Wednesday, June 4, 2014

ঘরের নিচে বাংকার বনে আরও অস্ত্র

ঘরের নিচে বাংকার বনে আরও অস্ত্র
রেজওয়ান আহমেদ, সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন, আবুল কালাম আজাদ, সাতছড়ি থেকে
প্রকাশ : ০৫ জুন, ২০১৪

র‌্যাবের অপারেশন সাতছড়িতে বনের গভীরে আরও বাংকার এবং মজুদ অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। একটি ঘরের নিচে বাংকার খুঁজে পেয়েছে র‌্যাব। এখান থেকে ওষুধ কাগজপত্র সেলাই মেশিনসহ বিভিন্ন মালামাল উদ্ধার হয়েছে। তবে অস্ত্র পাওয়া যায়নি। বুধবার পর্যন্ত আবিষ্কৃত বাংকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতে। এসব বাংকারের একটি ছাড়া বাকিগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। বুধবার উদ্ধারকৃত হয়েছে ৭.৬২ মেশিনগান ৪টি, মেশিনগানের গুলির ব্যারেল ৫টি ও ১২ হাজার ৯৮৭টি গুলি, রকেট লঞ্চার ১টি, ৪০ মিলিমিটার রকেট গোলা ২২২টি, রকেট চার্জার (যা দিয়ে ফায়ার করা হয়) ২৪৮টি। তবে অস্ত্র ও গোলাবারুদগুলোর অধিকাংশই পুরনো। উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলোর সঙ্গে চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক ও কাহালুর অস্ত্র চালানের সঙ্গে মিল রয়েছে। এ ঘটনায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে আলাদা দুটি মামলা হয়েছে। অপারেশন সাতছড়ির ব্যাপারে গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলে প্রেস ব্রিফিং করে র‌্যাব। এতে র‌্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান জানান, এ ঘটনায় ২টি মামলা দায়ের করা হবে। একটি অস্ত্র ও অপরটি বিস্ফোরক আইনে। তার পর তদন্ত হবে। এর পরই এসব প্রশ্নের উত্তর বেরিয়ে আসবে। তবে অভিযান অব্যাহত থাকবে। পার্শ্ববর্তী আর কোনো পাহাড়ে আরও বাংকার বা অস্ত্রের মজুদ আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে অনুসন্ধান চালাবে। এদিকে র‌্যাবের এ অভিযান শুরুর পর থেকে আতঙ্ক ছড়িয়েছে পাহাড়ি আদিবাসী পল্লীতে। বাড়িগুলো একেবারেই পুরুষশূন্য। মহিলারা থাকলেও কোনো কথা বলতে চান না। তাদের চোখে-মুখে রয়েছে আতঙ্কের ছাপ। র‌্যাবের সন্দেহ পাহাড়ের গভীরে থাকা এসব বাংকার ও অস্ত্রের সঙ্গে আদিবাসী পল্লীর লোকজনের স¤পৃক্ততা থাকতে পারে। এজন্য পাড়ার বেশ কয়েকজনের তালিকা তৈরি করে তাদের গতিবিধি, পরিবার ও বাড়ি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্রের বহুল আলোচিত চালানের পর দ্বিতীয়বারের মতো সাতছড়ি থেকে অস্ত্রের বড় চালান উদ্ধার হয়েছে। এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার শুরু হলে দেশের ১৬টি গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে অধিকাংশ সংস্থার প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছেন। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন আদিবাসী পল্লীর সুরেষ দেব বর্মা ও শম্ভু দেব বর্মার বাড়ি কড়া নজরদারিতে রেখেছে। ওই দুটি বাড়ির ভূগর্ভে বিশাল দুটি বাংকারের সন্ধান পাওয়া যায়। বাংকার দুটি থেকে কিছু ওষুধপত্র এবং পলিথিন, সেলাই মেশিনসহ বিভিন্ন মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা একটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পোশাক তৈরি করা হতো, যা সেনাবাহিনীর পোশাকের আদলে। র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মোঃ হাবিবুর রহমান প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদ চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক এবং বগুড়ার কাহালুতে আটক ১ ট্রাক অস্ত্রের সঙ্গে সাদৃশ রয়েছে। তবে অস্ত্রগুলো কাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের কিনা তা এখনও জানা যায়নি। বুধবার দুপুরে উদ্যানের মাঠে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি।
অপারেশন সাতছড়ি : গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘদিন ধরে সাতছড়ি নজরদারিতে রেখেছিল র‌্যাব। গত পহেলা জুন গোপনে সাতছড়ির দিকে মার্চ শুরু করে র‌্যাব সদস্যরা। এখানে ফোর্স আনা হয় সিলেট, ঢাকা, শ্রীমঙ্গল থেকে। এর পর থেকেই স্থানীয় বাসিন্দাসহ আশপাশের এলাকার মানুষের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হয়। কি হচ্ছে এখানে? কিন্তু কেউ কিছু নিশ্চিত করতে পারেননি। সোমবার সকাল থেকে অভিযানে নেমে পড়ে র‌্যাব সদস্যরা। আনা হয় ডগ স্কোয়াড ও বিস্ফোরক ডিস্পোজাল টিম। ব্যাপক তল্লাশি চলে পাহাড়ে পাহাড়ে। মঙ্গলবার উদ্যানের প্রধান সড়ক থেকে প্রায় মাত্র এক কিলোমিটার দূরে প্রথমে একটি পাহাড়ে ৩টি বাংকারের সন্ধান পায় র‌্যাব। এরপর আরও দুটি বাংকারের সন্ধান পায়। পরবর্তীকালে আরও দুটি বাংকারের সন্ধান মেলে। প্রথম দিনে ট্যাংক বিধ্বংসী রকেট গোলাসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। বুধবারও আরও অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হয়। র‌্যাবের ধারণা পাহাড়ে আরও বাংকার, আরও অস্ত্র গোলাবারুদ থাকতে পারে।
পাহাড়ি মানুষের মধ্যে আতঙ্ক : অভিযানের শুরু থেকেই ত্রিপুরা পল্লীর বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ বাড়িতেই কেউ নেই। বাড়িগুলোর বাসিন্দা পুরুষ, মহিলা, শিশু সবাই পালিয়ে গেছে। জনশূন্য হয়ে পড়েছে পুরো পাহাড়ি এলাকা। দুটি বাংকারের পার্শ্ববর্তী বাড়িতে শুধু কয়েকজন মহিলাকে পাওয়া গেছে। তারা কোনো কিছুই বলতে রাজি হয়নি। কে বা কারা এ বাংকার তৈরি করেছে, এখানে কি করত কিছুই তারা জানে না। এ সময় তাদের চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ ছিল। এক মহিলা অসুস্থ হয়ে পড়ে। আরেকজন মহিলা সাংবাদিকদের দেখে পুজো দিতে শুরু করেন।
ত্রিপুরা টাইগার সাপোর্ট গ্র“পের বই উদ্ধার : স্বাধীনতার দাবিতে ত্রিপুরা টাইগার সাপোর্ট গ্র“পের একটি বই উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযান চালনাকালে একটি বাংকার থেকে এ বইটি উদ্ধার করা হয়। বইটির নাম ‘কেন ত্রিপুরারা স্বাধীনতার দাবিতে সংগ্রাম করছে।’ হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোঃ জয়নাল আবেদীন ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে বইটি সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করেন। তবে বইটিতে কি লেখা ছিল তা তিনি জানাননি। তিনি বলেন, ত্রিপুরা টাইগার সাপোর্ট গ্র“প নামে একটি সংগঠনের বই বাংকারের পার্শ্ববর্তী ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বইটিতে লেখা রয়েছে ত্রিপুরারা স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার দাবিতে সংগ্রাম করছে কেন। পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক মোঃ জয়নাল আবেদীন সাংবাদিকদের জানান, স্থানীয় লোকজন এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। অস্ত্রের মজুদ সম্পর্কে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিভিন্ন দেশের বস্তায় মোড়ানো ছিল অস্ত্রগুলো। একটি লঞ্চার দেখেছি যাতে লেখা ১৯৯০ সালে প্রস্তুতকৃত। কিন্তু কোন দেশের, কোথা থেকে এসেছে তা আমার জানা নেই।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা : অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার এবং অপারেশন সাতছড়িকে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। র‌্যাবের পাশাপাশি মোতায়েন রয়েছে পুলিশ ও বিজিবি। অভিযান চলাকালে ঢাকা-সিলেট পুরাতন মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম ছিল। এ সড়কে ৪ দিন ধরেই মানুষজন খুব সীমিতভাবে চলাচল করছে। খুব প্রয়োজনে বা না জেনে যারা চলাচল করছে তাদের মধ্যেও বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক।
কাহালুর অস্ত্র সাতছড়ি থেকে পাচার হয়েছিল : ২০০৩ সালের ২৭ জুন হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সাতছড়ি থেকেই পাচার হয়েছিল বগুড়ার কাহালুতে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, বিস্ফোরক ও গোলাবারুদ। দেশের প্রথম বিপুল পরিমাণ এ অস্ত্র বিস্ফোরক ও গোলাবারুদ আটকের পর দীর্ঘ তদন্ত শেষে চার্জশিটে একথাই উল্লেখ করা হয়েছিল। আর মামলা তদন্ত করেছিলেন তৎকালীন সিআইডির সিনিয়র পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমান। মামলাটি দীর্ঘ ১০ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি। দেশের সর্ববৃহৎ গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক চালান আটকের সঙ্গে কারা জড়িত বা কি উদ্দেশ্যে এসব অস্ত্র পাচার করা হয়েছিল তা জানা যায়নি। তবে এসব অস্ত্র গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক যে সাতছড়ি থেকে পাচার হয়ে গিয়েছিল তদন্তে তার সত্যতা পাওয়া গেছে। এ ঘটনার পর সাতছড়ি পল্লীর তৎকালীন হেডম্যান যোগেশ দেব বর্মার ভাতিজা আশীষ দেব বর্মা এখনও পলাতক রয়েছে। তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান মামলার চার্জশিটে এসব গোলাবারুদ ও বিস্ফোরকের উৎসস্থল ভারত বলে উল্লেখ করলেও কারা, কিভাবে এবং কেন তা এদেশে এনেছিল তার কোনো তথ্য উল্লেখ করেননি। এ মামলায় ৬ জনকে অভিযুক্ত করে বাকিদের খালাস দিয়ে তিনি চার্জশিট প্রদান করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৩ সালের ২৫ জুন বিকালে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সাতছড়ি ত্রিপুরা পল্লী এলাকা থেকে ট্রাক বোঝাই হয়ে পাচার করার সময় বগুড়ার কাহালু উপজেলার যোগারপাড়া গ্রামে ২৭ জুন রাতে জনতার হাতে ধরা পড়ে। তৎকালীন সময়ে দেশের আলোচিত এই গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক মামলা নিয়ে সারা দেশে হৈচৈ পড়ে। একে একে আটক হয় এসব গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক পাচারের সঙ্গে জড়িত সাতছড়ির ত্রিপুরা পল্লীর হেডম্যান যোগেশ দেব বর্মা, তার ছেলে চিত্ত দেব বর্মা, ভাতিজা ট্রাকের চালক ও মালিক আশীষ দেব বর্মা, ট্রাকের অপর চালক হবিগঞ্জের বাহুবলের আলতু মিয়া, ট্রাকের হেলপার স্বপন গোয়ালা, আব্দুল কালাম, বগুড়ার যোগারপাড়ার আখলাকুর রহমান পিন্টুর স্ত্রী আনোয়ারা বেগম বিথিসহ ১১ জন। এক পর্যায়ে মামলাটির তদন্তভার পড়ে সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমানের ওপর। তিনি মামলাটি তদন্ত করে একই বছরের ১১ ও ১৯ সেপ্টেম্বর আদালতে চারটি অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে তিনি এসব গোলাবারুদ ও বিস্ফোরকের উৎসস্থল ভারত বলে উল্লেখ করেছেন। আর অস্ত্রগুলো হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সাতছড়ি দিয়ে এসেছে বলে উল্লেখ করলেও তা কিভাবে কার মাধ্যমে কেন এদেশে এসেছিল এবং এসব বিস্ফোরক কোথায় যাওয়ার কথা ছিল এ সম্পর্কে কিছুই উল্লেখ করেননি। এছাড়া চার্জশিটে আখলাকুর রহমান পিন্টু, তার স্ত্রী আনোয়ারা খানম বিথি, আতিকুর রহমান দুলু, ট্রাক চালক ও মালিক সাতছড়ির আশিষ দেব বর্মা, মহরার হারুনার রশিদ জালাল ও বাহুবলের ট্রাক চালক আলতু মিয়াকে অভিযুক্ত দেখানো হয়। চার্জশিটে খালাস পাওয়া যোগেশ দেব বর্মাকে সাক্ষী করা হলেও তার ছেলে চিত্ত দেব বর্মা এ ঘটনার ৪ দিন পর টিপড়া পল্লী থেকে ভারতীয় অস্ত্র ও বিভিন্ন মালামাল উদ্ধারের মামলায় আটক হয়ে দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। যোগেশ দেব বর্মা মারা গেলেও তার ছেলে চিত্ত দেব বর্মা বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। তবে আশীষ দেব বর্মা পলাতক রয়েছে বলে জানা গেছে। ওই মামলার এক আসামি হাইকোর্টে আবেদন করলে মামলাটি স্থগিত করা হয়। প্রায় ৬ বছর পরে পুনরায় মামলার কার্যক্রম বগুড়ার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে শুরু হয়।
- See more at: http://www.jugantor.com/first-page/2014/06/05/107719#sthash.6JAMzaT3.dpuf

No comments:

Post a Comment