Sunday, May 11, 2014

হামলার আবহেই শেষ দফা

হামলার আবহেই শেষ দফা

DYFII-00-2
এই সময়: শেষ দফা ভোট 'অবাধ ও শান্তিপূর্ণ' করতে একাধিক পদক্ষেপ করছে নির্বাচন কমিশন৷ কিন্ত্ত প্রচারের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরেই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বিরোধী দলের নেতা -কর্মীদের উপরে ব্যাপক হামলা চালানোর অভিযোগ উঠল শাসকদলের বিরুদ্ধে৷ ফলে অন্তিম দফার ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগেই রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে শুরু করল দক্ষিণবঙ্গে৷ তাই এই রাউন্ডে সবথেকে কড়া পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে কমিশনও৷ শহরের উপকণ্ঠে বেলঘরিয়া , ব্যারাকপুর , বেলেঘাটা থেকে দক্ষিণ শহরতলির বিড়লাপুর ও নদিয়ার গয়েশপুরেও সিপিএম কর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে৷

আগামিকাল সোমবার লোকসভা নির্বাচনের শেষ দফার ভোট৷ এই দফায় পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে কলকাতা শহরাঞ্চল -সহ গুরুত্বপূর্ণ ১৭টি আসনে ভোট নেওয়া হবে৷ এই ১৭ আসনের মধ্যে ১৪টিই বর্তমানে তৃণমূলের দখলে৷ বাকি তিনটির মধ্যে কংগ্রেসের দখলে রয়েছে বহরমপুর , সিপিআই -এর হাতে রয়েছে ঘাটাল এবং জয়নগর কেন্দ্রটি রয়েছে একদা তৃণমূলের জোটশরিক এসইউসি -র হাতে৷ স্বভাবতই পঞ্চম দফার ভোট তৃণমূলের কাছে দুর্গ রক্ষার লড়াই৷ অন্যদিকে , সিপিএমের সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ৷ এই দফাতেই বিজেপিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল৷ গোলমাল এড়াতে শেষ মুহূর্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন৷ বাড়তি নজরদারির লক্ষ্যে ১৭ কেন্দ্রের জন্যই একজন করে অতিরিক্ত সাধারণ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে তারা৷ আজ রবিবারই তাঁদের সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে পেঁৗছে যাওয়ার কথা৷

লড়াই যে হাড্ডাহাডি হতে চলেছে শনিবার সন্ধ্যায় প্রচার শেষ হওয়ার আগেই সেই ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে ১৭ কেন্দ্রের নানা জায়গায়৷ বিক্ষিপ্ত গোলমাল হয়েছে শাসক ও বিরোধী দলের সমর্থকদের মধ্যে৷ রাতে বেলঘরিয়ার কামারহাটি পুরসভার ভগবতী চ্যাটার্জি স্ট্রিটে সিপিএমের একটি শাখা অফিসে দুষ্কৃতীরা ভাঙচুর চালায়৷ ঘটনায় অভিযোগের তির তৃণমূলের দিকে৷ সিপিএমের চার যুব নেতা হামলায় আহত হন৷ এঁদের মধ্যে রয়েছেন সিপিএম রাজ্য কমিটির সদস্য এবং ডিওয়াইএফআই রাজ্য সভাপতি সায়নদেব মিত্রও৷ সিটু নেতা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অভিযোগ , পরিবহণমন্ত্রী মদন মিত্র বিকেলে হুডখোলা জিপে র্যালি করার পরই দুষ্কৃতীরা পার্টি অফিস ও কর্মীদের উপর হামলা চালায়৷ থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে পথেও হামলা হয়৷ তবে সব অভিযোগ উড়িয়ে পরিবহণমন্ত্রী রাতে বলেন , 'বেলঘরিয়া , কামারহাটিতে সিপিএমের এমন অবস্থা নয় যে ওদের মারধর করতে হবে৷ মানুষ অনেক আগেই ওদের প্রত্যাখ্যান করেছে৷ ' তবে এই চাপানউতোরেই কিন্ত্ত থামেনি ঘটনা৷ রাতে এলাকার পরিস্থিতি ছিল থমথমে৷ ব্যারাকপুরের অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার সুরেশকুমার চাদিভে বলেন , 'এই ঘটনায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে৷ এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে৷ দুষ্কৃতীদের খোঁজে তল্লাশি চলছে৷ ' এই হামলাকে সামনে রেখে শাসকদল ও রাজ্য প্রশাসনের উপর চাপ বাড়িয়েছেন বাম নেতৃত্ব৷

উত্তর ২৪ পরগনার জেলা সম্পাদক গৌতম দেব জানিয়েছেন , আজ রবিবার সকাল ন 'টার মধ্যে দোষীদের ধরা না হলে সকাল দশটার পর দলের রাজ্য সম্পাদক বিমান বসু-সহ শীর্ষ বাম নেতারা সদলবল এলাকায় যাবেন আহতদের দেখতে৷ সঙ্গে থাকবেন দলের হাজার -হাজার সমর্থকও৷ এর ফলে এলাকায় ও বি টি রোড জুড়ে অচলাবস্থা সৃষ্টির পাশাপাশি নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে প্রশাসন৷ অবশ্য পরদিনই ভোট, এই পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন বামেদের এই কর্মসূচির অনুমতি দেবে না কি না তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে৷ শুক্রবার রাতেই ব্যারাকপুরের নোনাচন্দন পুকুরে সিপিএমের কার্যালয়েও হামলার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে৷ অন্যদিকে , বহরমপুরে তৃণমূল প্রার্থী ইন্দ্রনীল সেনের রোড -শোয়ে অনুমতিহীন বাইক আটকানোয় কমিশনের পুলিশ পর্যবেক্ষককে ঘিরে বিক্ষোভ দেখায় তৃণমূল৷ পর্যবেক্ষক কুমার ইন্দ্রভূষণ ইন্দ্রনীল -সহ প্রায় দু'শোজনের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছেন৷ ইন্দ্রনীলও পর্যবেক্ষকের বিরুদ্ধে পাল্টা এফআইআর করেছেন৷ এরই মধ্যে পশ্চিম মেদিনীপুরের সবংয়ে আবার তৃণমূলের মিছিলে হামলার অভিযোগ উঠেছে সিপিএমের বিরুদ্ধে৷ নির্বাচনের এই দফায় কলকাতার দুটি কেন্দ্রেও ভোট নেওয়া হবে৷

কলকাতা পুলিশ পর্যান্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেও বেহালা , যাদবপুর , হরিদেবপুর , পাটুলি , কসবা প্রভৃতি সংযোজিত এলাকা নিয়ে লালবাজারের কর্তারাও চিন্তিত৷ কালকের ভোটে রাজনৈতিক দলগুলির পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে৷ প্রথম দু'দফার ভোট অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হলেও তৃতীয় ও চতুর্থ দফা নিয়ে কমিশনকেই কাঠগড়ায় তুলেছিল বিরোধীরা৷ কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তোপ দাগেন বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদীও৷ লাগাতার সমালোচনার মুখে কমিশন শেষ মুহূর্তে কয়েকটি নয়া পদক্ষেপ করেছে৷ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল , ১৭ কেন্দ্রের ৩১৩৯২টি বুথের মধ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকছে প্রায় ১৯ হাজার বুথে , যা মোট বুথের ৬০ শতাংশ৷ এ ছাড়াও কমিশন নির্দেশ দিয়েছে স্পর্শকাতর নয় এমন বুথগুলিতেও মাইক্রো অবজার্ভার , ক্যামেরা এবং ওয়েবক্যাম ব্যবস্থার যে কোনও একটি রাখতে হবে৷ আগের দফাগুলিতে শুধুমাত্র স্পর্শকাতর বুথের ক্ষেত্রেই কমিশন এই ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ দিয়েছিল৷ আগের দফাগুলিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে পদে পদে অভিযোগ শুনতে হয়েছে কমিশনকে৷ বিশেষ পর্যবেক্ষক সুধীর কুমার রাকেশ জানান , কমিশনের ভিডিওগ্রাফারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের গতিবিধি ও বুথে তাদের ভূমিকা ক্যামেরাবন্দি করতে৷ এমনকি গাড়ির লগবুকও পরীক্ষা করা হবে৷ এই দফায় পোলিং এজেন্টদের নিয়েও কমিশন বাড়তি সতর্কতা জারি করেছে৷ বিশেষ পর্যবেক্ষক সুধীর কুমার রাকেশ শনিবার বলেছেন , 'এজেন্টকে ঢুকতে না দেওয়া বা বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটলে ২০ -২৫ মিনিটের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সেক্টর ম্যাজিস্ট্রেট বুথে পেঁৗছে দেবেন৷ '

রাকেশ জানিয়েছেন , কোনও অবস্থাতেই বাইক মিছিল বরদাস্ত করা হবে না৷ বুথে প্রবেশের মুখে যে সশস্ত্র রক্ষী থাকবেন , তিনিই ভোটারদের এপিক অথবা অন্য কোনও সচিত্র পরিচয়পত্র পরীক্ষা করবেন৷ কমিশনের এত আয়োজনেও বিরোধী দলগুলি কিন্ত্ত খুব একটা আস্থাশীল নয়৷ বিরোধীদের এই বক্তব্যের প্রধান কারণ , বুথের অনুপাতে বাহিনীর সংখ্যা যাই বলা হোক না কেন , কার্যক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা নিয়ে সংশয় থাকছেই৷ তাই কমিশনের উপর পুরোপুরি ভরসা না রেখে শেষ দফায় মরণবাঁচন লড়াইয়ের ইঙ্গিত মিলেছে বিরোধী শিবির থেকে৷ ভোটের দিন বুথ দখল কিংবা রিগিংয়ের ঘটনা ঘটলে রাস্তায় বসে পড়ে অবরোধ করা থেকে পুলিশ সুপারের দন্তর ঘেরাও করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সিপিএম৷ একই সঙ্গে বুথ দখল কিংবা রিগিংয়ের ছবি তুলে কমিশনে পৌঁছে দিতে উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় ১০০ দলীয় ক্যামেরাম্যান মোতায়েন করার পরিকল্পনাও করেছেন সিপিএম নেতৃত্ব৷

শনিবার বারাসতে সিপিএম রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য গৌতম দেবের অভিযোগ , 'হুগলি ও হাওড়ার মতো জেলায় যেখানে ইতিমধ্যে ভোট হয়েছে সেখান থেকে কয়েক হাজার বহিরাগত ও দুষ্কৃতীকে এই জেলায় নিয়ে আসা হচ্ছে৷ ভোটের দিন রিগিং হলে মহিলারা রাস্তায় বসে পড়বেন৷ অবরোধ হবে৷ জেলাশাসকের দন্তর যে বুথের অন্তর্গত সেখানে ভোটে বাধা দেওয়া হলে জেলাশাসকের দন্তর ঘেরাও করা হবে৷ ' তৃণমূল বাইরে থেকে জেলায় ছেলে নিয়ে গেলে তাঁরাও নিয়ে যেতে বাধ্য হবেন বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন গৌতমবাবু৷ সেই সঙ্গে রিগিং নিয়ে তাঁর দাওয়াই , 'ভোটের দিন শুধু সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা নয় , আমরাও একশো ক্যামেরা রাখব৷ গন্ডগোলের ছবি আমাদের মনিটরিং সেলে আসবে সেই ছবি ভি এস সম্পতকে মেল করা হবে৷ ' ইতিমধ্যে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা নেতৃত্বও একই পন্থা অবলম্বন করার কথা ঘোষণা করেছে৷ যদিও তৃণমূল সব সন্ত্রাসের অভিযোগকেই ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে৷ 

No comments:

Post a Comment