বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা করে অনেকেই কোটিপতি!
পাহাড়ে মিলছে পরিত্যক্ত বহু ঘরবাড়ি
সমীর কুমার দে ও কামরুল ইসলাম, চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) থেকে ফিরে
হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সাতছড়ি পাহাড়ি এলাকা ঘুরে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাতছড়ি উদ্যানের ভেতরে পাহাড়ের উপর অবস্থিত 'টিপরা' বস্তির বাসিন্দারা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দিয়ে নিজেদের ভাগ্য ফিরিয়েছেন। এখন ঐ বস্তিতে উঠেছে পাকা ঘর, বিদ্যুত্ বিচ্ছিন্ন ঐ এলাকায় ঘরের উপরে আছে সৌরবিদ্যুত্। ঘরের ভেতরেও উন্নতমানের আসবাবপত্র। যদিও ঐ বস্তির বাসিন্দারা বলছেন, টাকা তারা পেয়েছেন এটা সত্য। কিন্তু ওদের আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছে। না দিলে মেরে ফেলার ভয় দেখাতো। অনেকে আবার ইচ্ছে করেই ওদের দলে নাম লিখিয়েছে এমনটাও স্বীকার করলেন 'টিপরা' বস্তির বাসিন্দারা। তারা বলেছেন, শুধু তারা নয়, ঐ এলাকার তখনকার রাজনীতিবিদ, থানা-পুলিশ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরাও টাকা পেয়েছেন। বিপুল টাকা খরচ করে আহত সদস্যদের চিকিত্সা করিয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। যাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের আহত হওয়া তথ্য ফাঁস করে না দেয়। এ কারণে বিলের উপর বাড়তি টাকা দিয়ে গেছে।
চুনারুঘাটের একজন প্রবীণ ব্যবসায়ী বলেন, গত বিএনপি-জামায়াত সরকারের শাসনামলের শেষ দিকে এসে অবাধে এলাকার মধ্যে যাতায়াত করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। এই এলাকায় মূলত 'অল ত্রিপুরা টাইগার্স ফোর্স' (এটিটিএফ) ও 'ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা'র (এনএলএফটি) সদস্যদের বিচরণ ছিল বেশি। উলফার কোন সদস্যকে এখানে দেখা যায়নি। তিনি বলেন, ঐ সময় চুনারুঘাটে কোন অনুষ্ঠান হলে বড় অঙ্কের টাকা অনুদান দিত। অনেক নামকরা ব্যক্তিও তখন তাদের কাছ থেকে অনুদান নিয়ে অনুষ্ঠান করেছে। রাজনীতিবিদরাও প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ওদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসত। বিনিময়ে নির্বিঘ্নে তারা কাজ চালিয়ে গেছে। চুনারুঘাটের একজন বাম রাজনীতিক বলেন, স্থানীয় রাজনীতিবিদদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। রাষ্ট্রীয়ভাবে যখন ওদের শেল্টার দেয়া হয় তখন স্থানীয় দু'-একজন লোক তো সুবিধা নেবেই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চাইলেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারত না। কারণ উপরের অনুমতি ছিল না। ফলে তারাও সুবিধা নিয়েছে।
র্যাব-৯ এর শ্রীমঙ্গল ক্যাম্পের কমান্ডিং অফিসার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সানা শামীনুর রহমান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, পাশের পাহাড়গুলোতে গতকাল অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে নতুন কোন অস্ত্রের বাঙ্কারের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে পরিত্যক্ত কিছু ঘরবাড়ির সন্ধান মিলেছে। এগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে বেশ কয়েক বছর আগে এখানে কেউ বসবাস করতেন। তিনি বলেন, এলাকার মানুষের মধ্যে এখনো কিছু আতঙ্ক আছে। তবে তিনি এলাকাবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, নিরাপরাধ কাউকে হয়রানি করা হবে না। তারা নির্বিঘ্নে এলাকায় বসবাস করতে পারেন। গতকাল 'টিপরা' বস্তি ঘেঁষা সন্দেহজনক উঁচু সকল টিলায় তল্লাশী চালানো হয়েছে।
চুনারুঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) অমূল্য কুমার চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, উপজেলার সবক'টি সীমান্তে পুলিশ টহলের সোর্স নিয়োগ করেছে। অপরিচিত কাউকে সাতছড়ি সীমান্তে দেখা গেলে তার পরিচয় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনায় প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের একটি তালিকাও তৈরির কাজ চলছে। বিগত ১০ বছর আগে কারা টিপরা বস্তিতে বেশি যাতায়াত করত তাদেরও পরিচয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বন বিভাগের সাতছড়ি রেঞ্জের রেঞ্জ অফিসার মনির আহমেদ খান ইত্তেফাকে জানান, অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনায় আতঙ্কের কারণে পর্যটক কমে গেছে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত মাত্র ৬ জন দর্শনার্থী ওখানে ঘুরতে গেছেন। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে সহকারী হিসাব রক্ষক জসিম উদ্দিন জানান, গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনায় সাধারণ দর্শনার্থীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে দর্শনার্থী অনেক কমে গেছে।

No comments:
Post a Comment