দেশে প্রায় ২ লাখ অবৈধ বিদেশী, জড়াচ্ছে নানা অপকর্মে
তাদের শনাক্ত করতে তৈরি হচ্ছে ডাটাবেস, আরোপ হচ্ছে কড়াকড়ি
তৌহিদুর রহমান ॥ বাংলাদেশে অবৈধ বিদেশী নাগরিকের সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় দুই লাখ অবৈধ বিদেশী নাগরিক বাংলাদেশে বসবাস করছেন। বিভিন্ন সময়ে নাগরিক নানা ধরনের অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছেন। এসব অবৈধ বিদেশীর আয় করা অর্থ অবৈধভাবেই বিদেশে পাচার হচ্ছে। তবে আশার কথা এই যে, বাংলাদেশে সকল বিদেশী নাগরিক শনাক্তের লক্ষ্যে একটি ডাটাবেস তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এছাড়া আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য এখন ভিসা কড়াকড়ি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জনকণ্ঠ’কে বলেন, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের কিছুসংখ্যক অবৈধ নাগরিক বাংলাদেশে রয়েছেন। আফ্রিকার ওসব দেশের নাগরিকরা যেন সহজেই বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে ইতোমধ্যেই সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এসব দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য আগমনী ভিসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে বসবাসরত বিদেশী নাগরিকদের জন্য একটি ডাটাবেস তৈরি করা হচ্ছে। এই ডাটাবেস তৈরি হলে অবৈধ বিদেশীদের সহজেই শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
অবৈধ বিদেশী নাগরিক
প্রায় দুই লাখ
বাংলাদেশে অবৈধ বিদেশী নাগরিকের সংখ্যার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায় এই সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এর বাইরে আরও প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। বিনিয়োগ বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ হাজার ১৮৩ বিদেশী নাগরিক বৈধভাবে কর্মরত। শুধু ২০১৩ সালেই বাংলাদেশে বাণিজ্যিক খাতে বিদেশী কোম্পানির শাখা, লিয়াজোঁ ও প্রতিনিধি অফিস এবং স্থানীয়ভাবে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ৪ হাজার ৩২৯ বিদেশী কর্মীর জন্য নতুন কর্মানুমতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া এই সময়ের মধ্যে আরও ৪ হাজার ৬০৯ বিদেশী কর্মীর অনুক’লে কর্মানুমতির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সময়ে ৩৫০ বিদেশী কর্মীর কর্মানুমতিপত্র বাতিল করা হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে ভারত, চীন, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপিন্স, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইন্দোনেশিয়া, ডেনমার্ক ও স্পেনের বিদেশী কর্মীরা শিল্প এবং বাণিজ্যিক খাতে কর্মরত রয়েছেন।
যেসব দেশের অবৈধ নাগরিক
বাংলাদেশে অবস্থানকারী অবৈধ বিদেশী নাগরিকদের মধ্যে অধিকাংশই ক্যামেরুন, পাকিস্তান, ফিলিপিন্স, নাইজিরিয়া, ঘানা, কঙ্গো, লিবিয়া, আফগানিস্তান, সুদান, তাঞ্জানিয়া, উগান্ডা ও শ্রীলঙ্কার নাগরিক। ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও এসব বিদেশী অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাস করছেন। এরই মধ্যে এদের অনেককেই ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ের জন্য ভিসা নিয়ে বিদেশী এসব নাগরিক এদেশে এলেও মেয়াদ শেষে তাঁরা ফিরে যাচ্ছেন না। নতুন করে ভিসার জন্য আবেদনও করছেন না। আবার ঠিকানা পরিবর্তন করায় এসব বিদেশীকে খুঁজেও পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কার প্রায় বিশ হাজার অবৈধ নাগরিক রয়েছেন। এসব নাগিরক দেশের বিভিন্ন পোশাক শিল্প কারখানায় কাজ করছেন।
আয়কর ফাঁকি
অবৈধ বিদেশীরা বাংলাদেশের সরকারকে কোন রকম ভ্যাট বা কর দেন না অথচ তাঁরা সাধারণ নাগরিকের চেয়েও অধিক সুবিধা ভোগ করছেন। শুধু তাই নয়, এদেশে অবৈধভাবে টাকা উপার্জন করে তাঁরা নিজ নিজ দেশে পাঠাচ্ছেন। জানা গেছে, সাধারণত হুন্ডির মাধ্যমেই তাঁরা নিজ নিজ দেশে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। গত বছর প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে বিদেশী নাগরিকদের কর ফাঁকি ঠেকানোর উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সে নির্দেশনা দেয়ার পরে বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। আবার একই সঙ্গে একটি ডাটাবেস তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ওয়ার্ক পারমিট বাধ্যতামূলক হলেও মানা হচ্ছে না
বাংলাদেশে বিদেশী নাগরিকদের কর্মসংস্থানের জন্য ওয়ার্ক পারমিট বাধ্যতামূলক। বেসরকারী খাতের কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান যদি কোন বিদেশী নাগরিককে নিয়োগ দিতে চায়, তাহলে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্ধারিত ফরমে আগেই আবেদন করতে হয়। এই আবেদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কর্তৃক স্বীকৃত দেশের নাগরিক, অনুমোদিত শিল্প-প্রতিষ্ঠান, ১৮ বছরের উর্ধে বয়স হতে হবে। যেসব কাজের জন্য স্থানীয় বিশেষজ্ঞ পাওয়া যায় না, সেসব কাজেই বিদেশীদের নিয়োগ দেয়া যাবে। এছাড়া সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাসহ বিদেশী কর্মচারীর সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগের বেশি হতে পারবে না। একজন বিদেশী নাগরিকের নিয়োগ প্রাথমিকভাবে দু’বছরের জন্য বিবেচিত হবে। তবে পরবর্তীতে সন্তোষজনক হওয়ার ভিত্তিতে বাড়ানো হতে পারে। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্র নিতে হবে। তবে ওয়ার্ক পারমিট নেয়ার ক্ষেত্রে এসব জটিলতায় যেতে পছন্দ করেন না বিদেশী নাগরিকরা। সে কারণে ভ্রমণ ভিসা নিয়েই বাংলাদেশে আসেন। তারপর এখানে চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন।
জড়িয়ে পড়ছেন নানা অপরাধে
বিভিন্ন দেশ থেকে ভ্রমণ, ছাত্র ও ব্যবসায়িক ভিসা নিয়ে বিদেশীরা এদেশে এসে প্রতারণাসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন। ব্যবসায়িক ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে এসে থাইল্যান্ডের তরুণীদের অনেকেই রাজধানীর অভিজাত এলাকার নামীদামী হোটেল, ম্যাসাজ পার্লার ও স্পা সেন্টারে কাজ করছেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও এখানে অবস্থান করায় ইতোমধ্যে কয়েক থাই তরুণীকে আটক করে থাইল্যান্ডে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আবার সম্প্রতি ক্যামেরুনের কয়েক নাগরিককে গ্রেফতার করে তাদের কাছ থেকে জাল ডলার ও ডলার তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এছাড়া পাকিস্তানের অবৈধ নাগরিকরা মাদক, অস্ত্র চোরাচালানসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িত রয়েছেন। একই সঙ্গে জঙ্গীবাদ ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী কর্মকা-েও তাদের তৎপরতা রয়েছে। এভাবে বিভিন্ন সময়ে নানা দেশের বিদেশী নাগরিকরা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।
গ্রেফতারেও সুফল নেই
বিদেশীদের গ্রেফতারের পর তাদের জন্য কোন অভিবাসন সেন্টার নেই। এছাড়া সরকারী আর্থিক কোন বরাদ্দ না থাকায় অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাসকারী বিদেশী নাগরিকদের বিরুদ্ধে আটক অভিযান জোরদার করাও সম্ভব হচ্ছে না। অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাসকারী যে কোন বিদেশী নাগরিক মাত্র ছয় হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে ছাড়া পেতে পারেন। তারা ছাড়া পেয়ে নিজ নিজ দেশে গিয়ে আবারও এ দেশে আসার সুযোগ পান। এসব কারণে এদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েও তেমন কোন সুফল পাওয়া যায় না।
আগমনী ভিসার সুযোগ নিচ্ছেন বিদেশীরা
বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে আগমনী ভিসার সুযোগ নিচ্ছেন বিদেশীরা। যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই, সেসব দেশের নাগরিক বাংলাদেশে ত্রিশ দিনের আগমনী ভিসা (এ্যারাইভাল ভিসা) পেয়ে থাকেন। সর্বশেষ ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেই পরিপত্র অনুযায়ী যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই, সেসব দেশের নাগরিকদের আগমনী ভিসা দেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এই পরিপত্র অনুযায়ী শুধু চারটি দেশের জন্য ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি করা হয়েছে। এই চারটি দেশ হলো ইরাক, আফগানিস্তান, সুদান ও আলজিরিয়া। সে অনুযায়ী এসব দেশ ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সহজেই বিদেশী নাগরিকরা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারছেন। আবার কারও আগমনী ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন হলে তাঁরা বাড়াতেও পারেন। এসব কারণে অবৈধ বিদেশী বাড়ছে।
বিদেশীদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশে বিদেশীরা আসার পরে তাঁদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার থেকে একটি নতুন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। হোটেল-মোটেলে বিদেশীদের অবস্থান বিষয়কসংক্রান্ত এই নীতিমালা অনুযায়ী বিদেশীদের সার্বিক পর্যবেক্ষণে রাখতে হোটেল, মোটেল ও রেস্টহাউস এবং পুলিশ ও র্যাবকে নানা ধরনের তথ্য রাখতে হবে। এসব তথ্যের মধ্যে রয়েছে- হোটেল, মোটেল ও রেস্টহাউসে আগমনকারী বিদেশীর নাম, বাবার নাম, ঠিকানা, নিজ দেশের স্থায়ী ঠিকানা, চাকরি করলে তার বিস্তারিত তথ্য, ই-মেইল ঠিকানা ও ফোন নম্বর, জন্ম তারিখ, পাসপোর্টের ফটোকপি, ভ্রমণের উদ্দেশ্য, স্থানীয় গাইড বা কন্ট্রাক্ট ব্যক্তির নাম, ঠিকানা এবং স্থানীয় আমন্ত্রণকারীর পূর্ণ পরিচয় ও পাসপোর্ট নম্বর রাখতে হবে। কেউ এসব তথ্য না রাখলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোন বিদেশী অপরাধে জড়িত থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনী ব্যবস্থা নিতে পারবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিদেশী নাগরিকদের জন্য একটি ডাটাবেস তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই ডাটাবেস তৈরি হলে সকল বিদেশী শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জনকণ্ঠ’কে বলেন, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের কিছুসংখ্যক অবৈধ নাগরিক বাংলাদেশে রয়েছেন। আফ্রিকার ওসব দেশের নাগরিকরা যেন সহজেই বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে ইতোমধ্যেই সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এসব দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য আগমনী ভিসার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে বসবাসরত বিদেশী নাগরিকদের জন্য একটি ডাটাবেস তৈরি করা হচ্ছে। এই ডাটাবেস তৈরি হলে অবৈধ বিদেশীদের সহজেই শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
অবৈধ বিদেশী নাগরিক
প্রায় দুই লাখ
বাংলাদেশে অবৈধ বিদেশী নাগরিকের সংখ্যার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায় এই সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। এর বাইরে আরও প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। বিনিয়োগ বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ হাজার ১৮৩ বিদেশী নাগরিক বৈধভাবে কর্মরত। শুধু ২০১৩ সালেই বাংলাদেশে বাণিজ্যিক খাতে বিদেশী কোম্পানির শাখা, লিয়াজোঁ ও প্রতিনিধি অফিস এবং স্থানীয়ভাবে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ৪ হাজার ৩২৯ বিদেশী কর্মীর জন্য নতুন কর্মানুমতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া এই সময়ের মধ্যে আরও ৪ হাজার ৬০৯ বিদেশী কর্মীর অনুক’লে কর্মানুমতির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সময়ে ৩৫০ বিদেশী কর্মীর কর্মানুমতিপত্র বাতিল করা হয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে ভারত, চীন, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপিন্স, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইন্দোনেশিয়া, ডেনমার্ক ও স্পেনের বিদেশী কর্মীরা শিল্প এবং বাণিজ্যিক খাতে কর্মরত রয়েছেন।
যেসব দেশের অবৈধ নাগরিক
বাংলাদেশে অবস্থানকারী অবৈধ বিদেশী নাগরিকদের মধ্যে অধিকাংশই ক্যামেরুন, পাকিস্তান, ফিলিপিন্স, নাইজিরিয়া, ঘানা, কঙ্গো, লিবিয়া, আফগানিস্তান, সুদান, তাঞ্জানিয়া, উগান্ডা ও শ্রীলঙ্কার নাগরিক। ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও এসব বিদেশী অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাস করছেন। এরই মধ্যে এদের অনেককেই ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ের জন্য ভিসা নিয়ে বিদেশী এসব নাগরিক এদেশে এলেও মেয়াদ শেষে তাঁরা ফিরে যাচ্ছেন না। নতুন করে ভিসার জন্য আবেদনও করছেন না। আবার ঠিকানা পরিবর্তন করায় এসব বিদেশীকে খুঁজেও পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কার প্রায় বিশ হাজার অবৈধ নাগরিক রয়েছেন। এসব নাগিরক দেশের বিভিন্ন পোশাক শিল্প কারখানায় কাজ করছেন।
আয়কর ফাঁকি
অবৈধ বিদেশীরা বাংলাদেশের সরকারকে কোন রকম ভ্যাট বা কর দেন না অথচ তাঁরা সাধারণ নাগরিকের চেয়েও অধিক সুবিধা ভোগ করছেন। শুধু তাই নয়, এদেশে অবৈধভাবে টাকা উপার্জন করে তাঁরা নিজ নিজ দেশে পাঠাচ্ছেন। জানা গেছে, সাধারণত হুন্ডির মাধ্যমেই তাঁরা নিজ নিজ দেশে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। গত বছর প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে বিদেশী নাগরিকদের কর ফাঁকি ঠেকানোর উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সে নির্দেশনা দেয়ার পরে বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। আবার একই সঙ্গে একটি ডাটাবেস তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ওয়ার্ক পারমিট বাধ্যতামূলক হলেও মানা হচ্ছে না
বাংলাদেশে বিদেশী নাগরিকদের কর্মসংস্থানের জন্য ওয়ার্ক পারমিট বাধ্যতামূলক। বেসরকারী খাতের কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান যদি কোন বিদেশী নাগরিককে নিয়োগ দিতে চায়, তাহলে বিনিয়োগ বোর্ডের নির্ধারিত ফরমে আগেই আবেদন করতে হয়। এই আবেদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কর্তৃক স্বীকৃত দেশের নাগরিক, অনুমোদিত শিল্প-প্রতিষ্ঠান, ১৮ বছরের উর্ধে বয়স হতে হবে। যেসব কাজের জন্য স্থানীয় বিশেষজ্ঞ পাওয়া যায় না, সেসব কাজেই বিদেশীদের নিয়োগ দেয়া যাবে। এছাড়া সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাসহ বিদেশী কর্মচারীর সংখ্যা শতকরা ৫ ভাগের বেশি হতে পারবে না। একজন বিদেশী নাগরিকের নিয়োগ প্রাথমিকভাবে দু’বছরের জন্য বিবেচিত হবে। তবে পরবর্তীতে সন্তোষজনক হওয়ার ভিত্তিতে বাড়ানো হতে পারে। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্র নিতে হবে। তবে ওয়ার্ক পারমিট নেয়ার ক্ষেত্রে এসব জটিলতায় যেতে পছন্দ করেন না বিদেশী নাগরিকরা। সে কারণে ভ্রমণ ভিসা নিয়েই বাংলাদেশে আসেন। তারপর এখানে চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন।
জড়িয়ে পড়ছেন নানা অপরাধে
বিভিন্ন দেশ থেকে ভ্রমণ, ছাত্র ও ব্যবসায়িক ভিসা নিয়ে বিদেশীরা এদেশে এসে প্রতারণাসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন। ব্যবসায়িক ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে এসে থাইল্যান্ডের তরুণীদের অনেকেই রাজধানীর অভিজাত এলাকার নামীদামী হোটেল, ম্যাসাজ পার্লার ও স্পা সেন্টারে কাজ করছেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও এখানে অবস্থান করায় ইতোমধ্যে কয়েক থাই তরুণীকে আটক করে থাইল্যান্ডে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আবার সম্প্রতি ক্যামেরুনের কয়েক নাগরিককে গ্রেফতার করে তাদের কাছ থেকে জাল ডলার ও ডলার তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এছাড়া পাকিস্তানের অবৈধ নাগরিকরা মাদক, অস্ত্র চোরাচালানসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িত রয়েছেন। একই সঙ্গে জঙ্গীবাদ ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী কর্মকা-েও তাদের তৎপরতা রয়েছে। এভাবে বিভিন্ন সময়ে নানা দেশের বিদেশী নাগরিকরা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।
গ্রেফতারেও সুফল নেই
বিদেশীদের গ্রেফতারের পর তাদের জন্য কোন অভিবাসন সেন্টার নেই। এছাড়া সরকারী আর্থিক কোন বরাদ্দ না থাকায় অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাসকারী বিদেশী নাগরিকদের বিরুদ্ধে আটক অভিযান জোরদার করাও সম্ভব হচ্ছে না। অবৈধভাবে বাংলাদেশে বসবাসকারী যে কোন বিদেশী নাগরিক মাত্র ছয় হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে ছাড়া পেতে পারেন। তারা ছাড়া পেয়ে নিজ নিজ দেশে গিয়ে আবারও এ দেশে আসার সুযোগ পান। এসব কারণে এদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েও তেমন কোন সুফল পাওয়া যায় না।
আগমনী ভিসার সুযোগ নিচ্ছেন বিদেশীরা
বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে আগমনী ভিসার সুযোগ নিচ্ছেন বিদেশীরা। যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই, সেসব দেশের নাগরিক বাংলাদেশে ত্রিশ দিনের আগমনী ভিসা (এ্যারাইভাল ভিসা) পেয়ে থাকেন। সর্বশেষ ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেই পরিপত্র অনুযায়ী যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই, সেসব দেশের নাগরিকদের আগমনী ভিসা দেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এই পরিপত্র অনুযায়ী শুধু চারটি দেশের জন্য ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি করা হয়েছে। এই চারটি দেশ হলো ইরাক, আফগানিস্তান, সুদান ও আলজিরিয়া। সে অনুযায়ী এসব দেশ ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে সহজেই বিদেশী নাগরিকরা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারছেন। আবার কারও আগমনী ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন হলে তাঁরা বাড়াতেও পারেন। এসব কারণে অবৈধ বিদেশী বাড়ছে।
বিদেশীদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশে বিদেশীরা আসার পরে তাঁদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার থেকে একটি নতুন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। হোটেল-মোটেলে বিদেশীদের অবস্থান বিষয়কসংক্রান্ত এই নীতিমালা অনুযায়ী বিদেশীদের সার্বিক পর্যবেক্ষণে রাখতে হোটেল, মোটেল ও রেস্টহাউস এবং পুলিশ ও র্যাবকে নানা ধরনের তথ্য রাখতে হবে। এসব তথ্যের মধ্যে রয়েছে- হোটেল, মোটেল ও রেস্টহাউসে আগমনকারী বিদেশীর নাম, বাবার নাম, ঠিকানা, নিজ দেশের স্থায়ী ঠিকানা, চাকরি করলে তার বিস্তারিত তথ্য, ই-মেইল ঠিকানা ও ফোন নম্বর, জন্ম তারিখ, পাসপোর্টের ফটোকপি, ভ্রমণের উদ্দেশ্য, স্থানীয় গাইড বা কন্ট্রাক্ট ব্যক্তির নাম, ঠিকানা এবং স্থানীয় আমন্ত্রণকারীর পূর্ণ পরিচয় ও পাসপোর্ট নম্বর রাখতে হবে। কেউ এসব তথ্য না রাখলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোন বিদেশী অপরাধে জড়িত থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনী ব্যবস্থা নিতে পারবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিদেশী নাগরিকদের জন্য একটি ডাটাবেস তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই ডাটাবেস তৈরি হলে সকল বিদেশী শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
No comments:
Post a Comment