আরিফের স্বীকারোক্তি
রাজু আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ থেকে
প্রকাশ : ০৫ জুন, ২০১৪
নারায়ণগঞ্জে সাত অপহরণ ও খুনের ঘটনায় নিজের সরাসরি অংশগ্রহণ ও র্যাবের বেশকিছু কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন র্যাবের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা মেজর আরিফ হোসেন। বুধবার আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া ২০ পাতার জবানবন্দিতে পুরো কিলিং মিশনের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। তার জবানবন্দিতে উঠে এসেছে গ্রেফতারকৃত লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, লে. কমান্ডার এমএম রানাসহ র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম।
গতকাল দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কেএম মহিউদ্দিনের আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া এ জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। জানা গেছে, মেজর আরিফকে বুধবার সকাল ১০টায় অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর জবানবন্দি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বেলা ১১টা পর্যন্ত তাকে সময় বেঁধে দেন আদালত। বেলা ২টার পর আরিফ তার জবানবন্দি দেয়া শুরু করেন। বিকাল পৌনে ৫টার দিকে জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা শেষ হয়। স্বীকারোক্তিতে কি বলেছেন মেজর আরিফ- এ তথ্য জানার জন্য উদগ্রীব হয়েছিলেন মিডিয়াকর্মীরা। কিন্তু জবানবন্দির কপি মেলেনি।
আদালতের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মেজর আরিফের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে এই হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে একজন সরকারদলীয় মন্ত্রীর ছেলের নাম। ওই মন্ত্রীর ছেলের মাধ্যমেই নূর হোসেন নজরুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। জবানবন্দিতে মেজর আরিফ আরও উল্লেখ করেন, আইনজীবী চন্দন সরকারকে অপহরণের সময় তাকে নজরুলের লোক বলে ভুল করেছিল র্যাব সদস্যরা। ওই ৭ জনকে তুলে নেয়ার দায়িত্বে ছিলেন এমএম রানা। অপহরণের পর ঘটনাস্থলেই চন্দন সরকারের পরিচয় জানা যায়। একপর্যায়ে চন্দনকে ছেড়ে দেয়ারও সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু অ্যাডভোকেট চন্দন সেখানে ‘আর্গুমেন্ট’ করায় তাকেও হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই সূত্র আরও জানায়, অপহরণের বিষয়টি র্যাবের ঊর্ধ্বতন মহলের ‘কাউকে’ জানানো হয়েছিল। সেখান থেকে গ্রিন সিগনাল পেয়েই বাকি কাজ করা হয়েছে। মেজর আরিফ তার জবানবন্দিতে বর্ণনা করেছেন, কিভাবে ৭ জনকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশের সঙ্গে ইট বোঝাই বস্তা বেঁধে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলা হয়েছে। ইটগুলো র্যাবের আদমজী ক্যাম্পের পাশেই একটি প্রতিষ্ঠানের কাজের জন্য রাখা হয়েছিল। উল্লেখ্য, ওই ইটের সন্ধান সর্বপ্রথম দৈনিক যুগান্তরেই প্রকাশিত হয়েছিল।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান আদালতে দেয়া আরিফের জবানবন্দির বরাত দিয়ে বলেন, আরিফ ইতিমধ্যে সাত খুনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। ২০ পাতার জবাবন্দিতে আমরা জানতে পেরেছি যে, পুরো কিলিং মিশন তারেক সাঈদ নিজে উপস্থিত থেকে সম্পন্ন করেছেন। যেভাবে সাত জনকে খুন করা হয়েছে তার রোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছেন মেজর আরিফ। এ হত্যায় পরিকল্পনাকারীর একজন হয়ে তারেক সাঈদ পুরো কিলিং মিশন মনিটরিং করেছেন। জবানবন্দিতে বের হয়ে এসেছে এ হত্যায় নূর হোসেনের হয়ে র্যাব কর্মকর্তারা টাকার বিনিময়ে কাজ করেছেন। এ হত্যায় র্যাবের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে নিুপদস্থ পর্যন্ত কারা কারা জাড়িত ছিলেন তাও বেরিয়ে এসেছে।
৩নং সেলে আরিফ : নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের একটি সূত্র জানিয়েছে, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়ার পর মেজর আরিফকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। সেখান থেকেই তাকে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। কারাগার কর্তৃপক্ষ মেজর আরিফকে ৩নং সেলের একটি কক্ষে রেখেছে। সেখানে রয়েছে লাগোয়া বাথরুম। রাতে শোয়ার জন্য দেয়া হবে দু’খানি পুরনো কম্বল। আজ সকালে কারাগারের নতুন কয়েদি হিসেবে মেজর আরিফের ছবি তোলা হবে, নেয়া হবে ফিঙ্গার প্রিন্ট, স্বাক্ষর আর শরীরের উল্লেখযোগ্য কোনো চিহ্নের বর্ণনা।
তারেক ৫ দিনের রিমান্ডে : চাকরিচ্যুত র্যাব-১১ এর সাবেক কমান্ডার অবসরে পাঠানো সেনাবাহিনীর লে. কর্নেল তারেক সাঈদকে চতুর্থ দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। সাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রীর ও অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় পালের দায়ের করা পৃথক দুটি মামলায় সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। একই মামলায় তৃতীয় দফার রিমান্ড শেষে মেজর আরিফকেও হাজির করা হলে আদালত তাকে জেলহাজাতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আদালত সূত্র জানায়, বুধবার বিকাল ৫টা ১৮ মিনিটে তারেক সাঈদকে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকীর আদালতে হাজির করা হয়। ঠিক দু’মিনিট পরেই সেখানে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের খাস কামরায় অপেক্ষমাণ মেজর আরিফকেও হাজির করে পুলিশ। শুনানির সময় আদালত রাষ্ট্রপক্ষে কোর্ট পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আশরাফুজ্জামান আদালতকে জানান, পারিপার্শ্বিক এভিডেন্স ও এ যাবৎ তদন্তে এ ঘটনার রহস্য প্রায় উদ্ঘাটন হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই মেজর আরিফ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্তে কিছু লোকের নাম এসেছে এবং নূর হোসেন কোথায় পালিয়ে গেছেন এসব তথ্য জানতে আসামি তারেক সাঈদকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন। এ সময় রিমান্ড শুনানির সময় রাষ্ট্রপক্ষে পুলিশ ও আইনজীবীরা বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন। আদালতকে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন জানান, মেজর আরিফের জবানবন্দিতে তারেক সাঈদের নাম প্রকাশ পেলেও তিনি এখন পর্যন্ত মুখ খোলেননি। আদালতকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, গত শুক্রবার যখন তারেক সাঈদকে আদালতে আনা হয় তখন তিনি বলেছিলেন, তিনি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। কিন্তু আমরা কাগজে-কলমে দেখতে পেলাম তারেক সাঈদের বাবা মানুষকে হয়রানি করতে ৩৭টি মামলা করেছেন। সেই ঘরের সন্তান তিনি। পেশাদার খুনি বলেই তিনি এত বড় কিলিং মিশন সম্পন্ন করেছেন। এ সময় বারের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান জুয়েল বলেন, ২৭ এপ্রিল অপহরণের দিন রাত দেড়টায় হাজীগঞ্জ চেকপোস্ট এলাকায় র্যাবের ৩টি গাড়ি আটকে দেয় সেখানকার পুলিশ। সে সময় তল্লাশি করতে চাইলে র্যাব সদস্যরা নেমে আসেন। তাদের সঙ্গে তারেক সাঈদও ছিলেন। তিনি নেমে এসে বলেন আমি কমান্ডিং অফিসার। সেই গাড়িগুলোতেই অপহƒতরা ছিলেন। এ সময় তারেক সাঈদ আদালতে বলেন, সব অভিযোগ কল্পনাপ্রসূত। যত দ্রুত সম্ভব এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা হোক। শুনানি শেষে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী তারেক সাঈদকে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
No comments:
Post a Comment