ভারতে লোকসভা ভোট-চলছে ম্যাচ ফিক্সিং
গৌতম দাশ
ভারতের ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনের সপ্তম পর্বের সমাপ্তি ঘটল ৩০ এপ্রিল। আর দু’টি পর্ব বাকি। আগামী ৭ মে অষ্টম পর্ব এবং ১২ মে নবম তথা শেষ পর্বের ভোট হবে। ১৬ মে এক সঙ্গে প্রদেশে ভোট গোনা হবে এবং আশা করা যায় কোন বিপত্তি না ঘটলে সেদিন সন্ধ্যার মধ্যে ৫৪৩ আসনের লোকসভার সবক’টির গণনার ফলাফল ঘোষিত হয়ে যাবে।
এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সাত পর্বে তিন-চতুর্থাংশের বেশি আসনের ভোটে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে, বর্তমান শাসক জোট ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ এ্যালায়েন্স (্ইউপিএ)’র প্রধান শরিক কংগ্রেস দল শোচনীয়ভাবে পরাজিত হতে চলেছে, যা ভোট শুরুর আগেই স্পষ্ট হয়ে যায়। কংগ্রেস দলের নেতারা ইতোমধ্যেই কার্যত হার স্বীকার করে নিয়েছেন। অন্যদিকে, ভোটের গতি প্রকৃতি দেখে এটাও স্পষ্ট হচ্ছে, কট্টর হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যতই ‘মোদি হাওয়া’র তুফান উঠেছে বলে প্রচার করুক না কেন, এ দলের নেতারাও জোর গলায় দাবি করতে পারছেন না, বিজেপি এবং তাদের ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক এ্যালায়েন্স (এনডিএ) ২৭২টি আসন তথা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগুরিষ্ঠতা পাবে। আঞ্চলিক দলগুলো পরবর্তী সরকার গঠনে নির্ণায়ক ভূমিকা নেবে-তা-ই প্রতিভাত হচ্ছে।
বাস্তবে মোদি হাওয়া না থাকলেও কর্পোরেট হাউসগুলোর মালিকানাধীন সংবাদ মাধ্যম মোদি হাওয়া তোলার জন্য আদাজল খেয়ে নেমেছে। একদিকে কর্পোরেট হাউস নিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক চ্যানেলগুলো বিজেপি’র প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদির প্রতিটি নির্বাচনী জনসভার বক্তব্য সরাসরি সম্প্রচার করছে, অন্যদিকে, ভারতে জাতীয় ও আঞ্চলিক মিলিয়ে অন্তত পাঁচ শ’ বৈদ্যুতিক চ্যানেলে প্রতি আধঘণ্টা অন্তর ‘এবার হোক মোদি সরকার’ শিরোনামে মোদির নির্বাচনী বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। একটা উদাহরণ তুলে ধরলে বোঝা যাবে শুধু বৈদ্যুতিক চ্যানেলে মোদির প্রচারে কি পরিমাণ অর্থ খরচ করা হচ্ছে। ভারতের প্রথম পর্বের ভোট শুরুর আগে বাংলাদেশে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতা চলার সময় প্রতি ওভার বল শেষের পর মোদির ১০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। প্রতি সøটের জন্য বিজ্ঞাপনের বিল ছিল কোটি টাকা! আর এখন প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেল, সংবাদপত্রে ‘মোদি সরকার’ বানাতে ঢালাও বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদি প্রতিদিন চার্টার্ড বিমান, হেলিকপ্টারে বিস্তীর্ণ ভারতের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত চষে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনী প্রচারে। এত হাজার হাজার কোটি টাকার বিজ্ঞাপন প্রচার, মোদির চার্টার্ড বিমান, হেলিকপ্টারের ভাড়া, জনসভার জন্য লোক আনার বিশাল খরচ মেটাতে কোথা থেকে বিপুল অর্থরাশি আসছে?
ভারতের অন্যতম প্রধান ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন সেন্টার অব ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস (সিআইটিইউ)’র কেন্দ্রীয় সভাপতি পদ্মনাভান অভিযোগ করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক সংস্থা এনরন কোম্পানি থেকেই বিজেপি তাদের নির্বাচনী তহবিলে ৫ হাজার কোটি টাকা অর্থ পেয়েছে। কেন এনরন কোম্পানি এত বিরাট অঙ্কের অর্থ বিজেপি’র তহবিলে দিল? ১৯৯৭ সালে প্রথমে ১৩ দিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন বিজেপি’র নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ী। সংসদে আস্থা ভোট পাওয়া সাপেক্ষে বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। সংসদের আস্থা পাবার আগে কোন সরকারের নীতিগত এবং বড় ধরনের কোন সিদ্ধান্ত নেয়া অনৈতিক। কিন্তু বাজপেয়ীর ১৩ দিনের সরকার বামপন্থী দলগুলো এবং বিশেষজ্ঞদের প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি এনরনকে মহারাষ্ট্রের দাভোলে একটি বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়। মহারাষ্ট্র রাজ্য বিদ্যুত নিগমকে দিয়ে এনরনের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করানো হয়। চুক্তিতে শর্ত ছিল এনরন বিদ্যুতের যে রেট দেবে সে রেটে তাদের কাছ থেকে নিগমকে বিদ্যুত কিনতে হবে। মহারাষ্ট্র রাজ্য বিদ্যুত উন্নয়ন নিগম ছিল লাভজনক প্রতিষ্ঠান। বাজপেয়ী সরকারের নির্দেশে এনরনের সাথে চুক্তি করে চড়া রেটে বিদ্যুত কিনে মহারাষ্ট্র রাজ্য বিদ্যুত নিগম লাভের পরিবর্তে লোকসানে চলা কোম্পানিতে পরিণত হয়। কয়েক বছর চুটিয়ে ব্যবসা করে গণবিক্ষোভের চাপে এনরন কোম্পানি দাভোল বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্রটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। এবারে বিজেপি’র মোদি সরকার গঠন করতে পারলে মার্কিনী বহুজাতিক কোম্পানিটি নতুন করে লুণ্ঠন চালাতে সুযোগ পাবে, সে প্রত্যাশায় বিজেপি’র তহবিলে প্রচুর অর্থ দিয়েছে।
শুধু এনরন নয়, অনেক বিদেশি কোম্পানি বিজেপিকে অর্থ দিয়েছে। এছাড়া ভারতের একচেটিয়া পুঁজিপতিরা, বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিকরা বিজেপি’র তহবিলে ঢেলে অর্থ দিয়েছে। শুধু বিজেপিকে অর্থ দেয়া, সংবাদ মাধ্যমকে দিয়ে ‘মোদি ঝড়’ তুলেই একচেটিয়া পুঁজিপতিরা ক্ষান্ত নয়, ভারতের শীর্ষ পুঁজিপতি পরিবার আম্বানী পরিবারের অন্যতম অংশীদার অনিল আম্বানী প্রকাশ্যে প্রচারেও নেমেছেন। মোদি ভক্তিতে গদগদ অনিল আম্বানী বলেছেন, ‘নরেন্দ্র মোদি মানুষের ভগবান, রাজাদের রাজা’! শুধু আম্বানীরা নয়, মধ্যপ্রদেশের কুখ্যাত ডাকাত সর্দার মালখান সিং’ও মোদির প্রচারসঙ্গী। তবে মোদি প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন বিশ্বখ্যাত সানাই বাদক ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘ভারতরতœ’ প্রাপক বিসমিল্লাহ খানের পরিবারে। মোদি তার নিজের রাজ্য গুজরাটের একটি কেন্দ্র ছাড়াও উত্তরপ্রদেশের বারানসি কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছেন। মোদির পক্ষ থেকে বিসমিল্লাহ খানের ছেলেকে প্রার্থীর অন্যতম প্রস্তাবক হওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। সানাই’র জাদুকর বিসমিল্লাহ খানের ছেলে সবিনয়ে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। যদিও এমজে আকবরের মতো লোভী সাংবাদিক মোদির প্রচারসঙ্গী হয়েছেন।
বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানি, ভারতের একচেটিয়াপতি থেকে ডাকাত সর্দার- কেউ মোদিকে তার ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদ দখলের উচ্চাশা পূরণে নিশ্চিত করতে পারছে না। তাই, ভোটের প্রচারের পাশাপাশি আঞ্চলিক দলগুলোকে পাশে টানার চেষ্টা করছেন মোদিসহ বিজেপি’র অন্য নেতারা, তাদের সহযোগী কর্পোরেট হাউসগুলোর কর্তারা।
পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জীর মতো তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী তথা এডিএমকে নেত্রী জয়ললিতারও মনে বাসনা জেগেছে ভারতের প্রদানমন্ত্রী হওয়ার। অ-কংগ্রেস, অ-বিজেপি দলগুলোর ধর্মনিরপেক্ষ জোট যদি ভালসংখ্যক আসন পায় তবে সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে যে বেশি আসন পাবে সে দলের নেতা বা নেত্রীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। তাই, মমতার মতো জয়ললিতাও নিজ রাজ্য থেকে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার আশায় এবার বামপন্থীদের সাথে আসন সমঝোতায় যাননি। এখন জয়ললিতা বুঝছেন, তাঁর উচ্চাশা পূরণ হবার নয়। অতীতে জয়ললিতা বিজেপিকে সরকার গঠনে সাহায্য করেছিলেন। মুসলিম সংখ্যালঘুদের নিধনে যার হাত রক্তাক্ত সেই মোদির মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ফুলেল শুভেচ্ছাসহ এক মন্ত্রীকে পাঠিয়েছিলেন জয়ললিতা। মোদি ইতোমধ্যে তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে জয়ললিতার কাছে পাঠিয়েছেন।
অন্ধ্রপ্রদেশে চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলুগু দেশমের সাথে বিজেপি নির্বাচনী জোট করেছে। অন্ধ্রপ্রদেশে ভাগ হয়ে নবগঠিত তেলেঙ্গানা এবং সীমান্ধ্র প্রদেশের দু’টি দল তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতি (টিআরএস) এবং ওয়াই এসআর কংগ্রেস দলের সাথেও মোদির দূতরা যোগাযোগ করেছেন বলে খবর। এই দুটি দল যথাক্রমে তেলেঙ্গানা ও সীমান্ধ্রে ভাল আসন পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
শুধু ক্রিকেটে ম্যাচ ফিক্সিং হয় না, রাজনীতিতে ম্যাচ ফিক্সিং হয়। পশ্চিমবঙ্গে মোদি এবং মমতা ব্যানার্জী ম্যাচ ফিক্সিংয়ে নেমেছেন। ইতোমধ্যে যেসব রাজ্যে নির্বাচন হয়েছে, তার মধ্যে ত্রিপুরার দুটি আসন বামপন্থীদের দখলে তো থাকছেই, কেরালায়ও বামপন্থীরা ভাল আসন পাচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোকে একজোট করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকায় রয়েছে সিপিআই (এম) এবং অন্য বামপন্থীরা। তাই, পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের আসন পাওয়া ঠেকাতে মোদি ও মমতা ম্যাচ ফিক্সিং করেছেন বলে অভিযোগ। একদিকে মমতা তাঁর দলের ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনীকে দিয়ে বুথে বুথে বামপন্থী ভোটারদের মারপিট করে তাড়িয়ে বুথ দখল করাচ্ছেন, অন্যদিকে, হিন্দু ও মুসলিম ভোট যথাক্রমে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে সংহত করতে মোদি ও মমতা পরস্পরের মধ্যে তরজার লড়াই চালাচ্ছেন। ৩০ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে যে ভোট হয়েছে, তা এক কথায় প্রহসনাত্মক। মমতা সরকার কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় রেখে ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনী দিয়ে বর্ধমান, বীরভূম, হুগলি জেলায় বুথের পর বুথ দখল করেছে। নির্বাচন কমিশন ছিল নীরব দর্শক।
মমতাও বিজেপি’র পুরনো বন্ধু। বাজপেয়ী মন্ত্রিসভার রেল দফতরের মন্ত্রী ছিলেন মমতা ব্যানার্জী। ২০০২ সালে গুজরাটে মুসলিমদের বিরুদ্ধে মারাত্মক দাঙ্গার পরেও মমতা মন্ত্রিসভা ছাড়েননি। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন সাংসদ কৃষ্ণা বসু তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত বইয়ে উল্লেখ করেছেন, গুজরাট দাঙ্গার পর বিজেপি সরকারের পক্ষে সংসদে ভোট দিতে মমতা তাঁর ওপর প্রচ- চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। বিজেপি’র সাথে সমঝোতার রাস্তা খোলা রাখতে মমতা ব্যানার্জী আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছেন। ক’মাস আগেই মমতা তাঁর মন্ত্রিসভার দু’নম্বর স্থানে এবং সংগঠনেও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়ে এসেছেন অর্থ ও শিল্প দফতরের মন্ত্রী অমিত মিত্রকে। অমিত মিত্রের পরিচয় কি? ছাত্র জীবনে তিনি ছিলেন ভারতের জনসংঘ (বিজেপি’র পূর্বতন নাম)-এর ছাত্র সংগঠন বিদ্যার্থী পরিষদের সদস্য। অমিত মিত্র ভারতের শিল্প ও বণিকদের প্রধান সংগঠন ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ফিকি)’র মহাসচিব ছিলেন। ২০০২ সালে গুজরাটে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা ঘটিয়ে নরেন্দ্র মোদি যখন কোণঠাসা, তখন অমিত মিত্রের শরণাপন্ন হয়েছিলেন মোদি। অমিত মিত্র বিদেশী শিল্পপতি, ভারতের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের গুজরাটে বিনিয়োগ সভায় জড়ো করেছিলেন। মোদির মিত্র সেই অমিত মিত্র মোদির সাথে সহজেই দলের পক্ষে দর কষাকষি করতে পারবেন।
আগামী ১৬ মে’র আগে ও পরে আরও ম্যাচ ফিক্সিং হবে। তাতেই স্থির হবে ‘বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ’ বলে পরিচিত ভারতে দাঙ্গাবাজদের পা-া প্রধানমন্ত্রীর পদে বৃত হবেন, না অন্য কোন জোট থেকে প্রধানমন্ত্রী হবেন। ভারতের চলতি নির্বাচন সম্পর্কে আগেকার প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দিয়েছিলাম বামপন্থী এবং আঞ্চলিক দলগুলো ভাল সংখ্যায় আসন পেলে কংগ্রেসকে এ ধরনের জোটকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে হতে পারে। ভারতের কংগ্রেস দলের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর রাজনৈতিক সচিব আহমেদ প্যাটেল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সলমন খুরশেদ এবং গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী জয়রাম রমেশ ইতোমধ্যে বলেছেন, কংগ্রেস দল আঞ্চলিক দলগুলোর জোটকে সমর্থন দেবে। এখন অপেক্ষা ১৬মে’র ভোট গণনার জন্য।
লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক
dasgautam2019@gmail.com
এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সাত পর্বে তিন-চতুর্থাংশের বেশি আসনের ভোটে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে, বর্তমান শাসক জোট ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ এ্যালায়েন্স (্ইউপিএ)’র প্রধান শরিক কংগ্রেস দল শোচনীয়ভাবে পরাজিত হতে চলেছে, যা ভোট শুরুর আগেই স্পষ্ট হয়ে যায়। কংগ্রেস দলের নেতারা ইতোমধ্যেই কার্যত হার স্বীকার করে নিয়েছেন। অন্যদিকে, ভোটের গতি প্রকৃতি দেখে এটাও স্পষ্ট হচ্ছে, কট্টর হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যতই ‘মোদি হাওয়া’র তুফান উঠেছে বলে প্রচার করুক না কেন, এ দলের নেতারাও জোর গলায় দাবি করতে পারছেন না, বিজেপি এবং তাদের ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক এ্যালায়েন্স (এনডিএ) ২৭২টি আসন তথা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগুরিষ্ঠতা পাবে। আঞ্চলিক দলগুলো পরবর্তী সরকার গঠনে নির্ণায়ক ভূমিকা নেবে-তা-ই প্রতিভাত হচ্ছে।
বাস্তবে মোদি হাওয়া না থাকলেও কর্পোরেট হাউসগুলোর মালিকানাধীন সংবাদ মাধ্যম মোদি হাওয়া তোলার জন্য আদাজল খেয়ে নেমেছে। একদিকে কর্পোরেট হাউস নিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক চ্যানেলগুলো বিজেপি’র প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদির প্রতিটি নির্বাচনী জনসভার বক্তব্য সরাসরি সম্প্রচার করছে, অন্যদিকে, ভারতে জাতীয় ও আঞ্চলিক মিলিয়ে অন্তত পাঁচ শ’ বৈদ্যুতিক চ্যানেলে প্রতি আধঘণ্টা অন্তর ‘এবার হোক মোদি সরকার’ শিরোনামে মোদির নির্বাচনী বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। একটা উদাহরণ তুলে ধরলে বোঝা যাবে শুধু বৈদ্যুতিক চ্যানেলে মোদির প্রচারে কি পরিমাণ অর্থ খরচ করা হচ্ছে। ভারতের প্রথম পর্বের ভোট শুরুর আগে বাংলাদেশে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতা চলার সময় প্রতি ওভার বল শেষের পর মোদির ১০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। প্রতি সøটের জন্য বিজ্ঞাপনের বিল ছিল কোটি টাকা! আর এখন প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেল, সংবাদপত্রে ‘মোদি সরকার’ বানাতে ঢালাও বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদি প্রতিদিন চার্টার্ড বিমান, হেলিকপ্টারে বিস্তীর্ণ ভারতের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত চষে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনী প্রচারে। এত হাজার হাজার কোটি টাকার বিজ্ঞাপন প্রচার, মোদির চার্টার্ড বিমান, হেলিকপ্টারের ভাড়া, জনসভার জন্য লোক আনার বিশাল খরচ মেটাতে কোথা থেকে বিপুল অর্থরাশি আসছে?
ভারতের অন্যতম প্রধান ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন সেন্টার অব ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস (সিআইটিইউ)’র কেন্দ্রীয় সভাপতি পদ্মনাভান অভিযোগ করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক সংস্থা এনরন কোম্পানি থেকেই বিজেপি তাদের নির্বাচনী তহবিলে ৫ হাজার কোটি টাকা অর্থ পেয়েছে। কেন এনরন কোম্পানি এত বিরাট অঙ্কের অর্থ বিজেপি’র তহবিলে দিল? ১৯৯৭ সালে প্রথমে ১৩ দিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন বিজেপি’র নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ী। সংসদে আস্থা ভোট পাওয়া সাপেক্ষে বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। সংসদের আস্থা পাবার আগে কোন সরকারের নীতিগত এবং বড় ধরনের কোন সিদ্ধান্ত নেয়া অনৈতিক। কিন্তু বাজপেয়ীর ১৩ দিনের সরকার বামপন্থী দলগুলো এবং বিশেষজ্ঞদের প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি এনরনকে মহারাষ্ট্রের দাভোলে একটি বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়। মহারাষ্ট্র রাজ্য বিদ্যুত নিগমকে দিয়ে এনরনের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করানো হয়। চুক্তিতে শর্ত ছিল এনরন বিদ্যুতের যে রেট দেবে সে রেটে তাদের কাছ থেকে নিগমকে বিদ্যুত কিনতে হবে। মহারাষ্ট্র রাজ্য বিদ্যুত উন্নয়ন নিগম ছিল লাভজনক প্রতিষ্ঠান। বাজপেয়ী সরকারের নির্দেশে এনরনের সাথে চুক্তি করে চড়া রেটে বিদ্যুত কিনে মহারাষ্ট্র রাজ্য বিদ্যুত নিগম লাভের পরিবর্তে লোকসানে চলা কোম্পানিতে পরিণত হয়। কয়েক বছর চুটিয়ে ব্যবসা করে গণবিক্ষোভের চাপে এনরন কোম্পানি দাভোল বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্রটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। এবারে বিজেপি’র মোদি সরকার গঠন করতে পারলে মার্কিনী বহুজাতিক কোম্পানিটি নতুন করে লুণ্ঠন চালাতে সুযোগ পাবে, সে প্রত্যাশায় বিজেপি’র তহবিলে প্রচুর অর্থ দিয়েছে।
শুধু এনরন নয়, অনেক বিদেশি কোম্পানি বিজেপিকে অর্থ দিয়েছে। এছাড়া ভারতের একচেটিয়া পুঁজিপতিরা, বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিকরা বিজেপি’র তহবিলে ঢেলে অর্থ দিয়েছে। শুধু বিজেপিকে অর্থ দেয়া, সংবাদ মাধ্যমকে দিয়ে ‘মোদি ঝড়’ তুলেই একচেটিয়া পুঁজিপতিরা ক্ষান্ত নয়, ভারতের শীর্ষ পুঁজিপতি পরিবার আম্বানী পরিবারের অন্যতম অংশীদার অনিল আম্বানী প্রকাশ্যে প্রচারেও নেমেছেন। মোদি ভক্তিতে গদগদ অনিল আম্বানী বলেছেন, ‘নরেন্দ্র মোদি মানুষের ভগবান, রাজাদের রাজা’! শুধু আম্বানীরা নয়, মধ্যপ্রদেশের কুখ্যাত ডাকাত সর্দার মালখান সিং’ও মোদির প্রচারসঙ্গী। তবে মোদি প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন বিশ্বখ্যাত সানাই বাদক ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘ভারতরতœ’ প্রাপক বিসমিল্লাহ খানের পরিবারে। মোদি তার নিজের রাজ্য গুজরাটের একটি কেন্দ্র ছাড়াও উত্তরপ্রদেশের বারানসি কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছেন। মোদির পক্ষ থেকে বিসমিল্লাহ খানের ছেলেকে প্রার্থীর অন্যতম প্রস্তাবক হওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। সানাই’র জাদুকর বিসমিল্লাহ খানের ছেলে সবিনয়ে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। যদিও এমজে আকবরের মতো লোভী সাংবাদিক মোদির প্রচারসঙ্গী হয়েছেন।
বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানি, ভারতের একচেটিয়াপতি থেকে ডাকাত সর্দার- কেউ মোদিকে তার ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদ দখলের উচ্চাশা পূরণে নিশ্চিত করতে পারছে না। তাই, ভোটের প্রচারের পাশাপাশি আঞ্চলিক দলগুলোকে পাশে টানার চেষ্টা করছেন মোদিসহ বিজেপি’র অন্য নেতারা, তাদের সহযোগী কর্পোরেট হাউসগুলোর কর্তারা।
পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জীর মতো তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী তথা এডিএমকে নেত্রী জয়ললিতারও মনে বাসনা জেগেছে ভারতের প্রদানমন্ত্রী হওয়ার। অ-কংগ্রেস, অ-বিজেপি দলগুলোর ধর্মনিরপেক্ষ জোট যদি ভালসংখ্যক আসন পায় তবে সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে যে বেশি আসন পাবে সে দলের নেতা বা নেত্রীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। তাই, মমতার মতো জয়ললিতাও নিজ রাজ্য থেকে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়ার আশায় এবার বামপন্থীদের সাথে আসন সমঝোতায় যাননি। এখন জয়ললিতা বুঝছেন, তাঁর উচ্চাশা পূরণ হবার নয়। অতীতে জয়ললিতা বিজেপিকে সরকার গঠনে সাহায্য করেছিলেন। মুসলিম সংখ্যালঘুদের নিধনে যার হাত রক্তাক্ত সেই মোদির মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ফুলেল শুভেচ্ছাসহ এক মন্ত্রীকে পাঠিয়েছিলেন জয়ললিতা। মোদি ইতোমধ্যে তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে জয়ললিতার কাছে পাঠিয়েছেন।
অন্ধ্রপ্রদেশে চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলুগু দেশমের সাথে বিজেপি নির্বাচনী জোট করেছে। অন্ধ্রপ্রদেশে ভাগ হয়ে নবগঠিত তেলেঙ্গানা এবং সীমান্ধ্র প্রদেশের দু’টি দল তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতি (টিআরএস) এবং ওয়াই এসআর কংগ্রেস দলের সাথেও মোদির দূতরা যোগাযোগ করেছেন বলে খবর। এই দুটি দল যথাক্রমে তেলেঙ্গানা ও সীমান্ধ্রে ভাল আসন পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
শুধু ক্রিকেটে ম্যাচ ফিক্সিং হয় না, রাজনীতিতে ম্যাচ ফিক্সিং হয়। পশ্চিমবঙ্গে মোদি এবং মমতা ব্যানার্জী ম্যাচ ফিক্সিংয়ে নেমেছেন। ইতোমধ্যে যেসব রাজ্যে নির্বাচন হয়েছে, তার মধ্যে ত্রিপুরার দুটি আসন বামপন্থীদের দখলে তো থাকছেই, কেরালায়ও বামপন্থীরা ভাল আসন পাচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোকে একজোট করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকায় রয়েছে সিপিআই (এম) এবং অন্য বামপন্থীরা। তাই, পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের আসন পাওয়া ঠেকাতে মোদি ও মমতা ম্যাচ ফিক্সিং করেছেন বলে অভিযোগ। একদিকে মমতা তাঁর দলের ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনীকে দিয়ে বুথে বুথে বামপন্থী ভোটারদের মারপিট করে তাড়িয়ে বুথ দখল করাচ্ছেন, অন্যদিকে, হিন্দু ও মুসলিম ভোট যথাক্রমে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে সংহত করতে মোদি ও মমতা পরস্পরের মধ্যে তরজার লড়াই চালাচ্ছেন। ৩০ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে যে ভোট হয়েছে, তা এক কথায় প্রহসনাত্মক। মমতা সরকার কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় রেখে ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনী দিয়ে বর্ধমান, বীরভূম, হুগলি জেলায় বুথের পর বুথ দখল করেছে। নির্বাচন কমিশন ছিল নীরব দর্শক।
মমতাও বিজেপি’র পুরনো বন্ধু। বাজপেয়ী মন্ত্রিসভার রেল দফতরের মন্ত্রী ছিলেন মমতা ব্যানার্জী। ২০০২ সালে গুজরাটে মুসলিমদের বিরুদ্ধে মারাত্মক দাঙ্গার পরেও মমতা মন্ত্রিসভা ছাড়েননি। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন সাংসদ কৃষ্ণা বসু তাঁর সম্প্রতি প্রকাশিত বইয়ে উল্লেখ করেছেন, গুজরাট দাঙ্গার পর বিজেপি সরকারের পক্ষে সংসদে ভোট দিতে মমতা তাঁর ওপর প্রচ- চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। বিজেপি’র সাথে সমঝোতার রাস্তা খোলা রাখতে মমতা ব্যানার্জী আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছেন। ক’মাস আগেই মমতা তাঁর মন্ত্রিসভার দু’নম্বর স্থানে এবং সংগঠনেও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়ে এসেছেন অর্থ ও শিল্প দফতরের মন্ত্রী অমিত মিত্রকে। অমিত মিত্রের পরিচয় কি? ছাত্র জীবনে তিনি ছিলেন ভারতের জনসংঘ (বিজেপি’র পূর্বতন নাম)-এর ছাত্র সংগঠন বিদ্যার্থী পরিষদের সদস্য। অমিত মিত্র ভারতের শিল্প ও বণিকদের প্রধান সংগঠন ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ফিকি)’র মহাসচিব ছিলেন। ২০০২ সালে গুজরাটে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা ঘটিয়ে নরেন্দ্র মোদি যখন কোণঠাসা, তখন অমিত মিত্রের শরণাপন্ন হয়েছিলেন মোদি। অমিত মিত্র বিদেশী শিল্পপতি, ভারতের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের গুজরাটে বিনিয়োগ সভায় জড়ো করেছিলেন। মোদির মিত্র সেই অমিত মিত্র মোদির সাথে সহজেই দলের পক্ষে দর কষাকষি করতে পারবেন।
আগামী ১৬ মে’র আগে ও পরে আরও ম্যাচ ফিক্সিং হবে। তাতেই স্থির হবে ‘বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ’ বলে পরিচিত ভারতে দাঙ্গাবাজদের পা-া প্রধানমন্ত্রীর পদে বৃত হবেন, না অন্য কোন জোট থেকে প্রধানমন্ত্রী হবেন। ভারতের চলতি নির্বাচন সম্পর্কে আগেকার প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দিয়েছিলাম বামপন্থী এবং আঞ্চলিক দলগুলো ভাল সংখ্যায় আসন পেলে কংগ্রেসকে এ ধরনের জোটকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে হতে পারে। ভারতের কংগ্রেস দলের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর রাজনৈতিক সচিব আহমেদ প্যাটেল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সলমন খুরশেদ এবং গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী জয়রাম রমেশ ইতোমধ্যে বলেছেন, কংগ্রেস দল আঞ্চলিক দলগুলোর জোটকে সমর্থন দেবে। এখন অপেক্ষা ১৬মে’র ভোট গণনার জন্য।
লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক
dasgautam2019@gmail.com
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
No comments:
Post a Comment