Saturday, May 10, 2014

মোদি কার মুশকিল, কার মুশকিল আসান?

মোদি কার মুশকিল, কার মুশকিল আসান?
Aajkaal: the leading bengali daily newspaper from Kolkata
গৌতম রায়
সি পি এম রাজ্য দপ্তরে ওপরতলার নির্বাচনী তথ্য ও অনুসন্ধানঘরে হয়ে-যাওয়া নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে ভাল-খারাপ খবরের মধ্যে ভাল খবরই বেশি৷‌ রায়গঞ্জ কেন্দ্রে মহম্মদ সেলিমের জয় প্রায় নিশ্চিত৷‌ মোদি-ভোট এখানে বাড়তে পারেনি৷‌ হাওয়ার গুণেই হাওড়া থেকেও ভাল খবর৷‌ হাওড়ায় বি জে পি-র ভোটব্যাঙ্ক আছে৷‌ সি পি এমের আশা , বামভোট তথাকথিত মোদি-ঝড়ে উড়ে যাবে না৷‌ আবার এই বাজারেও, ২০১১ সালের পর থেকে ভোটের বাজারে ফাঁড়া-হয়ে-ওঠা তিন কেন্দ্র– বর্ধমান পূর্ব, বীরভূম, লাভপুরে প্রায় দেড় হাজারের মতো বুথে পুনর্নির্বাচন চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরেও ভাল খবর আসার বিরাম নেই৷‌ নব্যতৃণমূলি জাগরণে অস্হির জনতার সেই রোষে নমোর পায়ে নমো ঠোকায় আশঙ্কার বদলে আশাই দেখছে সি পি এম৷‌ ভাবাচ্ছে এক বিরাট অংশের ভোটারের তীব্র তৃণমূল-বিরোধিতার সমাধান– মমতাকে হটাতে মোদিকে ভোট৷‌ কিন্তু যেখানে কংগ্রেস বা সি পি এম তৃণমূলকে হারাতে সক্ষম, সেখানে এমন দাওয়াই যে প্রযুক্ত হবে না, তা-ও সি পি এমের বিশ্লেষকেরা ভেবে রেখেছেন৷‌ তাই দলের ইঞ্জিনিয়ার-সংগঠক শ্রীদীপ ভট্টচার্য, দুই ডাক্তারবাবু রামচন্দ্র ডোম ও কামরে ইলাহির পাল্লা যে ভারী হয়ে উঠবে তা নিয়ে সন্দেহ নেই৷‌ এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই অসম্ভব সব ভাল খবর আসছে মুর্শিদাবাদ, মালদহের কংগ্রেস বেল্ট থেকেও৷‌ অর্থাৎ, একদা বর্তমান রাষ্ট্রপতি এবং বর্তমানে তাঁর পুত্র অভিজিৎ মুখার্জির গত নির্বাচনে অল্প ভোটে জেতা কেন্দ্র জঙ্গিপুর থেকেও৷‌ মুর্শিদাবাদে হিন্দু-অধ্যুষিত বহরমপুরে সি পি এমের ভোট বেশ কিছুটা কমলেও মুর্শিদাবাদ, জঙ্গিপুর কেন্দ্রে তেমন কমেনি৷‌ এখানে তৃণমূলের বিশেষ কোনও হাওয়াও নেই৷‌ তবে মুসলিম-অধ্যুষিত, তাই মোদি-হাওয়া৷‌ ভদ্র কংগ্রেসি মান্নান হোসেনের নরম দাপট বজায় এখানে৷‌ তাই মাঝ থেকে ভাল খবর জুটলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই৷‌ তেমনি মালদা দক্ষিণে আশা জাগিয়ে তুলেছেন প্রয়াত বরকত গনির ভাই আবু হাসেম খানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ’৬৯-এর খাদ্য আন্দোলনের সময় থেকে দলের সেনানী সি পি এম প্রার্থী আবুল হাসনাত খান৷‌ এখানেও কংগ্রেসের হিন্দুভোটে মোদির টান৷‌ তবে মোদি শেষ পর্যম্ত ‘মুশকিল আসান পির’ হতে পারছেন কি না তা এঁরা আরও ভাল করে আরও তথ্যের ওপর নির্ভর করতে চান৷‌ এই হিন্দুভোট এ রাজ্যে এক অশ্রুতপূর্ব শব্দ৷‌ বামপম্হীরা বুঝছেন, এ মোদি-ভোট সাম্প্রদায়িক নয়৷‌ শাসক তৃণমূলের প্রতি হতাশা থেকেই৷‌ বেশ কিছু কেন্দ্র যেমন বনেদি শহরাঞ্চল– উত্তর কলকাতা, হুগলি, শহর হাওড়া, শ্রীরামপুর, একদা লালে লাল উদ্বাস্তু বেল্ট দমদম, বনগাঁ, কৃষ্ণনগর, কয়লা শ্রমিক আন্দোলনের আঁতুড়ঘর আসানসোল থেকে বরাকর নদীর পাশ ঘেঁষে ধানবাদ পর্যম্ত ঝড় নয়, বাতাস নয়, এক অস্বস্তিকর হাওয়ার নাম ‘মোদি-হাওয়া’৷‌ এখানে এখনও পাট্টা না-পাওয়া উদ্বাস্তু কলোনি থেকে অস্বাস্হ্যকর শ্রমিক ঘেটোয় ‘হাওয়া লেগে’ অসুস্হতা, এমনকি মৃত্যুর আশঙ্কার কাহিনীও মুখে-মুখে৷‌ শ্রমিক তো কোন ছার, সাহেবরাই ম্যালেরিয়াকে চিনতে না পেরে বলেছিল ‘ম্যাল এয়ার’ মানে মন্দ হাওয়া৷‌ পঞ্চায়েত ও পুরসভার ভোটের ফল দেখলে এবং পরবর্তী সাংগঠনিক বেহাল অবস্হার কারণে বাঁকুড়ায় জয়ের কথা সি পি এমের কেউ ভাবেননি৷‌ কিন্তু এখন তো তাই ভাবছেন৷‌ এখানে বাঁকুড়ার বাংলাভুক্তির আগে থেকেই ব্যবসা উপলক্ষে আসা অবাঙালি মানুষ বি জে পি-ভক্ত৷‌ এই হাজার চল্লিশ ভোটের আশায় রাজ্য বি জে পি নেতা রাহুল সিনহা বারকয়েক কলকাতা থেকে বাঁকুড়ায় ভোটে দাঁড়াতে যেতেন৷‌ এই ভোট মোদির গুণিতকে দাঁড়ালে বাসুদেব আচারিয়া দ্বাদশ বারের জন্য লোকসভায় জিতবেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর কাছে জয়ে আশ্বস্ত মুনমুন সেন তৃতীয় স্হানে থাকবেন– আশা এমনটাই৷‌

শুধু সি পি এম কেন, সব রাজনৈতিক দলই এমন উপলব্ধি করছে, নৈতিক রাজনীতির পোলারাইজেশনের বলে বলীয়ান হয়ে হিন্দু, মুসলিম ভোট বিভাজন এ রাজ্যে নেই বলে সেকুলারিস্ট আত্মশ্লাঘায় ভোগার দিন আর নেই৷‌ তৃণমূলের ঘাঁটিতে রাজ্য রাজনীতিতে, কংগ্রেসি রাজনীতিতে রয়্যাল বলে কথিত মন্ত্রী ডাঃ গোপাল দাস নাগের কন্যা রত্না দে নাগের বিরুদ্ধে আশা জাগিয়ে তুলেছেন অজ্ঞাতনামা সি পি এম প্রার্থী প্রদীপ সাহা৷‌ আশার কারণ অবশ্যই দিল্লির বি জে পি থিঙ্কট্যাঙ্কের সদস্য এবং নরেন্দ্র মোদির প্রিয়পাত্র চন্দন মিত্রের অনুকূলে বি জে পি-ঝড়৷‌ বনেদি হুগলিতে ট্র্যাডিশনাল কংগ্রেস, তৃণমূল ভোটাররা অনায়াসে বি জে পি-র বেড়া টপকাবেন– এতটুকুই সি পি এমের আশা৷‌ তৃণমূলের ক্যাম্পকেও দোলা দিচ্ছে মোদি-হাওয়া৷‌ তাদেরও আশা, চিরশত্রু মমতাকে হারাতে সি পি এমের ভোট-ভিত চলে যাচ্ছে মোদির দিকে, তাতেই তারা কুপোকাৎ হবে৷‌ দমদম থেকে ট্রেন ছেড়ে রেললাইন যতদূর যায় দু’পাশের উদ্বাস্তু কলোনির ভোটের দিকে বি জে পি-র জুলজুল চোখে নজর দীর্ঘদিনের৷‌ দেখা যাক সি পি এম, তৃণমূল ‘মোদি-হাওয়া কি বুরা নজর’ থেকে এঁদের কতটা বাঁচিয়ে রাখতে পারে!

No comments:

Post a Comment