যুদ্ধাপরাধী বিচার ॥ তলোয়ার দিয়ে মতলেবকে কোপালে রক্ত সুবহানের গায়েও লাগে
ফজলুর রহমানের জবানবন্দী
স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুস সুবহানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ১১তম সাক্ষী মোঃ ফজলুর রহমান ফান্টু ও জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোঃ কায়সারের বিরুদ্ধে ঊনবিংশ সাক্ষী নায়েব আলী জবানবন্দী প্রদান করেছেন। জবানবন্দী শেষে আজ দুই সাক্ষীকে আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরার জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। সুবহানের বিরুদ্ধে সাক্ষী মোঃ ফজুলর রহমান বলেন, খোদা বক্সসহ উপস্থিত অন্যদের সঙ্গে আব্দুস সুবহান কিছুক্ষণ কথা বলে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষ করে তহুরুলের বাবা মোয়াজ্জেম হোসেনকে সুবহান এবং তার সঙ্গে থাকা জামায়াতের লোকজন টেনেহিঁচড়ে মসজিদ থেকে বের করে কয়লার ডিপোর কাছে নিয়ে যান। তখন জামায়াতের এক সদস্য তলোয়ার জাতীয় ছোরা সুবহানের হাতে দেন। সুবহান তলোয়ার দিয়ে প্রথমে মোয়াজ্জেম হোসেনকে আঘাত করতেই তিনি ‘আল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করে লুটিয়ে পড়েন। তখন সুবহানের সঙ্গে থাকা লোকজন মোয়াজ্জেম হোসেনকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। তখন আমার সঙ্গে লুকিয়ে থাকা তহুরুল চিৎকার দিয়ে উঠলে আমি তার মুখ চেপে ধরি। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ সাক্ষী এই জবানবন্দী প্রদান করেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মোঃ মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মোঃ শাহিনুর ইসলাম।
একই ট্রাইব্যুনালে জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোঃ কায়সারের বিরুদ্ধে ঊনবিংশ সাক্ষী নায়েব আলী জবানবন্দীতে বলেছেন, আমি কায়সার সাহেবকে সালাম দিলে তিনি আমার সালামের জবাব দেননি। আমি আবারও সালাম দিলে কায়সার আমাকে দেখিয়ে বলেন, সে মুজিবের লোক। তখন এক পাকিস্তানী সেনা আমাকে রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়। অন্য সেনারা বুট জুতা দিয়ে আমাকে পদদলিত করতে থাকে। তখন আমি অনেকটা অচেতন হয়ে পড়ি। প্রসিকিউশনের সাক্ষীর জবানবন্দী শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবী সাক্ষীকে জেরা করেন। আজ আবার অসমাপ্ত জেরা করার জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
আব্দুস সুবহান
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুুক্ত জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আব্দুস সুবহানের বিরুদ্ধে ১১তম সাক্ষী মোঃ ফজলুর রহমান ফান্টু জবানবন্দী প্রদান করেছেন। আজ আসামিপক্ষের আইনজীবী প্রসিকিউশনের সাক্ষীকে জেরা করবেন। প্রসিকিউশনের সাক্ষী তাঁর জবানবন্দীতে বলেন, আমার নাম মোঃ ফজুলর রহমান ফান্টু, পিতা- মৃত জয়নাল আবেদীন, মাতা- মৃত ফাতেমা খাতুন। ঠিকানা- গ্রাম-দড়িনারিচা (থানাপাড়া), থানা-ঈশ্বরদী, জেলা-পাবনা। আমার বর্তমান বয়স ৬৩ বছর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ২১ বছর। আমি ঠিকাদারী ব্যবসা করি এবং একটি স্থানীয় পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। আমি ১৯৬৯ সালে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় মারামারির কারণে আমি কারারুদ্ধ হই। পরবর্তীতে ওই মামলায় আমি খালাসপ্রাপ্ত হই। আমি এইচএসসি পাস করেছি।
জবানবন্দীতে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বিকেলে পাবনা থেকে একটি সাদা গাড়ি ঈশ্বরদী জামে মসজিদের পাশে জামায়াতের টর্চারসেলের সামনে এসে দাঁড়ায়। ওই গাড়ি থেকে মাওলানা সুবহানসহ তিন-চারজন নামলে খোদা বক্সসহ কিছু লোক তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। এ সময় তাঁরা সশস্ত্র ছিলেন। খোদা বক্সসহ উপস্থিত অন্যাদের সঙ্গে আব্দুস সুবহান কিছুক্ষণ কথা বলে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষ করে তহুরুলের বাবা মোয়াজ্জেম হোসেনকে সুবহান এবং তার সাঙ্গে থাকা জামায়াতের লোকজন টেনেহিঁচড়ে মসজিদ থেকে বের করে কয়লার ডিপোর কাছে নিয়ে যান। তখন জামায়াতের এক সদস্য তলোয়ার জাতীয় ছোরা সুবহানের হাতে দেন। সুবহান তলোয়ার দিয়ে প্রথমে মোয়াজ্জেম হোসেনকে আঘাত করতেই তিনি ‘আল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করে লুটিয়ে পড়েন। তখন সুবহানের সঙ্গে থাকা লোকজন মোয়াজ্জেম হোসেনকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। তখন আমার সঙ্গে লুকিয়ে থাকা তহুরুল চিৎকার দিয়ে উঠলে আমি তার মুখ চেপে ধরি।
প্রসিকিউশনের ১১তম সাক্ষীর জবানবন্দী শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম সংক্ষিপ্ত জেরা করেন। আজ আবার অসমাপ্ত জেরা অনুষ্ঠিত হবে। এ সময় প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন, প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ এবং প্রসিকিউটর রেজিয়া সুলতানা চমন ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষী মোঃ ফজলুর রহমান ফান্টু এবং মোয়াজ্জেম হোসেনের ছেলে তহুরুল ইশ্বরদী জামে মসজিদের পাশের জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে এ ঘটনা দেখেন। এ ঘটনার পর তাঁরা তিলকপুর গ্রামের আশ্রয়স্থলে ফিরে যান। পর দিন তহুরুল তাঁর বাবার লাশ আনতে যাওয়ার অনুরোধ জানালে ১৮ এপ্রিল বেলা ১১টা-সাড়ে ১১টার দিকে আবারও ঈশ্বরদী জামে মসজিদের পাশের জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নেন তাঁরা। সেখানে এসে জামায়াতের স্থানীয় নেতা এবং বিহারিদের খুবই সতর্ক অবস্থায় দেখতে পান। আগের দিনের মতো মাওলানা সুবহান সাদা গাড়িতে করে টর্চারসেলের সামনে এসে নামেন। তখন তাঁর সঙ্গে আরও দুই-তিনজন ছিলেন। আগের দিনের মতোই খোদা বক্স তাদের অভ্যর্থনা জানান। কিছুক্ষণ আলাপচারিতার পর সুবহান কয়লার ডিপোর দিকে এবং কয়েকজন মসজিদের দিকে যান।
মসজিদ থেকে তারা মতলেব আহমেদ খান এবং তার ছেলে নাজমুল হক খানকে মসজিদ থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে কয়লার ডিপোর কাছে নিয়ে যান। তখন জামায়াতকর্মী হারিজ উদ্দিন একটি তলোয়ার মাওলানা সুবহানের হাতে তুলে দেন। সুবহান তলোয়ারটি নিয়ে মতলেব আহমেদ খানকে সজোরে কোপ দিলে তার শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসে। সে রক্ত সুবহানের গায়েও লাগে। সুবহানের সঙ্গে থাকা জামায়াতের লোকজন এবং বিহারিরা তাদের হাতে থাকা তলোয়ার দিয়ে দুইজনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে।
প্রসিকিউশনের ১১তম সাক্ষী মোঃ ফজলুর রহমান ফান্টু জবানবন্দীতে আরও বলেন, ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গোটা ঈশ্বরদী দখল করে নিয়ে ঈশ্বরদী বিমানবন্দর, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র, ডাল গবেষণা কেন্দ্র, ঈশ্বরদী ডাকবাংলোতে ক্যাম্প স্থাপন করে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আসার পর পরই স্থানীয় জামায়াত, মুসলিম লীগ এবং বিহারিরা এলাকায় লুটপাট শুরু করে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে থাকে। অনেকেই তখন এক গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে আশ্রয় নেন। ১১ এপ্রিল জামায়াত, মুসলিম লীগ এবং ভুট্টোর পিপলস পার্টির স্থানীয় নেতারা পাকিস্তানী সেনাদের সঙ্গে নিয়ে ঈশ্বরদীর বিভিন্ন এলাকার প্রায় ২০০ জনকে হত্যা করেন।
স্থানীয় প্রায় আরও ২০০ জন সে দিন নিরাপদ আশ্রয় মনে করে ঈশ্বরদী জামে মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মাওলানা সুবহান আসার পর সেখান থেকে স্বাধীনতাকামী লোকজনদের ধরে এনে তলোয়ার দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হতো। এ ঘটনার পর ফেরার পথে মতলেব আহমেদের শ্যালক শহিদুজ্জামানের সঙ্গে দেখা হলে তাঁরা এ ঘটনা তাঁকে বর্ণনা করেন। এর পর তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে চলে যান। প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জলঙ্গি বর্ডার দিয়ে ঈশ্বরদীর সাড়াঘাট-বাঘাইল এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে আসেন। সাক্ষী মোঃ ফজলুর রহমান ফান্টু জবানবন্দীতে বলেন, ঈশ্বরদীর ওই কয়লার ডিপোর কাছেই পরবর্তীতে ঈশ্বরদী প্রেসক্লাব স্থাপন করা হয়েছে। এ প্রেসক্লাবের কাছেই ১৯ জন শহীদের নাম সংবলিত একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে মোয়াজ্জেম হোসেন, মতলেব আহমেদ খান ও তার ছেলে নাজমুল হক খানের নাম রয়েছে।
সাক্ষী মোঃ ফজলুর রহমান আসামি সুবহানকে আগে থেকেই চিনতেন দাবি করে বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে যে সব আলবদর, রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধীদের কারণে দেশের ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন, আমাদের পিতা-মাতা ও পূর্বসূরীরা নির্যাতন সহ্য করেছেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ট্রাইব্যুনালের কাছে সেই ঘৃণ্য অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। পরে আসামির কাঠগড়ায় থাকা সুবহানকে শনাক্ত করেন সাক্ষী। গত ৭ এপ্রিল শুরু হয়ে এর আগে সুবহানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন প্রসিকিউশনপক্ষের আরও ১০ জন সাক্ষী। তাঁরা হলেন- সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী আ ত ম শাহিদুজ্জামান নাসিম, শহীদপুত্র মুক্তিযোদ্ধা তহুরুল আলম মোল্লা, মোঃ আবু আসাদ, রুস্তম আলী, মোঃ ইসরাইল, কোরবান আলী, শহীদ জায়া জাহানারা বেগম, আশরাফ উদ্দিন মিয়া, মোঃ রিয়াজ উদ্দিন মণ্ডল এবং সানোয়ারা খাতুন।
সৈয়দ মোঃ কায়সার
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোঃ কায়সারের বিরুদ্ধে ঊনবিংশ সাক্ষী নায়েব আলী জবানবন্দীতে বলেছেন, আমি কায়সার সাহেবকে সালাম দিলে তিনি আমার সালামের জবাব দেননি। আমি আবারও সালাম দিলে কায়সার আমাকে দেখিয়ে বলেন, সে মুজিবের লোক। তখন এক পাকিস্তানী সেনা আমাকে রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়। অন্য সেনারা বুট জুতো দিয়ে আমাকে পদদলিত করতে থাকে। তখন আমি অনেকটা অচেতন হয়ে পড়ি। চেযারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এই জবানবন্দী প্রদান করেন। জবানবন্দী শেষে সাক্ষীকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী এসএম শাহজাহান। আজ আবার অসমাপ্ত জেরা অনুষ্ঠিত হবে। জবানবন্দী গ্রহণে সহায়তা করেন প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত।
সাক্ষী তাঁর জবানবন্দীতে বলেন, তাঁর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থানার ইসলামপুর গ্রামে। বর্তমানে কৃষিকাজের পাশাপাশি গরু কেনাবেচার ব্যবসা করেন। তিনি নিজে নিরক্ষর। ১৯৭১ সালের বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সম্ভবত ১৩ বৈশাখ জোহরের নামাজের পর তিনি ভাত খাচ্ছিলেন। এ সময় বাড়ির পশ্চিম দিক থেকে গুলির শব্দ এবং ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান শুনতে পান। লোকজন তখন যেদিকে পারছিলেন সেদিকে পালাচ্ছিলেন আর চিৎকার করে বলাবলি করছিলেন- শাহজাহান চেয়ারম্যান গুলিতে মারা গেছেন। এ সময় আমি বাড়ি থেকে রাস্তায় বের হয়ে দেখি কায়সার ও তার বাহিনী ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ এবং ‘নারায়ে তাকবির’ ধ্বনি দিতে দিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও শান্তি কমিটির লোকজন নিয়ে উত্তর দিকে যাচ্ছেন। আমি কায়সার সাহেবকে সালাম দিলে তিনি আমার সালামের জবাব দেননি। আমি আবারও সালাম দিলে কায়সার আমাকে দেখিয়ে বলেন, সে মুজিবের লোক। তখন এক পাকিস্তানী সেনা আমাকে রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়। অন্য সেনারা বুট জুতো দিয়ে আমাকে পদদলিত করতে থাকে। তখন আমি অচেতন হয়ে পড়ি।
স্থানীয় নোয়াপাড়ায় সৈয়দ কায়সারদের বাজারে গরু কেনাবেচা করার কারণে আগে থেকেই কায়সারকে চিনতেন। কায়সার ও তাঁর বাহিনী আরও উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে কাজিবাড়ি গিয়ে কাজী কবির উদ্দিনের বাড়ি লুট করে আগুন ধরিয়ে দেয়। তার পর আমার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এই লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের পর আমার ও কাজী কবির উদ্দিনের বাড়ির গবাদিপশু নিয়ে কায়সারের নেতৃত্বে দলটি উত্তর দিকে চলে যায়। তারা চলে যাওয়ার পর গ্রামের লোকজন যারা এদিক সেদিক চলে গিয়েছিল, তারা আমাকে পড়ে থাকতে দেখে তুলে বাড়িতে নিয়ে আসে। সাক্ষী নায়েব আলী জানান, বাড়িতে আসার পর আসরের নামাজের সময় বাড়ি থেকে মাইল দুয়েক দূরে মাধবপুর বাজারের পশ্চিম দিকে ধোঁয়া দেখতে পান তিনি। গুলির শব্দও পান। সন্ধ্যার দিকে প্রতিবেশী লাল মিয়া খান তাঁকে দেখতে এসে জানান, কায়সার ও তার বাহিনী এবং পাকিস্তানী সেনারা মিলে মাধবপুর বাজারের পশ্চিম অংশের প্রায় দুই-আড়াই শ’ ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে।
পর দিন সকাল ১০টা-সাড়ে ১০টার দিকে বাজারের পূর্ব অংশে আবারও ধোঁয়া দেখতে পান এবং গুলির শব্দ শুনতে পান। সেদিন সন্ধ্যায় আবারও লাল মিয়া খান এসে তাঁকে জানান, তাঁর ঘরটিসহ বাজারের অনেক ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং ১০-১২ জনকে হত্যা করা হয়েছে। সবশেষে সাক্ষী নায়েব আলী আসামির কাঠগড়ায় কায়সারকে শনাক্ত করেন এবং তাঁকে নির্যাতনের বিচার দাবি করেন।
গত ৯ মার্চ শুরুর পর এ পর্যন্ত কায়সারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আরও ১৮ সাক্ষী। তাঁরা হচ্ছেন- মুক্তিযোদ্ধা কাজী কবির উদ্দিন, মোহাম্মদ আলী টিপু, কায়সার বাহিনীর সদস্য হাজী মোঃ তাজুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী পাঠান, কায়সারের অপরাধের শিকার একজন বৃদ্ধা নারী (ক্যামেরা ট্রায়াল), মোঃ ইয়াকুব আলী, শাহ হাসান আলী ফুলু মিয়া, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা শাহ হোসেন আলী সাবু, শহীদপুত্র মোঃ মোস্তফা আলী, কায়সারের অপরাধের শিকার একজন সাক্ষী (ক্যামেরা ট্রায়াল), শহীদপুত্র মোঃ নওশাদ আলী, মুক্তিযোদ্ধা গৌর প্রসাদ রায়, মোঃ গোলাম নুর, মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নায়েব আলী, আলহাজ নিশামন, মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মতিন জামাল, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক ফুলু মিয়া এবং বাসু সাওতাল। তাদের জেরা করেছেন আসামিপক্ষ।
একই ট্রাইব্যুনালে জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোঃ কায়সারের বিরুদ্ধে ঊনবিংশ সাক্ষী নায়েব আলী জবানবন্দীতে বলেছেন, আমি কায়সার সাহেবকে সালাম দিলে তিনি আমার সালামের জবাব দেননি। আমি আবারও সালাম দিলে কায়সার আমাকে দেখিয়ে বলেন, সে মুজিবের লোক। তখন এক পাকিস্তানী সেনা আমাকে রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়। অন্য সেনারা বুট জুতা দিয়ে আমাকে পদদলিত করতে থাকে। তখন আমি অনেকটা অচেতন হয়ে পড়ি। প্রসিকিউশনের সাক্ষীর জবানবন্দী শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবী সাক্ষীকে জেরা করেন। আজ আবার অসমাপ্ত জেরা করার জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
আব্দুস সুবহান
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুুক্ত জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আব্দুস সুবহানের বিরুদ্ধে ১১তম সাক্ষী মোঃ ফজলুর রহমান ফান্টু জবানবন্দী প্রদান করেছেন। আজ আসামিপক্ষের আইনজীবী প্রসিকিউশনের সাক্ষীকে জেরা করবেন। প্রসিকিউশনের সাক্ষী তাঁর জবানবন্দীতে বলেন, আমার নাম মোঃ ফজুলর রহমান ফান্টু, পিতা- মৃত জয়নাল আবেদীন, মাতা- মৃত ফাতেমা খাতুন। ঠিকানা- গ্রাম-দড়িনারিচা (থানাপাড়া), থানা-ঈশ্বরদী, জেলা-পাবনা। আমার বর্তমান বয়স ৬৩ বছর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ২১ বছর। আমি ঠিকাদারী ব্যবসা করি এবং একটি স্থানীয় পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। আমি ১৯৬৯ সালে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় মারামারির কারণে আমি কারারুদ্ধ হই। পরবর্তীতে ওই মামলায় আমি খালাসপ্রাপ্ত হই। আমি এইচএসসি পাস করেছি।
জবানবন্দীতে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বিকেলে পাবনা থেকে একটি সাদা গাড়ি ঈশ্বরদী জামে মসজিদের পাশে জামায়াতের টর্চারসেলের সামনে এসে দাঁড়ায়। ওই গাড়ি থেকে মাওলানা সুবহানসহ তিন-চারজন নামলে খোদা বক্সসহ কিছু লোক তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। এ সময় তাঁরা সশস্ত্র ছিলেন। খোদা বক্সসহ উপস্থিত অন্যাদের সঙ্গে আব্দুস সুবহান কিছুক্ষণ কথা বলে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষ করে তহুরুলের বাবা মোয়াজ্জেম হোসেনকে সুবহান এবং তার সাঙ্গে থাকা জামায়াতের লোকজন টেনেহিঁচড়ে মসজিদ থেকে বের করে কয়লার ডিপোর কাছে নিয়ে যান। তখন জামায়াতের এক সদস্য তলোয়ার জাতীয় ছোরা সুবহানের হাতে দেন। সুবহান তলোয়ার দিয়ে প্রথমে মোয়াজ্জেম হোসেনকে আঘাত করতেই তিনি ‘আল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করে লুটিয়ে পড়েন। তখন সুবহানের সঙ্গে থাকা লোকজন মোয়াজ্জেম হোসেনকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। তখন আমার সঙ্গে লুকিয়ে থাকা তহুরুল চিৎকার দিয়ে উঠলে আমি তার মুখ চেপে ধরি।
প্রসিকিউশনের ১১তম সাক্ষীর জবানবন্দী শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম সংক্ষিপ্ত জেরা করেন। আজ আবার অসমাপ্ত জেরা অনুষ্ঠিত হবে। এ সময় প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন, প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ এবং প্রসিকিউটর রেজিয়া সুলতানা চমন ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষী মোঃ ফজলুর রহমান ফান্টু এবং মোয়াজ্জেম হোসেনের ছেলে তহুরুল ইশ্বরদী জামে মসজিদের পাশের জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে এ ঘটনা দেখেন। এ ঘটনার পর তাঁরা তিলকপুর গ্রামের আশ্রয়স্থলে ফিরে যান। পর দিন তহুরুল তাঁর বাবার লাশ আনতে যাওয়ার অনুরোধ জানালে ১৮ এপ্রিল বেলা ১১টা-সাড়ে ১১টার দিকে আবারও ঈশ্বরদী জামে মসজিদের পাশের জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নেন তাঁরা। সেখানে এসে জামায়াতের স্থানীয় নেতা এবং বিহারিদের খুবই সতর্ক অবস্থায় দেখতে পান। আগের দিনের মতো মাওলানা সুবহান সাদা গাড়িতে করে টর্চারসেলের সামনে এসে নামেন। তখন তাঁর সঙ্গে আরও দুই-তিনজন ছিলেন। আগের দিনের মতোই খোদা বক্স তাদের অভ্যর্থনা জানান। কিছুক্ষণ আলাপচারিতার পর সুবহান কয়লার ডিপোর দিকে এবং কয়েকজন মসজিদের দিকে যান।
মসজিদ থেকে তারা মতলেব আহমেদ খান এবং তার ছেলে নাজমুল হক খানকে মসজিদ থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে কয়লার ডিপোর কাছে নিয়ে যান। তখন জামায়াতকর্মী হারিজ উদ্দিন একটি তলোয়ার মাওলানা সুবহানের হাতে তুলে দেন। সুবহান তলোয়ারটি নিয়ে মতলেব আহমেদ খানকে সজোরে কোপ দিলে তার শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসে। সে রক্ত সুবহানের গায়েও লাগে। সুবহানের সঙ্গে থাকা জামায়াতের লোকজন এবং বিহারিরা তাদের হাতে থাকা তলোয়ার দিয়ে দুইজনকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে।
প্রসিকিউশনের ১১তম সাক্ষী মোঃ ফজলুর রহমান ফান্টু জবানবন্দীতে আরও বলেন, ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গোটা ঈশ্বরদী দখল করে নিয়ে ঈশ্বরদী বিমানবন্দর, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র, ডাল গবেষণা কেন্দ্র, ঈশ্বরদী ডাকবাংলোতে ক্যাম্প স্থাপন করে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আসার পর পরই স্থানীয় জামায়াত, মুসলিম লীগ এবং বিহারিরা এলাকায় লুটপাট শুরু করে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে থাকে। অনেকেই তখন এক গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে আশ্রয় নেন। ১১ এপ্রিল জামায়াত, মুসলিম লীগ এবং ভুট্টোর পিপলস পার্টির স্থানীয় নেতারা পাকিস্তানী সেনাদের সঙ্গে নিয়ে ঈশ্বরদীর বিভিন্ন এলাকার প্রায় ২০০ জনকে হত্যা করেন।
স্থানীয় প্রায় আরও ২০০ জন সে দিন নিরাপদ আশ্রয় মনে করে ঈশ্বরদী জামে মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মাওলানা সুবহান আসার পর সেখান থেকে স্বাধীনতাকামী লোকজনদের ধরে এনে তলোয়ার দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হতো। এ ঘটনার পর ফেরার পথে মতলেব আহমেদের শ্যালক শহিদুজ্জামানের সঙ্গে দেখা হলে তাঁরা এ ঘটনা তাঁকে বর্ণনা করেন। এর পর তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে চলে যান। প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জলঙ্গি বর্ডার দিয়ে ঈশ্বরদীর সাড়াঘাট-বাঘাইল এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে আসেন। সাক্ষী মোঃ ফজলুর রহমান ফান্টু জবানবন্দীতে বলেন, ঈশ্বরদীর ওই কয়লার ডিপোর কাছেই পরবর্তীতে ঈশ্বরদী প্রেসক্লাব স্থাপন করা হয়েছে। এ প্রেসক্লাবের কাছেই ১৯ জন শহীদের নাম সংবলিত একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে মোয়াজ্জেম হোসেন, মতলেব আহমেদ খান ও তার ছেলে নাজমুল হক খানের নাম রয়েছে।
সাক্ষী মোঃ ফজলুর রহমান আসামি সুবহানকে আগে থেকেই চিনতেন দাবি করে বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে যে সব আলবদর, রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধীদের কারণে দেশের ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন, আমাদের পিতা-মাতা ও পূর্বসূরীরা নির্যাতন সহ্য করেছেন, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ট্রাইব্যুনালের কাছে সেই ঘৃণ্য অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। পরে আসামির কাঠগড়ায় থাকা সুবহানকে শনাক্ত করেন সাক্ষী। গত ৭ এপ্রিল শুরু হয়ে এর আগে সুবহানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন প্রসিকিউশনপক্ষের আরও ১০ জন সাক্ষী। তাঁরা হলেন- সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী আ ত ম শাহিদুজ্জামান নাসিম, শহীদপুত্র মুক্তিযোদ্ধা তহুরুল আলম মোল্লা, মোঃ আবু আসাদ, রুস্তম আলী, মোঃ ইসরাইল, কোরবান আলী, শহীদ জায়া জাহানারা বেগম, আশরাফ উদ্দিন মিয়া, মোঃ রিয়াজ উদ্দিন মণ্ডল এবং সানোয়ারা খাতুন।
সৈয়দ মোঃ কায়সার
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোঃ কায়সারের বিরুদ্ধে ঊনবিংশ সাক্ষী নায়েব আলী জবানবন্দীতে বলেছেন, আমি কায়সার সাহেবকে সালাম দিলে তিনি আমার সালামের জবাব দেননি। আমি আবারও সালাম দিলে কায়সার আমাকে দেখিয়ে বলেন, সে মুজিবের লোক। তখন এক পাকিস্তানী সেনা আমাকে রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়। অন্য সেনারা বুট জুতো দিয়ে আমাকে পদদলিত করতে থাকে। তখন আমি অনেকটা অচেতন হয়ে পড়ি। চেযারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এই জবানবন্দী প্রদান করেন। জবানবন্দী শেষে সাক্ষীকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী এসএম শাহজাহান। আজ আবার অসমাপ্ত জেরা অনুষ্ঠিত হবে। জবানবন্দী গ্রহণে সহায়তা করেন প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত।
সাক্ষী তাঁর জবানবন্দীতে বলেন, তাঁর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থানার ইসলামপুর গ্রামে। বর্তমানে কৃষিকাজের পাশাপাশি গরু কেনাবেচার ব্যবসা করেন। তিনি নিজে নিরক্ষর। ১৯৭১ সালের বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সম্ভবত ১৩ বৈশাখ জোহরের নামাজের পর তিনি ভাত খাচ্ছিলেন। এ সময় বাড়ির পশ্চিম দিক থেকে গুলির শব্দ এবং ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান শুনতে পান। লোকজন তখন যেদিকে পারছিলেন সেদিকে পালাচ্ছিলেন আর চিৎকার করে বলাবলি করছিলেন- শাহজাহান চেয়ারম্যান গুলিতে মারা গেছেন। এ সময় আমি বাড়ি থেকে রাস্তায় বের হয়ে দেখি কায়সার ও তার বাহিনী ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ এবং ‘নারায়ে তাকবির’ ধ্বনি দিতে দিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও শান্তি কমিটির লোকজন নিয়ে উত্তর দিকে যাচ্ছেন। আমি কায়সার সাহেবকে সালাম দিলে তিনি আমার সালামের জবাব দেননি। আমি আবারও সালাম দিলে কায়সার আমাকে দেখিয়ে বলেন, সে মুজিবের লোক। তখন এক পাকিস্তানী সেনা আমাকে রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়। অন্য সেনারা বুট জুতো দিয়ে আমাকে পদদলিত করতে থাকে। তখন আমি অচেতন হয়ে পড়ি।
স্থানীয় নোয়াপাড়ায় সৈয়দ কায়সারদের বাজারে গরু কেনাবেচা করার কারণে আগে থেকেই কায়সারকে চিনতেন। কায়সার ও তাঁর বাহিনী আরও উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে কাজিবাড়ি গিয়ে কাজী কবির উদ্দিনের বাড়ি লুট করে আগুন ধরিয়ে দেয়। তার পর আমার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এই লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের পর আমার ও কাজী কবির উদ্দিনের বাড়ির গবাদিপশু নিয়ে কায়সারের নেতৃত্বে দলটি উত্তর দিকে চলে যায়। তারা চলে যাওয়ার পর গ্রামের লোকজন যারা এদিক সেদিক চলে গিয়েছিল, তারা আমাকে পড়ে থাকতে দেখে তুলে বাড়িতে নিয়ে আসে। সাক্ষী নায়েব আলী জানান, বাড়িতে আসার পর আসরের নামাজের সময় বাড়ি থেকে মাইল দুয়েক দূরে মাধবপুর বাজারের পশ্চিম দিকে ধোঁয়া দেখতে পান তিনি। গুলির শব্দও পান। সন্ধ্যার দিকে প্রতিবেশী লাল মিয়া খান তাঁকে দেখতে এসে জানান, কায়সার ও তার বাহিনী এবং পাকিস্তানী সেনারা মিলে মাধবপুর বাজারের পশ্চিম অংশের প্রায় দুই-আড়াই শ’ ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে।
পর দিন সকাল ১০টা-সাড়ে ১০টার দিকে বাজারের পূর্ব অংশে আবারও ধোঁয়া দেখতে পান এবং গুলির শব্দ শুনতে পান। সেদিন সন্ধ্যায় আবারও লাল মিয়া খান এসে তাঁকে জানান, তাঁর ঘরটিসহ বাজারের অনেক ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং ১০-১২ জনকে হত্যা করা হয়েছে। সবশেষে সাক্ষী নায়েব আলী আসামির কাঠগড়ায় কায়সারকে শনাক্ত করেন এবং তাঁকে নির্যাতনের বিচার দাবি করেন।
গত ৯ মার্চ শুরুর পর এ পর্যন্ত কায়সারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আরও ১৮ সাক্ষী। তাঁরা হচ্ছেন- মুক্তিযোদ্ধা কাজী কবির উদ্দিন, মোহাম্মদ আলী টিপু, কায়সার বাহিনীর সদস্য হাজী মোঃ তাজুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী পাঠান, কায়সারের অপরাধের শিকার একজন বৃদ্ধা নারী (ক্যামেরা ট্রায়াল), মোঃ ইয়াকুব আলী, শাহ হাসান আলী ফুলু মিয়া, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা শাহ হোসেন আলী সাবু, শহীদপুত্র মোঃ মোস্তফা আলী, কায়সারের অপরাধের শিকার একজন সাক্ষী (ক্যামেরা ট্রায়াল), শহীদপুত্র মোঃ নওশাদ আলী, মুক্তিযোদ্ধা গৌর প্রসাদ রায়, মোঃ গোলাম নুর, মুক্তিযোদ্ধা মোঃ নায়েব আলী, আলহাজ নিশামন, মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মতিন জামাল, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক ফুলু মিয়া এবং বাসু সাওতাল। তাদের জেরা করেছেন আসামিপক্ষ।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
No comments:
Post a Comment