বাজেট কতটা নারীবান্ধব
০ রুখসানা কাজল
২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার বাজেটে দেশের ৮ কোটি নারীর ওপর বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৭. ৬৮ শতাংশ টাকা অর্থাৎ ৬১ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা। নারীর অংশ নিশ্চিত করতে এবারের বাজেটে ৪০ টি মন্ত্রণালয়ের জন্য আলাদা জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। গতবারের তুলনায় ১৫ টি মন্ত্রণালয় বেশি। অথচ বরাদ্দের পরিমাণ গত অর্থবছরের তুলনায় কম। তবে বাজেটে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয় যে, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, যৌন নিপীড়ন ও হয়রানি রোধ, নারী ও শিশু পাচার রোধ, কর্মক্ষেত্রে কর্মজীবী নারীর নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে সরকার যথেষ্ট সজাগ এবং পূর্বের ধারাবাহিকতায় এই সকল ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করবে। এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন, “জাতীয় অর্থনীতিতে নারীকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে আমরা শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। পাশাপাশি ধর্র্মের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে নারীবিদ্বেষী প্রচারণা ও সামাজিক বিধিনিষেধ আরোপের বিরদ্ধে সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনগত প্রতিরোধ গড়ে তুলব।”
এবারের বাজেটে কোন কোন মন্ত্রণালয়ে নারী উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হলেও কোন কোনটির ক্ষেত্রে কমিয়ে আনা হয়েছে। বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত নারী ও শিশু কল্যাণে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। বাজেট বক্তৃতায় মন্ত্রী বলেন, “জাতীয় বাজেটে নারীর হিস্যা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৯-১০ অর্থবছরে আমরা ৪টি মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করেছিলাম। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২৫টি মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছিল, এবার মোট ৪০টি মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপন করা হয়েছে।” বাজেট উপস্থাপনের সময় ৪০টি মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে সরকারী বরাদ্দ ও ব্যয়ের জেন্ডার ভিত্তিক বিভাজন তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের ৫৩ শতাংশ অর্থাৎ ছয় হাজার ৩২৫ কোটি টাকা নারীদের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়,পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ,ধর্ম মন্ত্রণালয়,সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়,মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মোট বরাদ্দের কিছু অংশ নারীর উন্নয়ন কাজে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য মন্ত্রণালয় নারী উন্নয়নে আলাদা বাজেট রেখেছে সরকার। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, “নারীকে স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করব, অব্যাহত রাখব নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের কার্যক্রম। এবারেও নারী উন্নয়নের জন্য ১০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ অব্যাহত থাকবে।”
১১ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে দৈনিক ইত্তেফাক এবং বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ডর্পের উদ্যোগে “বাজেট ভাবনা: সংগ্রামে উন্নয়নে দারিদ্র্য বিমোচনে মা” শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেই আলোচনায় সম্মানিত স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, বাজেটে নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে যেমন বয়স্কভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতার সঙ্গে হতদরিদ্র মায়েদের জন্য মাসে ৩০ কেজি চাল দেয়া এবং বিধবাভাতাও রয়েছে; এটা নারীর জন্য সুখের বিষয়। তবে নারী উন্নয়নের সুযোগ-সুবিধা নারীর দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক মিসেস তাসমিমা হোসেন বলেন, নারী মানেই একজন মা। তাই এই বাজেটে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুমৃত্যু,বাল্যবিবাহ এবং নারীর প্রতি সকল প্রকার সহিংসতা বন্ধের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে শিক্ষাসহ কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন স্তরে একটি নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। শিক্ষিত, অশিক্ষিত,স্বল্পশিক্ষিত নারীর মধ্যে কর্ম উদ্দীপনার এক প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। তারা এখন আর ঘরের চার দেয়ালে বন্দী না থেকে কাজ করে অর্থ উপার্জনে পরিবারের সহায়ক ভূমিকা রেখে চলেছে। কাজের সন্ধানে শহরমুখী গ্রামীণ নারীই একেকটি পরিবারের আর্থিক খুঁটি হিসেবে নেপথ্যে শক্তি যোগাচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর অংশগ্রহণ ছাড়াও প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে বর্তমান সরকার নারী অধিক সংখ্যায় নিয়োগ দেয়ায় বাংলাদেশে ব্যাপক হারে নারীর অগ্রগামিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে । ব্যবসা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীর অংশগ্রহণে আগ্রহী করে তোলার উদ্দেশ্য সফল বলা চলে। যদিও ভারি শিল্প, কলকারখানা বা বৃহৎ ব্যবসাক্ষেত্রে এখনও নারী একক ভূমিকা রাখতে পারেনি । তবে সরকারের অব্যাহত প্রচেষ্টায় বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায় নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। ২০১৩ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নারীর অবস্থান বর্তমানে বিশ্বে সপ্তম। বাজেটে নারীর জন্য পৃথক বরাদ্দ নিঃসন্দেহে নারীকে আর্থিক কর্মকা-ে আরও বেশি সম্পৃক্ত করে তোলার প্রণোদনা সৃষ্টি করবে যার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উন্নতির এক নব উদ্দীপনা দেখা দেবে; যার সমষ্টিগত ফল হবে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ়করণ। কিন্তু এই সকল ক্ষেত্রে নারীর জন্য বরাদ্দ অর্থ সঠিক এবং সুদক্ষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত করা উচিত, যাতে অর্থের সঠিক বিলি ব্যবস্থা হয় । নানা প্রকার হয়রানি এবং প্রতারণা ঢুকে গেলে সাধারণ নারীর ব্যবসাক্ষেত্রে কাজ করা সম্ভব নয়।
প্রস্তাবিত বাজেটে চরম দারিদ্র্য বিমোচনে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে সত্য কিন্তু নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করার কিছু সক্রিয় উদ্যোগের ব্যবস্থা বাজেটে সুস্পস্টভাবে উল্লেখ থাকলে সর্বাঙ্গ সুন্দর হতো। তা ছাড়া বাজেটে নারীর জন্য যে প্রকল্পগুলো রাখা হয়েছে তার কোনটিই স্বদেশের অর্থে নয়। প্রতিটি প্রকল্প বিদেশী দাতাগোষ্ঠী দ্বারা নির্দিষ্ট করে দেয়া এবং বিদেশী সাহায্য নিয়েই তাদের পরিচালিত হতে হবে বা হচ্ছে। একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে কেবল বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে কোন দেশের উন্নয়নে দাতাগোষ্ঠীর শর্ত মেনেই সরকার সাহায্যপুষ্ট হয়। সে ক্ষেত্রে এটি জানার সুযোগ নেই এই মুহূর্তে নারীর অগ্রাধিকার কোন্ ক্ষেত্রে।
শ্রমে নারী কখনও পিছপা নয় । ইট বহন, মাটি কাটা, রিকশাভ্যান চালানোর মতো কাজও নারী করে যাচ্ছে সহিষ্ণুতার সঙ্গে। এ সকল অনিয়মিত কাজ নারীর শ্রমকে অপেক্ষাকৃত কম মজুরিতে কিনে নেয়া হয়। একজন পুরুষ ইচ্ছা করলে তার সম্পূর্ণ মজুরি নিজের জন্য নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করার মানসিকতা রাখতে পারে । নারী কিন্তু তা করে না। দেশের শ্রম বাজারে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। কিন্তু তাদের শ্রমের সঠিক মূল্য দেয়া হচ্ছে না। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, “নারীকে স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করব, অব্যাহত রাখব নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের কার্যক্রম। এবারেও নারী উন্নয়নের জন্য ১০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ অব্যাহত থাকবে।” সেদিকে লক্ষ্য রেখেই দেশের উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলো গ্রহণ করা উচিত। একমাত্র আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নারী অনেক পিছিয়ে। কারণ নারী অবহেলিত বলে।
দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী নারী। অসচ্ছল, অনগ্রসর এই নারী সমাজের উন্নয়নের লক্ষ্যে বাজেটে বরাদ্দ নারী উন্নয়ন খাতগুলোর অর্থ যেন সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় সেদিকে সরকারের সুতীক্ষè সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। দেশের একটি ক্ষুদ্র নারী সমাজ উন্নয়নের আওতায় এলেও শহর এবং বিশেষ করে গ্রামীণ নারীকে উন্নয়নের ধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে। কেবলমাত্র দেশের কয়েকটি বড় বড় নজরকাড়া পদে কয়েক নারীকে পদপর্যাদা দিলেই যে বাংলাদেশের নারীর মর্যাদা সমুন্নত হলো তা নয়। দেশের উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলো এমনভাবে নিতে হবে যেন সকল শ্রেণীর নারী অংশগ্রহ করতে পারে। বাজেটে নির্ধারিত প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের যে অর্থ নারীর উন্নয়নকল্পে ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে তার যথাযথ প্রয়োগ কার্যকরী করতে মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে।
নারীর সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক নাড়ির । তাই বর্তমান বাজেটে ভবিষ্যত কর্ণধারদের জন্য আলাদা বাজেট দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ২০১৬ অর্থবছরে পরীক্ষামূলকভাবে শিশু বাজেট উপস্থাপনের আশ্বাস দেয়া হয়। শিশুশ্রম বন্ধ করে শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করে তোলা, জাতিসংঘ শিশু সনদ অনুসরণে জাতীয় শিশুনীতি হালনাগাদ করা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অবিলম্বে কঠোর এবং কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একপেশে হয়ে থাকবে। এর সুফল সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে পৌঁছবে না।
এবারের বাজেটে কোন কোন মন্ত্রণালয়ে নারী উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হলেও কোন কোনটির ক্ষেত্রে কমিয়ে আনা হয়েছে। বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত নারী ও শিশু কল্যাণে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। বাজেট বক্তৃতায় মন্ত্রী বলেন, “জাতীয় বাজেটে নারীর হিস্যা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৯-১০ অর্থবছরে আমরা ৪টি মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করেছিলাম। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২৫টি মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছিল, এবার মোট ৪০টি মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপন করা হয়েছে।” বাজেট উপস্থাপনের সময় ৪০টি মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে সরকারী বরাদ্দ ও ব্যয়ের জেন্ডার ভিত্তিক বিভাজন তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের ৫৩ শতাংশ অর্থাৎ ছয় হাজার ৩২৫ কোটি টাকা নারীদের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়,পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ,ধর্ম মন্ত্রণালয়,সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়,মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মোট বরাদ্দের কিছু অংশ নারীর উন্নয়ন কাজে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য মন্ত্রণালয় নারী উন্নয়নে আলাদা বাজেট রেখেছে সরকার। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, “নারীকে স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করব, অব্যাহত রাখব নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের কার্যক্রম। এবারেও নারী উন্নয়নের জন্য ১০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ অব্যাহত থাকবে।”
১১ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে দৈনিক ইত্তেফাক এবং বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ডর্পের উদ্যোগে “বাজেট ভাবনা: সংগ্রামে উন্নয়নে দারিদ্র্য বিমোচনে মা” শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেই আলোচনায় সম্মানিত স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, বাজেটে নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে যেমন বয়স্কভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতার সঙ্গে হতদরিদ্র মায়েদের জন্য মাসে ৩০ কেজি চাল দেয়া এবং বিধবাভাতাও রয়েছে; এটা নারীর জন্য সুখের বিষয়। তবে নারী উন্নয়নের সুযোগ-সুবিধা নারীর দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক মিসেস তাসমিমা হোসেন বলেন, নারী মানেই একজন মা। তাই এই বাজেটে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুমৃত্যু,বাল্যবিবাহ এবং নারীর প্রতি সকল প্রকার সহিংসতা বন্ধের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে শিক্ষাসহ কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন স্তরে একটি নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। শিক্ষিত, অশিক্ষিত,স্বল্পশিক্ষিত নারীর মধ্যে কর্ম উদ্দীপনার এক প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। তারা এখন আর ঘরের চার দেয়ালে বন্দী না থেকে কাজ করে অর্থ উপার্জনে পরিবারের সহায়ক ভূমিকা রেখে চলেছে। কাজের সন্ধানে শহরমুখী গ্রামীণ নারীই একেকটি পরিবারের আর্থিক খুঁটি হিসেবে নেপথ্যে শক্তি যোগাচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর অংশগ্রহণ ছাড়াও প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে বর্তমান সরকার নারী অধিক সংখ্যায় নিয়োগ দেয়ায় বাংলাদেশে ব্যাপক হারে নারীর অগ্রগামিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে । ব্যবসা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীর অংশগ্রহণে আগ্রহী করে তোলার উদ্দেশ্য সফল বলা চলে। যদিও ভারি শিল্প, কলকারখানা বা বৃহৎ ব্যবসাক্ষেত্রে এখনও নারী একক ভূমিকা রাখতে পারেনি । তবে সরকারের অব্যাহত প্রচেষ্টায় বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায় নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। ২০১৩ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নারীর অবস্থান বর্তমানে বিশ্বে সপ্তম। বাজেটে নারীর জন্য পৃথক বরাদ্দ নিঃসন্দেহে নারীকে আর্থিক কর্মকা-ে আরও বেশি সম্পৃক্ত করে তোলার প্রণোদনা সৃষ্টি করবে যার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উন্নতির এক নব উদ্দীপনা দেখা দেবে; যার সমষ্টিগত ফল হবে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ়করণ। কিন্তু এই সকল ক্ষেত্রে নারীর জন্য বরাদ্দ অর্থ সঠিক এবং সুদক্ষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত করা উচিত, যাতে অর্থের সঠিক বিলি ব্যবস্থা হয় । নানা প্রকার হয়রানি এবং প্রতারণা ঢুকে গেলে সাধারণ নারীর ব্যবসাক্ষেত্রে কাজ করা সম্ভব নয়।
প্রস্তাবিত বাজেটে চরম দারিদ্র্য বিমোচনে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে সত্য কিন্তু নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূর করার কিছু সক্রিয় উদ্যোগের ব্যবস্থা বাজেটে সুস্পস্টভাবে উল্লেখ থাকলে সর্বাঙ্গ সুন্দর হতো। তা ছাড়া বাজেটে নারীর জন্য যে প্রকল্পগুলো রাখা হয়েছে তার কোনটিই স্বদেশের অর্থে নয়। প্রতিটি প্রকল্প বিদেশী দাতাগোষ্ঠী দ্বারা নির্দিষ্ট করে দেয়া এবং বিদেশী সাহায্য নিয়েই তাদের পরিচালিত হতে হবে বা হচ্ছে। একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে কেবল বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে কোন দেশের উন্নয়নে দাতাগোষ্ঠীর শর্ত মেনেই সরকার সাহায্যপুষ্ট হয়। সে ক্ষেত্রে এটি জানার সুযোগ নেই এই মুহূর্তে নারীর অগ্রাধিকার কোন্ ক্ষেত্রে।
শ্রমে নারী কখনও পিছপা নয় । ইট বহন, মাটি কাটা, রিকশাভ্যান চালানোর মতো কাজও নারী করে যাচ্ছে সহিষ্ণুতার সঙ্গে। এ সকল অনিয়মিত কাজ নারীর শ্রমকে অপেক্ষাকৃত কম মজুরিতে কিনে নেয়া হয়। একজন পুরুষ ইচ্ছা করলে তার সম্পূর্ণ মজুরি নিজের জন্য নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করার মানসিকতা রাখতে পারে । নারী কিন্তু তা করে না। দেশের শ্রম বাজারে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। কিন্তু তাদের শ্রমের সঠিক মূল্য দেয়া হচ্ছে না। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, “নারীকে স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করব, অব্যাহত রাখব নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের কার্যক্রম। এবারেও নারী উন্নয়নের জন্য ১০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ অব্যাহত থাকবে।” সেদিকে লক্ষ্য রেখেই দেশের উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলো গ্রহণ করা উচিত। একমাত্র আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নারী অনেক পিছিয়ে। কারণ নারী অবহেলিত বলে।
দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী নারী। অসচ্ছল, অনগ্রসর এই নারী সমাজের উন্নয়নের লক্ষ্যে বাজেটে বরাদ্দ নারী উন্নয়ন খাতগুলোর অর্থ যেন সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় সেদিকে সরকারের সুতীক্ষè সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। দেশের একটি ক্ষুদ্র নারী সমাজ উন্নয়নের আওতায় এলেও শহর এবং বিশেষ করে গ্রামীণ নারীকে উন্নয়নের ধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে। কেবলমাত্র দেশের কয়েকটি বড় বড় নজরকাড়া পদে কয়েক নারীকে পদপর্যাদা দিলেই যে বাংলাদেশের নারীর মর্যাদা সমুন্নত হলো তা নয়। দেশের উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলো এমনভাবে নিতে হবে যেন সকল শ্রেণীর নারী অংশগ্রহ করতে পারে। বাজেটে নির্ধারিত প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের যে অর্থ নারীর উন্নয়নকল্পে ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে তার যথাযথ প্রয়োগ কার্যকরী করতে মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে।
নারীর সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক নাড়ির । তাই বর্তমান বাজেটে ভবিষ্যত কর্ণধারদের জন্য আলাদা বাজেট দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ২০১৬ অর্থবছরে পরীক্ষামূলকভাবে শিশু বাজেট উপস্থাপনের আশ্বাস দেয়া হয়। শিশুশ্রম বন্ধ করে শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করে তোলা, জাতিসংঘ শিশু সনদ অনুসরণে জাতীয় শিশুনীতি হালনাগাদ করা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অবিলম্বে কঠোর এবং কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একপেশে হয়ে থাকবে। এর সুফল সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে পৌঁছবে না।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
No comments:
Post a Comment