Saturday, June 14, 2014

মর্মান্তিক মৃত্যু ০ মিরপুরের কালশীতে আটকেপড়া বিহারীদের ঘরে আগুনে পুড়ে মারা গেছে ১০ জন ০ আতশবাজিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে ০ বিদ্যুত সংযোগ নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে সপ্তাহব্যাপী

মর্মান্তিক মৃত্যু
০ মিরপুরের কালশীতে আটকেপড়া বিহারীদের ঘরে আগুনে পুড়ে মারা গেছে ১০ জন
০ আতশবাজিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ বলে উল্লেখ করা হয়েছে
০ বিদ্যুত সংযোগ নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে সপ্তাহব্যাপী
স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঘরের ভেতর এক পরিবারের সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ওরা সেটা জেনেও ঘরের বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেয়। তারপর টিনের ফাঁক দিয়ে ভেতরে পেট্রোল ছিটানো হয়। এরপর আগুন। মুহূর্তেই দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই সবাই। কী মর্মান্তিক! ওরা সবাই পুড়ে ছাই। কালো কুৎসিত, বীভৎস সেরূপ। যেভাবে ঘুমিয়েছিল, সেভাবেই তারা ভস্মীভূত। কারও হাত উপরে ওঠানো, কারও হাঁটু বাঁকানো। চেনার উপায় নেই। বিকৃত তাদের মুখম-ল। এভাবেই রাখা একই পরিবারের নয়জনের সারিবদ্ধ মরদেহ। তাদের মাঝে রয়েছে তিন শিশু। শব-ই-বরাত রাতের শেষে তাদের জীবনে নেমে আসবে এমন করুণ পরিণতি তা এখনও কেউ-ই বিশ্বাস করতে পারছে না।
আতশবাজির মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হঠাৎ এমন বিপর্যয় ঘটে গেল রাজধানীর মিরপুর কালশীর বিহারী ক্যাম্পে। রাজধানীর মিরপুরের কালশীতে আতশবাজি পোড়ানোকে কেন্দ্র করে আটকেপড়া পাকিস্তানীদের বিহারী ক্যাম্পে আগুনে পুড়ে, গুলিবিদ্ধ হয়ে একই পরিবারের ৯ জনসহ ১০ নিহত হয়েছে। শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সহিংস ঘটনার সময়ে পুলিশের রাবার বুলেট, টিয়ারশেল নিক্ষেপ, ইটপাটকেল বিনিময়, ধাওয়া পাল্টাধাওয়ায় গোটা এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। দুর্বৃত্তরা বিহারী ক্যাম্পের কয়েকটি ঘর তালাবদ্ধ করে আগুন দেয়ার ঘটনায় ঘরে আটকা পড়ে আগুনে পুড়ে মারা গেছে। এই ঘটনার পর বিহারী ক্যাম্প এলাকায় আতঙ্ক ও থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। সংঘর্ষ স্থল থেকে পুলিশ ২০ জনকে আটক করেছে। পুলিশ প্রহরা বসানো হয়েছে বিহারী ক্যাম্প এলাকায়। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, আইজিপি, পুলিশ কমিশনার, ঢাকা জেলা প্রশাসকসহ উর্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এই ঘটনার তদন্তের জন্য ডিএমপি জয়েন্ট কমিশনারের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিহতের পরিবারকে প্রতিটি লাশ দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গণমাধ্যমকে বলেছেন, এটা একটা দুর্ঘটনা।
শনিবার ভোরে বিহারী ক্যাম্প ও বাঙ্গালী বস্তির মধ্যকার দফায় দফায় সংঘর্ষের পর অগ্নি হামলায় মোট দশজনের প্রাণহানি ঘটে। যার মধ্যে নয়জনই একই পরিবারের। রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মরদেহগুলো ছিল ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতাল মর্গে। শনিবার রাতে ময়নাতদন্ত হয়নি। আজ রবিবার ময়নাতদন্তের পর লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে।
শনিবার বেলা বারোটায় অকুস্থলে গিয়ে দেখা যায়, একটি ঘরে রাখা এসব মরদেহ। কুর্মিটোলা ক্যাম্পের আই ওয়ান লাইন ঘরের বেবী আক্তার (৪৫), বেবীর ছেলের স্ত্রী জায়েদা, বেবীর দুই মেয়ে শাহানা (২৫) ও আফসানা (১৮), শাহানার ছেলে আদিল (১০), ফারজানা (১৫), যমজ দুই ভাই লালু ও ভুলু (৮), বেবীর ছেলে আশিক (২০), আজাদ (৪৫)। এর মধ্যে আজাদ ছাড়া বাকি সবাই একই পরিবারের। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও ছয়জন। তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
মিরপুর জোনের ডিসি ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, তাদের মধ্যে দুই যমজসহ একাধিক শিশুও রয়েছে। এরা আগুনে পুড়ে নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় কয়েক পুলিশ আহত হয়েছে। এদের মধ্যে রূপনগর থানার এসআই জুবায়েরের বাম ঊরুতে গুলি লেগেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আজাদ বাদে নিহত বাকিদের লাশ বিহারী ক্যাম্পের ভেতরে পাকিস্তানী এসপিজিআরসি অফিসের ভেতরে রাখে বিহারীরা। তারা সবাই এক পরিবারের সদস্য। তবে এক পরিবারের সদস্য কতজন- সেটা নিশ্চিত করতে পারেননি কেউ-ই। পুড়ে মারা যাওয়া সদস্যদের এক অভিভাবক ইয়াসীন গাজীপুর থেকে আগের রাতে বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি পাশের আরেক বাসায় রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন। সে জন্যই বেঁচে যান। চিৎকার শুনে ঘুম থেকে উঠে দেখেন, তাঁর স্ত্রী-পুত্র কেউই বেঁচে নেই।
বেলা বারোটার সময় সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বিহারীরা তখনও থেমে থেমে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। পুলিশ ধাওয়া দিয়ে তাদের মেইন রোড থেকে ক্যাম্পের ভেতর পাঠিয়ে দেয়। পুলিশ যখনই ভস্মদেহগুলো ওই ঘর থেকে বের করে আনার চেষ্টা করে, তখনই বিহারীরা মারমুখী হয়ে ওঠে।
সকাল আটটা থেকেই পুলিশ এভাবে ওদের মোকাবেলা করতে থাকে। এ সময় ছররা গুলি ছুড়ে ওদের ছত্র ভঙ্গ করা হয়। এভাবে কয়েক ঘণ্টা চলার পর সাড়ে বারোটায় সেখানে হাজির হন ঢাকা জেলা প্রশাসক শেখ ইউসুফ হোসেন হারুন। তিনি সাংবাদিকদের নিয়ে ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হন। এরপর কয়েকদফা বিহারীদের একাধিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলেন। কিছুতেই ওরা লাশ দিতে রাজি হয়নি। এ সময় ওরা গুটিকয়েক এ হত্যাকা-কে পরিকল্পিত বলে সেøাগান দিতে থাকে। তারা স্থানীয় সাসংদ ইলিয়াস মোল্লার নাম নিয়ে তাকে দায়ী করেন। বিহারী নেতা মোস্তাক আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, পটকা ফোটানোর কথা বলা হলেও মূল কারণ বিদ্যুত সংযোগ। এমপি ইলিয়াস চেয়েছিলেন বিহারী ক্যাম্পের লাইন থেকে অন্য গাজীর বস্তিতে বিদ্যুত সংযোগ দিতে। দু’তিন দিন আগে এতেই বাধা দেয় বিহারীরা। এ নিয়েই বিরোধ। তারপর আজ ভোরে ঘটেছে এই অমানুষিক কীর্তিকলাপ। বাইরে থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয়া হয়। মুহূর্তেই সবাই পুড়ে মরেছে।
কী ঘটেছিল এত ভোরে? ॥ আগের রাত ছিল পবিত্র শব-ই-বরাতের। কালশী রোডের এক পাশে বিহারী ক্যাম্প অপর পাশে বাঙালী বস্তি। দু’পাশেই রয়েছে দুটো মসজিদ। নামাজ বিহারী মসজিদে রাতভর যেমন এবাদত জিকির আজকার চলে তেমনি চলে পটকা ফোটানোর ধুম। বিহারী ক্যাম্পের ছেলেমেয়েরা অনেক রাত পর্যন্তই সজাগ ছিল। তারা আতশবাজি করেছে। এ নিয়ে ফজরের আজানের সময় মুসল্লিদের সঙ্গে এক দফা বিহারী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বাঙালী মুসল্লিদের বাদানুবাদ হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী রিজওয়ান জনকণ্ঠকে বলেন, ফজরের নামাজের পর মুরব্বিরা সবাই ঘুমাতে যান। তারপরই হঠাৎ বিপদ দেখা দেয়। ওই বাউনিয়া বস্তির কয়েক যুবক হঠাৎ মিছিল নিয়ে এসে চড়াও হয় বিহারী ক্যাম্পে। তারা এলোপাতাড়ি পটকা ফাটায়। এ সময় বিহারী ক্যাম্প থেকে লোকজন বের হয়ে আসার আগেই তারা রাস্তার পাশে একটা ঘরে হামলা চালায়। এ সময়ই দেয়া হয় আগুন। তখন পুলিশ ছিল পাশেই। আগুন দেয়ার পর বিহারীরা যখন তা নেভানোর জন্য এগিয়ে আসে, তখন তাদের ছত্র ভঙ্গ করার জন্য মারা হয় টিয়ারগ্যাস।
এ ব্যাপারে নিহত পরিবারের এক স্বজন ছালেহা জানান, আগুন দেয়ার আগে ওরা ওই ঘরের বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে দেয়। টিনের ফাঁক দিয়ে তেল ঢালা হয়। আগুন দেয়ার পর ওরা দৌড়ে চলে যায় বাউনিয়া বস্তির দিকে। পুলিশ ছিল পাশে। তারা ওদের ধরবে দূরের কথা উল্টো আগুন নেভাতে আসা লোকজনদের দেখে গুলি করেছে। গ্যাস মেরেছে। এ সময় আরও এক যুবক গুলি খায়। পরে ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে সে মারা যায়। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও কজন।
দীর্ঘদিনের বাসিন্দা এসব বিহারির অভিযোগ, লালমাটিয়া বাউনিয়া বস্তির লোকজন শনিবার সকাল ৮টার দিকে তাদের ক্যাম্পে আগুন লাগিয়ে দেয়। এতেই হতাহতের ঘটনা ঘটে।
এখানকার গফুর ও মাহমুদ আলম বলেন, সকালে কালশীতে আতশবাজি ফাটানো হচ্ছিল। হঠাৎ বাউনিয়া বস্তির ৩-৪শ’ লোক তাদের ধাওয়া দেয় ও বিহারী ক্যাম্পে আগুন লাগিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। এর কিছুক্ষণ পরেই আগুন লাগানো হয়। এ আগুনে আনোয়ারের চায়ের দোকানসহ বিহারী ক্যাম্পের মোট আটটি ঘর পুড়ে গেছে।
বিহারীদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পল্লবী থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল রানা ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাপ্পীর নেতৃত্বে তৈইল্লা জাহিদ, নুরা ও পেট কাটা সুমন অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশের সহযোগিতায় হামলা চালানো হয় বলেও অভিযোগ করেন অনেকে।
কাউনিয়া বস্তির লোকেরা আগুন লাগানোর অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করছেন, ওই বিহারী ক্যাম্পে আতশবাজি তৈরি ও বিক্রি করা হয়। এ কারণে শনিবার সকালে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। এ অভিযানের সময় পুলিশের ওপর হামলা করে বিহারীরা। এ সময় তারা পুলিশকে সাহায্য করতে এগিয়ে যান। পুলিশ বলছে, বিহারী ক্যাম্পটিতে চার-পাঁচটি গ্রুপ রয়েছে। নানা বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ লেগে থাকে। এ বিরোধ থেকেই সংঘর্ষের সূত্রপাত।
ডিসি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ওখানে বেশকিছু গ্রুপ রয়েছে। শব-ই-বরাতের আগের রাতে ওই ক্যাম্প থেকে বেশ কজনকে আটক করে পুলিশ। এর মধ্যে হয়ত কোন পক্ষের লোক বেশি ধরা পড়েছে। হতে পারে, এ কারণে ওই পক্ষের লোকরা অন্যপক্ষের ওপর হামলা চালায়।
ঘটনাস্থলেই জনকণ্ঠের মুখোমুখি হওয়া ঢাকা জেলা প্রশাসক তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া সাংবাদিকদের বলেছেন, দুইপক্ষের মারামারিতে নয়জন মারা গেছে। এ ঘটনায় প্রশাসনের দুর্বলতা থাকতে পারে। তবে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
যেভাবে লাশ হস্তান্তর ॥ জেলা প্রশাসক শেখ ইউসুফ হারুণ সেখানে হাজির হওয়ার আগ পর্যন্ত পুলিশ ও বিহারীদের মধ্যে থেমে থেমে ধাওয়া পাল্টাধাওয়া চলতে থাকে। সাংবাদিকরা সব লাশ দেখতে চাইলেও বিহারীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে তাদের প্রশাসনের দালাল বলে অভিযুক্ত করতে থাকে। বেলা সাড়ে বারোটার দিকে জেলা প্রশাসক সেখানে হাজির হন। তার পর পরই আসেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য সাহেদা তারেক দীপ্তি। তাঁরা দুজনেই বিহারীদের নেতা মোস্তাক, বাবুল, ইয়াসীনসহ অন্যদের সঙ্গে লাশ হস্তান্তরের ব্যাপারে আলোচনা করেন। এ সময় জেলা প্রশাসক তাঁদের নিয়ে লাশ আনতে ক্যাম্পের ভেতরে ঢোকেন। তখনই তারা বিক্ষুব্ধ বিহারীদের তোপের মুখে পড়েন। এ সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার নাম নিয়ে এ ঘটনার জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়।
জেলা প্রশাসক শেখ ইউসুফ হারুণ ও সাহেদা তারেক দীপ্তি উত্তেজিত ও শোকার্তদের আশ্বস্ত করেন লাশ দেয়া হলে ময়নাতদন্তের পর ফেরত দেয়া হবে। থানায় দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা হবে। তদন্ত করে বিচার করা হবে।
তাঁদের এ সব আশ্বাসে ওরা ভরসা রাখতে পারেনি। বরং মারমুখী হয়ে ওঠে। এ সময় পুলিশ এখান থেকে ৫ বিহারী যুবককে আটক করে গাড়িতে তোলে। এতে আরও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এ সময় একজন দোকানদার জানান, সকাল থেকে ক্যাম্পের ভেতরে স্ট্যান্ডেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপেট্রিয়েশন কমিটির কার্যালয়ে লাশগুলো রাখা ছিল। সেখানে শত শত নারী-পুরুষ লাশ ঘিরে রাখে। এর আগে গুম হওয়ার আশঙ্কায় লাশগুলো হস্তান্তর করতে চাচ্ছিলেন না বিহারীরা। যে কারণে বাধার মুখে পুলিশ কিংবা প্রশাসন চেষ্টা করেও সেখানে পৌঁছাতে পারছিলেন না। এর আগে এই ক্যাম্পের ভেতরে দুপুরের দিকে বিহারীদের পক্ষ থেকে মাইকিং করে, ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের প্রকৃত সত্য তুলে ধরার আহ্বান জানানো হয়। সেখানেও লাশ গুম হওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জেলা প্রশাসক সেখানে গিয়ে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সান্ত¡না দেয়ার চেষ্টা করেন। পরে তিনি হ্যান্ডমাইকে করে লাশ ফিরিয়ে দিয়ে প্রশাসনিক কাজ করতে দেয়ার আহ্বান জানালে বিহারীরা তাঁর বিরুদ্ধে সেøাগান দিতে থাকে। একপর্যায়ে জেলা প্রশাসক তাঁর বক্তব্য বন্ধ করে দেন। দুপুরের দিকে পুলিশ বিহারী ক্যাম্প ও তার আশপাশে অভিযান শুরু করে। কিন্তু লাশ ঘিরে ব্যাপক বিহারী নারী-পুরুষ অবস্থান নেয়ায় এবং বাধার মুখে সেখানে যেতে পারছিল না পুলিশ। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে মিরপুর ডিওএইচএসের পাশের রাস্তা থেকে প্রায় ৭ বিহারী যুবককে একসঙ্গে ধরে প্রিজনভ্যানে উঠিয়ে নেয়। এ ছাড়াও ক্যাম্পের ভেতর থেকে বিচ্ছিন্নভাবে আরও ৫ জনকে আটক করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, এ সময় প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে বার বার ফোন করে জেলা প্রশাসকের কাছে জানতে চাওয়া হয় ঠিক কত লাশ সেখানে পড়ে আছে অথবা লুকানো হয়েছে। জেলা প্রশাসক সঠিক সংখ্যা জানার স্বচক্ষে লাশগুলো দেখার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে আগুনে পুড়া ঘরের কাছে গিয়ে দেখেন সেখানে কোন লাশ নেই। তখন তাঁকে জানানো হয় লাশগুলো সরিয়ে রাখা হয়েছে ওপাশের বিহারী সমিতির অফিসে। তারপর জেলা প্রশাসক ও সাহেদা তারেক একত্রে আরেকটা বিহারী সমিতির অফিসে গিয়ে বৈঠকে বসেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদপুর থেকে আসা আটকেপড়া পাকিস্তানীদের কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল জব্বার খান ও সাধারণ সম্পাদক শওকত। এ ছাড়া ছিলেন মিরপুুর বিহারী সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ। তাদের সঙ্গে চল্লিশ মিনিট বৈঠক করার শর্ত সাপেক্ষে লাশগুলো জেলা প্রশাসকের কাছে দিতে রাজি হয়। তবে কিছুতেই লাশগুলো পুলিশের গাড়িতে দিতে রাজি হয়নি। এতে আনা হয় একটি আলাদা মিনি ট্রাক।
বেলা তিনটার দিকে ওই ঘর থেকে সাদা কাপড়ে মোড়ানো লাশ এক এক করে বের করে আনা হয়। তোলা হয় ট্রাকে। শত শত শোকার্ত তখন মাতম করতে থাকে। লাশগুলো বের করার আগে এক মাইকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন ইয়াসীন। তিনি বেশ কিছু শর্ত দেন। ঘটনার জন্য দায়ীদের গ্রেফতার, পুলিশ কর্তৃক আটক ৭ জনের মুক্তি ও ক্যাম্পের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শর্ত দেন তিনি। এ সব শর্ত মেনেই জেলা প্রশাসক লাশগুলো বুঝে নেন। দুপুর সোয়া ৩টার দিকে পিকআপে (ঢাকা মেট্রো-ন-১৬১৩৪৪) করে ৯টি লাশ ‘পুলিশ’ লেখা সংবলিত বস্তায় ভরে কালশীর বিহারী ক্যাম্প থেকে বের করে আনা হয়। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ৯টি লাশ ঢামেকে পৌঁছে।
এ সময় ঢাকা জেলা প্রশাসক ইউসুফ হারুন সাংবাদিকদের জানান, নিহত ১০ জনের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ময়নাতদন্ত শেষে তা ফের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এর পর তাদের দাফন-কাফন সম্পন্ন হবে। দাফনের জন্য প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে সহযোগিতা দেয়া হবে, পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করা হবে।

তদন্ত কমিটি
কালশীর ঘটনায় পুলিশের জয়েন্ট কমিশনারকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শনিবার বিকেলে নিহতদের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে দেখতে এসে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জমান খান কামাল এ ঘোষণা দেন। বিকেল সাড়ে চারটায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ঢামেকে আসেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার বেনজির আহমেদসহ পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারা। লাশ দেখে বেরিয়ে যাওয়ার সময় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কালশীর ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাক্সিক্ষত বলে উল্লেখ করেন।
বেনজির আহমেদ বলেন, আতশবাজি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও কোন কোন জায়গায় কিছুটা আতশবাজি হয়েছে। তবে আগামী শব-ই-বরাতে আর আতশবাজি থাকবে না।
পুলিশের বক্তব্য ॥ ঘটনাস্থলেই পুুলিশের উপকমিশনার (ডিসি) ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, কয়েকদিন আগেও একই এলাকায় বিদ্যুত সংযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের সঙ্গে বিহারীদের কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে তাদের সঙ্গেও সংঘর্ষ হয় বিহারী ও স্থানীয়দের। শনিবার ভোরেও এ ধরনের বিষয় নিয়েই স্থানীয় ও বিহারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে রাস্তার পাশে থাকা দুটি বিহারী বাড়িতে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এ আগুন নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ লাগিয়েছে তা জানা যায়নি।

আহতদের অভিযোগ
এ ঘটনায় মোঃ আসলাম (৫০), বদর উদ্দিন (৪৫), আরজু (১৬) নামে গুলিবিদ্ধ তিন ব্যক্তিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়াও ফারজানা নামে এক অগ্নিদগ্ধ নারী ঢামেকে এসেছেন। তাঁর মুখ, শরীরের বিভিন্ন অংশ আগুনে পুড়ে গেছে। তিনি মিরপুর-১২ এর কুর্মিটোলা ক্যাম্পে বসবাস করেন।
মিরপুর-১২ নম্বরের কুর্মিটোলার পাকিস্তানী ক্যাম্পের জয়েন্ট সেক্রেটারি আব্দুস সাত্তার জনকণ্ঠকে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে জানান, নিহতদের মধ্যে ৩ শিশু, ২ নারী ও ৫ জন পুরুষ।
আহত আসলামের স্ত্রী নাজমা বেগম জানান, আনুমানিক সকাল ৭টায় পল্লবীর কালশীর নতুন রাস্তায় দুই গ্রুপের সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় পুলিশের গুলিতে আসলাম আহত হন। তার পিঠে গুলি লাগে। আসলাম তার পরিবারসহ মিরপুর-১২ এর কুর্মিটোলা ক্যাম্পে বসবাস করেন।
এর আগে সকালে এলাকায় বেশ কিছু বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এ সব ঘরে বাসিন্দারা আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন। কালশী ও আশপাশের কয়েকটি রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। মোনাপাড়া ক্যাম্পের ভেতর লাশের পাশে থাকা বিহারী যুবক নবাব হুসাইন জানান, তার আত্মীয় আব্দুল কাদেরসহ (৯) একই পরিবারের চারজন মারা গেছেন। আরেকটি পরিবারের দুইজন সদস্য অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন বলে জানান নবাব।
মহলবিশেষ দায়ী ॥ আগুনে নিহত স্বজনদের অভিযোগ, বিহারীদের জন্য বরাদ্দকৃত জমি অবৈধভাবে দখলের চেষ্টা ও বিদ্যুতের ট্রান্সমিটার থেকে বস্তিবাসীদের বিদ্যুত সংযোগে বাধা দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিরপুরে কালশীর ঘটনা ঘটিয়েছে একটি বিশেষ মহল। এই বিশেষ মহলকে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন স্থানীয় এক প্রভাবশালী রাজনীতিক।
ওয়েলফেয়ার মিশন অব বিহারীর চেয়ারম্যান ও অবাঙালীদের সংগঠন ইউসিবিএসের প্রধান উপদেষ্টা মোস্তাক আহমেদ শনিবার দুপুরে কুর্মিটোলা ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় সাংবাদিকদের কাছে এ দাবি করেন।
মোস্তাক আহমেদ বলেন, প্রতিবছর একসঙ্গে বাঙালী ও অবাঙালী একই সঙ্গে শব-ই-বরাত উদযাপন করে আসছে। কখনও আতশবাজি ফোটানো বা অন্য কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধ বাধেনি।
তিনি বলেন, একটি দুটি নয়, দশটি ঘরে আগুন দিলেও দশজন মানুষ পুড়ে মরার কথা নয়। তিনটি পরিবারের তিনটি ঘরে তালাবদ্ধ করে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটায় বিশেষ মহলটি। তিনি আরও বলেন, বিহারীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার জন্য প্রভাবশালীদের লেলিয়ে দেয়া ওই চক্রটি পরিকল্পিতভাবে আতশবাজি ফোটানোর ঘটনা সাজায়। এর পর ফজরের নামাজ শেষে মানুষ ঘুমিয়ে পড়ার পর পরিকল্পিকতভাবে এ ঘটনা ঘটায়। তিনি বিহারী ক্যাম্পের এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।
পুলিশের গুলিতে আজাদের নিহত হওয়ার ব্যাপারে পুলিশ সঠিক কোন বক্তব্য দিতে পারেনি।
তিনি পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন কিনা জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার কামাল উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, সংঘর্ষের সময় এলাকাবাসীও পুলিশকে লক্ষ্য করে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। তারাও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছিল। তাই কাদের গুলিতে তার মৃত্যু হয়েছে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হন বলে সহকারী কমিশনার কামাল জানান। তিনি আরও জানান, আতশবাজি ফোটানোসহ সংঘর্ষে জড়িত থাকার অভিযোগে তারা ৬৬ জনকে আটক করেছেন।
ঢাকা মেডিক্যালে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসাধীন বদর উদ্দীন (৫৬), আরজু (১৮), আসলাম (৪৫) এবং মোঃ সরদারের (৬০) শরীরের বিভিন্ন অংশে র্ছরা গুলির চিহ্ন রয়েছে। আহত মোঃ নাদিমের মাথায় আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। একই ঘটনায় দেহের ১৭ শতাংশ আগুনের ক্ষত নিয়ে ফারজানা (১৬) নামে এক শিক্ষার্থী ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন।

http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment