বাংলাদেশে সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবের স্তর এবং শ্রেণীসমূহের ভেতরকার অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব
তারিখ: ১৬ নভে ২০১১
http://www.mongoldhoni.net/revolutionary-struggle-of-proletariat/
লিখেছেন: মনজুরুল হক

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ; মানব মুক্তির পথ
আগের লেখায় (দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ প্রসঙ্গে মার্কসীয় ব্যাখ্যা এবং বাংলাদেশের বাম রাজনীতি) হেগেল এবং ফয়েরবাখের ভাববাদী দর্শন এবং দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। সেই দর্শন থেকে কিভাবে মার্কসের বস্তুবাদ এবং দ্বন্দ্বাত্মক বস্তুবাদের বিকাশ সেটাও আলোচিত হয়েছিল। বিশ্ব পরিস্থিতি বদলে যাবার পর বিশেষ করে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের পর মার্কসের দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদেরও গুণগত পরিবর্তন এসেছে। নতুন বিশ্ব পরিস্থিতিতে দ্বন্দ্বের বিকাশ এবং দ্বন্দ্বের বিভিন্ন দিক উন্মোচিত হয়েছে। আরো পরে চীনের বিপ্লব সম্পন্ন হলে বিশ্ব পুঁজিবাদ, সর্বহারা শ্রেণী, সর্বহারা শ্রেণীর শত্রু-মিত্র, কৃষি সমস্যা, সাম্রাজ্যবাদের হুমকি ইত্যাদি বিষয়গুলি সামনে চলে আসায় দ্বন্দ্বের বিভিন্ন দিক নতুন করে ভাবতে হয়েছে। নতুন সারসংকলন করতে হয়েছে এবং সেটি করেছেন মাও সেতুং। চীন বিপ্লবের সময়ই মাও ‘দ্বন্দ্বের নিয়ম’কে দ্বন্দ্ববাদের মূল নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ইতিপূর্বে তিনটি, চারটি বা পাঁচটি নিয়মকে দ্বন্দ্বের মূল নিয়ম বলে চিহ্নিত করা হতো। তিনিই প্রথম উল্লেখ করেন ‘দুয়ে মিলে এক’ একটি সমন্বয়বাদী ধারা। এই দার্শনিক ব্যাখ্যাকে তিনি খণ্ডন করেন ‘এক দুয়ে বিভক্ত হয়’ এই তত্ত্ব দিয়ে। এর সাথে যুক্তভাবে ‘সংশ্লেষণ’ সম্পর্কিত ধারণাকেও তিনি বিকশিত করেন। তিনি দ্বন্দ্বে নতুন ব্যাখ্যা দেন- ‘দ্বন্দ্বে সার্বজনীনতা ও বিশিষ্টতা, প্রধান দ্বন্দ্ব, দ্বন্দ্বে বৈরিতা ও অভেদ’। মার্কসীয় জ্ঞানতত্ত্বকে তিনি সমৃদ্ধ করেন-সকল জ্ঞানের মূল উৎস হিসেবে অনুশীলনকে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে; একই সাথে বস্তু ও চেতনার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন জ্ঞানের দ্বন্দ্ববাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এর কোনোটিই একাডেমিক বা পণ্ডিতি আলোচনা ছিল না। বরং বাস্তব বিপ্লবী সংগ্রাম ও শ্রেণী সংগ্রামের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ও তাকে সেবা করার জন্যই তিনি এগুলো আবিষ্কার করেন, যা বিপ্লবী অনুশীলনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।

আমরা এবার আমাদের দেশের বাস্তব অবস্থায় প্রধান দ্বন্দ্ব কি, দ্বন্দ্বের প্রধান দিক কি, সার্বজনীনতা কি বা বিশিষ্টতা কি সেই আলোনায় যাব।
বিশ্ব বাজার ব্যবস্থার অধীনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহ এখর আর কোনো ‘স্বাধীন’ রাষ্ট্র নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নয়া কৌশলে সাম্রাজ্যবাদের অনুপ্রবেশ অর্থনৈতিকভাবে এখন আর কোনো রাষ্ট্রকে স্বাধীন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতায় রাখেনি। তাই জাতীয় বুর্জোয়ার সাথে সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। শাসক শ্রেণীর সাথে ব্যাপক জনগোষ্ঠির দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। শাসক গোষ্ঠির একাংশের সাথে ক্ষমতাবান অন্য অংশের দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। এর সাথে আছে গ্রামীণ ধনী কৃষকের সাথে ভূমিহীন ক্ষেতমজুরের দ্বন্দ্ব, ক্ষুদে কৃষকের সাথে জোতদারের দ্বন্দ্ব, গ্রাম্য জোতদার-ভূমিমালিকদের সাথে শহুরে শ্রেণীর দ্বন্দ্ব, মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদীদের সাথে স্থায়ী-সাময়ীক শ্রমিক শ্রেণীর দ্বন্দ্ব, কৃষি নির্ভর শ্রেণীর সাথে শহুরে ব্যবসায়ী, লুম্পেন শ্রেণীর দ্বন্দ্ব, ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠির সাথে নেতৃত্বদানকারী বৃহৎ জাতিগোষ্ঠির দ্বন্দ্ব, শিক্ষিত মদ্যবিত্ত শ্রেণীর সাথে অশিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দ্বন্দ্ব এবং ভাসমান জনগোষ্টির সাথে ক্ষুদে মালিকদের দ্বন্দ্ব। এই সব দ্বন্দ্বের মীমাংসার ক্ষেত্রে আমাদের বাস্তব অবস্থার নিরীখে প্রধান দ্বন্দ্ব কোনটি?
নিশ্চিতভাবেই ব্যাপক অবহেলিত, অত্যাচারিত, নিপীড়িত শ্রেণীর দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বে প্রধান দিক হচ্ছে, যেহেতু শাসক শ্রেণী দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠির একাংশের প্রতিনিধিত্ব করে, এবং শাসকশ্রেণীর দু‘টি বা তিনটি রাজনৈতিক দল সেই প্রতিনিধি, তাই শাসক শ্রেণীর বাইরের বিশাল জনগোষ্ঠির মুক্তিই আশু লক্ষ্য। এখন পর্যন্ত যে মুক্তির অনুশীলন দেখা যায় নির্বাচনের মাধ্যমে শাসকশ্রেণীর এক অংশ থেকে আর এক অংশে পুনঃস্থাপনে। এই সঙ্ঘবদ্ধ শাসকশ্রেণীকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে নির্বাচনই এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রতিষেধক মনে করা হয়, যা শাসকশ্রেণীকে উচ্ছেদ তো করেই না, বরং এক রঙের শেণী থেকে আর এক রঙের শ্রেণীর খপ্পরে গিয়ে পড়ে শাসিত জনগণ। কেবলমাত্র ব্যাপক সহিংস বিপ্লবই পারে এই জনগণকে মুক্তি দিতে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সেই কাজটি কারা করবে? কিভাবে করবে? কোন শ্রেণীর নেতৃত্বে কোন কোন শ্রেণীর সমন্বয়ে করবে?
এই পরিবর্তন যে নির্বাচনের মাধ্যমে আসবে না সেটি পরীক্ষিত সত্য। রাশিয়ায় বিপ্লবকালিন কুখ্যাত কাউৎস্কী যে তত্ত্ব আবিষ্কার করে ইতিহাসে কুখ্যাতি পেয়েছিলেন, সেই কাউৎস্কীর ভাব ধারার বুদ্ধিজীবী, অনুশীলনকারী, রাজনৈতিক চেতনাধারীরা এদেশেও ক্রমাগত সাধারণ জনগণকে নির্বাচনী আফিম খাইয়ে বেহুশ করে রেখেছে এবং রাখতে চায়। তারা ইনিয়ে বিনিয়ে একটু ভালো ধরণের নির্বাচন, একটা জাতীয় সরকারের মডেল, সাম্রজ্যবাদ বিরোধীতার জিগির, সুষ্ঠু নির্বাচন পদ্ধতি, দেশপ্রেমিক সরকার, গণ-অভ্যুত্থান, ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়া কল্পিত আন্দোলন,ধীরে ধীরে রাষ্ট্র ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার মত সংশোধনবাদী যুক্তি ব্যাখ্যা দিয়ে কার্যত সহিংস সর্বহারা বিপ্লবকে অস্বীকার করতে চান,আড়াল করতে চান। এ প্রসঙ্গে লেনিন বলেন; ‘পার্লামেন্টারি পথ হলো বার্নস্টেইনবাদ, কাউৎস্কীবাদ কর্তৃক বর্ণিত নির্ভেজাল হীন সুবিধাবাদ। সর্বহারা শ্রেণীর বৈপ্লবিক একনায়কত্বের চরম বিকৃতি এটা’। (‘সর্বহারা বিপ্লব ও দলত্যাগী কাউৎস্কী’, ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ নি.র.সং, মস্কো, ১৯৫২,২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৭)
এখানে রাষ্ট্র নিজেই হচ্ছে শক্তি প্রয়োগের একটি রূপ। রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল উৎপাদনই হচ্ছে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিভিন্ন আধা-সামরিক বাহিনী। ইতিহাস শিক্ষা দিয়েছে যে, নিজেদের শাসন রক্ষা করার জন্য সকল শাসকশ্রেণীই শক্তিপ্রয়োগের উপর নির্ভর করে। সর্বহারা শ্রেণী অবশ্যই শান্তিপূর্ণ পথে ক্ষমতা দখলের পথই পছন্দ করত। কিন্তু বিপুল সংখ্যক ঐতিহাসিক নজির দেখিয়ে দেয় যে, প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণীসমূহ কখনোই স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ত্যাগ করে না। ক্ষমতার প্রশ্নে সর্বহারা শ্রেণীকে একমাত্র দিক নির্দেশনা দেয় মার্কসবাদ-লেনিনবাদ। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মৌলিক শিক্ষাবলি অনুযায়ী, প্রত্যেক বিপ্লবেরই মূল প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রশ্ন। আর সর্বহারা বিপ্লবের মূল প্রশ্ন হচ্ছে শক্তি প্রয়োগের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল ও বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে চূর্ণ-বিচূর্ণকরণ, সর্বহারাশ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা এবং সর্বহারা রাষ্ট্র দ্বারা বুর্জোয়া রাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্তকরণ। (লেনিন, ‘প্রফেটিক ওয়ার্ডস’, সং.র. মস্কো, ১৯৬২, ২৭শ খণ্ড, পৃঃ ৪৯৬) এ প্রসঙ্গে মাও-এর উক্তি হচ্ছে, “শ্রেণী বিভক্ত সমাজে বিপ্লব ও বিপ্লবী যুদ্ধ অপরিহার্য, আর এগুলো ছাড়া সমাজ বিকাশের কোনো অগ্রগমন সম্পন্ন করা এবং প্রতিক্রিয়াশীল শাসকশ্রেণীগুলোকে উচ্ছেদ করা অসম্ভব” (‘দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে’, নি.র.ইং.সং, ১৯৬৪, ১ম খণ্ড, পৃ:৩৪৪)
এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশে সর্বহারাশ্রেণী কর্তৃক রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার জন্য ‘সর্বহারা শ্রেণী’ প্রস্তুত কি-না? বাংলাদেশে সর্বহারা শ্রেণী কারা?সর্বহারা শ্রেণী বলতে সাধারণভাবে বোঝায় যাদের হারাবার মত কিছুই নাই, অর্থাৎ সহায় সম্পদহীন শ্রেণী। মোটা দাগে শ্রমিক শ্রেণী। সঠিকার্থে শিল্পীয় শ্রমিক শ্রেণী। যেহেতু বাংলাদেশে পশ্চিমা বিশ্বের মত পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটেনি, বাংলাদেশের অর্থনীতি কল কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয়লব্ধ পুঁজি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নয়। এই পুঁজি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতেখুব সামান্য অবদান রাখে। একাত্তর পরবর্তী সময়ে শিল্পের বিকাশকে কেউ কেউ মনে করেন ‘শিল্পবিপ্লব’, কিন্তু তারা এটি খতিয়ে দেখেন না যে, বাংলাদেশের বাজেটের কত ভাগ শিল্প উৎপাদন থেকে আসে, কত ভাগ বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো রেমিটেন্স থেকে আসে কিংবা কত ভাগ এদেশে এ্যাসেম্বলিং শিল্প থেকে আসে? সরকারি হিসেবে জাতীয় অর্থনীতে ৬২ থেকে ৭২ ভাগ অর্থ যোগান দেয় গার্মেন্ট শিল্প। আবার আইডিপি বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের অধিকাংশ অর্থ আসে বিদেশি অনুদান থেকে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড.আবুল বারকাত তার এক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি নয়, এ দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি হচ্ছে সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদে উৎপাদক শ্রেণী, যারা ম্যান্যুয়ালি ছোট ছোট জিনিসপত্র বানায়, লেদ মেশিনে কলকব্জা বা স্পেয়ার পার্টস বানায়, তৈজসপত্র বানায়, কাঠের বা লোহার এবং মাটির জিনিসপত্র বানায়। সামগ্রিকভাবে তাদের অবদানের কোনো রেকর্ড না থাকায় সরকারি হিসেবে প্রধানত গার্মেন্ট সেক্টর, দ্বিতীয়ত বৈদেশিক রেমিটেন্সকেই জাতীয় বাজেট বা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি বলা হয়।
তার পরও দেশে যে কল কারখানা গড়ে উঠেছে তাতে কর্মরত শ্রমিকরা শিল্পীয় শ্রমিক হলেও বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়ার মত বিশাল ক্ষমতাবান এবং বর্ধিষ্ণু শ্রেণী নয়। এই কল-কারখানায় কাজ করা শ্রমিক শ্রেণী মূলত ক্ষুদে কৃষক বা ভূমিহীন কৃষক অবস্থান থেকে শিল্প শ্রমিকে রূপান্তর ঘটেছে। যা নেতৃত্ব দানকারী অবস্থানে পৌছুতে পারেনি। এর বাইরে সবচেয়ে বেশি যে শ্রেণীর দেখা মেলে তারাই বাংলাদেশের সর্বহারাশ্রেণী হিসেবে বর্ধিষ্ণু। তারা ভূমিহীন ক্ষেতমজুর, নিজের ঘরে বসবাসকারী ক্ষেতমজুর এবং সামান্য পরিমাণ ভিটে বাড়ির মালিক দরিদ্র জনগোষ্ঠি। এরাই বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। সুতরাং শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে গরিব কৃষক শ্রেণীকে প্রধান শক্তি ধরে এরাই বিপ্লবের প্রধান চালিকা শক্তি হতে পারে। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, শাসক শ্রেণীর সাথে ব্যাপক জনগোষ্ঠির দ্বন্দ্ব, অশিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দ্বন্দ্ব এবং ভাসমান জনগোষ্টির সাথে ক্ষুদে মালিকদের দ্বন্দ্ব। গ্রামীণ ধনী কৃষকের সাথে ভূমিহীন ক্ষেতমজুরের দ্বন্দ্ব, ক্ষুদে কৃষকের সাথে জোতদারের দ্বন্দ্ব, গ্রাম্য জোতদার-ভূমিমালিকদের সাথে শহুরে শ্রেণীর দ্বন্দ্ব, মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদীদের সাথে স্থায়ী-সাময়ীক শ্রমিক শ্রেণীর দ্বন্দ্ব, কৃষি নির্ভর শ্রেণীর সাথে শহুরে ব্যবসায়ী, লুম্পেন শ্রেণীর দ্বন্দ্ব।
এখন, যেহেতু বাংলাদেশে পুঁজির বিকাশ না ঘটায় পুঁজিবাদ দেশের শাসকশ্রেণী নয় (পুঁজিবাদের ক্রমান্বয় বিকাশের কারণে তারা শাসকদের একটি অংশ), যেহেতু বিপ্লবের প্রধান চালিকা শক্তি শ্রমিক শ্রেণী যথেষ্ট পরিমাণ শক্তিশালী এবং সংগঠিত নয়, যেহেতু ‘পুঁজিবাদ‘ নিপীড়িত জনগোষ্ঠির প্রধান ‘শত্রু‘ নয়, যেহেতু এই বিপ্লবে শ্রমিকশ্রেণীকে মিত্র হিসেবে ক্ষুদে কৃষক, ভূমিহীন কৃষক, নিপীড়িত মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে সাথে নিতে হবে,যেহেতু এই বিপ্লবের অংশিদাররা কোনো না কোনোভাবে জোত এবং জমির মালিক, সম্পদের মালিক, সেহেতু এটা সর্বহারার ক্ষমতা দখলের বিপ্লব নয়। এই বিপ্লবের চরিত্র অনেকটা সর্বহারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মত হলেও এটা কোনোও ভাবে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নয়। যেহেতু এই বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ করে শ্রমিক শ্রেণীর শাসন কায়েম হবে না, বরং পুঁজিবাদ,সামন্তবাদ, সাম্রাজ্যবাদের দালাল বুর্জোয়া শ্রেণী, আমলা মুৎসুদ্দি, ধনী কৃষকদের এবং জাতীয় মুক্তি প্রশ্নে আন্তর্জাতিক লুটেরা চক্র, সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী চক্র, লুটপাট আর অবৈধ উপায়ে সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখা দুবৃত্ত চক্র, শাসকদের দালালী করে নব্য শাসক হয়ে ওঠা ভাড়াটে লম্পট চক্রকে উচ্ছেদ করে ব্যাপক জনগণের মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে, সেহেতু এই বিপ্লবের চরিত্র সমাজতান্ত্রিক নয়। তাই মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মৌলিক শিক্ষাবলি অনুযায়ী, প্রত্যেক বিপ্লবেরই মূল প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রশ্ন। আর সর্বহারা বিপ্লবের মূল প্রশ্ন হচ্ছে শক্তি প্রয়োগের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল ও বুর্জোয়া রাষ্ট্র যন্ত্রকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করণ, সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা এবং সর্বহারা রাষ্ট্র দ্বারা বুর্জোয়া রাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্তকরণ হলেও এবং এই বিপ্লবের সহিংস গণযুদ্ধের মাধ্যমে হলেও এই বিপ্লব সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নয়। বরং এটা অনেকটা জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে, জোত-এর বিরুদ্ধে রাশিয়ার শ্রমিক-কৃষক শ্রেণীর প্রথম বুর্জোয়া বিপ্লব বা জাপ-চিয়াং কাইশেক চক্রের বিরুদ্ধে চীনের ব্যাপক শ্রমিক-কৃষকের জাতীয় মুক্তির বিপ্লবের মত জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব। এই জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হবার পরই কেবল বাংলাদেশের সর্বহারা শ্রেণী পুঁজিবাদী সমাজের সারমর্মকে বুঝতে পারবে এবং সামাজিক শ্রেণীগুলির মধ্যকার শোষণের সম্পর্কগুলিকে সর্বহারা শ্রেণীর নিজ ঐতিহাসিক কর্তব্যকে বুঝতে পারবে। আর তখনই সর্বহারা শ্রেণী ‘নিজের জন্য-শ্রেণীতে’ উপনীত হতে পারবে।
যেহেতু এই বিপ্লবের জন্য শ্রমিক শ্রেণীকে প্রধান মিত্র হিসেবে কৃষক শ্রেণীকে সাথে নিতে হবে, এবং সেই কৃষকদের মধ্যে জমির মালিক কৃষকও থাকবে। থাকবে মিত্র হিসেবে গণতান্ত্রিক দলসমূহ, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দলসমূহ, নিপীড়ক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জাতীয় চরিত্রের বুর্জোয়া দলসমূহ,সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ-আধিপত্ববাদ বিরোধী দলসমূহ, শ্রেণী বিভক্ত সমাজের শিক্ষিত অংশ হিসেবে ব্যাপক মধ্যবিত্ত ছাত্র-বুদ্ধিজীবী, ছোট চাকরিজীবী, ছোট ব্যবসায়ী, সেহেতু সর্বহারা শ্রেণীর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সকল শর্ত পূরণ করে, কিংবা সর্বহারা শ্রেণীর সকল রণকৌশল-রণনীতি অনুসরণ করেও এটা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয়ে উঠতে পারে না।
রাশিয়া, চীন, কিউবাসহ বিশ্বের অন্যান্য সকল বিপ্লবের মত বিশ্বের যে কোন বিপ্লবেইমার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিপ্লবের আদর্শ অনুযায়ী বিপ্লব সম্পন্ন করতে হবে শ্রমিকশ্রেণীকে। শ্রমিকশ্রেণীর এই বিপ্লবে প্রয়োজন পড়বে একটি নেতৃত্বদানকারী মার্কসবাদী-লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টি,গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে গঠিত বাহিনী, সমমনা বা সমআদর্শের দলগুলোর সাথে যুক্তফ্রন্ট, এবং রণকৌশল-রণনীতির উপর ভিত্তি করে দীর্ঘ মেয়াদি সংগ্রামের ভিত্তিতে ব্যাপক জনগণকে মিত্র হিসেবে সাথে নিয়ে জনগণের চূড়ান্ত ক্ষমতায়ন। (‘লেনিনবাদের প্রশ্নাবলি সম্পর্কে’, রচনাবলী,ইং, সং, মস্কো, ১৯৫৪, ৮ম খণ্ড) এই ‘ব্যাপক জনগণ’ বলতে কেবল শ্রমিক-কৃষক বোঝায় না। বরং সাম্রজ্যবাদবিরোধী দেশ প্রেমিক বুর্জোয়া,আধিপত্ববাদবিরোধী দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী, একচেটিয়া পুঁজিবাদবিরোধী জাতীয় পুঁজিবাদী, ছাত্র-শিক্ষক-মধ্যবিত্ত শ্রেণীকেও বোঝায়।
বাংলাদেশে এমন পার্টির অস্তিত্ব আছে কি-না, বা যারা নিজেদের এমন পার্টি দাবি করেন তারা আদৌ এই সকল শর্ত পূরণ করেন কি-না, বর্তমান সমাজ বিশ্লেষণে এই বাস্তবতা আছে কি-না সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ।
বিশ্বের যে সকল দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে সেই সব দেশের পার্টি লাগাতার নিজেদের সমাজে অভ্যন্তরের ক্রমাগত পরিবর্তিত হওয়া শ্রেণীসমূহের বিশ্লেষণ করেছেন। যাকে এক কথায় বলা যায়- ‘শ্রেণী বিশ্লেষণ’। বাংলাদেশে এটি ঘটেনি। যে পার্টিগুলো নিজেদের মার্কসাবাদী-লেনিনবাদী বলে দাবি করেন তাদের কারোরই বিশেষ ব্যবস্থায় বিশেষ শ্রেণী বিশ্লেষণ নেই। প্রয়াত আলাউদ্দিন একটি বই লিখেছিলেন- ‘বাংলাদেশের শ্রেণী বিশ্লেষণ’ নামে। সেটি ব্যাপকভাবে জনগণের হাতে পৌছায়নি। তার পূর্বসূরিরা তাকে ‘পাগল হয়ে গেছেন’ আখ্যা দেয়ায় তার শ্রেণী বিশ্লেষণ সম্পর্কে নেতি বাচক প্রচার হওয়ায় সেই বইটি সেভাবে গ্রহণযোগ্যতাপায়নি। কিন্তু প্রতিটি পার্টি তাদের দলিল দস্তাবেজ ও দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণের সময় একটা গড় শ্রেণীবিশ্লেষণ করে থাকেন। সেই বিশ্লেষণ তাদের গঠনতন্ত্র বা প্রচার পুস্তিকায় অংশ বিশেষ হিসেবে দেখা যায়, কিন্তু সমাজের অভ্যন্তরে শ্রেণী সমূহের চারিত্রিক এবং উৎপাদন সম্পর্কগুলো যে বছর বছর পরিবর্তিত হতে থাকে, তাৎক্ষণিক শ্রেণীবিশ্লেষণ যে আর আগের অবস্থানে থাকে না সেটি তারা বিবেচনায় আনেন না। তার ফলে সত্তর দশকে সামাজিক শ্রেণীসমূহের অবস্থানকে বিচার করা হয় নব্বই দশকে এসেও। যেমন, এখন বলা হচ্ছে বাংলাদেশে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে গেছে, শ্রমিকশ্রেণী সংগঠিত, শিল্প শ্রমিকরাই সংখ্যাগুরু! কিন্তু তারা বিষয়টি তলিয়ে দেখছেন না যে, লুটেরা লুম্পেন ধরণের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সমগ্র শ্রমিক শ্রেণীকে কিভাবে কলুষিত করে রেখেছে।
বাংলাদেশের এমন কোনোও একটি হাট-বাজার, পাড়া-মহল্লা, অলি-গলি পাওয়া যাবে না যেখানে তথাকথিত ‘সমবায়’ বা ‘সিন্ডিকেট’ নেই! ছোট ছোট ব্যবসা করা ব্যবসায়ী, দোকানের কর্মচারি, অফিসের পিয়ন, গৃহবধূ, গৃহকর্মী, ড্রাইভার, রিকসা চালক, ভ্যান চালক, ক্ষুদে মেরামতকারী,দিনমজুর এবং এই সব ছোট ছোট কাজ করে নিজেদের টিকিয়ে রাখার সংগ্রামরত মানুষগুলো কোনও না কোনওভাবে এই সব ‘সমবায়’ বা ‘সিন্ডিকেট’ এর কাছে বন্দী। সমগ্র ব্যাপারটা স্রেফ সুদে টাকা লাগিয়ে লাভ করার ব্যবসা। যার শিকার এদেশের প্রায় ছয়-সাত কোটি মানুষ। এরই উচ্চতর ব্যবস্থা হচ্ছে এমএলএম বা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং। এখন এই ধরণের দুর্বৃত্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড করা থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার জন্য শ্রমিকশ্রেণী নির্বাচন করা নিঃসন্দেহে দুরূহ কাজ। ঠিক একই ঘটনা ঘটে শিল্প শ্রমিকদের বেলায়ও। সেখানেও ওই দুবৃত্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় বসবাসকারী কিছু ক্ষমতাবানদের দ্বারা।
বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক বা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব, যা-ই হোক না কেন তা করতে সমাজে বিদ্যমান এই সমস্ত বিষয়গুলি বিবেচনায় আনতে হবে। তাত্ত্বিক দর্শন তো চোখের সামনে খোলাই আছে, আছে সেই দর্শনকে কাজে লাগানোর ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং উপমাসমূহ। আরো আছে এর ব্যতিক্রম ঘটলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে কি কি বিপর্যয় ঘটেছে তার নিদর্শনসমূহ। আরো মজুদ আছে এদেশের ঐতিহাসিক সংগ্রামের ঐতিহ্যসমূহ। কিন্তু সেই সব ইতিবাচক উপাদান তখনই কাজে আসবে, যখন ভেতরে পুঞ্জিভূত ক্ষোভ বা বিদ্রোহ, আকাঙ্খা বাইরের শক্তি দ্বারা পরিচালিত করার নীতি-কৌশল একীভূত করে একটি দৃঢ়চেতা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী পার্টি গড়ে উঠবে। তার আগে বিদ্যমান পার্টিগুলোর রংবেরঙের তত্ত্ব আর বিশ্লেষণ বর্তমান বিপ্লবাকাঙ্খী মানুষকে বিপথগামী এবং বিভ্রান্ত করে যাবে। যাচ্ছেও এবং এর খেসারত দিচ্ছে একটার পর একটা প্রজন্ম।।
No comments:
Post a Comment