ফুটবলের শহরে বিক্ষোভ
বিশ্বকাপ আয়োজনে অর্থ লুটপাটের অভিযোগ ব্রাজিলিয়ানদের
সোহেল সারওয়ার চঞ্চল, সাও পাওলো, ব্রাজিল থেকে
ব্রাজিলের সাধারণ মানুষজন বলছেন, সরকার নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের বিষয়গুলোর উপর জোর দিচ্ছে না। এখানে চিকিত্সা সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন, হাসপাতালের উন্নতি প্রয়োজন, লেখাপড়ার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত করা দরকার। স্থানীয় দোকানি পেরেইরা লোপেজ বলেন, 'আমাদের দেশে শিক্ষা এবং চিকিত্সায় সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করা দরকার, কিন্তু সেটি করা হয়নি। এমনকি সেদিকে খেয়ালও করেনি সরকার।' সরকারি চাকরিজীবীদের ১০ ভাগ বেতন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার। সেটাও করেনি।
অনেকে জানান, অবস্থা এমন পর্যায়ে যে এ বছরের শেষ নাগাদ এই প্রেসিডেন্টকে নামিয়ে দিতে পারেন সাধারণ জনগণ। তারা বলছেন, 'আমরা চাই বিশ্বকাপ হোক। কিন্তু জরুরি চাওয়াগুলো পূরণ না করে বিশ্বকাপ আমরা চাই না।' তবে ভিন্নমতও রয়েছে। ৬৯ বছর বয়সী ব্রাজিলিয়ান টনি লুইস বললেন, 'আসলে আন্দোলন যারা করছেন, তারা এমনিতেই অনেক সুযোগ-সুবিধা পান। কিন্তু এখন বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে সুযোগ-সুবিধা আরো বাড়িয়ে নিতে আন্দোলন করছেন।'
সরেজমিনে দেখা গেল, রাস্তায় বিক্ষোভ থেকে শুরু করে নানা ভাবে ব্রাজিলের সাধারণ মানুষ তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। সাও পাওলো স্টেডিয়ামে (বিশ্বকাপ উদ্বোধন হবে যেখানে) ঢুকতে দূরে চোখে পড়লো বিশ্বকাপ নিয়ে ছাপার অযোগ্য ভাষায় লেখা অশ্লীল দেয়াল লিখন। জানা গেছে, আন্দোলনের কারণে গত কয়েকদিন সাও পাওলো শহরে শত কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ট্রাফিক জ্যাম ছিল। জ্যামে পড়েছিলেন ফরাসি ফুটবলার মিশের প্লাতিনিসহ অনেক ফুটবল সেলিব্রেটি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত এপ্রিল থেকে ব্রাজিলে আন্দোলন শুরু হয়। দেশটির ফুটবলারদের বহনকারী গাড়ির উপর হামলাও হয়েছে। এর পর থেকে সাধারণ মানুষও গাড়ি নিয়ে বের হতে নানা হিসাব কষছেন। আন্দোলনে কে নেই! সাধারণ শ্রমিক থেকে শুরু করে সরকারি পুলিশও আন্দোলন করছেন। অনেক এলাকায় দায়িত্ব ফেলে রেখে পুলিশ যোগ দিয়েছেন মিছিলে। গত এক সপ্তাহ ধরে সাবওয়েতে ধর্মঘট চলছে, মেট্রোরেল বন্ধ। চলছে শুধু বাস। প্রচুর ভিড়, বাসস্ট্যান্ডে পা ফেলার জায়গা নেই।
আগামীকাল ১২ জুন ব্রাজিল-ক্রেয়েশিয়া ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলের ২০তম আসর শুরু হচ্ছে দেশটিতে। হাতে সময় কম। কিন্তু আন্দোলনকারীদের দমাতে পারছে না সরকার। খেলার আগে এমন চিত্র সবাইকে হতাশ করছে। যে কারণে ব্রাজিলের সরকার ধরেই নিয়েছে আন্দোলন সহসা থামছে না। আর তাই তারা নতুন করে ৩০০ ড্রাইভার নিয়োগ দিয়েছেন, যারা উদ্বোধনী ম্যাচের দিন মেট্রোরেল চালাবেন।
বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজক কমিটির উপদেষ্টা কিংবদন্তী ফুটবলার পেলে সাধারণ মানুষকে ধৈর্য ধরতে অনুরোধ করেছেন। পেলে সাংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, 'বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি খুব চিন্তিত। একদিকে সময় মতো স্টেডিয়ামগুলো নির্মাণসম্পন্ন হয়নি। তার উপর বিশ্বকাপ বিরোধীদের আন্দোলনে দেশের সম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এর মধ্যে বিদেশিরা আসতে নিরুত্সাহিত হচ্ছেন।'
সাধারণ মানুষজন বলছেন, অর্থ লুটপাট করার জন্যই ফিফার কাছ থেকে বিশ্বকাপ আয়োজনের অনুমোদন নিয়েছে ব্রাজিল সরকার। কিছু আমলা আর মন্ত্রী মিলে হাজার কোটি টাকা লুটপাট করছে। তবে পেলে বলেছেন, 'যখন ব্রাজিলে বিশ্বকাপ আয়োজনের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়,তখনই ব্রাজিলিয়ানদের উচিত ছিল আন্দোলন করা। এখন দুয়ারে বিশ্বকাপ। এই সময় আন্দোলন করাটা ঠিক হচ্ছে না।' অবশ্য এই ফুটবল কিংবদন্তীও সাধারণ মানুষের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেছেন, 'যে অর্থ ব্যয় করে খেলা আয়োজন করা হচ্ছে সেখান থেকে কিছু অর্থ ব্যয় করে সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করার জন্য কিছু করা যেতো। কিন্তু দুর্নীতি হয়েছে বলেই এটা সম্ভব হচ্ছে না। আমি অভিযোগ করছি সেই শয়তানদের বিরুদ্ধে, যারা স্টেডিয়াম নির্মাণের নামে টাকা চুরি করেছে।' তিনি আরো বলেন, 'ব্রাজিল সুন্দর দেশ। এর নাগরিকরাও ভালো। বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে আশা করি দেশটি উত্সবমুখর হবে। আমি স্বপ্ন দেখি ব্রাজিল এবার বিশ্বকাপ জিতবে।'
সাবওয়ে শ্রমিকদের ধর্মঘট প্রত্যাহার
সাও পাওলোতে বিশ্বকাপের উদ্বোধনের আগের দিন থেকে ব্রাজিলিয়ান সাবওয়ে শ্রমিকরা পাঁচদিনের যে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এ ব্যাপারে আজ বুধবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে শ্রমিকরা। ব্রাজিলের সাবওয়ের শ্রমিকরা ১২ শতাংশ বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু সাবওয়ে কোম্পানি তাদের বেতন মাত্র ৮ দশমিক সাত শতাংশ বাড়ানোয় শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। এর জের ধরে সোমবার বিক্ষোভ করে শ্রমিকরা। বিশ্বকাপ বিরোধীরাও যোগ দেয় এই বিক্ষোভে। শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘট অবৈধ বলে ঘোষণা দিয়েছে সাও পাওলো লেবার কোর্ট। শ্রমিকরা একমুখী যে সাবওয়ে নির্মাণ করছে সেটা সাও পাওলোর এয়ারপোর্টের সংযোগ স্থাপন করবে।

No comments:
Post a Comment