রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ চার মামলা
যুদ্ধাপরাধী বিচার
বিকাশ দত্ত ॥ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে রায় ঘোষণার জন্য সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২ এ চারটি মামলা অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছে। যে কোন দিন এ চারটি মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে আপীল বিভাগে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, ট্রাইব্যুনাল-১ এ জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, বিএনপির পলাতক নেতা নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র জাহিদ হোসেন খোকন ও ট্রাইব্যুনাল-২ এ জামায়াতের ইসলামীর নেতা মীর কাশেম আলী। একটি সূত্র জানিয়েছে শীঘ্রই আপীল বিভাগে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও ট্রাইব্যুনাল-১ মতিউর রহমান নিজামীর রায় ঘোষণা করা হবে। আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পিরোজপুরের জাতীয় পর্টির নেতা ইঞ্জিনিয়ার মোঃ আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও ধর্মান্তরিত করার ৫ ধরনের অভিযোগে ফরমাল চার্জ দাখিল করা হবে। এ ছাড়া এ মাসেই ক্রিমিনাল সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিরুদ্ধেও ফরমাল চার্জ দাখিল করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ খবর জানা গেছে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২ এ মোট চারটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল-১ এ আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মোঃ মোবারক হোসেন ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজাহারুল ইসলাম, ট্রাইব্যুনাল-২ এ জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুস সুবহান ও জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোঃ কায়সারের মামলা দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এ চারটি মামলা পাশাপািশ আরও কিছু নতুন মামলা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ক্রিমিনাল সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামী, পিরোজপুরের ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার, কিশোরগঞ্জের রাজাকার হাসান আলীর মামলাও সহসাই আসছে বলে জানা গেছে। জামায়াতের মামলাটির ফরমাল চার্জ শীঘ্রই ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদ- প্রাপ্ত জামায়াতের নায়েবে আমির দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে মামলার রায় যে কোন দিন ঘোষণা করা হবে। ১৬ এপ্রিল প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপীল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। আপীল বিভাগে অন্য বিচারপতিদের মধ্যে ছিলেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা, বিচারপতি মোঃ আবদুল ওয়াহহ্াব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেলেয়ার হোসাইন সাঈদীকে মানবতাবিরোধী অপরাধের ২০টি অভিযোগের মধ্যে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদ- প্রদান করেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন, ধর্মান্তর করাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের আটটি অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি অভিযোগে তাকে সর্বোচ্চ সাজা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- প্রদান করেছেন ট্রাইব্যুনাল। বাকি ১২টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়াত সেগুলো থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই বিচারপতি ছিলেন জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোযারুল হক।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর রায়ের বিরুদ্ধে ২৮ মার্চ মৃত্যুদ- প্রাপ্ত আসামি দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী ও সরকারপক্ষ পৃথক পৃথক ভাবে দুটি আপীল দায়ের করেন। ১৫ এপ্রিল ৪৯তম দিনে এ আবেদনের বিষয়ে আদেশের জন্য ১৬ এপ্রিল দিন ধার্য করা হয়েছিল। মৃত্যুদ-ের রায়ে আপীল আবেদনের ওপর রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন ১৫ এপ্রিল শেষ হয়। ১৬ এপ্রিল ছিল এ মামলায় আপীল শুনানি কার্যক্রমের ৫০তম দিন।
ট্রাইব্যুনালে তিন মামলা
আপীল বিভাগে ছাড়াও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আরও তিনটি মামলা রায় ঘোষণার অপেক্ষায় (সিএভি) রাখা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২ এ। এ মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জামায়াতের শীর্ষ নেতা আমির মতিউর রহমান নিজামী, বিএনপির পলাতক নেতা জাহিদ হোসেন খোকন, ট্রাইব্যুনাল-২ রয়েছে জামায়াতের আরেক নেতা মীর কাশেম আলীর মামলা। এই মামলাগুলোর রায়ও যে কোন দিন ঘোষণা করা হবে।
২৪ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট ট্রাইব্যুনাল মতিউর রহমান নিজামীর মামলায় দ্বিতীয় দফায় যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। এ ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক।
একমাত্র মতিউর রহমানের মামলাটিই দুইবার যুক্তিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসা বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর অবসরে গেলে এ আদালতে বিচার কার্যক্রমে কার্যত স্থবিরতা তৈরি হয়। বিচার কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। মতিউর রহমান নিজামীর ৫ মামলার যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থাতেই থাকে। অবশেষে ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়ার কারণে তিনি আবার মামলাটি নতুন করে যুক্ততর্ক শুনেন। যুক্তিতর্ক শেষে দ্বিতীয় দফায় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম আসামি মতিউর রহমান নিজামীর মামলায় রায় ঘোষণার জন্য ২৪ মার্চ অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনে মধ্য দিয়ে ২০১২ সালের ২৮ মে বিচার শুরু হয়। ২০১০ সালের ২৯ জুন মতিউর রহমান নিজামীকে একটি মামলায় গ্রেফতার করার পর একই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এর পর গত বছর ১১ ডিসেম্বর জামায়াতের আমিরের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উপস্থাপন করে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। ২৮ ডিসেম্বর আদালত অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। ২০১২ সালের ২৬ আগস্ট থেকে প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করা হয়। ২০১৩ সালের ২১ আগস্ট আসামি পক্ষের সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ২০১৩ সালের ৩ নবেম্বর থেকে প্রসিকিউশন পক্ষে যুক্তিতর্ক শুরু। একই বছরের ৬ নবেম্বর প্রসিকিউশন পক্ষের যুকিতর্ক শেষ। ৭ নবেম্বর আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু। ১৩ নবেম্বর আসামি পক্ষের সময়ের আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। একই দিন ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়। উল্লেখ্য, গত বছরের ১৩ নবেম্বর নিজামীর পক্ষের সিনিয়র আইনজীবীরা আদালতে না আসায় মামলার রায় যে কোন দিন দেয়া হবে মর্মে অপেক্ষমাণ (সিএভি) ২০ রেখে দেন ট্রাইব্যুনাল। এর পর ১৪ নবেম্বর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালের আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। ওই আবেদনের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল ফের যুক্তি উপস্থাপনের সময় দেন। ১৯ নবেম্বর নিজামীর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন সম্পন্ন করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। ২০ নবেম্বর আসামিপক্ষের আইনজীবী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। এর পর ট্রাইব্যুনাল ২০ নবেম্বর আদেশে ১৩ নবেম্বরের সিএভি আদেশই বহাল রাখেন।
পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফায় যুক্তিতর্ক শুনার পর চেযারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, ২৪ মার্চ যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।
খোকন রাজাকার
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকারের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম শেষে ১৭ এপ্রিল রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছে। যে কোন দিন তার মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। খোকনের বিরুদ্ধে ১৬ নারী ও শিশুসহ ৫০ জনকে হত্যা, তিনজনকে পুড়িয়ে হত্যা, ২ জনকে ধর্ষণ, ৯ জনকে ধর্মান্তরিত করা, ২টি মন্দিরসহ ১০টি গ্রামের বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, সাত গ্রামবাসীকে সপরিবারে দেশান্তরে বাধ্য করা ও ২৫ জনকে নির্যাতনসহ সুনির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগ আনা হয়েছে।
মীর কাশেম আলী
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতের নেতা মীর কাশেম আলীর বিচারিক কার্যক্রম শেষে ৪ মে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছে। অর্থাৎ যে কোন দিন তার মামলার রায় ঘোষণণা করা হবে। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করবেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মোঃ মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মোঃ শাহিনুর ইসলাম।
জামায়াতের ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মীর কাশেম আলীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় যে কোন দিন ঘোষণা করা হবে।
আব্দুল জব্বার
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জাতীয় পার্টির নেতা সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে আজ ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ দাখিল করা হবে। প্রসিকিউটর এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, আজ ৫টি অভিযোগের ভিত্তিতের জব্বারের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে এই ফরমাল চার্জ দাখিল করা হবে।
এর আগে ২৮ এপ্রিল তদন্ত সংস্থা আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্ট প্রকাশ করে। এর পর তারা ওই রিপোর্ট প্রসিকিউশনের দাখিল করা হয়। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ৫টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ৩৬ জনকে হত্যা ও গণহত্যা, ২০০ জনকে ধর্মান্তরিতকরণ এবং ৫৫৭টি লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার অপরাধের ঘটনাস্থল মঠবাড়িয়ার ফুলঝড়ি, ললি ও আঙ্গুলকাটা। ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে সাক্ষী করা হয়েছে ৪৬ জনকে। তাদের মধ্যে ৪০ জন ঘটনার এবং ৬ জন জব্দ তালিকার সাক্ষী।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২ এ মোট চারটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল-১ এ আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মোঃ মোবারক হোসেন ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজাহারুল ইসলাম, ট্রাইব্যুনাল-২ এ জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুস সুবহান ও জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোঃ কায়সারের মামলা দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এ চারটি মামলা পাশাপািশ আরও কিছু নতুন মামলা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ক্রিমিনাল সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামী, পিরোজপুরের ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার, কিশোরগঞ্জের রাজাকার হাসান আলীর মামলাও সহসাই আসছে বলে জানা গেছে। জামায়াতের মামলাটির ফরমাল চার্জ শীঘ্রই ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদ- প্রাপ্ত জামায়াতের নায়েবে আমির দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে মামলার রায় যে কোন দিন ঘোষণা করা হবে। ১৬ এপ্রিল প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপীল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। আপীল বিভাগে অন্য বিচারপতিদের মধ্যে ছিলেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা, বিচারপতি মোঃ আবদুল ওয়াহহ্াব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেলেয়ার হোসাইন সাঈদীকে মানবতাবিরোধী অপরাধের ২০টি অভিযোগের মধ্যে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদ- প্রদান করেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন, ধর্মান্তর করাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের আটটি অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি অভিযোগে তাকে সর্বোচ্চ সাজা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- প্রদান করেছেন ট্রাইব্যুনাল। বাকি ১২টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়াত সেগুলো থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই বিচারপতি ছিলেন জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোযারুল হক।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর রায়ের বিরুদ্ধে ২৮ মার্চ মৃত্যুদ- প্রাপ্ত আসামি দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী ও সরকারপক্ষ পৃথক পৃথক ভাবে দুটি আপীল দায়ের করেন। ১৫ এপ্রিল ৪৯তম দিনে এ আবেদনের বিষয়ে আদেশের জন্য ১৬ এপ্রিল দিন ধার্য করা হয়েছিল। মৃত্যুদ-ের রায়ে আপীল আবেদনের ওপর রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন ১৫ এপ্রিল শেষ হয়। ১৬ এপ্রিল ছিল এ মামলায় আপীল শুনানি কার্যক্রমের ৫০তম দিন।
ট্রাইব্যুনালে তিন মামলা
আপীল বিভাগে ছাড়াও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আরও তিনটি মামলা রায় ঘোষণার অপেক্ষায় (সিএভি) রাখা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২ এ। এ মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জামায়াতের শীর্ষ নেতা আমির মতিউর রহমান নিজামী, বিএনপির পলাতক নেতা জাহিদ হোসেন খোকন, ট্রাইব্যুনাল-২ রয়েছে জামায়াতের আরেক নেতা মীর কাশেম আলীর মামলা। এই মামলাগুলোর রায়ও যে কোন দিন ঘোষণা করা হবে।
২৪ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট ট্রাইব্যুনাল মতিউর রহমান নিজামীর মামলায় দ্বিতীয় দফায় যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। এ ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক।
একমাত্র মতিউর রহমানের মামলাটিই দুইবার যুক্তিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসা বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর অবসরে গেলে এ আদালতে বিচার কার্যক্রমে কার্যত স্থবিরতা তৈরি হয়। বিচার কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। মতিউর রহমান নিজামীর ৫ মামলার যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থাতেই থাকে। অবশেষে ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়ার কারণে তিনি আবার মামলাটি নতুন করে যুক্ততর্ক শুনেন। যুক্তিতর্ক শেষে দ্বিতীয় দফায় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম আসামি মতিউর রহমান নিজামীর মামলায় রায় ঘোষণার জন্য ২৪ মার্চ অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনে মধ্য দিয়ে ২০১২ সালের ২৮ মে বিচার শুরু হয়। ২০১০ সালের ২৯ জুন মতিউর রহমান নিজামীকে একটি মামলায় গ্রেফতার করার পর একই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এর পর গত বছর ১১ ডিসেম্বর জামায়াতের আমিরের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উপস্থাপন করে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। ২৮ ডিসেম্বর আদালত অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। ২০১২ সালের ২৬ আগস্ট থেকে প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করা হয়। ২০১৩ সালের ২১ আগস্ট আসামি পক্ষের সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ২০১৩ সালের ৩ নবেম্বর থেকে প্রসিকিউশন পক্ষে যুক্তিতর্ক শুরু। একই বছরের ৬ নবেম্বর প্রসিকিউশন পক্ষের যুকিতর্ক শেষ। ৭ নবেম্বর আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু। ১৩ নবেম্বর আসামি পক্ষের সময়ের আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। একই দিন ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়। উল্লেখ্য, গত বছরের ১৩ নবেম্বর নিজামীর পক্ষের সিনিয়র আইনজীবীরা আদালতে না আসায় মামলার রায় যে কোন দিন দেয়া হবে মর্মে অপেক্ষমাণ (সিএভি) ২০ রেখে দেন ট্রাইব্যুনাল। এর পর ১৪ নবেম্বর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালের আদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। ওই আবেদনের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল ফের যুক্তি উপস্থাপনের সময় দেন। ১৯ নবেম্বর নিজামীর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন সম্পন্ন করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। ২০ নবেম্বর আসামিপক্ষের আইনজীবী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। এর পর ট্রাইব্যুনাল ২০ নবেম্বর আদেশে ১৩ নবেম্বরের সিএভি আদেশই বহাল রাখেন।
পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফায় যুক্তিতর্ক শুনার পর চেযারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, ২৪ মার্চ যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।
খোকন রাজাকার
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকারের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম শেষে ১৭ এপ্রিল রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছে। যে কোন দিন তার মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। খোকনের বিরুদ্ধে ১৬ নারী ও শিশুসহ ৫০ জনকে হত্যা, তিনজনকে পুড়িয়ে হত্যা, ২ জনকে ধর্ষণ, ৯ জনকে ধর্মান্তরিত করা, ২টি মন্দিরসহ ১০টি গ্রামের বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, সাত গ্রামবাসীকে সপরিবারে দেশান্তরে বাধ্য করা ও ২৫ জনকে নির্যাতনসহ সুনির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগ আনা হয়েছে।
মীর কাশেম আলী
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত জামায়াতের নেতা মীর কাশেম আলীর বিচারিক কার্যক্রম শেষে ৪ মে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছে। অর্থাৎ যে কোন দিন তার মামলার রায় ঘোষণণা করা হবে। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করবেন। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মোঃ মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মোঃ শাহিনুর ইসলাম।
জামায়াতের ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মীর কাশেম আলীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় যে কোন দিন ঘোষণা করা হবে।
আব্দুল জব্বার
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জাতীয় পার্টির নেতা সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে আজ ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ দাখিল করা হবে। প্রসিকিউটর এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, আজ ৫টি অভিযোগের ভিত্তিতের জব্বারের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে এই ফরমাল চার্জ দাখিল করা হবে।
এর আগে ২৮ এপ্রিল তদন্ত সংস্থা আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে রিপোর্ট প্রকাশ করে। এর পর তারা ওই রিপোর্ট প্রসিকিউশনের দাখিল করা হয়। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ৫টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ৩৬ জনকে হত্যা ও গণহত্যা, ২০০ জনকে ধর্মান্তরিতকরণ এবং ৫৫৭টি লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার অপরাধের ঘটনাস্থল মঠবাড়িয়ার ফুলঝড়ি, ললি ও আঙ্গুলকাটা। ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে সাক্ষী করা হয়েছে ৪৬ জনকে। তাদের মধ্যে ৪০ জন ঘটনার এবং ৬ জন জব্দ তালিকার সাক্ষী।
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
No comments:
Post a Comment