Sunday, June 8, 2014

সাম্প্রদায়িক রাজনীতি উত্থানরোধে নতুন কৌশল নির্ধারণ জরুরী মুহম্মদ আমির উদ্দিন

সাম্প্রদায়িক রাজনীতি উত্থানরোধে নতুন কৌশল নির্ধারণ জরুরী
মুহম্মদ আমির উদ্দিন
৭১২ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানদের সিন্ধু বিজয়ের পথ ধরে ভারতে আরবদের আগমন ঘটে। এরপর থেকে আরব বণিকদের অবাধ যাতায়াত গড়ে ওঠে। ধর্ম প্রচারক সুফীদের উদার-সাম্য জীবনাচার, বর্ণাঘাতে জর্জরিত নিম্নবর্গীয় হিন্দু-বৌদ্ধদেব তীব্র আকর্ষণ করেছিল যার ফলে দলে দলে এরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। আরবেরা অধিকৃত ভূমিতে অমুসলিমদের ওপর যেভাবে যুদ্ধকর চাপিয়েছিল ভারতে মুসলিম মোঘল শাসকেরা সেকরম কর চাপায়নি; তারা একটা অসম্প্রাদায়িক শাসন ব্যবস্থা বজায় রেখেছিলেন। বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয়ের আগে এবং পরে পীর আউলিয়াদের মাধ্যমে ভারতে ইসলাম ধর্মের ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। মোঘল বিজয়ে মুসলিম শাসন পাকাপোক্ত হলেও ধর্ম বিষয়ে তারা প্রায়ই নিরপেক্ষ ছিল বলা যায়। ঔরঙ্গজেব ব্যতীত অন্য মোঘল শাসকের দরবারে হিন্দু অমাত্যের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশ ভাটি অঞ্চলের দেশ। এদেশ ছিল জলা- জঙ্গলাই ভরা। এখানকার সাপ-খোপ-বিচ্ছুর ভয়ে শাসকরা আসতে অনীহা দেখালেও এ অঞ্চল নিভৃতচারী সুফী-দরবেশদের পছন্দের জায়গা ছিল। পীর-ফকিরের সংস্পর্শে এসে বৈরাগ্য প্রকৃতির নিয়তিবাদী বাঙালীরা দ্রুত ইসলাম কবুল করে। এ দেশের মানুষের জীবনাচারে সুফী দর্শনের প্রভাব ব্যাপক। সুফীবাদী মুসলিম সংস্কৃতি বাঙালী সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় বরং বন্ধুভাবাপন্ন। সুফীবাদের ত্বরীকা মারফতি আর কট্টরবাদীদের ত্বরীকা শরিয়া ভিত্তিক। দু’ত্বরীকার বাহাস এ অঞ্চলে বহু পুরনো। দুটোর সমন্বয় করে এ দেশে সর্বজনগ্রাহ্য ইসলামী জীবনদর্শন গড়ে তোলা গেলে ভাল হতো।
বিদ্যমান খ্রিস্টধর্মকে পেছনে ফেলে ইসলামের দ্রুত প্রসারের অন্যতম কারণ হলোÑ ইসলাম যে দেশে গেছে সে দেশের সংস্কৃতিকে দ্রুত আত্মস্থ করতে পেরেছে। এক সময়ের প্রকৃতিবাদী মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা অগ্নিপুজারী পারসিকদের স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামী সংস্কৃতির বিরোধ কখনও ঘটেনি বরং দুটো মিলে একাকার হয়ে এক নতুন সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। ‘মেঘবতী সুকর্ণপুত্রি’ নামটি বাংলাদেশে কোন মুসলমানের হলে সেটি নিয়ে অনেক বিতর্ক হতো, অথচ এ নামটি ইন্দোনেশিয়ার সাবেক মুসলিম প্রধানমন্ত্রীর।
সাংস্কৃতিক ডিলেমায় বাঙালীকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। বাঙালী কখনও ধর্মভিত্তিক বিভাজনে স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবিতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, কখনও শাসকের চাপিয়ে দেয়া মুসলিমকরণ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ভাষা আন্দোলন করেছে। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে ধর্মনিরপেক্ষ, স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করেছে।
বাঙালী মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সঙ্কটের ফাঁক দিয়ে জামায়াতের মতো ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি টিকে থাকার অক্সিজেন পায়। ইসলামের তেহাত্তর ফেরকার একটা জামায়াতবাদ (jamaatism)। ভারত প্রত্যাগত পাকিস্তানী মাওলানা আবুল আলা মওদুদী এ তত্ত্বের উদ্ভাবক হলেও এর বীজ খারেজী তত্ত্বে নিহিত ছিল। খারেজীদের বাড়াবাড়ির কারণে হযরত আলী (রা.)সহ উমাইয়া শাসকদের বার বার বিপদে পড়তে হয়েছিল, এরা ইসলামের ইতিহাসে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত পায়। একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, মুসলমান হওয়ার জন্য বাংলাদেশের মানুষকে জামায়াতবাদ বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ব্যতীত পৃথিবীর কোথাও জামায়াতে ইসলামী বলে কোন সংগঠন নেই। এমনকি পুরো মধ্যপ্রাচ্যে জামায়াতে ইসলামী বলে কোন দল নেই। তাই বলে কি সেখানে ইসলাম আজ বিপন্ন? বাংলাদেশের মানুষকে ফিতনা সৃষ্টিকারী জামায়াতের হাত ধরে ধর্মকর্ম পালনের কোন যৌক্তিকতা নেই। ‘প্রকৃত মুসলমান সে যার মুখ ও হাত থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ’ কিন্তু জামায়াতের হাতে বাংলাদেশের মানুষ কখনও নিরাপদ নয়। একাত্তরে তাদের ভূমিকা কিংবা তাদের সাম্প্রতিক সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন তা প্রমাণ করে। এরা নিজেদের লোক ছাড়া আর কাউকে মুসলমান বলে গণ্য করে না। পীর-আউলিয়াদের কবর জেয়ারত করাকে তারা হারাম বলে মনে করে এবং পীরভক্ত মানুষকে নাজেহাল করতে কসুর করে না। সংগঠনটি কোরানিক দর্শনের সেসব জেহাদী তত্ত্বই প্রচার করে যা তাদের আগ্রাসি কার্যকলাপকে সমর্থন করে। চটি বই আকারে সেসব তত্ত্ব তারা মেধাবী, অথচ রাজনীতিতে অজ্ঞ তরুণ প্রজন্মের কাছে সুকৌশলে পৌঁছে দেয়। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ছাত্র সংগঠন বিশেষ করে ছাত্রলীগের নেতিবাচক কাজের বিপরীতে ছাত্রশিবিরের কর্মীরা ধর্মের মোড়কে জামায়াতীজম প্রচার করে তরুণদের একটা অংশকে বিভ্রান্ত করতে সমর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, বেতনধারী মহিলা জামায়াত কর্মীরা কোরান শিক্ষার আড়ালে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে সারাবছর সরলামনা মহিলাদের কাছে সুকৌশলে জামায়াতীজম প্রচার করছে। এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো কোরান শিক্ষার আড়ালে মওদুদীবাদ প্রচারের ফলে মায়েদের মাধ্যমে সন্তানরা শিবির হবে। সীতাকু-, সাতক্ষীরা, সাতকানিয়াসহ বাংলাদেশের অনেক জায়গায় তাদের এ থিয়োরি কাজ দিয়েছে। সরলপ্রাণ মায়েরা কোরান শিক্ষার মতো ধর্মের মহান কাজ করছে বলে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেও প্রশ্ন নিজেরা কখনও করে না যে ‘এসব জামায়াতী মহিলা ছোট বাচ্চাদের আরবী শেখায় না কেন?’ অথচ বেতন দিয়ে হুজুর রেখে বাচ্চাদের আরবী শেখাতে হয়!
জামায়াতীজম কোরানের উদার, মানবিক, সহনশীলতার আয়াতগুলো বা সুফীদর্শনের পক্ষের আয়াত এড়িয়ে যায়। তাই জামায়াতের মতো একচোখা, আগ্রাসী চরম মতবাদ সমাজে কেবল অস্থিরতা, হিংসা-হানাহানিই ছড়াবে, বিভাজন সৃষ্টি করবে। যার খারাপ পরিণতি বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ভোগ করছে। জামায়াতী দর্শন শরিয়াভিত্তিক বলে দাবি করা হলেও এ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সময়ের প্রয়োজনে যে কোন কিছুর সঙ্গে আপোস করে। ধর্মের কথা মুখে বললেও প্রয়োজনে মুয়াবিয়ার মতো ধূর্ত হতে তারা পারঙ্গম। ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম বললেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা তা সানন্দে মেনে নিয়েছে। সুফীবাদের মারফতি তত্ত্বের বিরুদ্ধে কথা বললেও সাঈদীকে চাঁদে পাঠানোর মারফতি ঘটনা মানুষকে বিশ্বাস করাতে চেয়েছিল। এ ধরনের কন্ট্রাডিকশন নিয়ে বাংলাদেশে অন্য কোন দল রাজনীতি করে না। ইসলামে সুদ হারাম হলেও ইসলামী ব্যাংকসহ জামায়াত সৃষ্ট ব্যাংকগুলো মুদারাবার নামে সুদের রমরমা কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। এসব ব্যবসাকে হালাল করার জন্য নিজেদের লোক নিয়ে শরিয়া বোর্ড গঠন করে সুবিধামতো ফতোয়া দিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে। একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা ছিল নৃশংস। মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য তাদের কিছু নেতার বিচার হচ্ছে। এ বিচার বানচাল করার জন্য এমন কোন হীনকৌশল নেই যা তারা অবলম্বন করেনি।
বাংলাদেশের মতো প্রায় সমরূপী জাতিরাষ্ট্রে জামায়াতীজম স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে এক বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ। এ ধরনের হিপনোটিক চরম মতবাদ প্রতিরোধ করার কাজটি সহজ ভেবে আমরা ভুল করে এসেছি- আমরা যুক্তির চেয়েও আবেগের পথে বেশি হেঁটেছি। আজকের বাস্তবতায় জামায়াতী উগ্রবাদ ঠেকানোর জন্য কেবলমাত্র তাদের একাত্তরের ভূমিকা বা রাজনৈতিক স্ববিরোধিতা কিংবা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তুলে ধরাটাই যথেষ্ট নয়। তরুণ প্রজন্ম কেন এ ধরনের বিতর্কিত সাম্প্রদায়িক দলের কর্মসূচীতে যোগ দিচ্ছে তা গভীরভাবে ভেবে দেখা উচিত।
জামায়াতবাদ প্রতিরোধে নতুন করে ভাবতে হবে। দেশে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দ্বারা দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই হবে প্রাথমিক কাজ। তৃণমূল পর্যায়ে রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ-অসাম্প্রদায়িক, সৃজনশীলদের আত্মকেন্দ্রিকতার খোলস ছেড়ে সামাজিক নেতৃত্ব গ্রহণে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজে বিদ্যমান অনাচার ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে মানুষকে সংগঠিত করে আমাদের লোকজ সংস্কৃতির প্রসার ঘটাতে হবে। বড় দলগুলোর ছাত্র সংগঠন- বিশেষ করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের লাগাম টেনে ধরে আদর্শ দ্বারা পরিচালিত করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে দিনের পর দিন এদের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি দেখে তরুণ প্রজন্মের বিভ্রান্ত অংশ শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
জামায়াতের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে এর সমর্থকরা ধর্মবিরোধী বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। লক্ষ্য রাখতে হবে জামায়াতকে বিরোধিতা করতে গিয়ে যেন কোনভাবেই ধর্মবিরোধিতা না হয়। সম্প্রতি ভারতে বিজেপির নবোত্থানে জামায়াত নড়েচড়ে বসেছে। তারা উৎফুল্ল যে, কংগ্রেসের বিপর্যয়ে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সমর্থন কেন্দ্র নড়বড়ে হয়ে গেছে। এখন কেবল একটা নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করে ক্ষমতাসীন সরকারকে টেনে নামাতে পারলেই হলো! সুশাসনের অভাবে ভারতীয়রা কংগ্রেসকে প্রত্যাখ্যান করেছে; নির্বাচন হলে এখানে আওয়ামী লীগকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করবে। তাদের এ হিসেব ভুল বলে মনে হয়। বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত আর একদিকে বঙ্গোপসাগর। ভারত আমাদের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক তারা কখনই চাইবে না তাদের পাশে ইরানের মতো কোন মৌলবাদী রাষ্ট্র গড়ে উঠুক। আমাদের উচিত ভারত তোষণ বা বিরোধিতা না করে একটা মর্যাদপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার দিকে নিজেদের ব্যাপৃত করা।
সাম্প্রতিক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের দাবিতে জামায়াতের সহিংস প্রতিবাদ পুনরায় একাত্তরকে সামনে নিয়ে এসেছে। ছাত্রশিবিরের সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের এন্টিথিসিসে গণজাগরণ মঞ্চের জন্ম দিয়েছে। তারুণ্যের এ শক্তি বাংলাদেশকে আগামীতে পথ দেখাবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment