Monday, June 9, 2014

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে পাঁচ চুক্তি স্বাক্ষর বেজিং গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে পাঁচ চুক্তি স্বাক্ষর
বেজিং গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সোমবার বেজিংয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বিষয়ে পাঁচটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এর মধ্যে দু্িট চুক্তি হচ্ছে-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং বিদ্যুত উৎপাদন ও জলবায়ু পরিবর্তনে উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলায় দু‘দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা। চীনের রাজধানী বেজিংয়ের গ্রেট হলে দু‘দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। খবর বাসসর।
চুক্তিতে দু’দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বাক্ষর করেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, স্বাক্ষরিত পাঁচটি চুক্তির মধ্যে দুটি চুক্তি হলো সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং পত্র বিনিময় (ইওএল)। প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি একেএম শামীম চৌধুরী এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, চুক্তিগুলো হলো- বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনীতি ও কারিগরি সহযোগিতা সংক্রান্ত চুক্তি এবং পটুয়াখালীতে কয়লাচালিত বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র।
শহীদুল হক বলেন, চট্টগ্রামে চীনা ইকোনমিক এ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট জোন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ জোন কর্তৃপক্ষ (বেপজা) এবং চীনের হারবার এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
শহীদুল হক বলেন, দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাঁচটি প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন সরকারের সহায়তা চেয়েছেন। চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে শেখ হাসিনাকে আশ্বাস প্রদান করেন। প্রস্তাবিত প্রকল্পসমূহ হলো বাংলাদেশ সরকারের জন্য ন্যাশনাল আইসিটি ইনফ্রা-নেটওয়ার্ক (ফেস-৩), রাজশাহী ওয়াসা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মাণ, কালুরঘাট পয়েন্টে কর্ণফুলী নদীর ওপর দ্বিতীয় রেলওয়ে-কাম-সড়ক সেতু নির্মাণ, রামু হয়ে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ, ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২ এবং সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রজেক্ট প্রতিষ্ঠা। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে সোনাদিয়া গভীর সমূদ্রবন্দর নির্মাণ প্রসঙ্গটি আলোচনায় স্থান পায়। এই বিষয়টি নিয়ে উভয়পক্ষ আলোচনা অব্যাহত রাখতে সম্মত হন।

গ্রেট হলে শেখ হাসিনাকে উষ্ণ সংবর্ধনা
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং দু’দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর আগে সোমবার বেজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। শেখ হাসিনা গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এর পূর্ব প্লাজায় এসে পৌঁছলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং তাঁকে স্বাগত জানান। এরপর প্রধানমন্ত্রী লি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের অন্য নেতৃবৃন্দ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর দুই প্রধানমন্ত্রী অভিবাদন মঞ্চে ওঠেন। এখানে চীনের গণমুক্তি ফৌজের (পিএলএ) সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল ১৯ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিবাদন জানায়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিবাদন গ্রহন করেন। এ সময় দু‘দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। পরে চীনের গণমুক্তি ফৌজের (পিএলএ) একটি দল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংকে সঙ্গে নিয়ে শেখ হাসিনা গার্ড পরিদর্শন এবং অভিবাদন গ্রহণ করেন। গার্ড পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রেট হল প্লাজার সামনে গণমুক্তি ফৌজের (পিএলএ) পতাকার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

চীনের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন পথ উন্মোচিত
হবে ॥ প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, চীনে তাঁর বর্তমান সফরে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার এক নতুন পথ উন্মোচিত হবে। তিনি বলেন, ‘আমার চীন সফর একটি বিরাট সাফল্য।’ এখন থেকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় অতীতের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্ব পাবে। খবর বাসসর।
সোমবার বেজিংয়ে ‘সাম্প্রতিক বছরে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক সাফল্য এবং চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে চীনের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। চায়না ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিআইআইএস) বেজিংয়ে তার নিজস্ব কার্যালয়ে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ-ভারত-চীন-মিয়ানমার (বিআইসিএম) অর্থনৈতিক করিডর প্রতিষ্ঠায় চীনের প্রস্তাবের প্রতি বাংলাদেশ সমর্থন জানিয়েছে। এক সময়ের জনপ্রিয় ‘সিল্ক রুট’ হিসেবে পরিচিত এই করিডরের ফলে নেপাল ও ভুটানসহ এ অঞ্চলের সব দেশের জনগণ লাভবান হবে।
এ সময় সিআইআইএসের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাবেক কূটনীতিক রুয়ান জংঝে তাঁর স্বাগত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরেন এবং তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে সাফল্যের বর্ণনা দেন। রুয়ান জংঝে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকারের জন্য তাঁর প্রশংসা করেন।
এ প্রশ্নোত্তর পর্বে পিপলস ডেইলি ও শেন জেন টেলিভিশনের সাংবাদিক এবং চায়না কমিউনিকেশন ইউনিভার্সিটির (সিসিইউ) ফ্যাকাল্টির সদস্যসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এ সময় সিআইআইএস সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বাংলা ভাষার বিপুলসংখ্যক সাবেক ছাত্রছাত্রী এবং উভয় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা ও চীনা ভাষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর লিখিত ভাষণে ২০১১ সালে জাতিসংঘ মহাসচিব ‘বাংলাদেশ উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি মডেল’ বলে যে মন্তব্য করেছেন তার উল্লেখ করে বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিবের এ বক্তব্য তাঁর সরকারকে ‘রূপকল্প-২০২১’ কৌশল গ্রহণে উৎসাহিত করেছে।
তিনি বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মূল্যবোধের অংশীদারিত্ব এবং প্রাচীনকাল থেকে ব্যবসা ও ভ্রমণের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
চীনকে সহযোগিতার অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোন আদর্শিক ও আঞ্চলিক পক্ষপাত ছাড়াই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীন উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থে কার্যকর যে কোন ইস্যুকে পুরোপুরি সমর্থন দিয়ে আসছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ৫ বছরে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে ১৭টি চুক্তি ও এমওইউ স্বাক্ষর করেছে। ফলে ২০০৭ সাল থেকে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ও আমদানির উৎসে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের (বিসিআইএম-ইসি) ব্যাপারে চীনের সক্রিয় ভূমিকায় সন্তোষ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, এই গ্রুপের প্রথম স্টাডি বৈঠকে যোগাযোগ, পণ্য বাণিজ্য, সেবা ও বিনিয়োগ, পরিবেশের টেকসই উন্নয়ন এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগকে সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ বছরের শেষ দিকে ঢাকায় এই গ্রুপের দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সকল ধর্মের লোক শান্তি-সমৃদ্ধির সঙ্গে বসবাস করতে এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি গণতান্ত্রিক আধুনিক ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

No comments:

Post a Comment