ঢাকা মেডিক্যালে ফের ইন্টার্ন ডাক্তারদের কর্মবিরতি ॥ রোগীরা অসহায়
০ ইমার্জেন্সি দুপুর আড়াইটা থেকে চালু হলে অবস্থার খানিকটা উন্নতি
০ তিন ঢাবি ছাত্রের নামোল্লেখসহ শাহবাগ থানায় মামলা
০ ডাক্তারদের ওপর হামলা নিন্দনীয়, রোগীদের কষ্ট দেয়া প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না ॥ নাসিম
০ তিন ঢাবি ছাত্রের নামোল্লেখসহ শাহবাগ থানায় মামলা
০ ডাক্তারদের ওপর হামলা নিন্দনীয়, রোগীদের কষ্ট দেয়া প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না ॥ নাসিম
বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ॥ ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ১২টা বেজে ৪৩ মিনিট। মাথার উপরের খাঁ-খাঁ রোদে সুস্থ মানুষেরই প্রাণ যায় যায় অবস্থা। এমনই এক অসহ্য পরিবেশে প্রাণ বাঁচাতে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (ঢামেক) এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে ছোটাছুটি করছিলেন আহত বাকি বিল্লাহ (৩৫)। দুর্ঘটনায় হাত কেটে গিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল তাঁর। তীব্র যন্ত্রণায় প্রাণ যায় যায় অবস্থা। কিন্তু তাতে কী? সামান্য একটু চিকিৎসা মিলল না বাকি বিল্লাহর। অঝোর ধারায় রক্ত ঝরা দেখেও এতটুকুও মন গলল না মানবতার সেবায় নিয়োজিত কোন চিকিৎসকেরও। কারণ এক চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনায় রবিবার সকাল থেকে চিকিৎসকদের ৪৮ ঘণ্টা কর্মবিরতিতে প্রায় স্থবির ছিল ঢাকা মেডিক্যালের স্বাভাবিক কার্যক্রম। ঢামেকে চিকিৎসা না পেয়ে অর্ধমৃত বাকি বিল্লাহকে নিয়ে বেসরকারী ক্লিনিকে ভর্তি হতে সিএনজি নিয়ে ছুটল তাঁর পরিবার।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিক্রিয়া জানতে গেলেই ক্ষোভে-দুঃখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন আহত বাকি বিল্লাহ ও তাঁর পরিবার। তিনি বলেন, ‘কী মরার দেশে পড়ছি রে বাবা। কেউ কারও কথা শোনে না। ডাক্তারদের জন্য যদি প্রাণ যায়, তাইলে হেগো দরকার কী?‘ বলতে বলতে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল তাঁর। শুধু বাকি বিল্লাহই নন। ওনার মতো প্রায় ৫ হাজার রোগী রবিবার দেশের সর্ববৃহৎ এই সরকারী হাসপাতালে সেবা না পেয়ে একের পর এক ফিরে যেতে থাকেন বহির্বিভাগ (জরুরী) থেকে।
কারও প্রয়োজন ছিল জরুরী অপারেশনের। কিছু সন্তানসম্ভবা মায়েরা এসেছিলেন প্রচন্ড প্রসব যন্ত্রণা নিয়ে। হৃদরোগে এক বৃদ্ধের জীবন যায় যায়! দুর্ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে কারও অবস্থা ছিল গুরুতর। কিন্তু জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা কোন মুমূর্ষু রোগীই রবিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসা এতটুকু সহানুভূতি পাননি চিকিৎসকদের কাছ থেকে। তবে দুপুর আড়াইটার দিকে জরুরী বিভাগের কার্যক্রম চালু হওয়ার পর সার্বিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়।
শুধু রবিবারই নয়, প্রায়শই সামান্য অজুহাতে হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ধর্মঘট ডেকে কেড়ে নিচ্ছে মানুষের প্রাণ। প্রশাসনসহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দফায় দফায় বৈঠক করেও এর সুরাহা করতে পারছেন না। রোগীদের জিম্মি করে হাসপাতালে ধর্মঘট আহ্বানের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দেয়া হলেও সেদিকে যেন কোনই ভ্রুক্ষেপ নেই ইন্টার্ন চিকিৎসকদের। রাজশাহী, ঢাকার মিটফোর্ড, বারডেমের পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মাত্র ক’দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফা চিকিৎসকদের কর্মবিরতি, বিক্ষোভ আর সংঘাতে বৃহৎ এই হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থাই প্রায় ভেঙ্গে যেতে বসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত শনিবার রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ছয় অনারারি চিকিৎসকের ওপর দুর্বৃত্তদের হামলার ঘটনা কেন্দ্র করে। এই হামলার ঘটনায় ডা. মমিনুল ইসলাম (২৮) নামে এক অনারারি চিকিৎসক আহত হন। এই ঘটনা নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শনিবার রাত থেকেই চিকিৎসকরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে হাসপাতালে। রবিবার সকাল থেকেই ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি শুরু করলে পুনরায় ব্যাপক অরাজকতা সৃষ্টি হয় হাসপাতালটিতে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সকাল ১১টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা জরুরী বৈঠকে বসেন। দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠকেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। বরং ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেফতার করা না হলে তাঁরা ধর্মঘট চালিয়ে যাবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন। তবে দুপুরের পর ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ছাড়া আবাসিকসহ বাকি চিকিৎসকরা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেয়া শুরু করলে সার্বিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়।
চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় রবিবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার জিল্লুর রহমান বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। থানার এএসআই আমিনুল ইসলাম মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিরাজ, আশিক ও জুয়েলের নাম উল্লেখ করে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র সফররত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনাটি সত্যিই ‘দুঃখজনক ও নিন্দনীয়।’ এ ধরনের ঘটনা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার করার জন্য তিনি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি চিকিৎসকদের রোগীর সেবা থেকে বিরত না থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, একজন চিকিৎসক হিসেবে রোগীকে সেবা দেয়া প্রত্যেক চিকিৎসকের মানবিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীদের কষ্ট দেয়া প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিএমএর মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। তিনি বলেন, ধর্মঘটের কারণে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে শুধু এই বিষয়ের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে চিকিৎসকরাও যে মার খাচ্ছেন, সেদিকেও সাংবাদিকদের গুরুত্ব দেয়া উচিত। একজন চিকিৎসককে মেরে গুরুতর আহত করা হয়েছে। তিনি এখন আইসিইউতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ওই চিকিৎসকদের ওপর হামলাকারীদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার না করতে পারলে চিকিৎসকরা সে পর্যন্ত এই কর্মবিরতি চালিয়ে যাবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। তবে বাইরে থেকে আসা আহত ও মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসা চলতে থাকবে।
বিএমএ মহাসচিব আরও বলেন, এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান আমরা সবাই চাই। তবে এ জন্য সব পক্ষকেই এগিয়ে এসে আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে। আর গণমাধ্যমকর্মীদের এমন সব সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে হবে যাতে চিকিৎসা সেবার ক্ষতি না হয়। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে ধর্মঘট চলবে কিনা, এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য না করেই তিনি চলে যান। মিটিংয়ের পর সাংবাদিকদের জানানো হলেও মিটিং শেষে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান কারও সঙ্গে কথা না বলেই চলে যান।
আহত চিকিৎসক মমিনুলের সহপাঠী ফজলে বারী সাংবাদিকদের জানান, তাদের এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের মাধ্যমে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা। এ জন্য তাঁরা প্রয়োজনীয় সব কিছুই করতে রাজি আছেন। তবে গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে কর্মবিরতি শিথিল করা হবে বলেও জানান তিনি। জানতে চেয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁর মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ধর্মঘটের কারণে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। রবিবার দুপুর পর্যন্ত ঢামেকের সম্মুখ ঘুরে দেখা যায়, কল্যাণপুর থেকে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নাসিমাকে নিয়ে জরুরী ভিত্তিতে ঢামেকে এসে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করেছেন স্বামী সারোয়ার। কিন্তু দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ইন্টার্ন ডাক্তারদের মন গলাতে পারেননি। দুই ঘণ্টা পাগলের মতো ছোটাছুটি করেও ব্যর্থ হয়ে বাধ্য হয়েই স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছুটে যান তিনি।
শুধু নাসিমাই নয়, সকালে বহির্বিভাগের টিকেট কাউন্টারে তালা ঝুলিয়ে দেয়ার পর ৮-১০ অন্তঃসত্ত্বা নারীকে এমন দুর্ভোগে পড়ে ফেরত যেতে হয়েছে। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পরও ইন্টার্ন ডাক্তাররা তাদের হাসপাতালে ঢুকতে দেননি বলে অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের। আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সুমিকে (২৭) কুমিল্লা থেকে চিকিৎসার জন্য ঢামেকে নিয়ে আসা স্বামী মাইনুল ইসলামও ঢামেকের ইন্টার্নদের এ আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শনিবার রাত ৩টায় ঢামেক হাসপাতাল জরুরী বিভাগে এসে অবস্থান করছি আমরা। কোন টিকেট নেই, কোন ডাক্তার নেই। সারারাত আমার স্ত্রী ছটফট করেছে, মনে হয় গর্ভেই আমার সন্তান মারা গেছে। সকাল ৯টায় একটি টিকেট পেলেও গাইনি বিভাগে কোন চিকিৎসক পাইনি। তিনি জানান, এখন সুমিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ফরিদপুর থেকে আগত গাইনি রোগী রিয়া খাতুনও (৩৫) চিকিৎসকদের এমন আচরণে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, টিকেটও পাইনি, কোথায় যাব তাও বুঝতে পারছি না, আমি ঢাকার কিছুই চিনি না। শুধু অন্তঃসত্ত্বা নারীই নয়, অনেক গুরুতর আহত রোগীকেও ঢামেকের বহির্বিভাগের ফটক থেকে ফেরত যেতে হচ্ছে। কামরাঙ্গীরচর পূর্বরসূলপুর এক নম্বর গলির নোয়াখালীর বাড়ির ভাড়াটিয়া সাড়ে ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা শিউলী বহির্বিভাগে এসেছিলেন চিকিৎসা নিতে। কিন্তু বহির্বিভাগ টিকেট কাউন্টার বন্ধ পেয়ে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে ফিরে যান।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. বদিউজ্জামান ডাবলুসহ বিএমএ নেতারা ঢামেক ভবনে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন। স্বাস্থ্য সচিব এখনও বিষয়টির কোন সুরাহা করতে পারেননি। এ ঘটনায় ঢামেকের জরুরী বিভাগের সামনে দুই শতাধিক রোগী বিক্ষোভ করেছেন সকাল থেকে।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিক্রিয়া জানতে গেলেই ক্ষোভে-দুঃখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন আহত বাকি বিল্লাহ ও তাঁর পরিবার। তিনি বলেন, ‘কী মরার দেশে পড়ছি রে বাবা। কেউ কারও কথা শোনে না। ডাক্তারদের জন্য যদি প্রাণ যায়, তাইলে হেগো দরকার কী?‘ বলতে বলতে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল তাঁর। শুধু বাকি বিল্লাহই নন। ওনার মতো প্রায় ৫ হাজার রোগী রবিবার দেশের সর্ববৃহৎ এই সরকারী হাসপাতালে সেবা না পেয়ে একের পর এক ফিরে যেতে থাকেন বহির্বিভাগ (জরুরী) থেকে।
কারও প্রয়োজন ছিল জরুরী অপারেশনের। কিছু সন্তানসম্ভবা মায়েরা এসেছিলেন প্রচন্ড প্রসব যন্ত্রণা নিয়ে। হৃদরোগে এক বৃদ্ধের জীবন যায় যায়! দুর্ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে কারও অবস্থা ছিল গুরুতর। কিন্তু জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা কোন মুমূর্ষু রোগীই রবিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসা এতটুকু সহানুভূতি পাননি চিকিৎসকদের কাছ থেকে। তবে দুপুর আড়াইটার দিকে জরুরী বিভাগের কার্যক্রম চালু হওয়ার পর সার্বিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়।
শুধু রবিবারই নয়, প্রায়শই সামান্য অজুহাতে হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ধর্মঘট ডেকে কেড়ে নিচ্ছে মানুষের প্রাণ। প্রশাসনসহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দফায় দফায় বৈঠক করেও এর সুরাহা করতে পারছেন না। রোগীদের জিম্মি করে হাসপাতালে ধর্মঘট আহ্বানের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দেয়া হলেও সেদিকে যেন কোনই ভ্রুক্ষেপ নেই ইন্টার্ন চিকিৎসকদের। রাজশাহী, ঢাকার মিটফোর্ড, বারডেমের পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মাত্র ক’দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফা চিকিৎসকদের কর্মবিরতি, বিক্ষোভ আর সংঘাতে বৃহৎ এই হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থাই প্রায় ভেঙ্গে যেতে বসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত শনিবার রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ছয় অনারারি চিকিৎসকের ওপর দুর্বৃত্তদের হামলার ঘটনা কেন্দ্র করে। এই হামলার ঘটনায় ডা. মমিনুল ইসলাম (২৮) নামে এক অনারারি চিকিৎসক আহত হন। এই ঘটনা নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শনিবার রাত থেকেই চিকিৎসকরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে হাসপাতালে। রবিবার সকাল থেকেই ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি শুরু করলে পুনরায় ব্যাপক অরাজকতা সৃষ্টি হয় হাসপাতালটিতে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সকাল ১১টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা জরুরী বৈঠকে বসেন। দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠকেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। বরং ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেফতার করা না হলে তাঁরা ধর্মঘট চালিয়ে যাবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন। তবে দুপুরের পর ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ছাড়া আবাসিকসহ বাকি চিকিৎসকরা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেয়া শুরু করলে সার্বিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়।
চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় রবিবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার জিল্লুর রহমান বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। থানার এএসআই আমিনুল ইসলাম মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিরাজ, আশিক ও জুয়েলের নাম উল্লেখ করে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র সফররত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনাটি সত্যিই ‘দুঃখজনক ও নিন্দনীয়।’ এ ধরনের ঘটনা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার করার জন্য তিনি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি চিকিৎসকদের রোগীর সেবা থেকে বিরত না থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, একজন চিকিৎসক হিসেবে রোগীকে সেবা দেয়া প্রত্যেক চিকিৎসকের মানবিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীদের কষ্ট দেয়া প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিএমএর মহাসচিব অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। তিনি বলেন, ধর্মঘটের কারণে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে শুধু এই বিষয়ের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে চিকিৎসকরাও যে মার খাচ্ছেন, সেদিকেও সাংবাদিকদের গুরুত্ব দেয়া উচিত। একজন চিকিৎসককে মেরে গুরুতর আহত করা হয়েছে। তিনি এখন আইসিইউতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ওই চিকিৎসকদের ওপর হামলাকারীদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার না করতে পারলে চিকিৎসকরা সে পর্যন্ত এই কর্মবিরতি চালিয়ে যাবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। তবে বাইরে থেকে আসা আহত ও মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসা চলতে থাকবে।
বিএমএ মহাসচিব আরও বলেন, এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান আমরা সবাই চাই। তবে এ জন্য সব পক্ষকেই এগিয়ে এসে আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে। আর গণমাধ্যমকর্মীদের এমন সব সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে হবে যাতে চিকিৎসা সেবার ক্ষতি না হয়। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে ধর্মঘট চলবে কিনা, এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য না করেই তিনি চলে যান। মিটিংয়ের পর সাংবাদিকদের জানানো হলেও মিটিং শেষে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান কারও সঙ্গে কথা না বলেই চলে যান।
আহত চিকিৎসক মমিনুলের সহপাঠী ফজলে বারী সাংবাদিকদের জানান, তাদের এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের মাধ্যমে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা। এ জন্য তাঁরা প্রয়োজনীয় সব কিছুই করতে রাজি আছেন। তবে গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে কর্মবিরতি শিথিল করা হবে বলেও জানান তিনি। জানতে চেয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁর মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ধর্মঘটের কারণে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। রবিবার দুপুর পর্যন্ত ঢামেকের সম্মুখ ঘুরে দেখা যায়, কল্যাণপুর থেকে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নাসিমাকে নিয়ে জরুরী ভিত্তিতে ঢামেকে এসে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করেছেন স্বামী সারোয়ার। কিন্তু দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ইন্টার্ন ডাক্তারদের মন গলাতে পারেননি। দুই ঘণ্টা পাগলের মতো ছোটাছুটি করেও ব্যর্থ হয়ে বাধ্য হয়েই স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছুটে যান তিনি।
শুধু নাসিমাই নয়, সকালে বহির্বিভাগের টিকেট কাউন্টারে তালা ঝুলিয়ে দেয়ার পর ৮-১০ অন্তঃসত্ত্বা নারীকে এমন দুর্ভোগে পড়ে ফেরত যেতে হয়েছে। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পরও ইন্টার্ন ডাক্তাররা তাদের হাসপাতালে ঢুকতে দেননি বলে অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের। আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সুমিকে (২৭) কুমিল্লা থেকে চিকিৎসার জন্য ঢামেকে নিয়ে আসা স্বামী মাইনুল ইসলামও ঢামেকের ইন্টার্নদের এ আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শনিবার রাত ৩টায় ঢামেক হাসপাতাল জরুরী বিভাগে এসে অবস্থান করছি আমরা। কোন টিকেট নেই, কোন ডাক্তার নেই। সারারাত আমার স্ত্রী ছটফট করেছে, মনে হয় গর্ভেই আমার সন্তান মারা গেছে। সকাল ৯টায় একটি টিকেট পেলেও গাইনি বিভাগে কোন চিকিৎসক পাইনি। তিনি জানান, এখন সুমিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ফরিদপুর থেকে আগত গাইনি রোগী রিয়া খাতুনও (৩৫) চিকিৎসকদের এমন আচরণে বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, টিকেটও পাইনি, কোথায় যাব তাও বুঝতে পারছি না, আমি ঢাকার কিছুই চিনি না। শুধু অন্তঃসত্ত্বা নারীই নয়, অনেক গুরুতর আহত রোগীকেও ঢামেকের বহির্বিভাগের ফটক থেকে ফেরত যেতে হচ্ছে। কামরাঙ্গীরচর পূর্বরসূলপুর এক নম্বর গলির নোয়াখালীর বাড়ির ভাড়াটিয়া সাড়ে ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা শিউলী বহির্বিভাগে এসেছিলেন চিকিৎসা নিতে। কিন্তু বহির্বিভাগ টিকেট কাউন্টার বন্ধ পেয়ে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে ফিরে যান।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. বদিউজ্জামান ডাবলুসহ বিএমএ নেতারা ঢামেক ভবনে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন। স্বাস্থ্য সচিব এখনও বিষয়টির কোন সুরাহা করতে পারেননি। এ ঘটনায় ঢামেকের জরুরী বিভাগের সামনে দুই শতাধিক রোগী বিক্ষোভ করেছেন সকাল থেকে।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
No comments:
Post a Comment