আসল কারণ : সীমান্ত, বিজিবি হত্যা এবং রোহিঙ্গা- আরএসও প্রসঙ্গ
-গোলাম মোর্তোজা
আমাদের একজন সৈনিককে মিয়ানমার গুলি করে হত্যা করেছে। আমরা মর্মাহত, আমরা শোকাহত। কিন্তু বাস্তবে আমাদের সৈনিকদের আমরা সীমান্তে কীভাবে রেখেছি- সত্যটা জানা দরকার। জানলে আপনার মন খারাপ আরও বাড়বে। আরও সমবেদনা জন্মাবে বিজিবি সদস্যদের প্রতি-
১. বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত প্রায় ২০০ কি.মি। প্রায় পুরো সীমান্তজুড়ে মিয়ানমার কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। কাঁটাতারের বেড়াসংলগ্ন ৩২ ফিট চওড়া রাস্ত বানিয়েছে। বাস-ট্রাক- সাঁজোয়া যান সবই চলতে পারে এই রাস্তায়। মিয়ানমার সীমান্তে টহল দেয়, কাঁটাতারের ভেতরে নিরাপদ থেকে, সামরিক গাড়ি নিয়ে।
২. আমাদের সীমান্ত পাহারা দেয়ার জন্য কিছু বিওপি (বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট) আছে, পাহাড়ের ওপরে। মিয়ানমার-বাংলাদেশ দু’পাশেই পাহাড়-জঙ্গল, দুর্গম এলাকা। আমাদের বিজিবি অবস্থান করে বিওপিতে। নিচে বিশাল পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা এলাকা পুরোপুরি অরক্ষিত। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই, পাহাড়িদের পায়ে হাঁটা দুর্গম কাঁচা রাস্তা ছাড়া।
৩. এখন পত্রিকায় নাম আসছে ৫২ নম্বর পিলার, ৫০ নম্বর পিলার... ইত্যাদি। ৫২ নম্বর পিলারেই আক্রান্ত হয়েছিলেন আমাদের সৈনিকেরা। কাছের একটি বিওপি থেকে সাদা পতাকা নিয়ে ৫২ নম্বর পিলারের কাছে গিয়েছিলেন ২০/২২ জনের বিজিবি সদস্যের একটি দল। ২৮ মে মিয়ানমার বাহিনীর গুলিতে মিজানুর গুলিবিদ্ধ হন, অন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটে আসেন।২৮ মে সারাদিন আমরা জানতে পারি না মিজানুর মারা গেছেন কি না, অন্য বিজিবি সদস্যদের কয়জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে। বিওপি থেকে ৫২ নম্বর পিলার পর্যন্ত যেতে সময় লাগে কমপক্ষে দুই ঘণ্টা।
৪. বাংলাদেশ মিজানুরের লাশ ফেরত চায় ৫০ নম্বর পিলারে, মিয়ানমার রাজি হয় না। ৫০ নম্বর পিলারে আমাদের রাস্তা আছে, গাড়ি যায়। তারা লাশ ফেরত দিতে চায় ৫২ নম্বর পিলারে। ৫০ নম্বর পিলার থেকে ৫২ নম্বর পিলারের দূরত্ব ৪ ঘণ্টার।৩০ তারিখ সকাল আটটায় ৫২ নম্বর পিলারের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে আমাদের বিজিবি, লাশ ফেরত আনার জন্য।বিকাল তিনটার দিকে ৫২ নম্বর পিলারের কাছাকাছি পৌঁছলে গুলিবর্ষণ শুরু করে মিয়ানমার। গুলিবর্ষণ করে জবাব দেয় বিজিবিও। চিন্তা করুন বিজিবি সদস্যদের অবস্থা! সকাল আটটা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত পাহাড়ের ওই দুর্গম পথ তাদের পাড়ি দিতে হয়েছে। তারপর আবার পাল্টা গুলি!!
৫. বিজিবি সদস্যদের সারা রাত এভাবে জঙ্গলে কাটে। দিনভর আলোচনার পর ঠিক হয় মিয়ানমার লাশ ফেরত দেবে বিকেল তিনটায়। কিন্তু লাশ ফেরত দেয় সাড়ে পাঁচটার দিকে। ঐ দুর্গম পথে লাশ কাঁধে ঝুলিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে নিয়ে আসেন বিজিবি সদস্যরা। লাশ পচে গন্ধ বের হচ্ছে। রাত হয়ে গেছে। একটি পাহাড়ে অবস্থান নেন তারা। বিজিবি সদস্যরা গিয়েছিলেন আগের দিন তিনটায় লাশ ফেরত আনার জন্য। লাশ ফেরত পেলেন পরের দিন সন্ধ্যায়। ততক্ষণে তাদের সঙ্গে থাকা শুকনো খাবার, পানি শেষ হয়ে যায়। পাহাড়-জঙ্গলে অভুক্ত অবস্থায় কাটে বিজিবি সদস্যদের। চার থেকে ছয়টি নদী পার হয়ে, চার থেকে সাত ঘণ্টা পায়ে হেঁটে তাদের কাছে পৌঁছানো ছাড়া আর কোনো পথ নেই। হেলিকপ্টারেও খাবার বা অন্য কোনো সাহায্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা নেই।
৬. স্থানীয়দের সহায়তায় এই দুর্গম পথ হেঁটে সহকর্মীর লাশ নিয়ে ফিরে আসেন অভুক্ত বিজিবি সদস্যরা। এই সময়ে যদি মিয়ানমার আবার আক্রমণ করত, কী অবস্থা হতো বিজিবি সদস্যদের?
৭. এবার অন্য প্রসঙ্গে আরও কিছু তথ্য। মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তে অনেক দিন ধরেই টানাপোড়েন চলছে। মিয়ানমার কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করছে এবং আমরা সেই অভিযোগ অস্বীকার করছি। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে দুটি অভিযোগ-
ক. ২০১২ সালের ৬ নভেম্বর মিয়ানমার সেনাবাহিনী সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার কাজ করছিল। তাদের ওপর আক্রমণ করে আরএসও (রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন)। আক্রমণে হতাহত হয় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্যদের কয়েকজন। সেনাবাহিনীর ৩ জন সদস্যকে অপহরণ করে আরএসও। মিয়ানমার দাবি করে আরএসও তাদের অপহরণ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে এসেছে। মিয়ানমারের অভিযোগ, আরএসও’র ঘাঁটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। বাংলাদেশ থেকে গিয়েই তারা মিয়ানমার সীমান্ত আক্রমণ করে এবং ফিরে আসে।বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আরএসও’র অবস্থান, অপহরণ করে নিয়ে আসাসহ মিয়ানমারের সব অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলাদেশ, বিজিবি।
খ. গত মাসের ১৭ তারিখে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর আবারও আক্রমণ করে আরএসও। অপহরণ করে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তিন সদস্যকে।দুইবারে অপহৃত তিনজন, তিনজন ছয়জন মিয়ানমারের সৈনিককে হত্যা করে আরএসও।
এগুলো সবই মিয়ানমারের পক্ষ থেকে করা অভিযোগ।
৮. এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত মাসের ২১ তারিখে ৫০ নম্বর পিলারে মিয়ানমারের সঙ্গে পতাকা বৈঠক হয় বিজিবি’র। উপরে উল্লেখিত দু’টি অভিযোগসহ মিয়ানমারের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা সব অভিযোগ বাংলাদেশ অস্বীকার করে। এতে ক্ষুব্ধ হয় মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী। সিদ্ধান্ত ছাড়া উত্তপ্ত অবস্থায় মিটিং শেষ হয়। মিয়ানমার হুমকি দিয়ে যায়, আমাদের সৈনিকরা হত্যার শিকার হলে, আমরাও তোমাদের দেখে নেব বলে। ২৮ মে ৫২ নম্বর পিলারের কাছে গুলি করে হত্যা করা হয় মিজানুর রহমানকে। সে কথা আগে লিখেছি।
৯. রাষ্ট্রীয়ভাবে যেহেতু আমরা বলছি, আরএসওকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছি না। সুতরাং আমাদের অবস্থানও সেটাই। এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।
কিন্তু কিছু বিষয়ে নজর দেয়া অতি জরুরি হয়ে পড়েছে বলে আমার ধারণা।
গ. নাইক্ষ্যংছড়ির পুরো এলাকাটি এখন মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপদ। এই এলাকার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০% রোহিঙ্গা। তারপর সমতল থেকে যাওয়া বাঙালি (যারা সেটেলার হিসেবে পরিচিত)। সংখ্যায় সবচেয়ে কম আদি পাহাড়ি বাসিন্দা। রাজনৈতিকভাবে জামায়াত অধ্যুষিত এলাকা। মাদক-অস্ত্র এবং সা¤প্রতিক ইয়াবা চোরাচালানের রুট। এখানকার চেয়ারম্যান জামায়াতের তোফায়েল। রামু বৌদ্ধপল্লী আক্রমণসহ নানা অপরাধের সঙ্গে তার নাম সম্পৃক্ত।এই পাহাড়-জঙ্গলের জনপদের ওপর আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
ঘ. আরএসও সদস্য আর সাধারণ রোহিঙ্গা, শনাক্ত করা খুবই দুরূহ। কারণ একই চেহারা- ভাষা। অস্ত্র-মাদক ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত রোহিঙ্গারা। এই রোহিঙ্গাদের মধ্যে আরএসও আছে কি না, সত্যি সত্যি তারা মিয়ানমার সীমান্তে আক্রমণ করছে কি না, অপহরণ করে এনে হত্যা করছে কি না- গভীরভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে।এটা শুধু সামরিক বাহিনীর বিষয় নয়। এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, ভারতের ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
ঙ. আমাদের সীমান্ত পুরোপুরি অরক্ষিত। বিজিবি বড় বেশি রকমের অসহায়। রাস্তা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা ছাড়া কোনোভাবেই কার্যকরভাবে সীমান্ত পাহারা দেয়া যায় না।
চ. সীমান্তে চোরাচালান, মানব পাচার সবই নির্ভর করে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর। এখানে আমাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।সামরিক শক্তির কথা বলছি না। যা আছে সেটা দিয়েই হবে। রাস্তা অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বলছি।
ছ. এই দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলে সীমান্ত ঘেঁষে রাস্তা বানানো ভয়ঙ্কর কঠিন কাজ। তবে অসম্ভব নয়। মিয়ানমার বানিয়েছে, ভারতও বানিয়েছে। আমাদেরও বানাতে হবে।
জ. নিশ্চয়ই রাস্তা বানানোর কাজটি আমাদের সেনাবাহিনী করতে পারে। পার্বত্য অঞ্চলে অনেক রাস্তা তারা বানিয়েছেও। ঢাকা শহরের ফ্লাইওভারের কাজে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার না করে, সরকার সীমান্ত এলাকায় রাস্তা বানানোর কাজে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগাতে পারে।
ঝ. মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধ নয়। আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষার জন্য বিজিবির সুযোগ সুবিধা, অবকাঠামো উন্নয়ন, আরএসও বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা এবং অবস্থান নেয়া দরকার। সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমনে, সমমর্যাদায় সহঅবস্থান নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেয়ার সময় এসেছে।
-গোলাম মোর্তোজা
আমাদের একজন সৈনিককে মিয়ানমার গুলি করে হত্যা করেছে। আমরা মর্মাহত, আমরা শোকাহত। কিন্তু বাস্তবে আমাদের সৈনিকদের আমরা সীমান্তে কীভাবে রেখেছি- সত্যটা জানা দরকার। জানলে আপনার মন খারাপ আরও বাড়বে। আরও সমবেদনা জন্মাবে বিজিবি সদস্যদের প্রতি-
১. বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত প্রায় ২০০ কি.মি। প্রায় পুরো সীমান্তজুড়ে মিয়ানমার কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। কাঁটাতারের বেড়াসংলগ্ন ৩২ ফিট চওড়া রাস্ত বানিয়েছে। বাস-ট্রাক- সাঁজোয়া যান সবই চলতে পারে এই রাস্তায়। মিয়ানমার সীমান্তে টহল দেয়, কাঁটাতারের ভেতরে নিরাপদ থেকে, সামরিক গাড়ি নিয়ে।
২. আমাদের সীমান্ত পাহারা দেয়ার জন্য কিছু বিওপি (বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট) আছে, পাহাড়ের ওপরে। মিয়ানমার-বাংলাদেশ দু’পাশেই পাহাড়-জঙ্গল, দুর্গম এলাকা। আমাদের বিজিবি অবস্থান করে বিওপিতে। নিচে বিশাল পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা এলাকা পুরোপুরি অরক্ষিত। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই, পাহাড়িদের পায়ে হাঁটা দুর্গম কাঁচা রাস্তা ছাড়া।
৩. এখন পত্রিকায় নাম আসছে ৫২ নম্বর পিলার, ৫০ নম্বর পিলার... ইত্যাদি। ৫২ নম্বর পিলারেই আক্রান্ত হয়েছিলেন আমাদের সৈনিকেরা। কাছের একটি বিওপি থেকে সাদা পতাকা নিয়ে ৫২ নম্বর পিলারের কাছে গিয়েছিলেন ২০/২২ জনের বিজিবি সদস্যের একটি দল। ২৮ মে মিয়ানমার বাহিনীর গুলিতে মিজানুর গুলিবিদ্ধ হন, অন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটে আসেন।২৮ মে সারাদিন আমরা জানতে পারি না মিজানুর মারা গেছেন কি না, অন্য বিজিবি সদস্যদের কয়জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে। বিওপি থেকে ৫২ নম্বর পিলার পর্যন্ত যেতে সময় লাগে কমপক্ষে দুই ঘণ্টা।
৪. বাংলাদেশ মিজানুরের লাশ ফেরত চায় ৫০ নম্বর পিলারে, মিয়ানমার রাজি হয় না। ৫০ নম্বর পিলারে আমাদের রাস্তা আছে, গাড়ি যায়। তারা লাশ ফেরত দিতে চায় ৫২ নম্বর পিলারে। ৫০ নম্বর পিলার থেকে ৫২ নম্বর পিলারের দূরত্ব ৪ ঘণ্টার।৩০ তারিখ সকাল আটটায় ৫২ নম্বর পিলারের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে আমাদের বিজিবি, লাশ ফেরত আনার জন্য।বিকাল তিনটার দিকে ৫২ নম্বর পিলারের কাছাকাছি পৌঁছলে গুলিবর্ষণ শুরু করে মিয়ানমার। গুলিবর্ষণ করে জবাব দেয় বিজিবিও। চিন্তা করুন বিজিবি সদস্যদের অবস্থা! সকাল আটটা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত পাহাড়ের ওই দুর্গম পথ তাদের পাড়ি দিতে হয়েছে। তারপর আবার পাল্টা গুলি!!
৫. বিজিবি সদস্যদের সারা রাত এভাবে জঙ্গলে কাটে। দিনভর আলোচনার পর ঠিক হয় মিয়ানমার লাশ ফেরত দেবে বিকেল তিনটায়। কিন্তু লাশ ফেরত দেয় সাড়ে পাঁচটার দিকে। ঐ দুর্গম পথে লাশ কাঁধে ঝুলিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে নিয়ে আসেন বিজিবি সদস্যরা। লাশ পচে গন্ধ বের হচ্ছে। রাত হয়ে গেছে। একটি পাহাড়ে অবস্থান নেন তারা। বিজিবি সদস্যরা গিয়েছিলেন আগের দিন তিনটায় লাশ ফেরত আনার জন্য। লাশ ফেরত পেলেন পরের দিন সন্ধ্যায়। ততক্ষণে তাদের সঙ্গে থাকা শুকনো খাবার, পানি শেষ হয়ে যায়। পাহাড়-জঙ্গলে অভুক্ত অবস্থায় কাটে বিজিবি সদস্যদের। চার থেকে ছয়টি নদী পার হয়ে, চার থেকে সাত ঘণ্টা পায়ে হেঁটে তাদের কাছে পৌঁছানো ছাড়া আর কোনো পথ নেই। হেলিকপ্টারেও খাবার বা অন্য কোনো সাহায্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা নেই।
৬. স্থানীয়দের সহায়তায় এই দুর্গম পথ হেঁটে সহকর্মীর লাশ নিয়ে ফিরে আসেন অভুক্ত বিজিবি সদস্যরা। এই সময়ে যদি মিয়ানমার আবার আক্রমণ করত, কী অবস্থা হতো বিজিবি সদস্যদের?
এই পুরো অঞ্চলটি আমার একাধিকার দেখা-জানা।৭. এবার অন্য প্রসঙ্গে আরও কিছু তথ্য। মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তে অনেক দিন ধরেই টানাপোড়েন চলছে। মিয়ানমার কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করছে এবং আমরা সেই অভিযোগ অস্বীকার করছি। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে দুটি অভিযোগ-
ক. ২০১২ সালের ৬ নভেম্বর মিয়ানমার সেনাবাহিনী সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার কাজ করছিল। তাদের ওপর আক্রমণ করে আরএসও (রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন)। আক্রমণে হতাহত হয় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্যদের কয়েকজন। সেনাবাহিনীর ৩ জন সদস্যকে অপহরণ করে আরএসও। মিয়ানমার দাবি করে আরএসও তাদের অপহরণ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়ে এসেছে। মিয়ানমারের অভিযোগ, আরএসও’র ঘাঁটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। বাংলাদেশ থেকে গিয়েই তারা মিয়ানমার সীমান্ত আক্রমণ করে এবং ফিরে আসে।বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আরএসও’র অবস্থান, অপহরণ করে নিয়ে আসাসহ মিয়ানমারের সব অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলাদেশ, বিজিবি।
খ. গত মাসের ১৭ তারিখে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর আবারও আক্রমণ করে আরএসও। অপহরণ করে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তিন সদস্যকে।দুইবারে অপহৃত তিনজন, তিনজন ছয়জন মিয়ানমারের সৈনিককে হত্যা করে আরএসও।
এগুলো সবই মিয়ানমারের পক্ষ থেকে করা অভিযোগ।
৮. এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত মাসের ২১ তারিখে ৫০ নম্বর পিলারে মিয়ানমারের সঙ্গে পতাকা বৈঠক হয় বিজিবি’র। উপরে উল্লেখিত দু’টি অভিযোগসহ মিয়ানমারের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা সব অভিযোগ বাংলাদেশ অস্বীকার করে। এতে ক্ষুব্ধ হয় মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী। সিদ্ধান্ত ছাড়া উত্তপ্ত অবস্থায় মিটিং শেষ হয়। মিয়ানমার হুমকি দিয়ে যায়, আমাদের সৈনিকরা হত্যার শিকার হলে, আমরাও তোমাদের দেখে নেব বলে। ২৮ মে ৫২ নম্বর পিলারের কাছে গুলি করে হত্যা করা হয় মিজানুর রহমানকে। সে কথা আগে লিখেছি।
৯. রাষ্ট্রীয়ভাবে যেহেতু আমরা বলছি, আরএসওকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছি না। সুতরাং আমাদের অবস্থানও সেটাই। এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।
কিন্তু কিছু বিষয়ে নজর দেয়া অতি জরুরি হয়ে পড়েছে বলে আমার ধারণা।
গ. নাইক্ষ্যংছড়ির পুরো এলাকাটি এখন মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপদ। এই এলাকার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০% রোহিঙ্গা। তারপর সমতল থেকে যাওয়া বাঙালি (যারা সেটেলার হিসেবে পরিচিত)। সংখ্যায় সবচেয়ে কম আদি পাহাড়ি বাসিন্দা। রাজনৈতিকভাবে জামায়াত অধ্যুষিত এলাকা। মাদক-অস্ত্র এবং সা¤প্রতিক ইয়াবা চোরাচালানের রুট। এখানকার চেয়ারম্যান জামায়াতের তোফায়েল। রামু বৌদ্ধপল্লী আক্রমণসহ নানা অপরাধের সঙ্গে তার নাম সম্পৃক্ত।এই পাহাড়-জঙ্গলের জনপদের ওপর আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
ঘ. আরএসও সদস্য আর সাধারণ রোহিঙ্গা, শনাক্ত করা খুবই দুরূহ। কারণ একই চেহারা- ভাষা। অস্ত্র-মাদক ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত রোহিঙ্গারা। এই রোহিঙ্গাদের মধ্যে আরএসও আছে কি না, সত্যি সত্যি তারা মিয়ানমার সীমান্তে আক্রমণ করছে কি না, অপহরণ করে এনে হত্যা করছে কি না- গভীরভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে।এটা শুধু সামরিক বাহিনীর বিষয় নয়। এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, ভারতের ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
ঙ. আমাদের সীমান্ত পুরোপুরি অরক্ষিত। বিজিবি বড় বেশি রকমের অসহায়। রাস্তা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা ছাড়া কোনোভাবেই কার্যকরভাবে সীমান্ত পাহারা দেয়া যায় না।
চ. সীমান্তে চোরাচালান, মানব পাচার সবই নির্ভর করে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর। এখানে আমাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।সামরিক শক্তির কথা বলছি না। যা আছে সেটা দিয়েই হবে। রাস্তা অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বলছি।
ছ. এই দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলে সীমান্ত ঘেঁষে রাস্তা বানানো ভয়ঙ্কর কঠিন কাজ। তবে অসম্ভব নয়। মিয়ানমার বানিয়েছে, ভারতও বানিয়েছে। আমাদেরও বানাতে হবে।
জ. নিশ্চয়ই রাস্তা বানানোর কাজটি আমাদের সেনাবাহিনী করতে পারে। পার্বত্য অঞ্চলে অনেক রাস্তা তারা বানিয়েছেও। ঢাকা শহরের ফ্লাইওভারের কাজে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার না করে, সরকার সীমান্ত এলাকায় রাস্তা বানানোর কাজে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগাতে পারে।
ঝ. মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধ নয়। আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষার জন্য বিজিবির সুযোগ সুবিধা, অবকাঠামো উন্নয়ন, আরএসও বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা এবং অবস্থান নেয়া দরকার। সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমনে, সমমর্যাদায় সহঅবস্থান নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেয়ার সময় এসেছে।
No comments:
Post a Comment