যৌন সন্ত্রাস, পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থারই বাই-প্রডাক্ট :: প্রতিবাদী সৈনিকদের লাল সালাম!!
তারিখ: ০২ ডিসে ২০১১
http://www.mongoldhoni.net/sexual-terrorism-a-byproduct-of-the-state-red-salute-to-the-fighters/
লিখেছেন: শাহেরীন আরাফাত
আমাদের দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে দীর্ঘকাল ধরে। কখনো তা হয়েছে প্রকাশিত, আবার কখনো বা থেকেছে অপ্রকাশিত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, তাতে তেমন কোন ভাটা লক্ষ্য করা যায়নি। নানাভাবে, নানাপন্থায় নির্যাতন চলে নারীর ওপর। নারীদের নির্যাতনের বিভিন্ন পন্থার মধ্যে খুন, ধর্ষণ, এ্যাসিড নিক্ষেপ, শারীরিক নির্যাতন, বখাটেদের দ্বারা যৌন হয়রানী ইত্যাদি নানা দিক রয়েছে। এমনকী পরিবারে সুখী মানুষের ভান করা নারীটিও কখনো মানসিকভাবে নির্যাতিত, যদিও বা তা থাকে অপ্রকাশিত। তবে বখাটেদের উৎপাত সাম্প্রতিককালে সমগ্র দেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অথচ এই যৌন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সমাজের কোন স্তর থেকেই সংঘবদ্ধভাবে কোন প্রতিবাদ আন্দোলনে রূপ নিতে না পারায় এই যৌন সন্ত্রাসীরা দলীয় পরিচয়ের কারণে রয়ে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলমান ছাত্র-শিক্ষক পরিচয়ধারী এই যৌন সন্ত্রাসী চক্রের বুর্জোয়া দলের লেজুরবৃত্তিতে কেবল ছাত্রীরাই নয়, শিক্ষিকারাও অত্যাচারিত। এই শিশ্ন সর্বস্ব যৌন সন্ত্রাসীরা মূলতঃ এই পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রেরই প্রতিফলন, আর তা ক্রমেই সমাজের সুগভীরে শিকড় গেড়ে চলেছে।
কুয়েট যখন যৌন সন্ত্রাসীদের আখড়া আর মদদদাতা সরকারী সন্ত্রাসী বাহিনী ছাত্রলীগ
খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)’এ সম্প্রতি ‘ইভ টিজিং’কে (প্রকৃতার্থে এটি যৌন সন্ত্রাস) কেন্দ্র করে যে রক্তাক্ত ঘটনার জন্ম হয়, তার সূত্রপাত হয় মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের (যন্ত্রকৌশল বিভাগ) দুই ছাত্রীকে (উভয় শিক্ষার্থী মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের) খান জাহান আলী হলের সামনে উত্তক্ত করাকে কেন্দ্র করে। এর আগেও এরকম ঘটনা বেশ কয়েকবার ঘটলেও এই ঘটনার পর মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব ‘ফেসবুক গ্রুপ’এ এই বিষয় নিয়ে নিন্দা জ্ঞাপন করে কিছু পোস্ট দেয়। কিন্তু এই গ্রুপটি ‘ক্লোজড’ থাকার পরেও কিছু মীরজাফরী চরিত্রের সহপাঠীদের কারণে ওই গ্রুপের কথা খান জাহান আলী হলের ‘ইভ টিজার গুরু’ গুলজার’এর কানে পৌছায়। এরপর গত ১০ অক্টোবর ২০১১ তারিখে মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের তিনজন ছাত্র (অংকুশ, অভ্র, সোহাগ)’কে খান জাহান আলী হলে ডেকে নিয়ে মার-ধর করা হয়। এর প্রতিবাদে ১২ অক্টোবর বেলা ১টা ১০ মিনিটে মানব বন্ধন করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা, সেখানে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর সম্মিলন ঘটে এবং ১৪ অক্টোবর মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টের ’০৮ ব্যাচ এবং রোকেয়া হলে শিক্ষার্থীরা (যৌন সন্ত্রাসের শিকার ছাত্রীরা রোকেয়া হলের) ওই সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও এর প্রতিকার চেয়ে উপাচার্য বরাবর পৃথক স্মারকলিপি জমা দেন। উপাচার্য ১দিনের মধ্যে বিচারের আশ্বাস দিলেও কার্যত এর কিছুই হয় না। এরই মাঝে রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও একজোট হয়ে বিচারের দাবীতে ১৭ অক্টোবর প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও করে, এতে নেতৃত্ব দেন রোকেয়া হলের ছাত্রী বর্ণালি বিশ্বাস। এসময় সিপিবি নেতা এডভোকেট ফিরোজ আহমেদ ক্যাম্পাসে আসেন এবং ছাত্রীদের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি সেখানে মেয়েদের আশ্বাস দেন, যদি এর বিচার না হয়, তাহলে তিনি উপাচার্যকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন বলে। এরপরে তিনি উপাচার্যের সাথে দেখা করতে যান, কিন্তু এই সাক্ষাতের পর তিনি তার অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও এর বিচার না হলে তিনি উপাচার্যকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন বলে শিক্ষার্থীদের কাছে তার বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করেন এবং তদন্ত কমিটি গঠন ও কমিটির রিপোর্ট প্রদানের জন্য শিক্ষার্থীদের নিকট ৭ দিন সময় চান, বলা হয় ২৪ অক্টোবর কমিটি তার রিপোর্ট জমা দিবে। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা যায়, উপাচার্য সিপিবি নেতাকে যৌন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনকে বিএনপি সমর্থিত শিক্ষক ড. খন্দকার আফতাব হোসেন’এর ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেন, তিনি সেসময় বলেন- “আপনি জানেন যে, আমি আওয়ামী লীগ করি; আর এরা সাধারণ শিক্ষার্থী নয়, এগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীর নাম নিয়ে বিএনপি’র ড. খন্দকার আফতাব হোসেন’এর আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র”।
আজ পর্যন্ত এদেশে গঠিত কোন তদন্ত কমিটি যথাসময়ে রিপোর্ট জমা দেয়নি, এখানেও তার ব্যাত্যয় ঘটেনি। ২৪ তারিখ রিপোর্ট না দেওয়ায় রোকেয়া হলের শিক্ষার্থীরা হলের বাইরে নেমে আসে ও অবস্থান নেয়, এসময়ে উপাচার্য আন্দোলনকারী ছাত্রীদের নেতৃত্বে থাকা বর্ণালি বিশ্বাসকে ডেকে নিয়ে নানান অজুহাত দেখিয়ে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত সময় চান। আন্দোলনকারীরা এতেও সম্মত হলেন, যদিও এটি ছিল নিতান্তই কালক্ষেপণ। নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা যায়, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট উপাচার্যকে দেওয়া হলেও তাতে কিছু শক্ত সুপারিশ থাকায় (যা উপাচার্যের দলীয় পরিচয়ের জন্য আত্মঘাতী) তা প্রকাশ করা হয়নি। ৩০ তারিখেও রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি, সিন্ডিকেটের মিটিংয়ে কোন বিচারের আদেশও আসেনি, এর প্রতিবাদে ৬০/৭০ জন ছাত্রী উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিলে উপাচার্য তাদের অচিরেই বিচার হবে বলে উল্লেখ করেন এবং ছাত্রীদের হলে ফিরে যেতে নির্দেশ দেন। ২ নভেম্বর তারিখে রোকেয়া হল থেকে খেলার মাঠ অঞ্চল সিসি ক্যামেরার আওতাধীন থাকবে বলে উল্লেখ করে একটি চিঠি রোকেয়া হল বাদে সকল হলে পাঠানো হয়। কিন্তু রিপোর্ট এখনো প্রকাশিত হয়নি এবং প্রকৃত যৌন সন্ত্রাসীদের শাস্তি হয়নি। আর সন্ত্রাসীরা ভালই জানে যে, সরকার প্রধানের আশীর্বাদপুষ্ট ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসী লীগের সদস্যদের এসব রিপোর্টে কিছুই যায় আসে না!!
যেমনটা বেশিরভাগ আন্দোলনে হয়, এখানেও তাই হলো। বারংবার কালক্ষেপণের ফলে এবং ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় এই বিষয়টা মোটামুটি ধামা চাপা পড়েছিল। কিন্তু এর মাঝেই ফেসবুক ও ব্লগ সাইটগুলোতে (লেখকের নাম প্রকাশ না করে) বেশকিছু লেখালেখি হয় ওই যৌন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে। ফলে উত্তক্তকারীদের রাগ ক্রমশ বাড়তে থাকে। কিন্তু পরিস্থিতি তখনো স্বাভাবিক।
এমতাবস্থায়, ২৪ নভেম্বর কুয়েটের একটি বাস বরাদ্দ নেয় ছাত্রলীগ। তাদের বিরোধীদের শায়েস্তা করতে শহর থেকে এই বাসে করেই আনা হয় অস্ত্র-শস্ত্র। সেই সুবাদে কারো ব্যক্তিগত আক্রোশ থাকলে তাও মিটিয়ে নেওয়া যাবে। এখানে উল্লেখ্য যে, কুয়েটে ছাত্রলীগের একটি আহবায়ক কমিটি গঠন করা হলেও এই কমিটিকে অন্যান্য গ্রুপ থেকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে ছাত্রলীগের দুইটি গ্রুপ কুয়েটে কার্যকর, আবীর (এমই ’০৭) ও জোবায়ের (ইইই ’০৭) গ্রুপ। এই দুই গ্রুপই ‘ইভ টিজার গুরু’ গুলজার’এর সন্ত্রাসের মূল শক্তি, এদের প্রভাব বলয়েই সে তার যৌন সন্ত্রসের রাজত্ব কায়েম করেছে, বন্য শূকরের মতোই সে তার এই রাজত্বে ঘুরে বেড়ায়। গুলজার নিজেও ’০৭ ব্যাচের ছাত্র।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসারত অংকুশ
সর্ব শেষ ঘটনা। গত ২৯ নভেম্বর ২০১১ তারিখ দিবাগত রাত ১:৩০’এর দিকে অংকুশ জানতে পারে যে, তাকে আক্রমণ করা হতে পারে। ফলে ৩য় বর্ষের ছাত্র প্রীতম অংকুশ একুশে হলের বর্ডার হলেও সে রাতে ফজলুল হক হলে নিনাদ হাসান (প্রীতম অংকুশের সহপাঠী, বন্ধু)’এর রুমে আশ্রয় নেয়। কিন্তু গুলজারের নেতৃত্বাধীন ৪০/৫০ জন সন্ত্রাসীর একটা দল একুশে হলে টহল দিয়ে অংকুশকে খুঁজে না পেয়ে ২:১৫’এর দিকে ফজলুল হক হলে টহল দিয়ে নিনাদ’এর রুম থেকে নিনাদ এবং অংকুশ’কে নিচে কথা বলার জন্য ডেকে নিয়ে যায় এবং সেখান থেকে নতুন নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু হলের নিচে নিয়ে রড, কাঠ, বাঁশ দিয়ে মারতে শুরু করে। তাদের কথা ছিল, কে ব্লগ লেখে, তারা তার নাম জানতে চায়। এই সন্ত্রাসী চক্রের অন্যতম সদস্যরা হলো- গুলজার (সিই ’০৭), রাব্বি (সিই ’০৭), নাজমুল (ইইই ’০৮), সবুজ (ইইই ’০৮), ফয়সাল(সিএসই ’০৮), শিতুল (সিএসই ’০৮), তুষার (সিএসই ’০৮), বাপি (সিএসই ’০৮), অমিত (সিই ’০৮), প্রিয়দীপ (সিই ’০৮), বাপ্পি(সিই ’০৮), শিশির (সিই ’০৮), মুকুল (সিই ’০৮), মুন্না (সিই ’০৮), ফয়সাল (সিই ’০৮) সহ মোট ৪০ জনের মতো। নিনাদ এর মাথায় লোহার রড দিয়ে প্রচন্ডভাবে আঘাত করা হয় এবং সারা শরীরে বিশেষ করে পিঠে অসংখ্য বার রড দিয়ে মারা হয়। উল্লেখ্য পূর্বের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডেও এদেরই হাত ছিল। অংকুশ এর মাথা থেকে পা পর্যন্ত এমন কোন জায়গা বাদ নেই যে ওই আওয়ামী মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীরা মারতে বাকি রেখেছে। অংকুশ ও নিনাদ চিৎকার করতে গেলে তাদের মুখে বালি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

রডের আঘাতে থেতলে দেওয়া হাত
এক পর্যায়ে নিনাদকে সেখানেই ফেলে রেখে গুলজারের নেতৃত্বাধীন ওই সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা অংকুশকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যায় এবং অকথ্য গালাগালির সাথে বলা হয়- “আজ সারা রাত তোকে মারা হবে, কোন হলে নিয়ে গিয়ে মারব বল, চল তোকে খাজা হলে নিয়ে যাই।” কিন্তু এর মধ্যেই মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’এর ছেলেরা খবর পেয়ে লাঠি হাতে ছুটে আসে। সন্ত্রাসীরা ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে গেলে অংকুশকে সেখান থেকে সংকটাপন্ন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। অংকুশ ও নিনাদ দু’জনকে রাতেই এম্বুলেন্সে করে খুলনা মেডিকেল এ নিয়ে যাওয়া হয় এবং এখনও তারা সেখানেই চিকিৎসাধীন (এই লেখা যখন লিখছি, তখনো পর্যন্ত)।
এখানে উল্লেখ্য যে, সন্ত্রাসী হামলার শিকার প্রীতম অংকুশ একাধারে চিন্তাশীল লেখক, কবি এবং রাজনৈতিক কর্মী, তিনি একটি প্রগতিশীল বাম ছাত্র সংগঠনের (সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট) সদস্য এবং নিনাদ হাসান সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট’এর আহবায়ক।

পা থেকে মাথা পর্যন্ত শরীরের কোন স্থানই আঘাতমুক্ত ছিল না
যৌন সন্ত্রাসী ও সরকারী দলের উপাচার্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে চলমান এই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার কোন চেষ্টা বাদ রাখেননি। প্রথমে বলা হলো, এটি বিএনপি’র ষড়যন্ত্র; পরবর্তীতে বলা হলো, ছাত্রলীগ ও ছাত্র ফ্রন্টের ভেতরকার বিরোধ থেকেই এই মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এখন ওই সন্ত্রাসী চক্র একথাও ছড়াচ্ছে যে, অংকুশের সাথে গুলজারের ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে এই মারামারির ঘটনা ঘটেছে।
সরকার দলীয় সন্ত্রাসী ও তাদের মাস্টারদের এ এক আজব খেলা,দাবী আদায়ের আন্দোলনকে নস্যাত করার হীন প্রচেষ্টা। আমরা শুধুমাত্র এই যৌন সন্ত্রাসীদের উপযুক্ত বিচারই দাবী করছি না, সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন পরবর্তীতে এমন ঘটনা না ঘটে সে জন্য(কুয়েট) বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিকট দাবী জানাই।
হয়ত এই প্রতিবাদে কিছুই হবে না। যেখানে বিচার করার মানুষটিই অপর পক্ষের আশীর্বাদপুষ্ট। কিন্তু আমরা যারা এমন ঘটনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি, তাদের উচিৎ সংঘবদ্ধ হওয়া এবং সমন্নিতভাবে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। আমাদের অনুধাবন করতে হবে যে, আমরা একতাবদ্ধ হলে ওই গুটিকয়েক সন্ত্রাসী কিছুই করতে পারবে না। তারা কতজন অংকুশ-নিনাদ’কে মারবে, যখন শত-শত অংকুশ, শত-শত নিনাদ তাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবে, তখন কিন্তু পালানোর রাস্তাটুকুও ওই দলীয় পরিচয়ের সন্ত্রাসীরা পাবে না।

সন্ত্রাসী হামলার পর পরই তোলা অংকুশের ছবি
ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধেই কেবল যৌন সন্ত্রাসের নির্মূল সম্ভব
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিকট এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও বাস্তবিকার্থে এটি মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়। আর পর্যায়ক্রমে এসব ঘটনা ঘটে চললেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সমাজ, পরিবার, সরকার, আইন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেউই এই অবস্থার প্রতিকারে এগিয়ে আসেননি, সবাই থাকেন কেবল ধামাচাপা দেওয়ার তালে। আর তাই পরিস্থিতি দিন দিন আরো বিষিয়ে উঠছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তার উপরে সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা তাণ্ডব চালাচ্ছে, আর অন্যেরা ভয়ে সিটিয়ে পড়ছেন, আর এটাই চাইছে ওই সন্ত্রাসীরা। সরকার দলীয় যৌন সন্ত্রাসীদের উত্তক্ত করাটা যেন তাদের নিত্যদিনের কর্মে পরিণত হয়েছে, যেন প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক একজন ‘সেঞ্চুরিয়ান মানিক’ তৈরী করার ঠেকা নিয়েছে সরকার।
এই ঘটনাগুলোর অভ্যন্তরে রয়েছে সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানা কারণ। রাষ্ট্র ব্যবস্থার চরম অব্যবস্থার মাঝে পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়া নোংড়ামী থেকে উৎপন্ন যৌন সন্ত্রাসের জন্য প্রকৃতপক্ষে দায়ী হলো সেই দূষিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা, যেখানে সাধারণের অধিকার বড়ই সীমিত।
আর তাই এই যৌন সন্ত্রাস প্রতিরোধে প্রতিটি পাড়ায়-মহল্লায় বখাটেদের উৎপাত বন্ধে সচেতনতা কর্মসূচি এলাকার জনগণের মধ্য থেকেই গ্রহণ করতে হবে। কোন মেয়ে উত্ত্যক্ত হলে এলাকার সচেতন, শিক্ষিত, দায়িত্বশীল মানুষটিকেই মেয়েটি ও তার অভিভাবকদের পাশে এবং যৌন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। কোন কোন এলাকায় জনসাধারণ প্রতিরোধ গড়ে তুলে যৌন সন্ত্রাসীদের উৎপাত বন্ধ করতে পেরেছে এমন দু-একটি সংবাদ আমরা সংবাদপত্রে দেখেছি, যা আশার সঞ্চারক। ঠিক তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রকৃত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে এই সন্ত্রাসের মোকাবেলা করতে হবে। তাদের দলীয় সন্ত্রাসের শক্তি থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে সেই সন্ত্রাসের শক্তিই শুধু নয়, সকল স্বৈরাচারও নস্যি।
তাই মানুষের মধ্যে এমন প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। পুলিশ সরকারী দলের সন্ত্রাসীদের রক্ষায় এগিয়ে আসলেও সকলে মিলে প্রতিবাদ-প্রতিরোধে দ্বারাই আমরা এই সরকার দলীয় যৌন সন্ত্রাসীদের রুখে দিতে পারি, নির্মূল করতে পারি সকল সন্ত্রাসের বীজ আর তার মাধ্যমে গড়ে উঠতে পারে ছাত্র রাজনীতির এক সুস্থ, প্রগতিশীল ধারা। ঘটনা ঘটলে নয়, ঘটবার আগেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিদ্যালয়/কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়), পরিবার এবং সমাজের সাধারণ মানুষগুলোকে একত্রিত হয়ে তৎপরতা দেখাতে হবে, আর এর কোন বিকল্প নাই। সকলের সংঘবদ্ধ আন্দোলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই আমরা রাষ্ট্রের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারি যেন সে তার ‘যৌন সন্ত্রাস’ নামক বাই-প্রডাক্ট এর প্রডাকশন বন্ধ করে…
(আন্তরিক কৃতজ্ঞতা: মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীদের)
No comments:
Post a Comment