একুশের ষাট বছর :: আমরা কি পরাজিত হবো ?
তারিখ: ০৬ ফেব্রু ২০১২
ট্যাগসমূহ: আদিবাসী, একুশ, জাতিরাষ্ট্র, বিপন্ন ভাষা, বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস,ভাষা, ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সত্যজিত দত্ত পুরকায়স্থ, সাহিত্য, ১৯৫২
http://www.mongoldhoni.net/60-years-of-ekush-can-we-be-defeated/
লিখেছেন: সত্যজিত দত্ত পুরকায়স্থ
১.
ভাষা একটি পুর্নাঙ্গ জীবনব্যবস্থার ছবি। আমাদের প্রতিনিয়ত শিক্ষন বা সামাজিক জীব হিসাবে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া সম্পাদনের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভাষা। ভাষার যথাযথ প্রকাশ মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করে তুলেছে। ভাষা শুধু যে সংস্কৃতির বাহন তাই নয়, ভাষা নতুন সংস্কৃতির জন্মও দিতে পারে। বাংলাদেশ তার সবচে’ বড় উদাহরণ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রদর্শিত পথ ধরেই বাংলাদেশ নামক জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের জন্ম রাষ্ট্রবিজ্ঞানে চিন্তার নতুন দ্বার উন্মোচন করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো একটি ভাষাভিত্তিক জাতি হিসাবে আমরা আমাদের ভূখন্ডের অভ্যন্তরে কোন ভাষা বিলুপ্তির দায় নিবো কি না। আমাদের উন্নাসিকতা, বিশ্বায়নের প্রভাব যাই বলিনা কেন বাস্তবতা হলো আমাদের দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠির মাতৃভাষার অস্তিত্ব আজ হুমকির সম্মুখিন। মাতৃভাষার অভাববোধ থেকে ব্যক্তির মধ্যে পরিচিতি সংকট দেখা দিতে পারে। আফ্রিকা মহাদেশে চলমান সংঘাতের জন্য অনেকেই তাদের মাতৃভাষার বিলুপ্তিকে দায়ী করে থাকেন।
২.
ইউনেস্কোর মাতৃভাষা দিবসের ঘোষণার মূল বক্তব্যই হলো ভাষার বহুত্ব, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র ও ভিন্নতাকে সংরক্ষণ করা। অর্থাৎ যত ক্ষুদ্রই হোক তা বিলুপ্ত হতে দেয়া যাবে না। ইউনিস্কোর মতে বিশ্বে ভাষার সংখ্যা ৬৯১২টি, যার মধ্যে প্রতি ১৪ দিনে একটি করে বিপন্ন ভাষার মৃত্যু ঘটছে। ভাষার বিপন্নতা পরিমাপ করা হয় যদি কোন ভাষার ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫০০০০ এর নিচে নেমে যায়। আবার সংখ্যাটি ৫০০০০ এর বেশী হলেও যদি শিশু-কিশোরের সংখ্যা আনুপাতিক হারে কম হয় তাহলে সে ভাষা বাঁচিয়ে রাখা দুরুহ। ২০১০ সালের জানুয়ারীতে ভারতের আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ৮০টি আদিবাসী গোষ্টির সবচেয়ে বৃদ্ধ সদস্য বার সর ৮৫ বছর বয়সে মারা যান। তিনি ছিলেন আদিবাসী ভাষা জানা সর্বশেষ ব্যাক্তি। ইন্দোনেশিয়ার কায়েলি ভাষার জীবিত শেষ তিন জন তাদের মাতৃভাষার অনেক শব্দ মনে করতে পারছেন না। তাদের বয়স ৬০ এর বেশী। চিলির কোয়াসকার ভাষা জানা লোক মাত্র ২০ জন, যার মধ্যে ৪ জন বাদে সবাই দ্বিভাষী। অস্ট্রেলিয়ার জিঙ্গিল ভাষা জানা মাত্র ১০ জন বেঁচে আছেন এবং গুগুরেরা আদিবাসীদের মধ্যে মাত্র ১৫ জন তাদের মাত্ভাষা জানেন।
৩.
বাংলাদেশে ৫৪টি আদিবাসী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠি বাস করেন, যাদের অধিকাংশের মাতৃভাষা আজ বিলুপ্তির পথে। যেমন সিলেটে বসবাসকারী আদিবাসী পাত্র সম্প্রদায়ের মোট জনসংখ্যা ৪০০-৫০০ এর মধ্যে। তাদের মাতৃভাষা জানা প্রবীণদের অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন এবং বর্তমান প্রজন্ম এই ভাষা সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানে না। রাজবংশী, ভোজপুরী ভাষার ইতিমধ্যেই মৃত্যু ঘটেছে, কোচ, খাড়িয়া ভাষা শুধু প্রবীণেরাই জানেন। প্রাতিষ্ঠানিক অনাগ্রহ ও চর্চ্চার অভাবে ৩০টি ভাষা বিলুপ্তির পথে। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আদিবাসীদের মাতৃভাষায় পাঠ্যবই রচনার উদ্যাগ। ভাষার উপর তথাকথিত সংখ্যাগুরু শাসকগোষ্ঠির আগ্রাসনের রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। অতি কৌশলে মুছে ফেলা হতো মাতৃভাষা চর্চা প্রক্রিয়া। পাকিস্তানী উপনিবেশিক শাসনামলে এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধেই ছিল আমাদের লড়াই। আমরা আফ্রিকার দিকে থাকালেও এর সত্যতা সর্ম্পকে নিশ্চিত হতে পারি। আফ্রিকার অনেক দেশের ভাষা “পিজিন ইংরেজি” নামে পরিচিত, অর্থাৎ মাতৃভাষার সাথে ইংরেজীর সংমিশ্রণ। এমনকি খোদ বৃটেনে ইংরেজীর আধিপত্যে ১৭৭৭ সালে “কর্নিশ” ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যায়। আমাদের দেশেও এর প্রমান পাওয়া যায়, হাজংদের নিজস্ব ভাষায় প্রচুর বাংলা শব্দ ঢুকে গেছে। কিন্তু আমরা যদি অতীত খুঁজে দেখি তাহলে এই জনপদের আদিবাসী ভাষাগুলোর সমৃদ্ধ ইতিহাস খুঁজে পাই। যেমন চাকমা বর্ণে বাইবেল প্রকাশ পায় ১৮৬০ সালে। জার্মান ভাষা বিজ্ঞানী জর্জ গিয়ার্সন ১৯০৩ সালেই তঞ্চ্যঙ্গা ভাষাকে স্বতন্ত্র ভাষার মর্যাদা দেন।
৪.
ভাষার বিলুপ্তির সাথে সাথে জীবনের মৃত্যু ঘটে। কোন জনপদে ভাষার বিলুপ্তির সাথে সাথে লোপ পায় ঐ জনপদের যুগ যুগের সঞ্চিত জ্ঞান,লোক সাহিত্য, রুপকথা। যেমন গারোদের আচিক ভাষার মৃত্যু ঘটলে এরসাথে মৃত্যু ঘটবে গারোদের পালাগান সেরেজিং-এর। এক একটি ভাষায় সঞ্চিত থাকে মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতিহাস, অভিজ্ঞতা। তাই ভাষার মৃত্যু শুধুমাত্র সংস্কৃতির জন্য বিপর্যয় নয়, সভ্যতারও পরাজয়। একুশের রক্তস্নাত বাংলাদেশে আমাদের জন্য যদি কোন ভাষার মৃত্যু ঘটে তাহলে একুশ পরাজিত হবে না, পরাজিত হব আমরা।।
তথ্যসুত্রঃ
১) ভাষা আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, সেলিনা হোসেন (জয়ধ্বনি, ২০০০)।
২) আদিবাসীদের মাতৃভাষার কি হবে ?, সঞ্জীব দ্রং (জয়ধ্বনি, ২০০৫)।
৩) বরাক উপত্যকার ভাষা সংগ্রামগাঁথাঃ চন্দন সাহা রায় (জয়ধ্বনি, ২০০৫)।
৪) বহুভাষার বাংলাদেশ, জীবিত ভাষার মরনযাত্রা, এম এ মোমিন, দৈনিক প্রথম আলো, ৩রা ফেব্রুয়ারী, ২০১২।
No comments:
Post a Comment