Sunday, June 8, 2014

সাতছড়ির পাহাড়ে সুড়ঙ্গের সন্ধান

সাতছড়ির পাহাড়ে সুড়ঙ্গের সন্ধান
মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু, হবিগঞ্জ, সাতছড়ি থেকে
প্রকাশ : ০৮ জুন, ২০১৪

চারপাশে ঝোপঝাড়। মাঝে কবরের মতো গর্ত। তার ওপর বাঁশের মাচা। কাছে গিয়ে প্রথম দেখায় মনে হবে পুরনো কোনো কবর। কিন্তু আসলে এটা কবর নয়, সুড়ঙ্গের মুখ। সাতছড়ির বনে একটি পাহাড়ে এ সুড়ঙ্গের সন্ধান মিলেছে। সমতল থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে একটি সুউচ্চ পাহাড়ে রয়েছে এ সুড়ঙ্গটি। দীর্ঘ এ সুড়ঙ্গের শেষ কোথায় তা জানা যায়নি। তবে কোনো এক সময় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ব্যবহারের জন্য এই সুড়ঙ্গ পথ তৈরি করেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। সুড়ঙ্গের উল্টো পাশে একটি ওয়াচ টাওয়ারও দেখা গেছে। শনিবার যুগান্তরের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে ওই পাহাড়ে পাশাপাশি ঝোপঝাড়ে ঘেরা কয়েকটি পরিত্যক্ত বাড়িরও সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব বাড়িতে পুরনো আসবাবপত্র, ওয়াকিটকির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। বিভিন্ন কীটপতঙ্গের শব্দে গহিন বনে গা ছমছম করা আতংক। এর মাঝেই অন্তত ২০টি ছোট-বড় পাহাড় টপকে সন্দেহজনক ওই পাহাড়ে পৌঁছায় যুগান্তরের অনুসন্ধান টিম। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, এক সময় এখান এসে পলাতক জীবনযাপন করত সমমনা ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা। এদিকে সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের পর সাতছড়ির পাহাড়ে-পাহাড়ে এখন শুধুই আতংক। এসব স্থানে বসবাসকারী উপজাতীয়রাও পাহাড় ছেড়ে চলে গেছেন অজ্ঞাত স্থানে। আতংকে সাতছড়িমুখী হচ্ছেন না পর্যটকরাও। এ প্রসঙ্গে র‌্যাব-৯ এর শ্রীমঙ্গল ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সানা শামীনুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, অভিযান চলছে। পার্শ্ববর্তী সন্দেহভাজন টিলাগুলোতেও অভিযান চালানো হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত অস্ত্র উদ্ধারের সম্ভাবনা থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত অভিযান চলবে।’ গত ২ দিনে নতুন কোনো অস্ত্র গোলাবারুদ উদ্ধার হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পর্যটকদের আতংকিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে এখানে।’
শনিবার গভীর বনে একটি পাহাড়ে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে পাহাড়ের উঁচুতে বালুর বস্তা দিয়ে তৈরি করা নিরাপত্তা বেষ্টনী। অপর পাশে ওয়াচ টাওয়ার। মাঝে সুড়ঙ্গ মুখ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মতে পাহাড়ের এই স্থানগুলো প্রতিপক্ষের আক্রমণ রোধে ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। এ পাহাড়ে যা দেখা যাচ্ছে তার সব কিছুই প্রতিরক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ওয়াচ টাওয়ার থেকে শত্র“পক্ষের গতিবিধি লক্ষ্য রাখা হতো। সুযোগ বুঝে নিরাপত্তা বেষ্টনী থেকে শত্র“র ওপর হামলা চালানো, সর্বশেষ পেরে না উঠলে আত্মরক্ষায় সুড়ঙ্গ দিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পলায়ন। তাদের মতে, সুড়ঙ্গ বা নিরাপত্তা বেষ্টনী এত পুরনো যে কাছে গেলে বড় কোনো যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়। এগুলো এক সময় শান্তিবাহিনীর সদস্যরাও ব্যবহার করে থাকতে পারে। আবার যে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের লোকজনও এসে আস্তানা গাড়তে পারে। একটি ঘরে রয়েছে বড় ধরনের চারটি চুলা ও ডাইনিং হল। এ থেকে অনুমান করা যায়, এক সময়ে অনেক লোকের সমাগম হতো এ পাহাড়ে। র‌্যাব বলেছে, তারা ধীরে ধীরে প্রতিটি সন্দেহভাজন পাহাড়ে অনুসন্ধান চালাবে। শনিবারও লাল টিলায় র‌্যাবের কয়েকজন সদস্য ইতিপূর্বে শনাক্ত করা সাতটি বাংকারের খোঁড়াখুঁড়ি করছিল। এ পাহাড় থেকেই রবি ও সোমবার র‌্যাব সদস্যরা বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র এবং গোলাবারুদ উদ্ধার করে। র‌্যাব সদস্যরা ওই পাহাড়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
স্থানীয় পাহাড়ি ও সমতল জনগোষ্ঠীর বয়স্ক অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে ও বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বহু আগে সাতছড়ির গহিন অরণ্যে তৎপর ছিল ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ১৩টি সংগঠন। এগুলো হচ্ছে, ত্রিপুরা পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (টিপিডিএফ), ট্রাইবাল ফোর্স, ন্যাশনাল লিবারেল ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা (এনএলএফটি), ত্রিপুরা কিংডম, পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ), অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স (এটিটিএফ), রয়েল বরাক আর্মি (আরবিএ), ইউনাইটেড লিবারেশন অব আসাম (আলফা), পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) ও প্রিপাক।
তাদের মতে, একই সময়ে সিলেটের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ও নয়াপত্তন এলাকায় তৎপরতা ছিল ভারতী বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন পিপলস রিপাবলিকান আর্মি (পিএলএ) এবং প্রিপাকের। ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী বাংলাদেশী অংশে কোর্মা চা বাগানের অদূরে ত্রৈলং বাড়ি এলাকায় তৎপর ছিল ন্যাশনাল লিবারেল ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা (এনএলএফটি), অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স এটিটিএফ এবং ইউনাইটেড লিবারেশন অব আসামের (আলফা)। কুলাউড়ার ইকোপার্ক ও লাঠিটিলা এলাকায় দুটি ক্যাম্প ছিল এটিটিএফ, এএলএফএটি, এনএলএফটির। সিলেট শহরের মনিপুরি পাহাড়গুলোতে (১৩টি পাড়া) ছিল দুই বিচ্ছন্নতাবাদীদের ঘাঁটি। জাফলং খাসিয়া পল্লীতে স্টেশন ছিল এটিটিএফ, আলফা, এনএলএফটির ঘাঁটি। গোয়াইনঘাট নিরলা পুঁঞ্জিতে ছিল এটিটিএফ, আলফা, এনএলএফটির ঘাঁটি। কমলগঞ্জের বখতিয়ারখোলা গ্রামে ছিল পিএলএ, প্রিপাক, মনিপুরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জঙ্গি সংগঠন। বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সদস্যদের মাতৃভাষা হচ্ছে ককবরক। আলফা পিপলস লিবারেশন আর্মি ও প্রিপাক নামে দুটি সংগঠনের সদস্যদের মাতৃভাষা হল মৈতৈলোন। এভাষা বাংলাভাষাবাসীদের বোঝার কোনো উপায় নেই। এ ভাষা বোঝে শুধু তাদের জনগোষ্ঠী। ত্রিপুরাসহ পাহাড়ি আদিবাসীরা তাদের এসব ভাষা বোঝে। আর এ কারণেই তারা এ অঞ্চলগুলোকে নিজেদের আস্তানা হিসাবে বেছে নেয়। সাতছড়িতে ত্রিপুরা আদিবাসীদের একটি পুরনো আবাসস্থল। তাই এ অঞ্চলকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করছিল বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। গড়ে তুলেছিল মূল আস্তানা। এখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হতো তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে ভারতের ওপার থেকে এখানে লোকজনকে অপহরণ করে এনে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। ছোট-বড় টর্চার সেলে রেখে করা হতো নির্যাতন। এগুলো ঘটত অনেক আগে। বিশেষ করে দু’হাজার পাঁচ থেকে দু’হাজার সাত সালের পর থেকে সব পরিষ্কার। এরপর কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বা বিদেশী কোনো সন্ত্রাসী বাহিনীর আনাগোনা নেই। কাউকে ধরে এনে মুক্তিপণের জন্য বন্দি করেও রাখা হয় না। শনিবার যুগান্তরের পক্ষ থেকে পরিচালিত এ অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে ভয়াবহ এসব তথ্য। অনুসন্ধানে যুগান্তর টিমে ছিলেন হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন, মাধবপুর প্রতিনিধি রোকন উদ্দিন লস্কর।
সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেছে, ২০০৩ সালের ২৬ জুন বগুড়ার কাহালুতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসহ ট্রাক আটকের পর আলোচনায় আসে সাতছড়ির নাম। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটির খবর নিশ্চিত হয়ে পুলিশ ও তৎকালীন বিডিআর সাতছড়িতে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করে। ওই সময় সন্দেহভাজন ১৩ বিচ্ছিন্নতাবাদীকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েও পুলিশ ও তৎকালীন বিডিআর অস্ত্রের ঘাঁটি চিহ্নিত করতে পারেনি। ওই সময় র‌্যাবের তৎকালীন কর্মকর্তা বিডিআর বিদ্রোহে নিহত কর্নেল গুলজারের নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়। ওই অভিযানে একটি বাংকারের সন্ধান মিললেও সেখানে একটি বড় টেলিভিশন ছাড়া আর কিছু মেলেনি।
 
- See more at: http://www.jugantor.com/first-page/2014/06/08/109015#sthash.xkqh5jVX.dpuf

No comments:

Post a Comment