'মুক্তির পথে আলোর দিশারী'
শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় রবীন্দ্র জয়ন্তী উদযাপন
ইত্তেফাক রিপোর্ট
রাজধানীর অনুষ্ঠানগুলোতে ছিল বাঙালির প্রেরণার উত্স রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা ও নাটকের নানা আয়োজন। দর্শকরা প্রাণভরে উপভোগ করেন অনুষ্ঠানগুলো। জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সকালে ছিল জাতীয় পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। আর সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালার মূল মঞ্চে ছিল রবীন্দ্রসঙ্গীত ও রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য পরিবেশনা। জাতীয় অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে ঢাকার বাইরে রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, নওগাঁর পতিসর, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, খুলনার দক্ষিণডিহিতেও ছিল অনুষ্ঠানমালা। এছাড়া সারাদেশের জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
ওসমানী মিলনায়তনে
'রবীন্দ্রনাথের শিল্পসত্তা যেমন নানা মাত্রায় সন্নিবেশিত ও প্রতিষ্ঠিত, তার মানব সত্তাও তেমনি মানব কল্যাণে নিবেদিত। তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক এবং অসামপ্রদায়িক। তার অসামপ্রদায়িক চেতনা ও মানবতাবাদী জীবন দর্শন থেকে শিক্ষা নিতে হলে সর্বস্তরে রবীন্দ্র চর্চাকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে,' অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গতকাল বৃহস্পতিবার এ আহবান জানান। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। অনুষ্ঠানে রবীন্দ্র স্মারক বক্তৃতা দেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্কৃতি সচিব ড. রণজিত্ কুমার বিশ্বাস।
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অনিবার্য অংশ তিনি। বাংলা সাহিত্যকে তিনি বৈশ্বিক করেছেন। তার সাধনার স্পর্শে বাঙালির সাহিত্য পরিপূর্ণতা ও আধুনিকতা লাভ করেছে। তাকে বাদ দিয়ে বাঙালির চিন্তা-চেতনা ও জীবনযাত্রা অপূর্ণাঙ্গ।
"যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধন.." রবি কবির এই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তরুণ প্রজন্মকে দেশ ও মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। তিনি বলেন, "আমাদের অস্তিত্ব, সাহিত্য, সংস্কৃতি, জাতীয় ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে একাত্ম হয়ে আছেন আমাদের সকলের প্রিয় রবীন্দ্রনাথ। তাঁরই আলোয় আলোকিত হয়ে আমাদের পথ চলা। তিনি আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শিখিয়েছেন। তাঁরই আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে আমরা অন্যায়মুক্ত এক সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখি"।
অনুষ্ঠানে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করেন প্রখ্যাত রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, বুলবুল ইসলাম এবং আবৃত্তি করেন বিশিষ্ট আবৃত্তিকার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর শিল্পীরা এতে দলীয় সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন।
শিল্পকলা একাডেমি
দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে তিন দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কবির চিত্রশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করে। গতকাল সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে দেশের প্রখ্যাত শিল্পীবৃন্দ সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন।
একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার দ্বিতীয় গ্যালারিতে শুরু হয়েছে রবীন্দ্রনাথের আঁকা চিত্রকর্মের চিত্রপ্রতিলিপি ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আঁকা চিত্রের প্রদর্শনী। দুই সপ্তাহের এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক। এ সময় একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, চারুকলা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। প্রদর্শনীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ৪৫টি চিত্রকর্মের প্রতিলিপি স্থান পেয়েছে। এছাড়াও ৪০ জন শিল্পী এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথ ও তার সৃষ্টি নিয়ে চিত্রকর্ম।
পরে, একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার প্রধান মিলনায়তনে একাডেমির তিনদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক। আলোচক ছিলেন ড. হায়াত্ মামুদ ও আক্তার কামাল। অনুষ্ঠানে গীতমালিকার শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে 'জয় তব বিচিত্র আনন্দ' ও 'আমার প্রাণের মানুষ আছে' গানের সঙ্গে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সমবেত সঙ্গীত পরিবেশন করে পঞ্চভাস্বর। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন মহিউজ্জামান চৌধুরী, সালমা আকবর, তানিয়া মান্নান, আব্দুল ওয়াদুদ, স্বাতী সরকার, সাজেদ আকবর, শাহনাজ নাসরিন ইলা, নিলোত্পল সাধ্য ও তপন মাহমুদ। সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যনন্দন ও স্পন্দন। আবৃত্তি করেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, রেজিনা ওয়ালি লীনা ও ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়।
ছায়ানট
ছায়ানট ভবনে গতকাল দুই দিনব্যাপী রবীন্দ্র উত্সব শুরু হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সাধনা ও সংকল্প, আশ্বাস, নিঃসংশয় এবং স্বদেশ ভাবনার গান পরিবেশিত হয় অনুষ্ঠানে। আয়োজনে সম্মেলক ও একক গান ছাড়াও ছিল নৃত্য, পাঠ ও আবৃত্তি। উত্সবে অংশ নেয় ঢাকাসহ দেশের নানা অঞ্চলের প্রবীণ-নবীন শিল্পীরা। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক খায়রুল আনাম শাকিল। সম্মেলক কণ্ঠে 'বাজাও তুমি কবি' এ গান দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। আবৃত্তি করেন সৈয়দ হাসান ইমাম। এছাড়াও একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী সুতপা সাহা, ফারজানা আক্তার পপি, নাইমা ইসলাম নাজ, অসীম দত্ত, কাঞ্চন মোস্তফা, মিতা হক, মাহমুদা আক্তার, সত্যম দেবনাথ, তানিয়া মান্নান, রীমা সাহা, ইফফাত আরা দেওয়ান, ফারহিন খান জয়িতা, সেমন্তী মঞ্জরী, সাজেদ আকবর, ঝুমা খন্দকার, শিপ্রা তালুকদার, রোকাইয়া হাসিনা, শ্রাবণী মজুমদার, মানস ভট্টাচার্য, মিতা শর্মা, অভীক দেব, মনসুরা বেগম, এটিএম জাহাঙ্গীর, সুশান্ত রায় ও খন্দকার খায়রুজ্জামান কাইয়ুম।
উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে উদীচী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজন করা হয়েছিল আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে মুখ্য আলোচক ছিলেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি কামাল লোহানী। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক নিরঞ্জন অধিকারী, উদীচী'র কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক প্রবীর সরদার, ঢাকা মহানগর সংসদের সভাপতি কাজী মোহাম্মদ শীশ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
কচি-কাঁচার মেলা
কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচা ভবন মিলনায়তনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল কচি-কাঁচার মেলার শিশু-কিশোররা। শিশু কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান দর্শকদের মোহিত করে তোলে। সন্ধ্যায় এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। সভাপতিত্ব করেন মেলার পরিচালক অর্থনীতিবিদ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ।
বাংলা একাডেমিতে বইয়ের আড়ং
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৩তম জন্মবার্ষিকী এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলা একাডেমি গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে ৬ জুন পর্যন্ত বইয়ের আড়ং-এর আয়োজন করেছে। একাডেমির পুস্তক বিক্রয়কেন্দ্রের সামনে আড়ং উদ্বোধন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আড়ং-এ বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বই সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ে বিক্রি হবে।
চ্যানেল আইতে
চ্যানেল আই কার্যালয়ে গতকাল অনুষ্ঠিত হলো 'এবি ব্যাংক চ্যানেল আই রবীন্দ্রমেলা। এ বছর রবীন্দ্র গবেষণার জন্য সম্মানীত করা হয়েছে বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক ড. আহমদ রফিককে।
সকাল ১১টায় নানান রঙের বেলুন উড়িয়ে মেলার উদ্বোধন করেন ড. করুণাময় গোস্বামী, অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, চ্যানেল আই-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, এবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম আহমেদ চৌধুরী, চ্যানেল আই'র পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ, পরিচালক আবদুর রশিদ মজুমদার, জহিরউদ্দিন মাহমুদ মামুন, মুকিত মজুমদার বাবু, বাংলালিংকের ইফতেখারুজ্জামান, নাট্য ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, টিভি ব্যক্তিত্ব আলী ইমাম, নাট্য ব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান, সঙ্গীতজ্ঞ আজাদ রহমান, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, তপন মাহমুদ, কবি ও সাংবাদিক আনিসুল হক, রেজানুর রহমান, অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী প্রমুখ।
চ্যানেল আই চত্বরে রবীন্দ্রমেলার খোলা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত সঙ্গীত পরিবেশন করেন নবীন প্রবীণ শিল্পীরা। রবীন্দ্র স্মৃতিকর্মের বিভিন্ন স্টল ছাড়াও রবীন্দ্র জীবনাদর্শ নিয়ে ছোটদের পাশাপাশি চিত্রাংকন করেন রনজিত্ দাস, বীরেন সোম, আবদুল মান্নান, মনিরুজ্জামান, মোঃ জহির উদ্দিন ও রাশা।
এদিন মেলা মঞ্চে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার একক রবীন্দ্র সঙ্গীতের অ্যালবাম 'কোন গগনের তারা'র মোড়ক উন্মোচন করেন চ্যানেল আই'র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সোহেল আর কে হুসেন, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন, শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা প্রমুখ।
রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা
'...দিবে আর নিবে/মিলাবে মিলিবে/ যাবে না ফিরে'- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের পঙিতমালা ধারণ করে শাহবাগের সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে চলছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থার পাঁচদিনের পঞ্চবিংশ জাতীয় রবীন্দ্র উত্সব। উত্সবের তৃতীয় দিন বৃহস্পতিবার ছিল 'যুগমানব রবীন্দ্রনাথ' শীর্ষক একক বক্তৃতা। একক বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর। এদিন রবীন্দ্রনাথের প্রেম-পূজা, প্রকৃতি, স্বদেশ পর্যায়ের গান পরিবেশন করেন সংস্থার শিল্পীরা। শুরুতেই পর পর পরিবেশিত হয় তিনটি সম্মেলক গান 'হে নূতন দেখা দিক আর-বার', 'আমার মাথা নত করে দাঁও হে তোমার চরণ ধুলার তলে' ও 'আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে'। এর পর শুরু হয় একক পরিবেশনা। শিল্পীরা ছিলেন—শর্মিলা চক্রবর্তী, বুলা আহমেদ, নুসরাত জাহান, রাইয়ান খালিদ, রানু কর্মকার, সেলিনা পারভেজ, সীমা সরকার, সুষ্মিতা মন্ডল, সুফিয়া জাকারিয়া, সুমাইয়া ফারাহ খান, তানজিমা তমা প্রমুখ। রবীন্দ্রনাথের রচনাবলী থেকে পাঠ করেন হাসিনা আহমেদ সোমা। অনুষ্ঠান শেষ হয় 'বিশ্ববীণা রবে বিশ্বজন মোহিছে'।
No comments:
Post a Comment