Monday, May 12, 2014

শেষ মুহূর্তে সুর পাল্টে গেছে খাকি প্যান্ট গেরুয়া শার্টদের
কাওসার রহমান ॥ বিশ্বের গণতান্ত্রিক চর্চার বৃহত্তম আয়োজন ভারতীয় লোকসভা নির্বাচনের আজ শেষ ধাপ। এ শেষ ধাপের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে প্রায় দেড় মাসব্যাপী ম্যারাথন নির্বাচনের বিশাল কর্মযজ্ঞ। শেষ ধাপের নির্বাচনের স্পটলাইট থাকছে তীর্থ শহর বারানসীর দিকে। ‘হাইভোল্টেজ’ প্রচারের পর বারানসী এখন ভোটযুদ্ধের জন্য বেজায় চাঙ্গা। এ আসনে আজ ভোটের লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছেন স্বয়ং ভারতীয় জনতা দলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি এবং আম আদমি পার্টির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তাই সংবাদ মাধ্যম, রাজনৈতিক দলগুলো থেকে শুরু করে দেশের সবার নজর থাকছে এ তারকা-কেন্দ্রের দিকে। সে সঙ্গে বিশাল রোডশোর মাধ্যমে এ আসনে লড়াইয়ে ফিরে এসেছেন কংগ্রেস প্রার্থী অজয় রাই। তবে মন্দিরের এ শহরে ত্রিমুখী লড়াইয়ে মূল ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে প্রায় চার লাখ মুসলিম ভোট। দুর্নীতি ও ভ্রস্টাচার দূর অভিপ্রায় নিয়ে এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অরবিন্দ কেজরিওয়াল সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসাতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত মুখতার আনসারি মুক্তি পেয়ে স্বশরীরে আজয় রাইয়ের সঙ্গে যোগ দেয়ায় এ শেষ পর্যন্ত তীর্থস্থান কাশির ভোটের লড়াই জমে উঠেছে। আর এ ত্রিমুখী লড়াইও বেশ কঠিন করে তুলেছে। 
আজ সোমবার শেষ ধাপে তিনটি রাজ্যের ৪১ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আর এর মধ্য দিয়েই গত ৭ এপ্রিল শুরু হওয়া ১৬তম লোকসভা নির্বাচনের টানা দেড় মাসব্যাপী ভোটগ্রহণের সফল সমাপ্তি ঘটছে। ভোটের পর অপেক্ষা নির্বাচনের ফলের জন্য। আগামী ১৬ মে বিশ্বের বৃহত্তম নির্বাচনী ভোটযুদ্ধে ফল ঘোষণা করা হবে। তবে তার আগেই শুরু হয়েছে অঙ্কের হিসেব-নিকেষ। মিডিয়ার সৃষ্ট মোদি ওয়েভ ইতোমধ্যে হাওয়ায় মিলিয়ে এখন অঙ্কের এ হিসাবকে জটিল করে তুলেছে। ফলে ভোটের শেষদিকে এসে গেরুয়াদের সুর পাল্টে গেছে। সরকার গড়ার ম্যাজিক সংখ্যা পাবে না জেনে ইতোমধ্যে শরিক খুঁজতে শুরু করেছে বিজেপি। আর এ সুযোগে ‘কাচ কলা’ দেখাতে শুরু করেছেন মোদিপন্থী হিসাবে চিহ্নিত দিদি, বহিনজি ও আম্মাজি। শেষ পর্যন্ত দিদি (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়), বহিনজি (মায়াবতি) ও আম্মাজি (জয়ললিতা) সমর্থনে বিজেপি-ই সরকার গড়ে, নাকি কংগ্রেসের সমর্থনে তৃতীয় ফ্রন্টের সরকার হয় সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব। 
ম্যারাথন লোকসভা নির্বাচন প্রক্রিয়ার কাল নবম তথা চূড়ান্ত দফায় পশ্চিমবঙ্গসহ তিন রাজ্যের মোট ৪১ আসনে ভোট। রাজ্যগুলো হলো পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উত্তর প্রদেশ। এর মধ্যে পশ্চিম বাংলায় ১৭ আসনে, বিহারে ৬ আসনে এবং উত্তর প্রদেশে ১৮ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আজ উত্তর প্রদেশের বারানসীতে ভাগ্য পরীক্ষা হবে বিজেপির প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর প্রতিন্দ্বন্দ্বী আম আদমি পার্টির (আপ) প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালের। কাজেই সংবাদ মাধ্যম, রাজনৈতিক দলগুলো থেকে শুরু করে দেশের সবার নজর থাকছে এ তারকা-কেন্দ্রের দিকে। ভোট সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে বারানসীসহ সব কেন্দ্রেই নেয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
আজ আরও উল্লেখযোগ্য, প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারিত হবে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সমাজবাদী পার্টির (সপা) প্রধান মুলায়ম সিং যাদব, চিত্র পরিচালক প্রকাশ ঝা, ভোজপুরি অভিনেতা রবি কিষাণ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আরপিএনসিং, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রঘুবংশ প্রসাদ সিং, বিধায়ক অজয় রাই, তৃণমূল কংগ্রেসের ইন্দিরা তিওয়ারি, বিজেপির জগদম্বিকা পাল ও কলরাজ মিশ্র, কংগ্রেস নেতা অধির চৌধুরী, যাদুকর পিসি সরকার, অভিনেতা তাপস পাল ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জি। 
এ ৪১ আসনে মোট প্রার্থী ৬০৬। এসব কেন্দ্রের মোট ভোটার ৯ কোটির কিছু বেশি। তবে আজ সবার পাখির চোখ থাকবে বারানসীর ওপর। টানা দু’মাস ধরে এ মন্দির শহর সরগরম ছিল মোদি-রাহুল-কেজরির মধ্যে প্রচারের লড়াইয়ে। এ আসনেই পরস্পরের বিরুদ্ধে ভোটসমরে রয়েছেন বিজেপির প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী এবং আপ-প্রধান।
গত আট দফায় গড়ে ভোট পড়েছে ৬৬ শতাংশ। আজ শেষ দফার ভোটে তা আরও বাড়ে কি না সেটাও দেখার। লোকসভার ৫৪৩ আসসে ভোটগণনা ১৬ মে। ভোটের ফলাফলে ‘জাদু-সংখ্যা’ ২৭২ যে দল বা জোট করায়ত্ত করতে পারবে, আগামী দিনে কেন্দ্রে তারাই গড়বে নতুন সরকার।
শনিবার ছিল নবম তথা শেষ ধাপের নির্বাচনের প্রচারের শেষ দিন। একই সঙ্গে ১৬তম লোকসভা নির্বাচনেরও প্রচার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। শেষদিনে কোনও দলের প্রচারেই ক্লান্তির ছাপ ছিল না। বরং জনসভা, পথসভা, মিছিল, র‌্যালি, রোড শো মিলিয়ে ‘তারকাখচিত’ জমকালো প্রচার সেরেছে লাল-সবুজ গেরুয়া সব পক্ষই। 
এবারের নির্বাচনী প্রচারে সব থেকে এগিয়ে ছিল ভারতীয় জনতা দল (বিজেপি) তথা দলটির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কংগ্রেস তথা এ দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী। আর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস তথা এ দলটির প্রধান পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। 
দলের ভেতরের বাধাবিপত্তি কাটিয়ে সঙ্ঘের সবুজ সঙ্কেতেই মোদিকে বিজেপি তুলে ধরেছিল প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে। সে থেকে বলতে গেলে স্বপ্নের ঘোরে মরিয়া হয়ে দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন মোদি। গত ৮ মাসে প্রায় ৫,৮০০ জায়গায় সভা ও অন্য অনুষ্ঠান করেছেন। আকাশ ও স্থলপথে ছুটেছেন ৩ লাখ কিলোমিটারেরও বেশি। শনিবার শেষ দিনেও প্রচার চালিয়েছেন উত্তরপ্রদেশে।
প্রায় আড়াই মাস ধরে একটানা প্রচার করেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সভা-সমাবেশ ও রোডশো করেছেন। তার সঙ্গে অবশ্য কংগ্রেসের পক্ষে দলের প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধী এবং রাজীব কন্যা প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও নির্বাচনী প্রচারের যোগ দিয়েছেন। সর্বশেষ শনিবার উত্তরপ্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ আসন বারানসীতে এক মেগা রোডশো করে কংগ্রেসের পক্ষে নির্বাচনী ঝড় তুলেছেন। মূলত কংগ্রেস সহসভাপতি রাহুল গান্ধীর এ বিশাল রোডশোই বারানসীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফিরিয়ে এনেছে কংগ্রেসকে। এতদিন কংগ্রেস প্রার্থীর প্রচার তেমন চোখে পড়েনি। শেষদফার ভোটের জন্য প্রচারের শেষদিনে রাহুল গান্ধী বারানসীর সর্পিল পথ জুড়ে চার ঘণ্টার রোড শো করেন। প্রচুর দলীয় সমর্থক ও সাধারণ মানুষের উৎসাহে এখন উৎসাহিত কংগ্রেস প্রার্থী স্থানীয় বিধায়ক অজয় রাই।
প্রচারের নিরিখে মোদি ও রাহুলের পরেই তৃতীয় স্থানে পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী তৃণমৃল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কর্মিসভা ও জনসভা মিলে গত মাস তিনেকের মধ্যে মমতা ৪২ আসনের প্রতিটিতে গড়ে তিনবার করে গেছেন। এ রাজ্যে বিরোধী দলের কেউই এ ব্যাপারে তাঁর ধারে কাছে নেই। একটানা প্রচারে তৃণমূল নেত্রী ঘুরে বেড়িয়েছেন রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ঐতিহাসিক সেই প্রচারপর্ব তিনি দক্ষিণ কলকাতায় এসে শনিবার শেষ করেছেন। মোদি, রাহুল, লালু, মায়াবতী ও জয়ললিতার পাশাপাশি মমতাও এ নির্বাচনে দলকে প্রায় একাই টেনেছেন।

স্পটলাইটে বারানসী
এ মুহূর্তে বারানসী লোকসভা ভোটের দিকে সবার নজর। আজ উত্তর প্রদেশের বারানসীতে ভাগ্য পরীক্ষা হবে বিজেপির প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি ও তার প্রতিন্দন্দ্বী আম আদমি পার্টির (আপ) প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালের। কাজেই সংবাদ মাধ্যম ও রাজনৈতিক দলগুলো থেকে শুরু করে দেশের সবার নজর থাকছে এ তারকা-কেন্দ্রের দিকে। ভোট সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে বারানসীসহ সব কেন্দ্রেই নেয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
এ ছাড়াও এখানে সমাজবাদী পার্টি (এসপি), বহুজন সমাজপার্টি (বিএসপি) এবং কংগ্রেস মিলিতভাবে তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়া রুখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করলেন নরেন্দ্র মোদি। মোদি এ তিনটি দলকে ‘সবকা’ বলে উল্লেখ করে জানান, তাঁদের এখন একটাই কাজ, ‘মোদি রোকো।’ মোদি বহিরাগত সমর্থকদের বারানসীতে এনে সভায় ভিড় বাড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিএসপি নেত্রী মায়াবতী। তিনি আরও বলেছেন, মোদিকে জেতাতে ওই বহিরাগতরাই ভোটের দিন অশান্তি সৃষ্টি করবে।
এ আসনে এসপি প্রার্থী হলেন কৈলাশ চৌরাসিয়া। তিনিও শেষ মুহূর্তে এসে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবকে এনে রোডশো করে ভোটের লড়াইয়ে হাজির হয়েছেন। নির্বাচনের শেষ দফার প্রচারের শেষের দিনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারনায় জমজমাট হয়ে উঠেছে বারানসী। বিজেপি প্রার্থী নরেন্দ্র মোদি, আম আদমি পার্টির প্রার্থী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কংগ্রেস প্রার্থী অজয় রাইরা দলের অন্য নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন সভার পাশাপাশি ‘রোড শো’ করেছেন। প্রচারে ছিলেন বহুজন সমাজপার্টি, সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস এবং নির্দল প্রার্থীরাও। 
কংগ্রেস প্রার্থী অজয় রাইয়ের জন্য এ আসনে প্লাস পয়েন্ট হলো- কোয়ামি একতা দলের প্রধান আফজল আনসারি কংগ্রেসকে বারানসীতে সমর্থন করছে। এ কোয়ামি একতা দলের প্রার্থী স্থানীয় গডফাদার মোক্তার আনসারি গত লোকসভা নির্বাচনে বারানসী থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন। সেই মোক্তার আনসারির ভাই আফজল আনসারি তাঁদের দলের অধ্যক্ষ। এবার কোয়ামি একতা দল বারানসীতে কাউকে দাঁড় করায়নি। ধর্মনিরপেক্ষ ভোট যাতে ভাগ না হয়, সে জন্যই কোয়ামি একতা দলের এ প্রয়াস। আফজল আনসারির সমর্থনের ভিতটাও বেশ পোক্ত। 
তবে মুসলিম ভোটে ভাগ বসাতে চাইছেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তিনি মুসলিম মহল্লায় গিয়ে প্রচার চালিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদিকে চ্যালেঞ্জ ঠুকেই বারানসীতে এসে দাঁড়িয়েছেন আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালও। তিনিও তুমুল প্রচার করেছেন। শহর ও গ্রাম এলাকায় গিয়ে তিনি ও তার কর্মীরা গণসংযোগ করেছেন। 
আবার মুসলিম ভোটে ভাগ বসাতে পারে মুলায়মের সমাজবাদী পার্টি। সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী কৈলাস চৌরাসিয়া। তিনি অজয় রাইয়ের মতোই বিধায়ক। অজয় রাই পিন্দ্রা আসনে এবং কৈলাস চৌরাসিয়া মির্জাপুরের বিধায়ক। তবে বারানসীর মানুষ সমাজবাদী পার্টির ওপর খানিকটা ক্ষুব্ধ। এখানে পানির কষ্ট, বিদ্যুতের কষ্ট আরও বেশি। আগে যেমন কলকাতায় লোডশেডিংয়ের রুটিন ছিল, এখন বারানসীতেও লোডশেডিংয়ের রুটিন আছে। কখন কোন এলাকায় লোডশেডিং হবে, তা আগাম রুটিন করে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। রুটিন অনুযায়ী লোডশেডিং হয়, রুটিনের বাইরেও আলো আসে-যায়। বারানসী শহরে সমাজবাদী পার্টির কোনও বিধায়ক নেই। বারানসী শহরের ৩ বিধায়কই বিজেপির।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment