Monday, June 9, 2014

মিলছে না ওষুধ, ভোগান্তি গরিব ক্যান্সার আক্রান্তদের

মিলছে না ওষুধ, ভোগান্তি গরিব ক্যান্সার আক্রান্তদের

cancer-sign
অনির্বাণ ঘোষ

গরিব ক্যান্সার আক্রান্তদের ব্যয়বহুল চিকিত্‍সার দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল সরকার৷ কিন্ত্ত তাতেই এখন ভারাক্রান্ত রাজ্য৷ অনিয়মিত সরবরাহের কারণে হাসপাতালে মিলছে না ওষুধ৷ মাঝপথে চিকিত্‍সা থমকে যাওয়ায় অশেষ ভোগান্তি হচ্ছে ক্যান্সার রোগীদের৷

গত ডিসেম্বর থেকে ক্যান্সার চিকিত্‍সার মহার্ঘ কিছু ওষুধ রাজ্যের সব ক'টি মেডিক্যাল কলেজ-সহ বড় সরকারি হাসপাতালে মিলতে শুরু করেছিল বিনামূল্যে৷ চিকিত্‍সক মহলে 'বায়োলজিক্যালস' নামে পরিচিত এই ওষুধগুলি সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোর (সিএমএস)-এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়, হাতে চাঁদ পেয়েছিল গরিব রোগীকূল৷ আরজি কর হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের প্রধান সুবীর গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়, 'শুধু কেমোথেরাপির তুলনায়, তার সঙ্গে এই ওষুধ ব্যবহারে সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা গড়ে ৬০ শতাংশ বেশি৷ কিন্ত্ত এগুলো একমাত্র বিদেশি কোম্পানি তৈরি করায় এবং ওষুধগুলির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নগণ্য হওয়ায়, দামের দিক থেকে সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল রিটুক্সিম্যাব, বিভাসিজুম্যাব, ট্র্যাস্টুজুম্যাব ইত্যাদি এই সব ওষুধ৷ এ বছরের গোড়া থেকে অবশ্য লাখ লাখ টাকা দামের সে সব বায়োলজিক্যালস আম-আদমির হাতের নাগালে আসায়, ঘটি-বাটি বিক্রি না-করেই সুস্থ হয়ে উঠতে শুরু করেছিলেন বহু রোগী৷ '

কিন্ত্ত গরিবের কপাল পুড়তে দেরি হয়নি৷ প্রকল্প শুরুর ক' মাসের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে, এত দামি ওষুধের 'রিক্যুইজিশন' দিতে গিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছে না সরকারি হাসপাতালের তবহিল৷ রয়েছে হাসপাতালের সঙ্গে সিএমএসের সমন্বয়ের অভাবও৷ ফলে গত ছ' মাসে বার বারই অনিয়মিত সরবরাহের জেরে বায়োলজিক্যালস বাড়ন্ত হয়ে পড়ছে বিভিন্ন হাসপাতালের ভাঁড়ারে৷ ফলে, কারও চিকিত্‍সাই শুরু হচ্ছে না, কেউ আবার মাঝপথেই চিকিত্‍সা থামিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন৷

যেমন অলোকেশ গায়েন৷ তাঁর রক্তে ক্যান্সার৷ আরজি করে মার্চ থেকে তাঁর চিকিত্‍সা চলছিল৷ ডাক্তারবাবু তাঁকে ছ'টা রিটুক্সিম্যাব ইঞ্জেকশন নিতে বলেছিলেন, তিন সপ্তাহ অন্তর৷ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই ওষুধ (প্রতিটি ভায়ালের দাম ৩০-৩৫ হাজার টাকা, থেরাপির খরচ ন্যূনতম ১ লাখ ৮০ হাজার) আজকাল বিনামূল্যে মেলে সরকারি হাসপাতালে৷ প্রথম তিনটি ইঞ্জেকশনে অসুবিধা হয়নি৷ কিন্ত্ত মে মাসের মাঝমাঝি চতুর্থ ইঞ্জেকশন নিতে এসে জানতে পারেন, হাসপাতালে মজুতই নেই রিটুক্সিম্যাব৷ বাজার থেকে কেনার সামর্থ না-থাকায়, মাঝপথেই সবজি বিক্রেতা আলোকেশবাবুর চিকিত্‍সা হোঁচট খায় ভয়াবহ ভাবে৷ প্রায় নিয়ন্ত্রণে এসে যাওয়া ব্লাড-ক্যান্সার ফের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ক' দিন পর৷ বিভাগীয় চিকিত্‍সকরা জানাচ্ছেন, যথাসময়েই তাঁরা 'রিক্যুইজিশন' দেন৷ কিন্ত্ত ওষুধ আসে না নিয়মিত ভাবে৷ সুবীরবাবু উদ্বিগ্ন, তাঁর রোগীদের চিকিত্‍সায় এমন বিঘ্ন ঘটায়৷

সনত্‍ সামন্তের কোলন ক্যান্সার৷ এনআরএসে তাঁকে 'বিভাসিজুম্যাব' ইঞ্জেকশন নিতে বলেছিলেন ডাক্তারবাবু৷ হাসপাতালে বিনামূল্যেই মিলছিল ৪০ হাজার টাকা দামের এই ইঞ্জেকশন৷ ফলে বুকে বল পেয়েছিলেন পেশায় হকার সনত্‍বাবু৷ বাজারে যে বিভাসিজুম্যাব থেরাপির খরচ লাখ তিনেক টাকা! কিন্ত্ত বিধি বাম৷ মে মাসের শেষে ইঞ্জেকশন নিতে এসে তিনি জানতে পারেন, ওষুধ নেই৷ এনআরএসের ডাক্তারবাবু তাঁকে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে আসতে বলেছেন৷ ক্যান্সারের শিকার ছাপোষা ওই ব্যক্তি জানেন না, চিকিত্‍সাটা আদৌ চলবে কি না৷ এনআরএসের রেডিওথেরাপি বিভাগের প্রধান অমিতাভ রায় অবশ্য আশ্বাস দিচ্ছেন, অনিয়মিত সরবরাহের কারণে মাঝে মাঝে দেরি হলেও, আরোগ্যের পথে কোনও বিঘ্ন ঘটবে না৷

সুলেখা মজুমদারও একই রকম ঘটনার শিকার৷ জানুয়ারি থেকে স্তন ক্যান্সারের এই রোগিণীর 'ট্র্যাস্টুজুম্যাব' দিয়ে চিকিত্‍সা চলছিল এসএসকেএমে৷ কিন্ত্ত সরকারি সরবরাহের এই অত্যন্ত দামি ওষুধটি (প্রতি ভায়ালের দাম অন্তত ৫০ হাজার টাকা, থেরাপির খরচ কমপক্ষে লাখ পাঁচেক) হাসপাতালে মজুত না-থাকায় তৃতীয় ডোজ তিনি নিয়েছেন নির্ধারিত সময়ের দু' সপ্তাহ পর৷ পঞ্চম ডোজেও ফের দেরি মাসখানেকের৷ স্তন ক্যান্সার সারতে সারতেও বার বার আগ্রাসী হয়ে উঠছে বলে আক্ষেপ তাঁর চিকিত্‍সকের৷ 'ওষুধ না-থাকলে আমরা পরে আসতে বলছি রোগীদের৷ এর মধ্যে অবশ্য চিরাচরিত কেমোথেরাপি তাঁদের বন্ধ হচ্ছে না,' সাবধানী মন্তব্য এসএসকেএম হাসপাতালের প্রধান ক্যান্সার চিকিত্‍সক সিদ্ধার্থ বসুর৷

অনিয়মিত বায়োলজিক্যালস সরবরাহের কথা মেনে নিচ্ছে স্বাস্থ্যভবনও৷ স্বাস্থ্য দপ্তর মুখপাত্র সুমন বিশ্বাস বলেন, 'স্থানীয় স্তরে সমন্বয়ের অভাবেই সম্ভবত এমনটা হচ্ছে৷ সরকার নির্ধারিত দামে বায়োলজিক্যালস একেবারেই স্থানীয় বাজারে মেলে না৷ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে রিক্যুইজিশন দিলে ভিনরাজ্য থেকে তারা এই ওষুধ পাঠানোর ব্যবস্থা করে৷ ফলে সময় লাগে৷ হাসপাতালগুলি এই বিষয়টা মাথায় রেখে আগে থেকে রিক্যুইজিশন দিলে, সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ার কথা নয়৷' হাসপাতাল কর্তারাও বলছেন, ভিনরাজ্য থেকে ওষুধ আনাতে হয় বলেই এত সমস্যা৷ যদিও একান্তে তাঁরা বলছেন, এত বিপুল দামি ওষুধ চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত আনাতে গেলে বরাদ্দের পরিমাণ ঢের বাড়ানো প্রয়োজন৷ সেই অতিরিক্ত বরাদ্দ স্বাস্থ্যভবন না-দিলে, বায়োলজিক্যালসের সরবরাহ নিয়মিত হওয়া মুশকিল৷ 
http://eisamay.indiatimes.com/city/kolkata/wb-govt-cancer-fund-medicines-are-not-available-regualrly-for-needy-patients/articleshow/36284995.cms

No comments:

Post a Comment