Sunday, May 4, 2014

জিয়া ও জেনারেল মঞ্জুরের খুনি এরশাদের বিচার করা হবে

গণঅনশনে খালেদা জিয়া

আনোয়ার আলদীন
কেবল নারায়ণগঞ্জ নয়, সারাদেশ মৃত্যু উপত্যকা নূর হোসেন কোথায়? জনগণ জানতে চায় গুম খুনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামবো

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যার জন্য জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদকে সরাসরি দায়ী করে এরশাদের বিচারের অঙ্গীকার করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, এরশাদ মঞ্জুর ও জিয়াউর রহমানের খুনি। খুনি এরশাদের বিচার করতে হবে। এ অবৈধ সরকারের সঙ্গে একমাত্র খুনি এরশাদ ছাড়া আর কেউ নেই। তার বিচার হবে। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, খুনিদের পাশে নিয়ে চলা যায় না। শুধু নারায়ণগঞ্জ নয় সারাদেশ আজ মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাইরে থেকে একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করা হয়েছে। সেই বাহিনী এখন দেশব্যাপী গুম-খুন করছে। এই বাহিনী র্যাব-পুলিশের চেয়েও শক্তিশালী। তাদেরকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সরকারের নেই।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলেছেন, আমরা (আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী) যদি ঘটনাস্থলে আগে যাই তাহলে আমরাও গুম হয়ে যেতে পারি। এই হলো বর্তমান দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি।

গতকাল রবিবার বিকাল সোয়া চারটায় বিএনপির গণ-অনশন কর্মসূচিতে সংহতি জানাতে গিয়ে খালেদা জিয়া একথা বলেন। তিনি আরো বলেন, দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ নেতা-কর্মীদের নামে 'মিথ্যা' মামলা, গুম, খুন ও হামলার' প্রতিবাদে সারা দেশে এ কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় প্রেসক্লাবে সকাল নয়টা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত চলে এ কর্মসূচি। বিকালে তিনি নেতাদের অনশন ভাঙ্গানোর আগে বক্তব্য রাখেন। দলের ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার সভাপতিত্বে অনশনে সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান কাজী জাফর আহমদসহ দেশের বিভিন্ন পেশাজীবী নেতা। ১৯ দলীয় জোট নেতারা এতে সংহতি এবং একাত্মতা প্রকাশ করেন।

অনশনের শেষ পর্যায়ে লন্ডনে চিকিত্সাধীন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের এই গণ-অনশন কর্মসূচির প্রতি সংহতি জানান। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ তথ্য মাইকে ঘোষণা করে জানান- তারেক রহমান দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেছেন।

নারায়ণগঞ্জের সাতজন গুম ও খুনের ঘটনার কয়েক দিন পরে প্রধান আসামির বাড়িতে অভিযানের সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, নূর হোসেন একজন ক্রিমিনাল। সে কোথায়? জনগণ তাকে কারাগারে দেখতে চায়। সাত দিন পর কেন তার বাড়িতে অভিযান হলো? তিনি উল্লেখ করেন, একটি বিশেষ জেলার পুলিশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের দিকে আমাদের নজর আছে। আওয়ামী লীগ চিরদিন ক্ষমতায় থাকবে না। একদিন বিদায় নেবে। তারপর কোথায় যাবেন? জবাব দিতে হবে কত মানুষকে গুম-খুন করেছেন।

সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে আসতেই হবে। পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন ভুলে যান। জনসভা, মানববন্ধন, অনশনের মতো কর্মসূচিতে কাজ না হলে কঠোর ও কঠিন কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো। আমরা কঠোর কর্মসূচি দিতে চাই না। আমরা চাই কঠিন কর্মসূচির আগেই সরকার পদত্যাগ করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করুক। আমরা থেমে নেই, সময় দিচ্ছি। মনে করছি, তাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে।

সরকার বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকেও ভয় পায় অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, অনশন কর্মসূচিতেও সরকারের কতো ভয়। তারা প্রেসক্লাবের বাইরে জলকামান, রায়টকারসহ যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়েছে। চিন্তা নেই, এ কামান জনগণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে অন্যদিকে রওয়ানা হতে পারে।

'জো হুকুম হ্যায়, ও পালন করনা হ্যায়'

বর্তমান সরকার প্রতিবেশি দেশের আজ্ঞাবহ উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, এরা দাস নয়, ক্রীতদাস। দাসদের নিজেদের মতামত থাকে, কিন্তু ক্রীতদাসকে ওপর থেকে যা বলা হয় তাই পালন করতে হয়। 'জো হুকুম হ্যায়, 'জো হুকুম হ্যায়, ও পালন করনা হ্যায়'।

অনশনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, এম কে আনোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, মির্জা আব্বাস, ড. মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, আবদুল্লাহ আল নোমান, সেলিমা রহমান, শমসের মবিন চৌধুরী, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, শামসুজ্জামান দুদু, এজেডএম জাহিদ হোসেন প্রমুখ। এছাড়া আরো যারা কর্মসূচিতে একাত্মতা প্রকাশ করেন তাদের মধ্যে রয়েছেন, জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ডা. রেদওয়ান উল্লাহ সাহেদী, ইসলামী ঐক্য জোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহীম, জাতীয় পার্টির (নাজিউর) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজ উদ্দিন আহমেদ, সাদা দলের নেতা সদরুল আমীন, অধ্যাপক তাজমেরী এস এ ইসলাম, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান জাফরুল্লাহ চীেধুরী, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ প্রমুখ।

অনশনের পর অসুস্থ মির্জা ফখরুল

অনশন শেষে অসুস্থ হয়ে পড়েন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বিকালে পানি পান করিয়ে তাদের অনশন ভাঙ্গান। এর কিছুক্ষণ পর মির্জা ফখরুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি মঞ্চে জ্ঞান হারান। দলীয় নেতাকর্মীরা তাকে পানি পান করান। তার মাথায়ও পানি দেয়া হয়। প্রায় ২০ মিনিট পর তিনি কিছুটা সুস্থ হলে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন।

চট্টগ্রাম অফিস জানায়, নগরীর নাসিমন ভবনের সামনে গণঅনশন করেছে চট্টগ্রাম বিএনপি। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে পুরাতন বিমান অফিস সংলগ্ন ফুটপাতের উপর নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। মহানগরী ও উত্তর দক্ষিণ জেলার যৌথ উদ্যোগে এই কর্মসূচির আয়োজন করে। বিকাল ৪টায় অপহূত বোয়ালখালী বিএনপি সভাপতি, ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বাচার পরিবারের সদস্যরা এ অনশন কর্মসূচি ভাঙান। অনশন চলাকালে মহানগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

রাজশাহী অফিস জানায়, কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে নগরীর কোর্ট শহীদ মিনার চত্বরে অনশন কর্মসূচি পালন করেছে রাজশাহী মহানগর বিএনপি। বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব ও রাজশাহী মহানগর সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) মেয়র ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল প্রমুখ এখানে বক্তব্য রাখেন।

খুলনা অফিস জানায়, স্থানীয় জাতিসংঘ পার্কে বিএনপি সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অনশন কর্মসূচি পালন করে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে অংশগ্রহণকারিদের অনশন ভঙ্গ করান।

সিলেট অফিস জানায়, নগরীর কোর্ট পয়েন্টে সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অনশন চলে। বক্তারা বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অপহূত এম ইলিয়াস আলীকে অবিলম্বে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। বক্তব্য রাখেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. শাখাওয়াত হোসেন জীবন, সিলেট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এডভোকেট নূরুল হক প্রমুখ।

বরিশাল অফিস জানায়, নগরীর অশ্বিনী কুমার টাউন হল সংলগ্ন দলীয় কার্যালয়ের সামনে অনশন কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন জেলা (দক্ষিণ) বিএনপি সভাপতি এবায়দুল হক চাঁন। বক্তৃতা করেন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আহসান হাবিব কামাল, কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা এস. শরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু প্রমুখ।

রংপুর প্রতিনিধি জানান, শহরের পায়রা চত্বরে বিএনপি গণঅনশন কর্মসূচি পালন করে। এতে বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোজাফ্ফর হোসেন, যুগ্ম আহ্বায়ক শিরিন ভরসা প্রমুখ।

The Daily Ittefaq

No comments:

Post a Comment