Wednesday, May 14, 2014

মনমোহনের বিদায়, শেষ হলো ভারতের রাজনীতির এক যুগ

মনমোহনের বিদায়, শেষ হলো ভারতের রাজনীতির এক যুগ
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
কাওসার রহমান ॥ ভারতের আর্থিক সংস্কারের অন্যতম রূপকার ড. মনমোহন সিংকে বুধবার আনুষ্ঠানিক বিদায় জানাল তার দল জাতীয় কংগ্রেস। কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী বুধবার সন্ধ্যায় বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহনের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করে। ওই নৈশভোজে দলের ওয়ার্কিং কমিটির সব সদস্য ও মন্ত্রীদের সই করা স্মারক তুলে দেয়া হয় তাঁর হাতে। একটানা দশ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার রেকর্ড সৃষ্টি করে এক আবেগঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে বিদায় নিলেন তিনি। মনমোহনের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় রাজনীতিতে একটা যুগের শেষ হলো। শেষ হলো একটা নতুন ধরনের পরীক্ষার। সম্পন্ন হলো মনমোহন-সোনিয়ার যুগলবন্দী ভারতীয় প্রশাসনের একটা নতুন পরীক্ষা। আর কখনও সেই পরীক্ষার দরকার হবে কি না, সেটা ভবিষ্যতই বলবে। তবে ভারতের আর্থিক উদারনীতির প্রবর্তক মনমোহন সিংকে ইতিহাসের সবচেয়ে নীরব প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে বিদায় নিতে হচ্ছে রাজনৈতিক কারণে। আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদ থেকে মনমোহন সরে দাঁড়াবেন শনিবার। শুক্রবার লোকসভা ভোটের ফল প্রকাশের পর নিজের বাসভবনে শনিবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার শেষ বৈঠক করবেন তিনি। তার পর সেই বৈঠক থেকেই সোজা তিনি রওনা দেবেন রাষ্ট্রপতি ভবনের উদ্দেশে পদত্যাগপত্র জমা দিতে।
তার আগেই প্রধানমন্ত্রী থাকতে থাকতে এবং নির্বাচনের ফল বেরনোর আগের দিনই ৭ নম্বর রেসকোর্স রোডের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন খালি করে উঠে যাবেন তার জন্য নির্ধারিত বাসভবনে। অন্য কোনও প্রধানমন্ত্রী এভাবে সময়ের আগেই উত্তরসূরির জন্য বাসভবন খালি করে যাননি। নরেন্দ্র মোদি হোন বা অন্য কেউ হোন, প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণের পরেই ৭ রেসকোর্স রোডে প্রবেশ করতে পারবেন। এ সৌজন্যর নামই হলো মনমোহন।
এর আগে মঙ্গলবার তিনি সাউথ ব্লকের সঙ্গে দশ বছরের সম্পর্কের ইতি টানেন। পা-িত্য, সততা ও সৌজন্যের বিরল আবহে যাঁরা এতকাল তাঁর সঙ্গে ঘর-সংসার করেছেন, সেই সরকারী কর্মীরা এদিন তাঁকে কুর্নিশ জানান। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী এ সময় ঈশ্বরের কাছে তাদের মঙ্গল কামনা করেন। নেহেরু ও ইন্দিরার পর তিনিই হলেন তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী, যিনি এতদিন ধরে এ গুরুত্বপূর্ণ পদ অলঙ্কৃত করেছেন। মনমোহন কেমন প্রধানমন্ত্রী, তাঁর বিচার করবে ইতিহাস, কিন্তু তাঁর পা-িত্য ও সততা নিয়ে কেউ কোনদিন প্রশ্ন তোলার সাহস পাননি। বিজেপি নেতা অরুণ জেটলি পর্যন্ত ব্লগে লিখেছেন, ‘অসম্ভব প-িত মানুষ। তাঁর সততা সন্দেহের উর্ধে ছিল।’
ড. মনমোহন আরও কয়েকদিন প্রধানমন্ত্রীর পদে আছেন ঠিকই, কিন্তু সেটা আলঙ্কারিক। সাউথ ব্লকের অফিসে গিয়ে তিনি আর কাজ করবেন না। চিরদিনই নিজস্ব নীতি মেনে একটা লক্ষণরেখা টেনে চুপচাপ কাজ করে গেছেন তিনি। ফলে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের কর্মীরাও নির্বিঘ্নে কাজ করে গেছেন।
বাসা বদল বা ভোটের ফল ঘোষণার অনেক আগেই যোজনা কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ থেকে বিদায় নেন প্রধানমন্ত্রী। ৩০ এপ্রিল তিনি যোজনা কমিশনের প্রধানের পদ থেকে বিদায় নেন। যাকে বলা যেতে পারে সাউথ ব্লক থেকে নিজেকে সরানোর আনুষ্ঠানিক শুরু। যোজনা কমিশনের সঙ্গে মনমোহনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এক সময় তার উপাধ্যক্ষও ছিলেন। এর পর মে মাসের গোড়ায় তিন বাহিনীর প্রধানকে নৈশভোজে নিমন্ত্রণ জানান। একইভাবে সুপ্রীমকোর্টের প্রধান বিচারপতি ও অন্য বিচারপতি এবং সরকারের সচিব স্তরে আমলাদেরও একে একে নৈশভোজে নিমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী। সব শেষে ভোটের ফল ঘোষণার আগের দিন মন্ত্রিসভায় তার সতীর্থদের নৈশভোজে ডাকবেন ৭ নম্বর রেসকোর্স রোডের বাড়িতে।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও মনমোহন ছিলেন আপাদমস্তক একজন ভদ্রলোক ও নিরহঙ্কার ব্যক্তি। ফলে সরকারী কর্মীদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত। তবে মনমোহন সব সময় বিতর্ক এড়িয়ে চলতে চাইলে কী হবে, ইউপিএ-২ জামানায় বিতর্ক তাকে পিছু ছাড়েনি। একের পর এক কেলেঙ্কারির অভিযোগ, জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়া, বিরোধীদের বিরামহীন আক্রমণ, সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির গুজব, মন্ত্রিসভার ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়া এবং দেশের দুর্বলতম প্রাণমন্ত্রীর তকমা। সেদিক থেকে কিছুটা ক্ষুব্ধ ছিলেন মনমোহন। অভিমানে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি সফল না ব্যর্থ তা ভাবীকালই বিচার করবে।

৬০ হাজার কোটি টাজার বাজি
ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল জানতে অধীর আগ্রহে দিন গুনছে গোটা ভারত। কিন্তু সবচেয়ে টেনশন এখন বাজির বাজারে। দেশের প্রধানমন্ত্রীর গদিতে কে বসবেন তা নিয়ে রমরমিয়ে বেটিং চলছে। ইতোমধ্যেই বাজি ধরা হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। জুয়াড়িরা ‘হট ফেভারিট’ ধরেছেন বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদিকে। বাজারে মোদির দর ৬২ পয়সা, রাহুল গান্ধীর জন্য ৮৫ পয়সা, মুলায়ম সিং যাদবের দর ১ টাকা ৪০ পয়সা এবং অরবিন্দ কেজরিওয়ালের জন্য ৪ টাকা ৫০ পয়সা ধরা হয়েছে। মুম্বাইয়ের এক বুকির কথায়, ‘মোদিকেই আমরা ফেভারিট হিসেবে রাখছি। তাই ওর দর রাখা হয়েছে ৬২ পয়সা। নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্বের এক সপ্তাহ আগে থেকে বেশিরভাগই মোদির ওপর বাজি ধরছেন।’
বাজির বাজারে শুধু মোদি-রাহুলরাই নন, এনডিএ ও ইউপিএ সরকারের ওপরেও বাজি ধরেছেন জুয়াড়িরা। এনডিএ ১৫০ আসন জিতলে ৪২ পয়সা, ২০০ আসন জিতলে ৭৮ পয়সা, ২৫০ আসন জিতলে ২ টাকা ২৫ পয়সা, ৩০০ আসন জিতলে ৪ টাকা। ইউপিএ ১৫০ আসন জিতলে ৬০ পয়সা, ২০০ আসন জিতলে ৯০ পয়সা, ২৫০ আসন জিতলে ৩ টাকা ২৫ পয়সা। বিভিন্ন সমীক্ষা এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে মোদির গেরুয়া ঝড় দেখে এবার জুয়াড়িরা নরেন্দ্র মোদিকে ফেভারিট ধরেছেন। তাই মোদির দর কম রেখেই জুয়াড়িদের বিনিয়োগ টানছে বাজির বাজার। তবু ফলাফল নিয়ে দিল্লীতে বিজেপি ও কংগ্রেসের শীর্ষনেতাদের যত না টেনশন তার থেকে বেশি চিন্তায় বুকিরা। শেষ রক্ষা হবে তো? টাকা উঠবে তো? আপাতত ‘ডি-ডে’ আগামী শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা ছাড়া কোনও উপায় নেই তাদের হাতে।
নির্বাচনে ব্যয় ৩০ হাজার কোটি টাকা
খরচের বহরে ভারতের লোকসভা ভোট আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে প্রায় ধরে ফেলতে চলেছে। ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনে সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা মিলে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করেছে। কালটাকার লেনদেন ধরলে অঙ্কটা আরও বাড়বে। আর ২০১২-র প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আমেরিকায় টাকার হিসেবে খরচ হয়েছিল ৪২ হাজার কোটি। এবার নির্বাচন কমিশনই খরচ করেছে ৩,৪২৬ কোটি টাকা, যা ২০০৯ লোকসভা নির্বাচনের থেকে ১৩১ শতাংশ বেশি। গতবার লোকসভায় সরকারী কোষাগার থেকে খরচ হয়েছিল ১,৪৮৩ কোটি টাকা। তা ছাড়া এবার প্রার্থীপিছু খরচের সীমা ৪০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ করেছে কমিশন। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোও আরও বেশি খরচ করেছে। কমিশন জানিয়েছে, ভোটের হার বাড়ানোর জন্য জনগণের মধ্যে প্রচারসহ নানা কারণে এবার সরকারী খরচ বেড়েছে। তা ছাড়া এবার নির্বাচনে গতবারের তুলনায় রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বেড়েছে। এমনকি নির্দল প্রার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। প্রার্থী সংখ্যা যত বেশি হবে, সরকারী খরচও তত বেশি হবে। প্রথম ৬টি লোকসভা নির্বাচনে খরচ মোটের ওপর সীমার মধ্যেই ছিল। কিন্তু সপ্তম লোকসভা থেকেই তা উধর্বমুখী। ১৯৫২ সালে লোকসভা নির্বাচনে খরচ হয়েছিল ১০.৪৫ কোটি টাকা। ভোটারপিছু খরচ ছিল ৬০ পয়সা। সেটা ২০ গুণ বেড়ে ২০০৯ সালে হয়েছিল ভোটারপিছু ১২ টাকা।

বিজেপির বিজ্ঞাপন খরচ ৫০০০ কোটি টাকা
এবার শুধু বিজ্ঞাপনের পেছনেই বিজেপি খরচ করেছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এটা বিজ্ঞাপন বাবদ কংগ্রেসের বাজেটের প্রায় ৪ গুণ। দলের বিজ্ঞাপনের দায়িত্ব সামলাচ্ছে যে সংস্থা, সেই ম্যাডিসন ওয়ার্ল্ডের স্যাম বালসারা এ ব্যাপারে অবশ্য মুখ খুলেননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজেপির এক বর্ষীয়ান মিডিয়া ম্যানেজার বলেছেন, দল বিজ্ঞাপন বাবদ ৪,৫০০ কোটি টাকা খরচ করবে বলে প্রাথমিকভাবে পরিকল্পনা করেছিল। এ ছাড়া ৫০০ কোটি টাকা সরিয়ে রাখা হয়েছে জরুরী প্রয়োজনে খরচের জন্য। ৩ মাস ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিজেপির স্থায়ী হোর্ডিংয়ের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার। তুলনামূলকভাবে অপরিচিত জায়গায় হোর্ডিং-পিছু মাসে খরচ ২ থেকে ৩ লাখ টাকা হলেও, মুম্বাইয়ের নরিম্যান পয়েন্টে সেই খরচই গিয়ে দাঁড়ায় মাসে ২০ লাখ টাকা। হিসেব মতো বিজেপি এ ১৫ হাজার স্থায়ী হোর্ডিয়ের জন্যই খরচ করেছে ২৫০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া দেশের সেরা ৫০টি জাতীয় এবং আঞ্চলিক সংবাদপত্রে নির্বাচন চলাকালীন প্রতিদিন ৪ থেকে ৫টি করে বিজ্ঞাপন দিয়েছে তারা। এর খরচ আরও ৫০০ কোটি টাকা ১৫০ কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে বিভিন্ন ম্যাগাজিনে। পাশাপাশি টিভি চ্যানেলে হিন্দী, ইংরেজী এবং আঞ্চলিক ভাষায় প্রায় ২ হাজার স্পট বিজ্ঞাপন কিনে রেখেছিল বিজেপি। সাধারণত জনপ্রিয় বিনোদন চ্যানেলে ৩০ সেকেন্ডের একটি স্পটের খরচ ৮০ হাজার টাকা। সেদিক থেকে টিভি বিজ্ঞাপনে দলের খরচ হয়েছে প্রায় ১০০০ কোটি টাকা। এ ছাড়াও টি২০ বিশ্বকাপে দল খরচ করেছে প্রায় ১৫০ কোটি। এ ছাড়াও রয়েছে ফেস্টুন, ব্যানার ও লিফলেট বাবদ খরচ। সব মিলিয়ে বিজেপির খরচ হয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।

No comments:

Post a Comment