র্যাবের বিলুপ্তি চেয়ে খালেদা মুখরোচক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন
র্যাবকে নিজ হাতে স্বাধীনতা পদক দিয়েছিলেন
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ মাত্র ১০ বছরের ব্যবধান। ২০০৪ সালে স্বাধীনতা দিবসে ঢাকঢোল পিটিয়ে এলিটফোর্স র্যাব জন্ম দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। আর র্যাব গঠনের পরই বিচারবহির্ভূত হত্যায় ‘ক্রসফায়ার’ নামক মানবতাবিরোধী শব্দের আবিষ্কারও হয়েছিল তাঁরই আমলে। নিজে প্রধানমন্ত্রীর আসনে থাকা অবস্থায় মাত্র দুই বছরেই র্যাবের হাতে তিন শতাধিক মানুষকে কথিত ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে জীবন দিতে হয়েছে। শুধু দেশেই নয়, সারাবিশ্বেই মানবাধিকার সংগঠনগুলো যখন র্যাবের এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় তুলেছিল- ঠিক তখন এই খালেদা জিয়াই নিজ হাতে ‘জনসেবা’র জন্য র্যাবের হাতে তুলে দিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পদক’!
হঠাৎ করেই র্যাবের জন্মদাতা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াই এই পুরোবাহিনী বিলুপ্তির দাবি করেছেন। বিএনপি নেত্রীর ‘র্যাব বিলুপ্তি’র এই দাবি নিয়ে সারাদেশেই নানা মুখরোচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যিনি জন্মদাতা, তিনিই আজ কেন তার মৃত্যু চাচ্ছেন? এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে। র্যাবের কিছু সদস্যের নৈতিক স্খলনের জন্য পুরো বাহিনীকে বিলুপ্তির খালেদা জিয়ার দাবিকে ‘সাম্প্রতিক সময়ের সেরা প্রহসন এবং রাজনৈতিক দুরভিসন্ধিমূলক’ বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে।
রাজনৈতিক দলের নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, শুধু র্যাব নয়- পুলিশ, বিজিবি এমনকি সশস্ত্রবাহিনীর কিছু সদস্যও নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হতে পারে। তবে কি খালেদা জিয়া পুলিশ, বিজিবি এবং সশস্ত্রবাহিনীকেও বিলুপ্তির কথা বলবেন? কতিপয় ব্যক্তির দুষ্কর্মের জন্য পুরো বাহিনীর বিলুপ্তির দাবি হাস্যকরও বটে। আসলে জঙ্গীদের রক্ষায় র্যাবের বিলুপ্তি চান খালেদা জিয়া। তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক দুরভিসন্ধিমূলক ছাড়া আর কিছুই নয়।
এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জাসদ সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জনকণ্ঠকে বলেন, র্যাবের জন্মদাতা হলেন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। তিনিই ক্ষমতায় থাকতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে জঙ্গীবাদের জন্ম দিয়েছিলেন। আর তাঁর সৃষ্ট জঙ্গীবাদের ভয়াল তা-বের কারণেই র্যাব সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। শায়খ আবদুর রহমান, বাংলা ভাইসহ দুর্ধর্ষ সব জঙ্গীদের দমন করতে সাফল্য দেখিয়েছিল র্যাব। মাত্র কিছু দিন আগেও জঙ্গীগোষ্ঠী ও তাদের দোসর জামায়াত-শিবিরের ভয়াল তাণ্ডব-সহিংসতা কঠোর হস্তে দমন করে জনগণের জানমাল রক্ষা করেছে এই বাহিনী। এতদিন পর কিছু সদস্যের দুষ্কর্মের অজুহাতে পুরো র্যাবকে বিলুপ্তি করার খালেদা জিয়ার দাবি প্রহসন ও রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়।
তথ্যমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, শুধু র্যাব নয়, পুলিশ ও বিজিবির অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে নানা দুষ্কর্মের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সশস্ত্রবাহিনীরও কতিপয় সদস্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছিল। হত্যার শিকার হতে হয়েছিল বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার স্বামী জিয়াকেও। কতিপয় ব্যক্তির দুষ্কর্মের জন্য খালেদা জিয়া কি পুলিশ, বিজিবি ও সশস্ত্রবাহিনীকেও বিলুপ্তির দাবি করবেন? কোন বাহিনীর সদস্যরাই আইনের উর্ধে নয়। অপরাধ করলে সবার শাস্তি হবে এবং হচ্ছে। তাই বলে পুরো বাহিনীকে বিলুপ্ত করার প্রস্তাব দুরভিসন্ধিমূলক। র্যাব বিলুপ্ত হলে দেশে আবারও জঙ্গীবাদের সৃষ্টি হবে, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি আবারও ভয়াল তা-ব ও নৃশংসতা চালিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারবে। তথ্যমন্ত্রী বলেন, এ সব কারণ আর জঙ্গীবাদকে সামনে আনতেই খালেদা জিয়া র্যাব বিলুপ্তির দাবি করেছেন।
অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ র্যাব প্রতিষ্ঠার মাত্র সাড়ে ছয় মাসের মাথায় ১১ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া র্যাবের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের তিন বছরপূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে খালেদা জিয়া বলেন, ‘দলনিরপেক্ষভাবে সাহসী অভিযান পরিচালনা করছে র্যাব। জনগণ র্যাবের কারণে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। সন্ত্রাসের হার অনেক কমে গেছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা অনেকে অন্যদেশে পালিয়ে গেছে।’
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের এই এলিটফোর্স গঠনের পরিকল্পনা যে শুভ ছিল না, তা মাত্র ছয় মাসের মধ্যে জাতির সামনে স্পষ্ট হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে র্যাবকে ব্যবহার শুরু করে তৎকালীন জোট সরকার। শুরু হয় ক্রসফায়ারের গল্প, র্যাবের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের শিকার হতে থাকে সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি তৎকালীন বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। মাত্র এক বছরেই শতাধিক মানুষকে জীবন দিতে হয় র্যাবের হাতে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠে র্যাবের বিরুদ্ধে। ওই সময় শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের সব প্রান্তেই মানবাধিকার লঙ্ঘনবিষয়ক যত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, প্রত্যেক রিপোর্টের শীর্ষে উঠে আসে র্যাবের নাম।
প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সফরে গেলে সেখানেও র্যাবকে দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের প্রশ্নবাণে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছিল তাঁকে। ওই সময় তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ সকল প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্য অভিযোগ আনেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হাওয়া ভবন থেকে ক্রসফায়ারে হত্যার জন্য তালিকা তৈরি করে র্যাবের হাতে দেয়া হয়েছে। এমন নানা প্রশ্নের মুখেই র্যাবের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া র্যাবকে স্বাধীনতার পদকে ভূষিত করেন এবং পরের বছর দেন বিশেষ সম্মাননা পদক।
শুধু খালেদা জিয়াই নন, তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরাও র্যাবের প্রশংসায় ছিলেন পঞ্চমুখ। র্যাবকে ভেঙ্গে না দেয়া পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিমিশনে বাংলাদেশের সৈন্য না নিতে হংকংভিত্তিক দুটি মানবাধিকার সংগঠন জাতিসংঘের কাছে সুপারিশ করে। এ ব্যাপারে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচিত লুৎফুজ্জামান বাবর বলেন, ‘দিস ইজ আওয়ার কান্ট্রি...’ বিদেশী কারও কথায় কোন বাহিনী প্রত্যাহার করব না। বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য যা করার তাই করব। ক্রসফায়ার কন্টিনিউয়াস প্রসেস। এটা আইন অনুযায়ীই হচ্ছে। আর র্যাব মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং তা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছে।’
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় মদদে র্যাবকে দিয়ে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হত্যার অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের ২৩ জুন তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রী প্রয়াত আকবর হোসেন স্পষ্টভাষায় বলেন, মানুষের মানবাধিকার থাকে, দানবের কোন মানবাধিকারের প্রয়োজন নেই। আওয়ামী লীগসহ বিদেশীরা চিৎকার করলেও কোন লাভ হবে না। আগামীতে নির্বাচন হবে র্যাব বনাম আওয়ামী লীগের মধ্যে। মানুষ র্যাবের পক্ষেই রায় দেবে। র্যাব গঠনের সাত মাস পর ক্রসফায়ারকে জায়েজ করে তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ ২০০৪ সালের ১ ডিসেম্বর সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন, র্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ারে মৃতদের সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোন সম্পর্ক নেই। প্রাণরক্ষার জন্য র্যাবের প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ক্রসফায়ারের সঙ্গে মানবাধিকারের কোন সম্পর্ক নেই। আত্মরক্ষার অধিকার র্যাবেরও রয়েছে।
এমন নানা বিশেষণে র্যাবের ভূমিকায় পঞ্চমুখ ছিলেন খালেদা জিয়াসহ তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা। আজ তিনিই (খালেদা জিয়া) র্যাব বিলুপ্তির দাবি করছেন। হঠাৎ করেই কেন এমন ‘ইউটার্ন’ তা নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। শুধু নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার কারণেই এ দাবি- এটা মানতে নারাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জের মতো শত শত ঘটনা ঘটেছে। তখন তারা বিচারের বদলে উল্টো ইনডেমনিটি দিয়েছে। শুধু রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি থেকেই এমন দাবি আসতে পারে।
অনেকের মতে, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনপূর্ব বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের দেশজুড়ে সৃষ্ট নাশকতা, ভয়াল তা-ব আর নৃশংস সন্ত্রাস দমনে র্যাব প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে। জঙ্গীগোষ্ঠীর ব্যাপক নাশকতার পরিকল্পনা সাহসের সঙ্গে ভেস্তে দিতে সক্ষম হয়েছে এই এলিট ফোর্সটি। আগামীতেও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিবর্তে সন্ত্রাসনির্ভর আন্দোলন হলে এই র্যাবই তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর এ কারণেই তারা র্যাব বিলুপ্তির দাবি তুলেছে।
র্যাবকে বিলুপ্ত করতে খালেদা জিয়ার দাবির পেছনে ‘দুরভিসন্ধি’ রয়েছে বলেই মনে করছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। দলের পক্ষে প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশে যাতে জঙ্গীবাদ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে সে জন্য তিনি (খালেদা জিয়া) র্যাব বিলুপ্তির কথা বলছেন। কারণ তাঁরা জঙ্গীবাদ লালন করেন। নৈতিক স্খলনের জন্য পুরো বাহিনীকে যাঁরা বিলুপ্তির পরামর্শ দেন, তাঁদের মানসিক সুস্থতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা যায়। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধেও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আছে। তাই বলে কি বেগম জিয়া পুলিশও বিলুপ্তির কথা বলবেন?
হঠাৎ করেই র্যাবের জন্মদাতা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াই এই পুরোবাহিনী বিলুপ্তির দাবি করেছেন। বিএনপি নেত্রীর ‘র্যাব বিলুপ্তি’র এই দাবি নিয়ে সারাদেশেই নানা মুখরোচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যিনি জন্মদাতা, তিনিই আজ কেন তার মৃত্যু চাচ্ছেন? এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে। র্যাবের কিছু সদস্যের নৈতিক স্খলনের জন্য পুরো বাহিনীকে বিলুপ্তির খালেদা জিয়ার দাবিকে ‘সাম্প্রতিক সময়ের সেরা প্রহসন এবং রাজনৈতিক দুরভিসন্ধিমূলক’ বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে।
রাজনৈতিক দলের নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, শুধু র্যাব নয়- পুলিশ, বিজিবি এমনকি সশস্ত্রবাহিনীর কিছু সদস্যও নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হতে পারে। তবে কি খালেদা জিয়া পুলিশ, বিজিবি এবং সশস্ত্রবাহিনীকেও বিলুপ্তির কথা বলবেন? কতিপয় ব্যক্তির দুষ্কর্মের জন্য পুরো বাহিনীর বিলুপ্তির দাবি হাস্যকরও বটে। আসলে জঙ্গীদের রক্ষায় র্যাবের বিলুপ্তি চান খালেদা জিয়া। তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক দুরভিসন্ধিমূলক ছাড়া আর কিছুই নয়।
এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জাসদ সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জনকণ্ঠকে বলেন, র্যাবের জন্মদাতা হলেন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। তিনিই ক্ষমতায় থাকতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে জঙ্গীবাদের জন্ম দিয়েছিলেন। আর তাঁর সৃষ্ট জঙ্গীবাদের ভয়াল তা-বের কারণেই র্যাব সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। শায়খ আবদুর রহমান, বাংলা ভাইসহ দুর্ধর্ষ সব জঙ্গীদের দমন করতে সাফল্য দেখিয়েছিল র্যাব। মাত্র কিছু দিন আগেও জঙ্গীগোষ্ঠী ও তাদের দোসর জামায়াত-শিবিরের ভয়াল তাণ্ডব-সহিংসতা কঠোর হস্তে দমন করে জনগণের জানমাল রক্ষা করেছে এই বাহিনী। এতদিন পর কিছু সদস্যের দুষ্কর্মের অজুহাতে পুরো র্যাবকে বিলুপ্তি করার খালেদা জিয়ার দাবি প্রহসন ও রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়।
তথ্যমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, শুধু র্যাব নয়, পুলিশ ও বিজিবির অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে নানা দুষ্কর্মের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সশস্ত্রবাহিনীরও কতিপয় সদস্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছিল। হত্যার শিকার হতে হয়েছিল বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার স্বামী জিয়াকেও। কতিপয় ব্যক্তির দুষ্কর্মের জন্য খালেদা জিয়া কি পুলিশ, বিজিবি ও সশস্ত্রবাহিনীকেও বিলুপ্তির দাবি করবেন? কোন বাহিনীর সদস্যরাই আইনের উর্ধে নয়। অপরাধ করলে সবার শাস্তি হবে এবং হচ্ছে। তাই বলে পুরো বাহিনীকে বিলুপ্ত করার প্রস্তাব দুরভিসন্ধিমূলক। র্যাব বিলুপ্ত হলে দেশে আবারও জঙ্গীবাদের সৃষ্টি হবে, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি আবারও ভয়াল তা-ব ও নৃশংসতা চালিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পারবে। তথ্যমন্ত্রী বলেন, এ সব কারণ আর জঙ্গীবাদকে সামনে আনতেই খালেদা জিয়া র্যাব বিলুপ্তির দাবি করেছেন।
অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ র্যাব প্রতিষ্ঠার মাত্র সাড়ে ছয় মাসের মাথায় ১১ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া র্যাবের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের তিন বছরপূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে খালেদা জিয়া বলেন, ‘দলনিরপেক্ষভাবে সাহসী অভিযান পরিচালনা করছে র্যাব। জনগণ র্যাবের কারণে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। সন্ত্রাসের হার অনেক কমে গেছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা অনেকে অন্যদেশে পালিয়ে গেছে।’
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের এই এলিটফোর্স গঠনের পরিকল্পনা যে শুভ ছিল না, তা মাত্র ছয় মাসের মধ্যে জাতির সামনে স্পষ্ট হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে র্যাবকে ব্যবহার শুরু করে তৎকালীন জোট সরকার। শুরু হয় ক্রসফায়ারের গল্প, র্যাবের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের শিকার হতে থাকে সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি তৎকালীন বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। মাত্র এক বছরেই শতাধিক মানুষকে জীবন দিতে হয় র্যাবের হাতে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠে র্যাবের বিরুদ্ধে। ওই সময় শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের সব প্রান্তেই মানবাধিকার লঙ্ঘনবিষয়ক যত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, প্রত্যেক রিপোর্টের শীর্ষে উঠে আসে র্যাবের নাম।
প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সফরে গেলে সেখানেও র্যাবকে দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের প্রশ্নবাণে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছিল তাঁকে। ওই সময় তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ সকল প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্য অভিযোগ আনেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হাওয়া ভবন থেকে ক্রসফায়ারে হত্যার জন্য তালিকা তৈরি করে র্যাবের হাতে দেয়া হয়েছে। এমন নানা প্রশ্নের মুখেই র্যাবের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া র্যাবকে স্বাধীনতার পদকে ভূষিত করেন এবং পরের বছর দেন বিশেষ সম্মাননা পদক।
শুধু খালেদা জিয়াই নন, তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরাও র্যাবের প্রশংসায় ছিলেন পঞ্চমুখ। র্যাবকে ভেঙ্গে না দেয়া পর্যন্ত জাতিসংঘ শান্তিমিশনে বাংলাদেশের সৈন্য না নিতে হংকংভিত্তিক দুটি মানবাধিকার সংগঠন জাতিসংঘের কাছে সুপারিশ করে। এ ব্যাপারে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচিত লুৎফুজ্জামান বাবর বলেন, ‘দিস ইজ আওয়ার কান্ট্রি...’ বিদেশী কারও কথায় কোন বাহিনী প্রত্যাহার করব না। বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য যা করার তাই করব। ক্রসফায়ার কন্টিনিউয়াস প্রসেস। এটা আইন অনুযায়ীই হচ্ছে। আর র্যাব মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং তা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছে।’
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় মদদে র্যাবকে দিয়ে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের হত্যার অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের ২৩ জুন তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রী প্রয়াত আকবর হোসেন স্পষ্টভাষায় বলেন, মানুষের মানবাধিকার থাকে, দানবের কোন মানবাধিকারের প্রয়োজন নেই। আওয়ামী লীগসহ বিদেশীরা চিৎকার করলেও কোন লাভ হবে না। আগামীতে নির্বাচন হবে র্যাব বনাম আওয়ামী লীগের মধ্যে। মানুষ র্যাবের পক্ষেই রায় দেবে। র্যাব গঠনের সাত মাস পর ক্রসফায়ারকে জায়েজ করে তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ ২০০৪ সালের ১ ডিসেম্বর সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন, র্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ারে মৃতদের সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোন সম্পর্ক নেই। প্রাণরক্ষার জন্য র্যাবের প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ক্রসফায়ারের সঙ্গে মানবাধিকারের কোন সম্পর্ক নেই। আত্মরক্ষার অধিকার র্যাবেরও রয়েছে।
এমন নানা বিশেষণে র্যাবের ভূমিকায় পঞ্চমুখ ছিলেন খালেদা জিয়াসহ তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা। আজ তিনিই (খালেদা জিয়া) র্যাব বিলুপ্তির দাবি করছেন। হঠাৎ করেই কেন এমন ‘ইউটার্ন’ তা নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। শুধু নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার কারণেই এ দাবি- এটা মানতে নারাজ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জের মতো শত শত ঘটনা ঘটেছে। তখন তারা বিচারের বদলে উল্টো ইনডেমনিটি দিয়েছে। শুধু রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি থেকেই এমন দাবি আসতে পারে।
অনেকের মতে, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনপূর্ব বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের দেশজুড়ে সৃষ্ট নাশকতা, ভয়াল তা-ব আর নৃশংস সন্ত্রাস দমনে র্যাব প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছে। জঙ্গীগোষ্ঠীর ব্যাপক নাশকতার পরিকল্পনা সাহসের সঙ্গে ভেস্তে দিতে সক্ষম হয়েছে এই এলিট ফোর্সটি। আগামীতেও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিবর্তে সন্ত্রাসনির্ভর আন্দোলন হলে এই র্যাবই তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর এ কারণেই তারা র্যাব বিলুপ্তির দাবি তুলেছে।
র্যাবকে বিলুপ্ত করতে খালেদা জিয়ার দাবির পেছনে ‘দুরভিসন্ধি’ রয়েছে বলেই মনে করছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। দলের পক্ষে প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশে যাতে জঙ্গীবাদ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে সে জন্য তিনি (খালেদা জিয়া) র্যাব বিলুপ্তির কথা বলছেন। কারণ তাঁরা জঙ্গীবাদ লালন করেন। নৈতিক স্খলনের জন্য পুরো বাহিনীকে যাঁরা বিলুপ্তির পরামর্শ দেন, তাঁদের মানসিক সুস্থতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা যায়। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধেও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আছে। তাই বলে কি বেগম জিয়া পুলিশও বিলুপ্তির কথা বলবেন?
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
No comments:
Post a Comment