প্রতিদিন রংপুরে বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৭ লাখ টাকার মাদক
মাহবুব রহমান, রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ : ১২ জুন, ২০১৪
মাদকাসক্তদের নিয়ে কাজ করছে এমন একাধিক বেসরকারি সংস্থার জরিপ থেকে জানা গেছে, রংপুরে প্রতিদিন সাড়ে সাত লাখ টাকার মাদক বিক্রি হচ্ছে। ওই সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, রংপুর সিটি কর্পোরেশনসহ জেলার ৮টি উপজেলায় মাদকাসক্তরা বোতলজাত পানীয়, ইনজেকশন, ধূমপান ও ট্যাবলেট মাদকদ্রব্য হিসেবে গ্রহণ করছে। বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, মাদকাসক্তের সংখ্যা নগরীতে ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী। প্রায় ১৬ হাজার মাদকাসক্তকে নিরাময় কেন্দ্রের মাধ্যমে সারিয়ে তোলার জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। মাদকাসক্তদের বেশির ভাগই তরুণ। তরুণ-তরুণী ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন।
মাদকের যত নাম : রংপুরে মাদকাসক্তরা গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল, বাংলা মদ, ড্যান্ডি, ইয়াবাসহ বিভিন্ন জাতের মিশ্রণে তৈরি নানা ধরনের মাদক সেবনের মধ্য দিয়ে মাদকাসক্ত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রকার ওষুধের মিশ্রণে যে মাদক প্রস্তুত করা হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে ঝাক্কি-১. ঝাক্কি-২ ও মিকচার-১। কয়েকজন মাদকাসক্ত নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নগরীর ফরেন লিকার শপে যে সব অনুমোদিত মাদক পানীয় বিক্রি হয়ে থাকে তার বাজারমূল্য অনেক বেশি। সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে মাদকাসক্তরা তা ওই দোকান থেকে কেনে না। বেশ কিছু ক্ষেত্রে, মাদকদ্রব্য মাদকাসক্তরা নিজেরাই প্রস্তুত করে। আবার যে মাদক ব্যবসায়ী মাদকের ব্যবসা করছেন তারাও নিজেরাই স্থানীয়ভাবে নানা জাতের ওষুধের সংমিশ্রণে ঝাক্কি-১, ২ ও মিকচার তৈরি করে বাজারজাত করছে। এসব নতুন মাদক মাদকসেবীদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। ভবঘুরে নারী ও হিজড়াদের নিয়ে কাজ করছেন এমন একটি বেসরকারি সংস্থা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, ইনজেকশনের মাধ্যমে ১৭৯ জন, হেরোইনের মাধ্যমে ৬১৪ জন ও বিভিন্ন ট্যাবলেট গ্রহণের মাধ্যমে ৩ হাজার জন মাদকাসক্তকে তালিকাভুক্ত করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য তারা কাজ করছেন। সামাজিক মর্যাদার কারণে অনেকের পরিচয় ও তথ্য গোপন রাখা হচ্ছে। বিপুল সংখ্যক মাদকাসক্ত প্রতিদিন মৃত্যুর পথে ধাবিত হচ্ছেন।
মাদকাসক্তির কারণ : জানা গেছে, বিনোদনের অভাব, সাংস্কৃতিক অবক্ষয়, পারিবারিক অশান্তি, বেপরোয়া জীবনযাপন, কৌতূহলবশত ড্রাগ গ্রহণ, প্রেমঘটিত বিচ্ছেদ, স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ, বেকারত্ব, আর্থিক সংকটসহ নানাবিধ কারণে শত শত তরুণ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন। এদের অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চাইলেও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের সংকট, পারিবারিক উদাসীনতা ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার কারণে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারছেন না। রংপুর নগরীতে ৩৪টি মাদক বিক্রি কেন্দ্র থেকে ১০৭টি ছোট ছোট মাদকদ্রব্য বিক্রির দোকানে মাদক বিক্রি করা হয়ে থাকে। এছাড়া চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই ওষুধ প্রাপ্তির সহজলভ্যতার কারণে বিভিন্ন ওষুধের দোকান থেকেও সহজেই ড্রাগ কিনতে পারছেন মাদকাসক্তরা।
এসব ছোট ছোট বিক্রয় কেন্দ্রের ব্যবসায়ীরা শহরের ৬৫ জন মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাদক কিনে থাকেন। তবে চার মাদক ব্যবসায়ী রংপুর জেলা শহরসহ এ অঞ্চলের মাদক দ্রব্য সরবরাহ করে থাকেন বলে জানা গেছে। নগরীতে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকার মাদকদ্রব্য বিক্রি হচ্ছে। রংপুরের প্রধান ৪ মাদক ব্যবসায়ী রাজশাহীর চরাঞ্চল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জ, হিলি, লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা, কালিগঞ্জ, হারাগাছ, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি প্রভৃতি সীমান্ত পথে মাদকদ্রব্য নিয়ে আসেন। অভিযোগ রয়েছে মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশ, সাংবাদিক, এলাকার সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক দলের যুব-ছাত্র সংগঠনের নেতা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাসিক মাসোয়ারা দিয়ে মাদকের ব্যবসা চালিয়ে আসছেন।
জানা গেছে, শহরের মাদকাসক্তের ৩১ শতাংশ তরুণী। বেশ কিছু উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়েরাও মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। ওই সূত্র আরও জানায়, ছেলেরা নানাভাবে মাদক সেবনের টাকা জোগান পেয়ে থাকে। কখনও কখনও এরা চুরি-ছিনতাই করে মাদক সেবনের টাকা জোগাড় করে। কিন্তু মাদকাসক্ত মেয়েরা মাদকের টাকার জন্য শরীর বিক্রি করছে। ফলে মাদকাসক্ত পতিতার সংখ্যা নগরীতে ক্রমাগত বাড়ছে।
চিকিৎসকের অভিমত : রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. জাকির হোসেন জানান, বিভিন্ন ওষুধের সংমিশ্রণে যেসব মাদকদ্রব্য তৈরি করে সেবন করা হচ্ছে তা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব মাদক সেবনের ফলে কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হয়। তদের মানবিক গুণাগুণ ও ভালো-মন্দ বিচার ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর : মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর রংপুর উপ-অঞ্চলের উপ-পরিচালক দিলারা রহমান যুগান্তরকে জানান, তাদের কাজের পরিধি অনুপাতে লোকবল সংকট রয়েছে। এছাড়া সীমান্ত এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্ত হওয়া প্রয়োজন। তার মতে, বেশির ভাগ মাদকই আসছে সীমান্ত গলিয়ে ভারত-মিয়ানমার থেকে।
No comments:
Post a Comment