Monday, May 12, 2014

স্বাধীন দেশে মানুষ হচ্ছে না কেউ মুনতাসীর মামুন

স্বাধীন দেশে মানুষ হচ্ছে না কেউ
মুনতাসীর মামুন
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
র‌্যাব গঠনের পর এ বাহিনী নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা কথাবার্তা উচ্চারিত হয়েছে। শুভ-অশুভ রাজনীতির কল্যাণে র‌্যাবের পক্ষে-বিপক্ষে নানা সমালোচনা হয়েছে। কখনও কখনও কেউ কেউ এই বাহিনীর প্রশংসাও করেছেন। বিএনপি আমলে সৃষ্ট এ বাহিনীর যৌক্তিকতা নিয়ে এখন বিএনপি নেত্রী এই বাহিনীর আর প্রয়োজন নেই বলে এর বিলুপ্তি চেয়েছেন। কিন্তু সত্যি কথা হলো তারা কী আসলেই তা চান? র‌্যাব-এর থাকা না থাকা, এই বাহিনীর জবাবদিহিতা, চেন অব কমান্ড মেনে চলা- সব মিলিয়ে একটি পর্যালোচনামূলক লেখা লিখেছেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। গতকালের পর আজ পড়ুন দ্বিতীয় কিস্তি।

॥ দুই ॥
বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে দু’একজন নামী সন্ত্রাসী যখন ক্রসফায়ারে মারা গেল, তখন এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। তখন যেসব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে কোন কথা বলা যেত না সরকারের ভয়ে, সে র‌্যাবের কাছে নিরুপায়- এ রকম একটি ইমেজ গড়ে উঠতে লাগল। কিন্তু ক্রমেই দেখা গেল র‌্যাবের সদস্যরাও ক্রয়ফায়ারের ভয় দেখিয়ে ছিনতাই-ডাকাতি করছে, চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। শুধু তা-ই নয়, ক্রসফায়ারে নামজাদা কিছু সন্ত্রাসী নিহত হলেও নিহত হতে লাগল চরমপন্থী রাজনীতির নেতারা, এমনকি নিরীহ পথচারীও। ফলে ক্রসফায়ারের একই গপ্পো আর মানুষজনকে গেলানো যাচ্ছে না। র‌্যাবের বিষয়ে সমালোচনা হতে থাকলে এবার পুলিশের ক্রসফায়ারে মানুষ মারা যেতে থাকে। এ বিষয়টি কিন্তু অনেকের চোখ এড়িয়ে গেছে এবং অনেকে বড় করে বিষয়টিকে বিবেচনাও করেননি। র‌্যাবের ক্রসফায়ারে মারা যদি না- জায়েজ হয়, তাহলে পুলিশের ক্রসফায়ারে হত্যা জায়েজ হবে কেন? সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যেমন কোন উন্নতি করতে পারবে না, তেমন ক্রসফায়ারে/ হেফাজতে/নির্যাতনে কোন মৃত্যুরও বিচার হবে না।
আওয়ামী লীগের গত আমলে, সরকারের মতে, ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় করা’ মামলা প্রত্যাহার হতে থাকলে বিএনপি জোট এর সমালোচনা শুরু করে। তারা বেমালুম ভুলে গেছিল যে তাদের আমলেও প্রচুর মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। সে সময় নীতি নির্ধারকদের বৈঠকে (মে, ২০০৫) বলা হয়েছিল, “এ পর্যন্ত ৭১ হাজার রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কোন রাজনৈতিক মামলার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট জেলায় যাচাই- বাছাইয়ের পরই ওই মামলাগুলো সম্পর্কে ব্যবস্থা নেয়া হবে।” আরও সিদ্ধান্ত হয়, র‌্যাবের সংখ্যা ১০ হাজারে উন্নীত হবে। এর অন্য অর্থ অপরাধী যাদের ধরা হয়েছিল, তাদের সবাইকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কেননা এরা ছিল, জোট সমর্থক বা জোটকে সমর্থন করবে। ধরে নিলাম এর মধ্যে ১০ হাজার রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার হয়েছিল। বাকিরা? এরা যে সন্ত্রাসী ছিল এর প্রমাণ নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যের একটি লাইন-‘যাচাই করে মুক্তি দেওয়া হবে।’ এর একটি কারণ, সন্ত্রাসী দলকে ব্যবহার করে, দরকার না হলে লিডারকে মানে না। দেশ যে তখন সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য-এর একটি কারণ, জোটের নীতি। তা র‌্যাব কি এই ৬০ হাজারের একজনের গায়েও হাত তুলেছে? ৬০ হাজারের একজনও কি ক্রসফায়ারে মারা গেছে? যায়নি। এই ৬০ হাজারকে রাখা হয়েছে আগামী নির্বাচনে ছিনতাইয়ের জন্য। কিন্তু এরই মধ্যে এই ৬০/৭০ হাজার পরিস্থিতি এমন করে তুলেছে যে, বাকিদের ধীরে-সুস্থে ছাড়তে হবে।
গত ছয় বছরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে একাধিক ইসলামী জঙ্গী সংগঠনের ৪৩৫ সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলা না করা, সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়া, পুলিশের একাধিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে এদের অধিকাংশই মুক্তি পেয়ে গেছে। এমনকি নজরদারি না থাকায় কারাগার থেকে বের হয়ে এরা নানা সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িয়ে গেছে বলে পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়’। (প্রথম আলো, ২৬.০২.০৫)
জোট সরকার ছিল জঙ্গীদের দ্বারা গঠিত। জামায়াত বা ইসলামী ঐক্যজোটকে জঙ্গী না বলা, জেনারেল জিয়াকে বিএনপির জন্মদাতা হিসেবে স্বীকার না করার মতো। গত আওয়ামী লীগ আমলের (১৯৯৯-২০০০) শেষ দিকে এদের সন্ত্রাস বাড়তে থাকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি, প্রশ্রয় দিয়েছে এবং তার ফলও ভোগ করেছে। পুলিশ ৫৪ ধারায় এদের গ্রেফতার করত এবং তারা অনতিবিলম্বে ছাড়া পেত। এটি ছিল সরকারী নির্দেশ। তখন খুব বাধ্য না হলে কোনো জঙ্গীকে গ্রেফতার করা হতো না। ২০০৩ ও ২০০৪ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল তার নির্যাসটুকু ছাপা হয়েছিল দৈনিক সংবাদে (২.৩.০৫)।

মানবাধিকার রিপোর্ট ২০০৩
১. সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ড খারাপ।
২. নিরাপত্তা বাহিনী কয়েকটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিচাবহির্ভূত হত্যাকা- ঘটিয়েছে। পুলিশ, বিডিআর, আনসার ও সেনাবাহিনী অপ্রয়োজনে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করেছে।
৩. এ বছর পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন ৮১ জন। আরও ১১৩ জন নিহত হয়েছেন কারাগারে অথবা পুলিশ হেফাজতে। প্রায় সকল ঘটনার জন্য শাস্তি পায়নি কেউ।

মানবাধিকার রিপোর্ট ২০০৪
১.সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ড আরও খারাপ হয়েছে।
২. নিরাপত্তা বাহিনী বহু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ঘটিয়েছে। পুলিশ, বিডিআর, আনসার ও র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) অপ্রয়োজনে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করেছে।
৩. নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হাতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। র‌্যাবের হাতেই নিহত হয়েছে ৭৯ জন। পুলিশের হাতেও ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সব মৃত্যুর ঘটনা অস্বাভাবিক এবং তারা ছিলেন নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে।
এর পরই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিজা রাইস বলেছেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা কিছু ব্যর্থ রাষ্ট্র ও সমস্যাসঙ্কুল বিষয় দেখতে পাচ্ছি। আর দেশগুলোর নাম বলতে গিয়ে তিনি নেপাল, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কথা বলেন’ (ভোরের কাগজ, ২০. ০৩.২০০৫)।
প্রায় একই সময় জাতিসংঘ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটি সতর্কসঙ্কেত প্রদান করে, যা বোধহয় অনেকেরই অজানা। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে জাতিসংঘ ঘোষণা করে, ‘সংস্থার পক্ষ থেকে এক নম্বর সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ সম্পর্কিত যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী বাংলাদেশে আসবেন, তাঁদের ঢাকাস্থ জাতিসংঘ নিরাপত্তা ব্যবস্থা দলের পূর্বানুমতি নিতে হবে।’
এর পর পরই ইউরোপীয় কমিশন ঘোষণা করে, ‘র‌্যাবের হত্যাকা-ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। মৌলবাদীদের সন্ত্রাসী তৎপরতাও এখন বড় হুমকিস্বরূপ’ (ভোরের কাগজ, ৯.৫.০৫)।
মওদুদ আহমদ তখন বলেছিলেন, এসব রিপোর্ট ঠিক নয়। মরহুম আমিনী তখন ঘোষণা করেছিলেন- ‘আমাদের অস্ত্রের সন্ধান আল্লাহ ছাড়া কেউ পাবেন না (সংবাদ ২.৩.০৫। না এ ঘোষণায় তখন সরকার বিচলতি হয়নি, কারণ আমিনী ছিলেন জোটের অংশ। না, ক্রসফায়ারের মুখোমুখি আমিনীকে হতে হয়নি। (চলবে)

No comments:

Post a Comment