Sunday, May 4, 2014

শামীম-আইভী কাদা ছোড়াছুড়ি ॥ সুযোগ নিচ্ছে খুনীরা ০ গণমাধ্যমের খবরে প্রভাবিত হতে পারে তদন্ত ০ মামলার তদন্ত ডিবিতে ন্যস্ত

শামীম-আইভী কাদা ছোড়াছুড়ি ॥ সুযোগ নিচ্ছে খুনীরা
০ গণমাধ্যমের খবরে প্রভাবিত হতে পারে তদন্ত
০ মামলার তদন্ত ডিবিতে ন্যস্ত
শংকর কুমার দে ॥ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ ও খুনের ঘটনাটি আওয়ামী লীগের সাংসদ শামীম ওসমান ও সিটি কর্পোরেশন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভীর মধ্যে একে অপরে দোষারোপ ও কাদা ছোড়াছুড়িতে প্রকৃত খুনীরা আড়ালে চলে যেতে পারে। অপহরণ ও খুন হওয়া কাউন্সিলরের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন র‌্যাবকে ৬ কোটি টাকা দিয়ে সাত খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে কাউন্সিলর নূর হোসেন। কাউন্সিলর নূর হোসেনের সন্ধানে এত দেরিতে অভিযান কেন এবং তিনি এখন কোথায়- এসব প্রশ্ন উঠেছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেছেন, তদন্তের অগ্রগতি হয়েছে। আওয়ামী লীগের এক কাউন্সিলর নূর হোসেনের হাতে অপর কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের বিষয়ে মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি প্রবাদের মতো হরতাল, প্রতিবাদ, বক্তব্য, সরকার ও সরকারদলীয় লোকজনদের দায়ী করে চলেছে বিএনপি। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, শুধু নূর হোসেন নয়, তার গডফাদারকেও খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনা হবে। নারায়ণগঞ্জে সাতজনকে অপহরণ ও খুনের মামলার তদন্তভার ন্যস্ত ডিবিতে করা হয়েছে। তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেছেন, নারায়ণগঞ্জের সাত অপহরণ ও খুনের ঘটনার তদন্তে যখন অগ্রগতি হতে চলেছে তখন স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিভাজনে একে অপরকে দায়ী করে কাদা ছোড়াছুড়ির মাধ্যমে তদন্তকে প্রভাবিত করে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ধাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত খুনীদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। রবিবার সংবাদ মাধ্যমেও তদন্তের চেয়ে আওয়ামী লীগের সাংসদ শামীম ওসমান ও সিটি মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর দিকেই দৃষ্টি ছিল বেশি। তারা কে কার বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন সেটাই প্রাধান্য পেয়েছে গণমাধ্যমে।
কাউন্সিলর নজরুলসহ সাত হত্যার প্রতিবাদে সিটি কর্পোরেশনে কর্মবিরতির মধ্যে রবিবার সিটি মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী এক সমাবেশে বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে একের পর এক হত্যাকান্ডে অতিষ্ঠ নারায়ণগঞ্জবাসী একটি পরিবারের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। গডফাদারদের কাছ থেকে মানুষ মুক্তি চায়। পরিবেশ আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী নারায়ণগঞ্জে অপহৃত হওয়ার পর আইভী সরাসরি শামীমের নাম বলেছিলেন। সাংসদ একেএম শামীম নারায়ণগঞ্জে অপহরণের ঘটনায় মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীসহ বিভিন্ন মহল থেকে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করে ‘ক্যাঙ্গারু’ পারভেজের সন্ধান চেয়েছেন তিনি। বিভিন্ন সংবাদপত্রে শামীম ওসমানকে জড়িয়ে খবর ছাপানোর প্রতিক্রিয়ায় শামীম ওসমান বলেছেন, কাউন্সিলর নজরুল দীর্ঘদিন আমার সঙ্গে রাজনীতি করেছে। লোক মরছে আমার, আবার আমার ওপরই দায় চাপানোর অপচেষ্টা করছে সিটি মেয়র আইভী। তিনি বলেন, মাকসুদ শামীমের, পারভেজ শামীমের, নজরুল ও শামীমের, সব শামীমের। তিনি প্রশ্ন করেন শামীমের লোক শামীম মারবে কেন? তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে অপরাধমূলক কর্মকা- হলেই আইভী আমাকে জড়িয়ে মিথ্যা অপপ্রচার চালায়। নারায়ণগঞ্জের সাংসদ শামীম ওসমান ও সিটি মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী গণমাধ্যমে এ ধরনের বক্তব্য-বিবৃতি অপহরণ ও খুনের ঘটনা তদন্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন।
তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা বলেছেন, কোন তদন্তাধীন ও বিচারাধীন মামলার ব্যাপারে মন্তব্য করা সমীচীন নয়। এতে জনমত সৃষ্টি হয়। তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। নারায়ণগঞ্জের এ দুই নেতানেত্রী ইতোপূর্বেও একে অপরে কাদা ছোড়াছুড়ি করেছেন তারই ধারাবাহিকতায় নারায়ণগঞ্জের সাত অপহরণ ও খুনের ঘটনার মধ্যে ছায়া পড়া শুরু করেছে। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মুহিদ উদ্দিন রবিবার গণমাধ্যমে বলেছেন, ৭ অপহরণ ও খুনের মামলা তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। সাত হত্যা বিষয়টি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত প্রধান আসামির বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি গাড়ি ও কিছু আলামত জব্দ করা হয়েছে।
একটি রাস্তা সমাচার
একটি রাস্তা নিয়ে বিরোধের জের ধরেই নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণের পর হত্যাকান্ডের ঘটনাকে ত্বরান্বিত করেছে। এ হত্যার পরিকল্পনাকারী আরেক সিটি কাউন্সিলর নূর হোসেন। র‌্যাব পরিচয় দিয়েই সাতজনকে তুলে নেয় হত্যাকারী চক্র। হত্যাকারীদের টার্গেট ছিল নজরুল ইসলাম একাই। তবে ঘটনার সাক্ষী হওয়ার কারণে বাকিদেরও একই পরিণতি হয়েছে। অবশ্য হত্যার আগে জীবন নিয়ে শঙ্কার কারণে পালিয়ে বেরিয়েছেন নজরুল। দখল, দলীয় পদ এবং সর্বশেষ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নির্বাচিত হওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। তবে একটি রাস্তার কাজ নিয়েই বিরোধের সূত্র ধরে হত্যাকান্ডের ঘটনা ত্বরান্বিত হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মৌচাক এলাকা থেকে সিদ্ধিরগঞ্জের চৌধুরীপাড়া বাজার হয়ে মিজমিজি পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সড়ক উন্নয়নের কাজ নিয়ে সম্প্রতি নজরুলের সঙ্গে নূর হোসেনের বড় ধরনের বিরোধ দেখা দেয়।
আসামি ধরা পড়েনি
প্রশ্ন উঠেছে প্রধান আসামি কাউন্সিলর নূর হোসেন কোথায়? এতদিন পর অভিযান পরিচালনা কেন? যথাসময়ে অভিযান চালানো হলে যেমন অপহৃত সাতজনই বেঁচে যেতেন তেমনি অপহরণকারীরাও ধরা পড়ে যেত। ঘটনার এক সপ্তাহ পার হলেও কোন আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে। মামলার এজাহারে নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ছয়জনের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁরা হলেন নূর হোসেন, হাজী ইয়াছিন মিয়া, হাসমত আলী হাসু, আমিনুল ইসলাম রাজু, আনোয়ার হোসেন ও ইকবাল হোসেন। নিহত নজরুল ইসলামের স্বজন, প্রতিবেশী ও সহকর্মীদের দাবি নূর হোসেন র‌্যাব বা অন্য কোন সশস্ত্রপক্ষের সহায়তা নিয়ে নজরুলসহ সাতজনকে হত্যা করেছে তারা। নূর হোসেন নিয়মিতভাবে প্রশাসনসহ বিভিন্ন পক্ষে মাসোয়ারা দিত।

শ্বাসরোধেই হত্যা
অপহরণের হত্যা করা সাতজনের লাশেরই ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালে। ময়নাতদন্তকারী একজন ডাক্তার বলেছেন, প্রাথমিকভাবে যা দেখা গেছে তাতে সাতজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যার আলামত পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নজরুলসহ ছয়জনের মাথায় সামান্য আঘাতের চিহ্ন আছে। হত্যার পর তাদের পেট চিরে পানিতে ফেলা হয়েছে। লাশ উদ্ধারের ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা আগে তাদের হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে রবিবার পর্যন্ত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তৈরি হয়নি বলে জানা গেছে।
নজরুলের শ্বশুরের অভিযোগ
কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদ চেয়ারম্যান বলেছেন, কাউন্সিলর নূর হোসেন, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন মিয়াসহ এজাহারভুক্ত আসামিদের কাছ থেকে ৬ কোটি টাকা নিয়ে র‌্যাব আমার জামাতা নজরুলসহ ৭ জনকে খুন করেছে। ২৭ মে দুপুরে যখন নজরুলসহ ৭ জনকে দুটি গাড়িতে অপহরণ করা হয়, সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বালু শ্রমিকরা আমাদের জানিয়েছে, সে সময় র‌্যাব-১১ লেখা একটি গাড়ি ছিল। সঙ্গে সঙ্গে আমরা বিষয়টি নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের এমপি শামীম ওসমানকে জানাই। শামীম ওসমান আমাকে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীতে র‌্যাব-১১ সিইও দেখা করতে বলেন। সিইও আমাকে ৬ ঘণ্টা আটকে রেখে নানা রকম জিজ্ঞাসাবাদ করেন। র‌্যাবই আমার জামাতা নজরুলসহ ৭ জনকে খুন করেছে। আমি অপহরণের ঘটনার পর পরই র‌্যাব-১১ সিইওসহ জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে যাই। কিন্তু এসপি, ফতুল্লা মডেল থানার ওসি তাদের বিরুদ্ধে মামলা নেননি। তাঁরা আমাকে বলেন, সরকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না। আমি জড়িত র‌্যাব সদস্যদের শনাক্ত করে শাস্তি দাবি করছি। এ ঘটনার পর থেকে নিজেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। রবিবার বিকেলে শহরের চাষাঢ়া রাইফেল ক্লাবে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানের সামনে এ কথা বলেন, খুন হওয়া কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদ চেয়ারম্যান।
উল্লেখ্য, গত ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোড থেকে দিনে দুপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে নাসিকের ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, এ্যাডভোকেট চন্দন সরকারসহ অপহৃত হন গাড়িচালক জাহাঙ্গীর, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর সংগঠনের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কমিটির সহসভাপতি তাজুল ইসলাম, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগ কর্মী মনিরুজ্জামান স্বপন, লিটন ও তার গাড়িচালকসহ সাতজনকে দুর্বৃত্তরা অপহরণ করে নিয়ে খুন করার পর নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে সাতজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment