Saturday, May 10, 2014

প্রচারের আড়ালে পীরজাদাদের অপমানের আগুন জ্বলছে ডায়মন্ডহারবারে

প্রচারের আড়ালে পীরজাদাদের অপমানের আগুন জ্বলছে ডায়মন্ডহারবারে
Aajkaal: the leading bengali daily newspaper from Kolkata
তাপস গঙ্গোপাধ্যায়, ডায়মন্ডহারবার
শনিবার (৩ মে) সারাটা দিন কেটেছে রাজ্যের দক্ষিণতম প্রাম্তের লোকসভা কেন্দ্র মথুরাপুরের প্রার্থীদের সুলুকসন্ধানে৷‌ রবিবার সকালে মথুরাপুর ছেড়ে রওনা দিলাম ডায়মন্ডহারবারের প্রার্থীদের তত্ত্ব-তালাশে৷‌ আর মাত্র ৮ দিন বাকি৷‌ ১২ মে ভোট৷‌ তার আগে এটাই শেষ রবিবার৷‌ কারণ পরের রবিবার প্রার্থীরা আর ভোট-প্রচারে বেরোতে পারবেন না৷‌ ১০ মে শনিবার বিকেল থেকে শুরু হয়ে যাবে ৪৮ ঘণ্টার প্রচারাভিযানে নির্বাচন কমিশনের স্হগিতাদেশ৷‌

মথুরাপুরের পোলেরহাট থেকে কুলপির দূরত্ব ১৪-১৫ কিলোমিটার৷‌ কুলপি থেকে হটুগঞ্জ ৮ কিমি৷‌ এই হটুগঞ্জই ডায়মন্ডহারবার লোকসভা কেন্দ্রের সীমাম্ত৷‌ সেখান থেকে ডায়মন্ডহারবার শহরের দূরত্ব আরও ৮ কিমি৷‌ যখন হটুগঞ্জ পার হচ্ছি মোবাইল বেজে উঠল৷‌ ডায়মন্ডহারবারে আমাদের প্রতিনিধি গৌতম মণ্ডল লাইনে, ‘দাদা অভিষেক ব্যানার্জি আজ সকালে ডায়মন্ডহারবারে প্রচার করবেন রাজার তালুক মোড় থেকে৷‌’

হটুগঞ্জ থেকে রাজার তালুক ৬ কিলোমিটারের মতো৷‌ এসে যখন পৌঁছলাম তখন দেখি ওই মোড়ে ছোট একটা জটলা৷‌ জটলার কাছেই শুনলাম ঠিক সকাল ৯টায় অভিষেকের কনভয় চওড়া ডায়মন্ডহারবার রোড ছেড়ে ঢুকে পড়েছে পুরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পঞ্চাননতলা সরণিতে৷‌ সেই সরণি এতই সরু যে অভিষেক ও তাঁর সঙ্গের কর্মীরা কলকাতা থেকে স্করপিও এবং ইনোভা গাড়িতে এসেছেন তা ওই রাস্তায় ঢুকবে না৷‌ তাই স্হানীয় তৃণমূল নেতারা অভিষেককে একটা হুডখোলা অটোতে চাপিয়ে সাইকেলে ও বাইকে তাঁর অনুগামী হয়েছেন৷‌ পুরসভার ১৬টি ওয়ার্ডই ওই সরু লিকলিকে সরণির দু’ধারে৷‌

অভিষেকের সঙ্গে কলকাতা থেকে এসেছেন তাঁর ব্যক্তিগত সচিব সুমিত রায় আর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর দল৷‌ দেহরক্ষীদের নেতা স্মরজিৎ দে আমার অনুরোধে সুমিতবাবুকে ফোন করে জানালেন, কনভয় প্রচার পরিক্রমা শেষ করে শহরের দোরগোড়ায় ইন্দিরা মোড়ে এসে উঠবে ডায়মন্ডহারবার রোডে৷‌ চললাম ইন্দিরা মোড়ে বা বাটা মোড়ে৷‌ সেই সরু গলি৷‌ সেখানে ডায়মন্ডহারবারের তৃণমূল যুবকদের সঙ্গে দেখি অপেক্ষা করছেন কলকাতা-আগত একগুচ্ছ যুবা, যাঁরা অভিষেকের বন্ধু৷‌ খানিক বাদে খবর এল ইন্দিরা রোড নয়, স্টেশন বাজার রোড দিয়ে শহরের ব্যস্ততম এলাকায় ঢুকবে কনভয়৷‌ চলে গেলাম ঘিঞ্জি বাজার পার হয়ে স্টেশন ছাড়িয়ে লেভেল ক্রসিংয়ের মুখে৷‌ বাঁহাতে সামরিক পোশাকে ঢাকা নেতাজি স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে৷‌ সকাল সাড়ে দশটায় সেই কনভয় এল স্ট্যাচুর অপর পারে রেললাইনের দক্ষিণে৷‌ সামনে একের পর এক বাইক, সাইকেল, অটো৷‌ প্রতিটি অটোতে লাউড স্পিকারে অভিষেকের আগমনী ধ্বনিত হচ্ছে৷‌ একটি বাইকে দেখলাম পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান বর্তমানে ডেপুটি পান্নালাল হালদারকে৷‌ আর খোলা অটোর ড্রাইভারের পেছনে দাঁড়িয়ে অভিষেক, পাশে পুরসভার মহিলা চেয়ারপার্সন মীরা হালদার৷‌ তাঁর পেছনে একটা আধা তাসা আধা ব্যান্ড পার্টির জগঝম্প বাজনা দু’পাশের বাড়ির বাসিন্দাদের বাধ্য করছে দরজা-জানলা বন্ধ করতে৷‌ মাইকে ভেসে আসছে ‘আমাদের শ্রদ্ধেয় মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো অভিষেক...’

পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে অভিষেক৷‌ গালে দু-একদিনের বাসি দাড়ি৷‌ পাঞ্জাবির ওপর তৃণমূলি উত্তরীয় গলায়৷‌ চোখে দামি ফ্রেমের চশমা৷‌ টানা দেড়ঘণ্টা শেষ বৈশাখের গরমে উজ্জ্বল মোমবর্ণ গাত্রচর্মে জমে আছে ঘামের ফোঁটা৷‌ লেভেল ক্রসিং পেরনোর সময় নিশ্চয় অভিষেক দেখেছিলেন নেতাজি কীরকম নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে৷‌ তারপর ওই দু’ডজন বাইক, এক ডজন সাইকেল ও গোটা চারেক অটোর কনভয় কাটা পোনা, ট্যাংরা, পুঁটি, গোলাপখাস, বেগুনফুলি, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, কলমি, মেথির ডালা, ঝোলা দু’পাশে রেখে বাজারের ভিড় ঠেলে উঠল সামনের মোড়ে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেই স্করপিও এবং ইনোভা ও অভিষেকের বন্ধুর দল৷‌ দু’মিনিটেই সব ফাঁকা৷‌ এখন স্টেশন বাজারের মুখে চ!র কাটছে একটা ম্যাটাডর গায়ে বি জে পি-র নামাবলি জড়ানো৷‌ গাড়ির ভেতরে ক্যাসেটে বাজছে ‘নমো নমো, সাচ্চা সামনে৷‌...৷‌ মোদি কো হম‍্ জিতায়েঙ্গে’ এই মহান সঙ্গীত৷‌

বিকেল সাড়ে চারটে৷‌ মেটিয়াবুরুজের শম্পা-মির্জানগরের হাউজিং কলোনির সামনেটা লালে লাল৷‌ পতাকা-ফেস্টুনে৷‌ একটু বাদে বেরোবে সি পি এমের মহামিছিল প্রার্থী ডাঃ আবুল হাসনাতকে নিয়ে৷‌ কোথায় ডায়মন্ডহারবার ছাড়িয়ে হটুগঞ্জ আর কোথায় কলকাতা লাগোয়া মেটিয়াবুরুজ৷‌ সাতটা বিধানসভা– ডায়মন্ডহারবার, ফলতা, সাতগাছিয়া, বিষ্ণুপুর, মহেশতলা, বজবজ ও মেটিয়াবুরুজ নিয়ে ডায়মন্ডহারবার লোকসভা কেন্দ্র৷‌ ভোটার সাড়ে পনেরো লক্ষের ওপর, যার ৪৩ শতাংশ মুসলিম৷‌ ভোটারদের একাংশ রুজিরোজগার করেন মহেশতলা, বজবজ, মেটিয়াবুরুজের ছোটবড় কলকারখানা থেকে, বাকিদের বেশির ভাগের অন্ন আসে চাষবাস থেকে৷‌ সাতগাছিয়া গোটা দেশে বিখ্যাত নার্সারি বা চারা, ফুল, ফল ও পাতাবাহারি গাছের জন্য৷‌ সাতগাছিয়ার এক একটা পামগাছ দিল্লি কিনে নেয় আট থেকে দশ হাজারে৷‌

সকালে কথা হচ্ছিল ডাঃ হাসনাতের সঙ্গে৷‌ অরিজিন্যালি বর্ধমানের কেতুগ্রামের বাসিন্দা৷‌ বাবা মহম্মদ আছিয়া গুসকরার কাছে একটি প্রাথমিক স্কুলে পড়াতেন৷‌ ডাক্তারবাবুরা তিন ভাই৷‌ বড় মহসিন অর্থনীতির এম এ, একটা হাইস্কুলে একসময় পড়াতেন, বয়স এখন ৭৩৷‌ ছোট ইয়াসিন মুর্শিদাবাদের বড়েএžায় একটি স্কুলে পড়ান৷‌ ইতিহাসের এম এ৷‌ মেজ হাসনাত বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম বি বি এস করে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্জারিতে এম এস করেছেন৷‌ বয়স ৬৩৷‌ ১৯৮৮ থেকে ডায়মন্ডহারবার সরকারি হাসপাতালে ছিলেন৷‌ স্ত্রী নমিতা চক্রবর্তী পেশায় নার্স, একটি নার্সিংহোমে যুক্ত৷‌ দুই ছেলে ওঁদের৷‌ বড় সাদির কাটিহার মেডিক্যাল কলেজের রেসিডেন্ট অ্যানাস্হেটিস্ট৷‌ ছোট সৈকত যাদবপুরের কে পি সি মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম বি বি এস পাস করে এখন এম এস করছে৷‌ গত বছর পশ্চিমবঙ্গ হেল‍্থ ইউনিভার্সিটির তাবৎ ডাক্তারি ছাত্রের মধ্যে প্রথম হয়েছে৷‌ ডাক্তার হাসনাত টানা ২৬ বছর ডায়মন্ডহারবারে রোগীদের চিকিৎসা করার পর আর কেতুগ্রামে ফিরতে পারেননি৷‌ রোগীরাই যেতে দেননি৷‌ হাসপাতালের উল্টোদিকের তেতলাটা ডাক্তারবাবুর৷‌ ভোট বলেও রেহাই পাননি৷‌ সাতসকালেই রোগীরা হাজির৷‌ তাঁদের দেখার ফাঁকে হাতে-গড়া রুটি দুধে ডুবিয়ে কলা দিয়ে খেয়ে নিলেন৷‌ বেরোতে হবে৷‌ আটদিন বাদে মহারণ৷‌ এদিন যাবেন বজবজ, মহেশতলা ও মেটিয়াবুরুজে প্রচারে৷‌ দুয়ারে দাঁড়ায়ে গাড়ি৷‌

চোখে চশমা, সাড়ে ৫ ফুট মানুষটির ওজন ৭২ কিলো৷‌ ব্লাড প্রেসার নিল৷‌ সুগার আছে, ওষুধ নিয়মিত খান৷‌ হঠাৎ দেখলে লেখক, কবি, ফিল্ম ডিরেক্টর গুলজারের কথা মনে পড়ে৷‌ অনেকটা সেরকম দেখতে৷‌ ডাক্তারবাবুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ২৭ বছরের অভিষেক৷‌ বেহালার এম পি বিড়লা ফাউন্ডেশন হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র৷‌ বি বি এ এবং এম বি এ করেছেন দিল্লির আই আই পি এম থেকে৷‌ তারপর করেছেন দুটি বড় কাজ৷‌ প্রথমটি বিয়ে, বছর দুই আগে দিল্লিতে৷‌ দ্বিতীয়টি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন৷‌ কোথায়– না, ডায়মন্ডহারবারে৷‌ গত ৬৩ বছরে এই কেন্দ্রটির রূপ, রঙ সব বদলে গেছে৷‌ ১৯৫১-র প্রথম নির্বাচনে এটি ছিল জোড়া কেন্দ্র৷‌ অর্থাৎ একই কেন্দ্র নির্বাচিত করত দুজন প্রার্থীকে৷‌ প্রথমবার একান্ন সালে এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন অবিভক্ত সি পি আইয়ের কমল বসু, যিনি ৮০-র দশকে ছিলেন কলকাতার মেয়র এবং কংগ্রেসের পূর্ণেন্দুশেখর নস্কর৷‌ কমলবাবু হারান এক কংগ্রেস প্রার্থীকে আর নস্কর মশাই এক জনসঙঘীকে (বর্তমান বি জে পি)র পূর্বসূরি-৷‌ দ্বিতীয় নির্বাচনে, ১৯৫৭ সালে পূর্ণেন্দু নস্কর জিতলেন কমল বসুকে হারিয়ে আর সি পি আইয়ের কংসারি হালদার জিতলেন কংগ্রেসি এক প্রার্থীকে হারিয়ে৷‌ ১৯৬২ থেকে জোড়া আসনের মর্যাদা খোয়াল ডায়মন্ডহারবার৷‌ সেবারও কংগ্রেস প্রার্থী সুধাংশুভূষণ দাস সি পি আইয়ের কমল বসুকে হারিয়ে দিল্লি গেলেন৷‌ ১৯৬৭ থেকে ২০০৪, টানা ৩৭ বছর ডায়মন্ডহারবার ছিল সি পি এমের পকেটবরো৷‌ পালা করে চারবার জিতেছেন এই কেন্দ্রে জ্যোতির্ময় বসু, জ্যোতি বসুর ভাগনে অমল দত্ত এবং শমীক লাহিড়ী৷‌ ২০০৯-এ তৃণমূলের সোমেন মিত্র (যিনি এবার কংগ্রেস প্রার্থী হয়ে উত্তর কলকাতায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়ছেন) শমীক লাহিড়ীকে হারান দেড় লক্ষেরও বেশি ভোটে৷‌ এবার সেই আসনে মমতা ব্যানার্জির ভাইপোর বিরুদ্ধে একদিকে যেমন লড়ছেন সি পি এমের ডাঃ হাসনাত, তেমনি জঙ্গ-ই-ময়দানে সামিল কংগ্রেসের শ্রমিক নেতা কামারুজ্জামান কামরে এবং বি জে পি-র জঙ্গি শ্রমিক নেতা অভিজিৎ দাস যাঁকে আর এস এস প্রচারকরাও ববিদা নামে ডাকেন৷‌

সাতান্ন বছর বয়সী কামরে সাহেব আদিতে মেটিয়াবুরুজের বাসিন্দা হলেও গত তিন বছর চার মাস, ওঁর নিজের কথায় নিউ আলিপুরের ফ্ল্যাট বাসিন্দা৷‌ স্ত্রী রাজিয়া গত বছর মারা গেছেন৷‌ তিন সম্তানের মধ্যে বড় মেয়ে এখন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সির ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত৷‌ বড় ছেলে বি কম ফাইনাল ইয়ারে, ছোট ছেলে বি কমের প্রথম বর্ষে৷‌ ডক লেবার বোর্ডে শ্রমিক সংগ্রাম ও রাজনীতির শিক্ষারম্ভ৷‌ ১৯৯০ সালে প্রথম নির্বাচনী সংগ্রাম৷‌ কলকাতা পুরসভার ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডে৷‌ পাঁচ হাজার ভোট পেয়েও হারেন৷‌ চব্বিশ বছর পর পার্টি এবার তাঁকে দিল্লিতে পাঠাতে চায়৷‌ কিন্তু ভোটাররা? এই শেষ প্রশ্নের উত্তর পেলাম দলের স্হানীয় নেতা ও কর্মীদের কথায়– দিল্লি বছরের পর বছর তৃণমূলের সঙ্গে জোট বাঁধায় আমাদের দলটাই প্রায় উঠে যাচ্ছিল৷‌ এবার আমরা জিতব না, হারব, কিন্তু দলটা আবার গড়ে উঠবে৷‌ পরের নির্বাচনে আমরাই জিতব৷‌

সেই নির্বাচন আমি কভার করব কিনা জানি না, একদল হতাশ কংগ্রেসি নেতা ও কর্মীর সঙ্গে চা খেয়ে বিষ্ণুপুরের কার্যালয় থেকে যখন বেরোলাম তখন ঘড়িতে বাজে সাড়ে এগারোটা৷‌ সাড়ে এগারোটা থেকে সাড়ে তিনটে চার ঘণ্টা চষে বেড়িয়েছি কলকাতার প্রাম্তসীমায় ডায়মন্ডহারবার কেন্দ্রের বজবজ, মহেশতলা ও মেটিয়াবুরুজে যাঁর সন্ধানে সেই ববিদাকে অবশেষে খুঁজে পেলাম দুই আর এস এস প্রচারক অলঙ্কার সিং ও সুপ্রকাশ সিংয়ের সাহায্যে বজবজ শ্যামপুর বাজারের একটি গলির মিষ্টির দোকানে৷‌ মাটির ভাঁড়ে মিষ্টিদই প্লাস্টিকের চামচে মুখে তুলতে তুলতে বললেন, ‘এবার যে ৪ লাখ ভোট পাবে, সেই জিতবে৷‌ আমি জিতবই৷‌’

৫ ফুট সাড়ে ৯ ইঞ্চি মানুষটি যেন মেডিক্যাল কলেজের অ্যানাটমি ক্লাসের একটি দ্রষ্টব্য৷‌ পরনে চোঙা পাজামার ওপর গেরুয়া পাঞ্জাবি, গলায় উত্তরীয়৷‌ জন্মেছেন পি জি হাসপাতালে ১৯৬১ সালে৷‌ বাবা প্রয়াত বীরেন্দ্রকুমার দাস ছিলেন এ জি বেঙ্গলের সিনিয়র অডিটর৷‌ ২ ভাই ৪ বোনের মধ্যে বর্তমানে পঞ্চম অভিজিৎ দাস অর্থাৎ ববি বললেন, ‘আমি অষ্টম গর্ভজাত৷‌’ অর্থাৎ উনি শ্রীকৃষ্ণ৷‌ শত্রু বধের জন্য এবার ববির অবতারে অবতীর্ণ৷‌ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিউজিওলজির এম এসসি, ববি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি সায়েন্সের স্নাতক৷‌ ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন এয়ার ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা জার্নালিজম এবং মাস কমিউনিকেশনে৷‌ আবার উৎকল ইউনিভার্সিটির এল এল বি৷‌ ১৯৮৪ সালে আনন্দবাজারে সুনীত ঘোষের আর এস এসের সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রা ও পরিকল্পনার একটি নিবন্ধ পড়ে ববি মুগ্ধ৷‌ গোড়ায় যোগ দেন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদে৷‌ তারপর আর এস এস৷‌ ছিলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার প্রচার প্রমুখ৷‌ ২০০৯-এ বি জে পি৷‌ থাকেন আমতলার বীরেন্দ্রপল্লীতে৷‌ টানা ৪৪ বছর কুমার থাকার পর গত বছর স্বাধীনতা দিবসে কম্পিউটার টিচার মৌসুমী ঘোষের অধীনতা মেনে নিয়েছেন৷‌ বিয়ের পরও স্ত্রীর নাম মৌসুমী দাস না বলে ঘোষ বললেন কেন? প্রশ্নের উত্তর পেলাম, ‘আমার স্ত্রী স্বাধীনতাপ্রিয়৷‌’ তাহলে সংসার চলে কী করে? অসামান্য জবাব এল, ‘মা-বাবার পেনশন পান৷‌ বাড়ির পেছনের অংশের ভাড়া পাই৷‌ বড়দি স্কুলের হেড মিস্ট্রেস, ছোড়দিও স্কুলে পড়ান৷‌ সবার সাহায্যে চলে যায়৷‌’ এবার মাথায় রিবকের ক্রিকেট টুপিটা চাপালেন৷‌ শুরু হবে রোড শো৷‌

কলকাতার প্রাম্তসীমা জোকা থেকে হটুগঞ্জ, প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার রাস্তার দু’ধারের অধিকাংশ গাছ তৃণমূল তেরঙ্গা লাঞ্ছিত৷‌ শহর, গ্রাম, শ্রমিক বস্তিতে দেখেছি তৃণমূল তেরঙ্গার পাশে লাল পতাকা৷‌ অধিকাংশ দেওয়াল তৃণমূলের৷‌ ১৫ শতাংশ সি পি এমের৷‌ কংগ্রেসের ৫ শতাংশ৷‌ বি জে পি-র সেই হিসেবে অস্তিত্ব নিল৷‌ যদি ফ্ল্যাগ, ব্যানার, ফেস্টুন, দেওয়াল লেখাই জেতার মাপকাঠি হত, তাহলে লিখতাম অভিষেক ভোটের আগেই জয়ী৷‌ কিন্তু একটা চোরাস্রোত টের পেলাম এই কেন্দ্রে৷‌ সাড়ে ১৫ লাখ ভোটারের ৪৩ শতাংশ মুসলমান৷‌ তাঁদের একটা বড় অংশ ভালভাবে নেননি ফুরফুরা শরিফের পীরজাদাদের অসম্মান৷‌ ঘরে ঘরে, মোড়ে মোড়ে, চায়ের দোকানে, বাজারে কান পাতলে সে কথা ঠাহর করা খুব দুষ্কর নয়৷‌ রাজনীতির যাঁরা দলীয় পীর তাঁরা কি জানেন কী ঘটতে চলেছে ১২ মে?

No comments:

Post a Comment