Saturday, June 14, 2014

রিওর আকাশে রং ধরেছে বিশ্বকাপ ফুটবলের ধ্রুপদী লড়াইয়ের আজ মিশন শুরু আর্জেন্টিনার

রিওর আকাশে রং ধরেছে বিশ্বকাপ ফুটবলের ধ্রুপদী লড়াইয়ের
আজ মিশন শুরু আর্জেন্টিনার
মজিবর রহমান, রিও ডি জেনিরো, ব্রাজিল থেকে ॥ রিওর আকাশে রং ধরেছে। সাও পাওলোর বিক্ষেভ-ধর্মঘট, আন্দোলনের তিক্ত অভিজ্ঞতা আর দীর্ঘ ভ্রমণ ক্লান্তি সঙ্গী করে রিও ডি জেনিরোতে ফেরার পর চোখে পড়ল বিপরীত চিত্র। জোয়ারের তোড়ে সৈকতে গর্জন দিয়ে আছড়ে পড়া আটলান্টিকের উত্তাল ঢেউ। অপূর্ব এক দৃশ্য। পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ‘কোপাকাভানা’ বিচে বিকিনিখ্যাত সুন্দরীদের ভিড়, আর রাতের উজ্জ্বল আলোয় বিশ্বকাপ ফুটবল উপভোগ করতে আসা বিদেশী পর্যটক-প্রিয় দলের পোশাক গায়ে খেলা নিয়ে নানা স্লোগান, নৃত্য। রাতভর উৎসব। এই না হলে কি বিশ্বকাপ জমে? যা গত এক সপ্তাহে যা চোখ পড়েনি সাও পাওলোতে। একদিকে চন্দ্রিমা রাতের অপরূপ সৌন্দর্যের আটলান্টিক- নীল জলটা যেন আরও নানা রং মেখে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে আগত ফুটবলপ্রেমীদের সুসজ্জিত আলোকসজ্জার ঝলকানিতে। অন্যদিকে বিশাল পাহাড়ের ওপর আলো ঝলমলে ‘ফাবেলা’ বস্তি। তবে কুঁড়েঘর, ছাপড়া, ছাউনি নয়। উপর-নিচে সুবিশাল সারি সারি ঘিঞ্জি অট্টালিকা। ব্রাজিলে এটা ফাবেলা বস্তি হিসেবে পরিচিত। মাদক-পতিতা আর সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই বস্তি থেকে দূরে থাকতে সাবধান করে দিয়েছিল বিশ্বকাপ শুরুর আগে। অবশ্য বস্তি এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। রিও ডি জেনিরোর মিরামার কুইন্সও হোটেলে আমার ঘাঁটি। জানালা খুললেই একদিকে আটলান্টিক আর অন্যদিকে ফাবেলা বস্তি। রিও ডি জেনিরোর বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে আজ মিশন শুরু হচ্ছে এল-এম- টেন (লিওনেল মেসি, জার্সি-১০)-এর আর্জেন্টিনার। প্রতিপক্ষ ১৯৯৬ সালে মার্শাল টিটোর যুগোস্লাভিয়া ভেঙ্গে স্বাধীন হওয়া বসনিয়া এ্যান্ড হার্জেগোভিনা।
প্রতিপক্ষ যে দলই হোক, বিশ্বকাপের ম্যাচ। বসনিয়া এসেছে ইউরোপ থেকে। আর ব্রাজিলের পাশের দেশ আর্জেন্টিনা। তাই গোটা রিও এখন নারী-পুরুষ আর্জেন্টিনা সমর্থকদের পদভারে মুখর। সবার গায়ে দলের জার্সি, হাতে আর্জেন্টিনার পতাকা। রাতভর আটলান্টিকের সমুদ্রসৈকত মাতিয়ে রাখলেন নানা সেøøাগানে। ‘আরহেনতিনা ক্যাম্পিয়ানো’- আর্জেন্টিনাই চ্যাম্পিয়ন, আফ্রিকার ‘ভুভুজেলা’ সদৃশ বিশেষ বাঁশির কানফাটা আওয়াজ আর চিৎকার প্রমাণ করছে মাদকসেবী, ব্যবসায়ী আর পতিতাদের উপদ্রব, সন্ত্রাসকে পেছনে ঠেলে রিও জেগে উঠেছে ধ্রুপদী লড়াইয়ের বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনায়।
গ্রুপের প্রথম ম্যাচ। একটু টেনশন থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু মেসিরা বেশ ফুরফরে মেজাজে। সকালের অনুশীলন দেখে তাই মনে হচ্ছিল। এটাই স্বাভাবিক, যে দলটি বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামছে, তাদের সামনে বসনিয়া তো কোন দলই নয়। যদিও এটা মুখের কথা। কিন্তু তার পরও বাছাইপর্বের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মূলপর্বে জায়গা করে নেয়া কোন দলকেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। অনুশীলন-পরবর্তী কোচ আলেসান্দ্রো সাবেলার কথায় অবশ্য সেই প্রমাণ পাওয়া গেল। দুইবারের বিশ্বকাপ জয়ী (১৯৭৮, ১৯৮৬) আজেন্টিনা কোচের কথায়, শুধু গ্রুপপর্ব নয়। প্রত্যেকটি ম্যাচকেই তিনি সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। এখানে প্রতিপক্ষ বলে কোন কথা নেই। কাজেই বসনিয়া এ্যান্ড হার্জেগোভিনার বিরুদ্ধে ম্যাচটাও তাঁর কাছে বিশেষ গুরুত্বের। অতি আত্মবিশ্বাসী হওয়ার কোন কারণ দেখছেন না তিনি। এগোতে চান ধাপে ধাপে শিরোপার কাছাকাছি। এর পর ভাগ্যে যা ঘটে। দলকে তিনি খেলাতে চান ৪-৪-২, অথবা ৪-৩-৩ ছকে।
গ্রেট ম্যারাডোনা বিশ্বকাপ উপহার দিয়েছেন। ফুটবলের এই জীবন্ত কিংবদন্তি আবার ব্যর্থও হয়েছেন। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি ছিলেন সফল। আর পারেননি কোচ হিসেবে গত দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায়। এখন সবার মুখে কথা একটাই- ‘মেসি কি পারবেন ম্যারাডোনা হতে।’ ম্যারাডোনার মতো পায়ে-বলের জাদু দেখিয়ে তিনি কি পারবেন আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের দীর্ঘ শিরোপা-খরা ঘোচাতে? তবে কাপ জিততে আত্মবিশ্বাস প্রবল এই বার্সিলোনা তারকা ফরোয়ার্ডের। অল্প সময়ের দু-চার কথায় বললেন, আর্জেন্টিনা বরাবরই শিরোপার লক্ষ্যে মাঠে নামে। এবারও তাই। মেসির কথায় এবারের দলটি গতবারের চেয়ে বেশ পরিণত-অভিজ্ঞ। ম্যারাডোনা ২৫ বছর বয়সে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন। এবার মেসি তাঁর তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলছেন ২৭ বছর বয়সে। বিগত দুই বিশ্বকাপের কাপের খেলার আলোকে তাঁর অভিজ্ঞতার ভা-ারটাও নাকি এবার আরও সমৃদ্ধ। তাঁর সঙ্গে সার্জিও রোমেরো, পাবলো জাবালেতা, জাভিয়ের মাচেরানো, এ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া, সার্জিও এ্যাগুয়েরোর মতো পরিণত ফুটবলার রয়েছেন। যাঁরা এবার আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দেয়ার ক্ষমতা রাখেন। মেসির আরও সংযোজন, আগে গ্রুপ পেরোই। তার পর প্রতিপক্ষ বুঝে কৌশল, যা ঠিক করতে কাগজ-কলম নিয়ে তৈরি গুরু সাবেলা।
প্রসঙ্গ, গ্রুপের (এফ) অপর দুই প্রতিপক্ষ সুপার ইগল-খ্যাত আফ্রিকার নাইজিরিয়া ও এশিয়ার প্রতিনিধি ইরান। বিশ্বকাপ ফুটবল সামনে এলে বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে ব্রাজিল, অন্যদিকে আর্জেন্টিনা। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর প্রিয় দল আকাশী-সাদা জার্সির বিশ্বকাপ স্বপ্নযাত্রার এই ম্যাচ কিছুটা হলেও প্রমাণ করে দেবে জনপ্রিয় বার্সিলোনা তারকা মেসির নেতৃত্বে কত দূর যাবে আর্জেন্টিনা। অপরদিকে অতি পরিচিত তারকা ইডেন জেকোর অনুপ্রেরণায় কতটুকু চমক দেখাতে পারে বসনিয়া এ্যান্ড হার্জেগোভিনা- তাই দেখার বিষয়!

http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment