্ষীকে জেরা করেন। অসমাপ্ত জেরার জন্য আজই দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে একই মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুস সুবহানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন পক্ষের ১১তম সাক্ষী মোঃ ফজলুর রহমান ফান্টুকে আসামিপক্ষের জেরা শেষ হয়েছে। আজ ১২তম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করেছে ট্রাইব্যুনাল। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মঙ্গলবার এ আদেশ প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দু’সদস্য ছিলেন বিচারপতি মোঃ মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মোঃ শাহিনুর ইসলাম।
প্রসিকিউশনের সাক্ষীকে জবানবন্দীর সময় ট্রাইব্যুনালকে সহযোগিতা করেন প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত। এ সময় প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ এবং প্রসিকিউটর রেজিয়া সুলতানা চমন উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষ্য শেষে এ সাক্ষীকে জেরা শুরু করেছেন কায়সারের আইনজীবী আব্দুস সোবহান তরফদার। জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোঃ কায়সারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ২০তম সাক্ষী তাঁর জবানবন্দীতে বলেছেন, আমার নাম আব্দুল মোতালেব। পিতা-মৃত বাহাদুর আলী, মাতা-মৃত ছায়মন নেসা। ঠিকানা: গ্রাম-একরতলী, থানা-চুনারুঘাট, জেলা-হবিগঞ্জ। আমার বর্তমান বয়স ৭৬-৭৭ বছর। আমি কৃষি কাজ করি। আমি একরতলী প্রাইমারী স্কুলে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল অনুমানিক ২৭-২৮ বছর। ্ সাক্ষী তাঁর জবানবন্দীতে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সোর্স ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৪-৫ মে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান তাঁদের এলাকায় এসে তাঁকেসহ আরও কয়েকজনকে সোর্স হিসেবে মনোনীত করেন। তাঁদের দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানী সেনা এবং রাজাকাররা এলাকায় কী করে ভারতের কাঁচামাটি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে মতিউর রহমানের কাছে গিয়ে সে খবর দেয়া। মোতালেবের বাড়ি থেকে ক্যাম্পটি আনুমানিক দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে। ১৯৭১ সালের ১১ অথবা ১২ মে, সম্ভবত বৈশাখ মাসের শেষের দিকে সকাল নয়টার দিকে আমি রিপোর্ট দেয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে দক্ষিণ দিকে ডোলনা চা বাগানের দরগাবিলে একটি বটগাছের কাছে এসে পৌঁছাই। এ সময় দরগাবিলের ফাঁড়ির রাস্তায় হঠাৎ পাকিস্তানী সেনাদের পাঁচটি গাড়ি দেখতে পাই। এর মধ্যে চারটি গাড়ি ডোলনা চা বাগানের দিকে চলে যায়। দরগাবিল রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি থেকে এ সময় সাক্ষী পাকিস্তানী সেনা মেজর ইউসুফ আলীর টুআইসি শের বাহাদুর, মেজর ইউসুফ, সৈয়দ কায়সার এবং দু’জন অপরিচিত বাঙালীকে দেখেন। গাড়ি থেকে নেমে সাক্ষীকে দেখতে পেয়ে শের বাহাদুর হাত ইশারায় ডাক দিলে তিনি তাদের কাছে যান।
এ সময় সৈয়দ কায়সার সাক্ষী সম্পর্কে পাকিস্তানী সেনাদের বলেন, ‘সে তো মুক্তিযোদ্ধা’ এবং মুক্তিযোদ্ধারা কে কোথায় আছেনÑ জানতে চান কায়সার। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের খবরা-খবর দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে মেজর ইউসুফ এবং শের বাহাদুর বলেন, ‘সে তো ভাল লোক। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় আমরা তাদের বাংলা ঘরে থাকতাম। তার বাবা একজন ভাল গৃহস্থ এবং এলাকার মুরুব্বি। আমরা তাদের বাড়িতে থেকে ক্যাম্পগুলো পরিচালনা করতাম।’ কায়সার তখন বলেন, ‘ওকে ছাড়া যাবে না।’ ডোলনার দিকে যাওয়া চারটি গাড়ি ফিরে এলে সাক্ষী আব্দুল মোতালেবকে গাড়িতে তুলে চান্দপুরের দিকে রওনা দেয়। মেজর হাফিজ, শের বাহাদুর, সৈয়দ কায়সার একই গাড়িতে ছিলেন। চান্দপুরে পৌঁছে চারটি গাড়ি চা ফ্যাক্টরির দিকে চলে যায়। কিন্তু সাক্ষীকে বহনকারী গাড়িটি চান্দপুর ছাগল বাজার থেকে আনুমানিক ৩০০ গজ দূরে গিয়ে থামে। এ সময় দু’জন পাকিস্তানী সেনা সেখানে এলে কায়সার অপরিচিত দুই বাঙালী ও পাকিস্তানী সেনাদের নিয়ে পার্শ্ববর্তী এক চা শ্রমিকের বাড়ির দিকে যান।
তাঁরা গাড়ি থেকে কিছুদূর যাওয়ার পর সাক্ষী মেজর ইউসুফের কাছে জানতে চান, সে কী করবে? মেজর ইউসুফ তাঁকে চলে যেতে বলেন। সাক্ষী তখন একটি আখ ক্ষেতের ফাঁক দিয়ে হিরামনি সাঁওতালের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। তখনও তিনি হিরামনি সাঁওতালকে চিনতেন না। বাড়ির কাছাকাছি যাওয়ার পর তিনি হিরামনি সাঁওতালের কান্নাকাটি এবং চিৎকার শুনতে পেয়ে বেড়ার আড়ালে আশ্রয় নেন। তখন সাক্ষী শুনতে পান, হিরামনি সাঁওতাল চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমাকে বেইজ্জতি করেছে, আমি আর বাঁচতে চাই না।’
তখন পার্শ্ববর্তী বাড়ি থেকে একজন বৃদ্ধ লোক হিরামনিকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এলে কায়সার ও তাঁর সঙ্গের দুই অপরিচিত বাঙালী লোকটিকে কিল, ঘুসি ও ধাক্কা মেরে ফেলে দেন। এর ৪০ থেকে ৫০ মিনিট পর কায়সার ও তাঁর সঙ্গের পাকিস্তানী সেনারা নোয়াপাড়ার দিকে চলে গেলে হিরামনির বাড়িতে ঢুকে দেখতে পান, একজন মহিলা কাঁদছেন। উদ্ধার করতে আসা সেই বৃদ্ধ বাঙালী লোকটির কাছ থেকে জানতে পারেন, যে মহিলাটি কাঁদছেন তার নাম হিরামনি সাঁওতাল। এ লোকটির কাছেই সাক্ষী জানতে পারেন, সৈয়দ কায়সারের নির্দেশে দুই পাকিস্তানী সেনা হিরামনিকে তাঁর রান্নাঘরে নিয়ে ধর্ষণ এবং নির্যাতন করেছে। সাক্ষী সৈয়দ কায়সারকে আগে থেকেই চিনতেন। এ সময় ট্রাইব্যুনাল সাক্ষীর কাছে জানতে চান, মেজর ইউসুফ এবং শের বাহাদুর বাংলা জানতেন কি-না? যদি না জেনে থাকেন তবে সাক্ষী কিভাবে তাঁদের ভাষা বুঝতেন? উত্তরে সাক্ষী বলেন, ‘না তাঁরা বাংলা জানতেন না। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তাঁরা আমাদের বাড়িতে প্রায় ছয় মাস ছিলেন। সেই সুবাদে আমি কিছু উর্দু বুঝতাম এবং তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারতাম।’
৯ মার্চ শুরুর পর এ পর্যন্ত কায়সারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন প্রসিকিউশন পক্ষের আরও ১৯ সাক্ষী। তাঁরা হচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা কাজী কবির উদ্দিন, মোহাম্মদ আলী টিপু, কায়সার বাহিনীর সদস্য হাজী মোঃ তাজুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী পাঠান, কায়সারের অপরাধের শিকার একজন বৃদ্ধা নারী (ক্যামেরা ট্রায়াল), মোঃ ইয়াকুব আলী, শাহ হাসান আলী ফুলু মিয়া, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা শাহ হোসেন আলী সাবু, শহীদপুত্র মোঃ মোস্তফা আলী, কায়সারের অপরাধের শিকার একজন সাক্ষী (ক্যামেরা ট্রায়াল), শহীদপুত্র মোঃ নওশাদ আলী, মুক্তিযোদ্ধা গৌর প্রসাদ রায়, মোঃ গোলাম নুর, মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নায়েব আলী, আলহাজ নিশামন, মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মতিন জামাল, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক ফুলু মিয়া, বাসু সাঁওতাল এবং নায়েব আলী। তাঁদের জেরা করেছেন আসামিপক্ষ।
আব্দুস সুবহান ॥ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুস সুবহানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন পক্ষের ১১তম সাক্ষী মোঃ ফজলুর রহমান ফান্টুকে আসামিপক্ষের জেরা শেষ হয়েছে। আজ ১২তম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।
মঙ্গলবার মোঃ ফজলুর রহমান ফান্টুকে তৃতীয় ও শেষ দিনের মতো জেরা করেন সুবহানের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম। রবিবার সাক্ষ্য শেষে এ সাক্ষীকে জেরা শুরু হয়। ৭ এপ্রিল শুরু হয়ে এর আগে সুবহানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আরও ১০ সাক্ষী।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment