বুদ্ধ পূর্ণিমা ॥ সম্প্রীতি এবং মানবতাবোধ
ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধদের সবশ্রেষ্ঠ জাতীয় ও ধর্মীয় উৎসব। এ দিনটি বৌদ্ধদের কাছে পবিত্র ও মহিমান্বিত দিন। ভগবান বুদ্ধ বৈশাখী পূর্ণিমার বিশাখা নক্ষত্রে রাজকুমার সিদ্ধার্থ রূপে কপিলাবস্তুর লুম্বিনী কাননে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বুদ্ধ বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে আলোকপ্রাপ্ত হন। একইদিনে তিনি মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। বুদ্ধের জীবনে মহাপবিত্র ত্রি’স্মৃতিবিজড়িত বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধদের কাছে অতি গৌরবের ও মহাপবিত্র দিন। বৈশাখ মাসে সংঘটিত হয়েছিল বলে বিশ্ব বৌদ্ধরা এটিকে বৈশাখ দিবস বা ঠবংধশ ফধু হিসেবে উদযাপন করে। জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত টহরঃবফ ঘধঃরড়হ ফধু ড়ভ ঠবংধশ হিসেবে বিশ্ব বৌদ্ধদের প্রতিনিধিদের নিয়ে ব্যাংককে এ দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। ২৫৫৭ বুদ্ধবর্ষ এ বছরের বুদ্ধ পূর্ণিমা। বাংলাদেশের বৌদ্ধরাও নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে এ পবিত্র দিবসটি উদযাপন করছে। বুদ্ধবর্ষ গণনায় বৈশাখই প্রথম মাস। সেই হিসেবে বৌদ্ধপ্রধান দেশগুলো পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে। বিশেষত থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের কিছু কিছু প্রদেশ। বাংলাদেশও বৈশাখ মাসের প্রথম দিবসটি পহেলা বৈশাখ হিসেবে উদযাপন করে। যদিও পহেলা বৈশাখের প্রবর্তক মোগল সম্রাট আকবর বলে ইতিহাসবিদরা মতামত দিলেও প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধের সময়কাল থেকেই বাঙালী জাতি বৈশাখকে প্রথম মাস হিসেবে গণনা করে। কারণ এ দেশে বাঙালী সাংস্কৃতির বিকাশে পাল রাজাদের ভূমিকা ছিল। পাল রাজা বাঙালী ও বৌদ্ধদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাদের চারশ’ বছরের অসাম্প্রদায়িক শাসনকালকে ইতিহাসে স্বর্ণযুগ বলা হয়। মোগল সম্রাট আকবরও একজন অসাম্প্রদায়িক শাসক ছিলেন। তাঁর আমলে যে অঞ্চলে যে জনহিতকর কাজ ছিল তার ভাল দিক তা তিনি গ্রহণ করতেন। পহেলা বৈশাখ অসাম্প্রদায়িক ছিল বিধায় সম্রাট আকবর তা গ্রহণ করেছিলেন। এটা বৌদ্ধধর্মের প্রভাবের কারণে সমগ্র এশিয়ায় বৈশাখই বছর গণনায় প্রথম মাস। এটা বুদ্ধের জন্মোৎসবের কারণেই ইতিহাসিক ঘটনা। তাই ভগবান গৌতম বুদ্ধও একজন ঐতিহাসিক মহামানব হিসেবে বিশ্বস্বীকৃত।
শুধু বিশেষ আকার বা একটি কাঠামোর জন্য মানুষ হিসেবে বিবেচিত হন না। মানুষ হিসেবে আমাদের রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তি নামক বিশেষ একটি গুণ; যার ধর্ম হলো যে কোন বিষয়ে আমাদের বিচারিক ক্ষমতা বা মূল্যায়নের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও পূর্বে এ ভূভাগে জন্ম নেয়া তথাগত বুদ্ধ দাবি করেছিলেন সর্ব জীবের স্ব স্ব স্থানে স্বাধীন অবস্থান। শুধু মানুষের জন্য নয় তাঁর মৈত্রীভাব পৌঁছে গিয়েছিল দৃষ্টিগোচর হয় এবং দৃষ্টিগোচর হয় না এমন সকল প্রাণীর কাছে। তাই তো তিনি বলেছিলেন ‘সব্বে সত্ত্বা সুখিতা হোন্তু’ অর্থাৎ জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। বোধের অমৃত অবগাহন হলে প্রাজ্ঞদের সকলে স্বীকার করেন, জাতপ্রথা, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র বিভাজন নিষ্ফল, নিরর্থক! বোধের বাতায়ন রুদ্ধ থাকার দরুন অন্ধ প্রকোষ্ঠে মানুষ মানুষের সঙ্গে, ধর্ম ধর্মের সঙ্গে, গোত্র গোত্রের সঙ্গে স্বার্থ বা দেমাগের বশে কলহরত। মহান বুদ্ধ বলেন: কলহে জর্জরিত অন্ধ মানুষ জানে না, সে নিজেই যেখানে নিজের নয়, অন্যকে অধীনে, হাতের মুঠোতে বশ করতে চায় কি করে? বুদ্ধের শিক্ষা বা দেশনা পাঠোদ্ধার করলে দেখা যায়, জীব মাত্রেই স্বাধীন। কোন প্রকার বৈষম্য দেখা দিলে তা বুদ্ধধর্মের পরিপন্থী বলেই গণ্য হবে। তাই আমাদের মেনে নিতে একটুও দেরি হয় না যে- জ্ঞানচর্চায় এক অনন্য প্রভাবক ব্যক্তিত্ব, মিশেল ফুকোর এ আহ্বান- ‘আমার ভূমিকা হলো এবং তা হয়ত বাড়িয়ে বলা হবে- মানুষকে দেখানো যে, তারা যেটুকু অনুভব করে তার চেয়েও তারা বেশি স্বাধীন।’
মানুষ হিসেবে আমাদের বাড়তি কিছু সুযোগ-সুবিধা রয়েছে ... শুধু আত্ম স্বার্থ চরিতার্থ করাই নয়, অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদনের প্রতি সবিশেষ মনোযোগ, সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালনীয়। সর্বজীবের প্রতি মানবিক কর্তব্য পালনের জন্য কারও নির্দেশের অপেক্ষায় থাকাটাও অনেক সময় অমানবিক। আমরা মানুষ হিসেবে মঙ্গলকর কর্তব্য পালন করব এটা মানুষের ধর্ম। স্মরণ করতে পারি, এ বিষয়ে তথাগত বুদ্ধ বলেছেন : ‘মা’ যেভাবে সকল আপদ-বিপদ থেকে নিজের সন্তানকে অপার মৈত্রীবন্ধনে বুকে জড়িয়ে রাখে, রক্ষা করে তোমরাও সেইরূপ মৈত্রীভাবে সকল জীবের প্রতি পোষণ করিও।
বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত জনবহুল একটি দেশ। পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ আমাদের এই মাতৃভূমি। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার কারণে আমাদের সামগ্রিক অবস্থায় বিশেষ প্রভাব রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে যদি দেখি বৌদ্ধরা কখনও ধর্মীয় উম্মাদনায় আস্থাশীল নয়, তারা জ্ঞানের বাহনে চড়ে এ জীবনযাপন করতে আগ্রহী। এ দেশ চার শ’ বছর বৌদ্ধরা শাসন করে (পাল রাজাগণ) যাকে ঐতিহাসিকগণ বাংলার স্বর্ণযুগ বলেই মত দেন। পালদের রাজত্বকালে সকল ধর্মের সহাবস্থান বাংলার যে কোন সময়কে ম্লান করে দিয়ে আজও সোনার মতো ঔজ্জ্বল্য ছড়াতে থাকে। আমরা বুদ্ধের এ কথা কখনও ভুলি না যে কর্ম সু ও কু ফলদায়ী, যার যার কর্ম স্ব স্ব অবস্থানে ভোগ করবে। জীব মাত্রেই কর্মের অধীন। তাই জোর করে ধর্মের বাণী বা ব্যক্তিগত মত বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে কারও ওপর প্রতিষ্ঠা করতে পারি না। প্রত্যেকেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। তবে, মতামতের ভিত্তিতে তা খণ্ডনও করা যায়। জ্ঞানদৃষ্টি বা মানবিক দৃষ্টিকোণ, যেখান থেকেই বলি না কেন দেখা যাচ্ছে যে, ধর্ম বা মতবাদ মানা না মানা ব্যক্তির স্বতন্ত্র ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে কিন্তু ভিন্ন ধর্ম, মত ও পথের মানুষের সহাবস্থান নিরাপদ, সুনিশ্চিত করতে হবে।
ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান ছাড়াও এই ছোট্ট দেশটিতে রয়েছে নানা দেব-দেবীতে বিশ্বাসী অসংখ্য ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী যাদের প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা আলাদা কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভাষা, ধর্মবিশ্বাস, জীবনাচরণ ইত্যাদি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি সংখ্যালঘু এসব সম্প্রদায় সেই প্রাচীনকাল থেকেই মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। মসজিদ, মন্দির, বিহার, গির্জার পাশাপাশি উপাসনালয় রয়েছে নানা ধর্মবিশ্বাসীদের। মন্দিরের শাঁখ কিংবা কাঁসর ঘণ্টার আওয়াজ যেমন কখনও অন্যান্য ধর্মের লোকের কানে বেসুর ঠেকেনি তদ্রƒপ মসজিদের আজানের ধ্বনিও ভিন্ন মতালম্বীর কানে বিকট ঠেকেনি। বৌদ্ধদের বন্দনাগীতি, খ্রীস্টানদের ভজনা ও নৃত্যগীত যে কাউকেই প্রীত করে। পীড়িত করে এসবের মাঝে যখন অপ্রত্যাশিতভাবেই ঐক্যতানে ছেঁদ পড়ে তখন বিপন্ন বোধ করি।
আমাদের ভুলে গেলে উচিত হবে না, এদেশের মানুষের কাছে নানান ধর্ম ও মতবাদ আসার আগেও আমাদের পূর্বপুরুষরা ছিল, আমরা তাদেরই উত্তরাধিকারী হয়ে ধর্ম ও মতের বিভক্তিতে রক্ত আর সংস্কৃতির বিচ্ছেদ করতে পারি না। এটা যথাযোগ্য অনুধাবন না করতে পারলে কোন জাতি সে যতই সমৃদ্ধশালী হোক না কেন, সময়ের পরিক্রমায় ধ্বংস তার অনিবার্য। ভিন্ন মত ও পথের বিচিত্র, বৈচিত্র্য মানুষ পৃথিবীতে অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে, ভবিষ্যতে থাকবে এটা স্বাভাবিক মেনেই সকলের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের, বন্ধুর বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে, এমন গুণাবলীই উত্তম ধর্ম মানুষের।
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক- বুদ্ধ পূর্ণিমার পবিত্র দিনের প্রার্থনা।
লেখক : উপাধ্যক্ষ,
আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার, মেরুল বাড্ডা, ঢাকা।
শুধু বিশেষ আকার বা একটি কাঠামোর জন্য মানুষ হিসেবে বিবেচিত হন না। মানুষ হিসেবে আমাদের রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তি নামক বিশেষ একটি গুণ; যার ধর্ম হলো যে কোন বিষয়ে আমাদের বিচারিক ক্ষমতা বা মূল্যায়নের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও পূর্বে এ ভূভাগে জন্ম নেয়া তথাগত বুদ্ধ দাবি করেছিলেন সর্ব জীবের স্ব স্ব স্থানে স্বাধীন অবস্থান। শুধু মানুষের জন্য নয় তাঁর মৈত্রীভাব পৌঁছে গিয়েছিল দৃষ্টিগোচর হয় এবং দৃষ্টিগোচর হয় না এমন সকল প্রাণীর কাছে। তাই তো তিনি বলেছিলেন ‘সব্বে সত্ত্বা সুখিতা হোন্তু’ অর্থাৎ জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। বোধের অমৃত অবগাহন হলে প্রাজ্ঞদের সকলে স্বীকার করেন, জাতপ্রথা, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র বিভাজন নিষ্ফল, নিরর্থক! বোধের বাতায়ন রুদ্ধ থাকার দরুন অন্ধ প্রকোষ্ঠে মানুষ মানুষের সঙ্গে, ধর্ম ধর্মের সঙ্গে, গোত্র গোত্রের সঙ্গে স্বার্থ বা দেমাগের বশে কলহরত। মহান বুদ্ধ বলেন: কলহে জর্জরিত অন্ধ মানুষ জানে না, সে নিজেই যেখানে নিজের নয়, অন্যকে অধীনে, হাতের মুঠোতে বশ করতে চায় কি করে? বুদ্ধের শিক্ষা বা দেশনা পাঠোদ্ধার করলে দেখা যায়, জীব মাত্রেই স্বাধীন। কোন প্রকার বৈষম্য দেখা দিলে তা বুদ্ধধর্মের পরিপন্থী বলেই গণ্য হবে। তাই আমাদের মেনে নিতে একটুও দেরি হয় না যে- জ্ঞানচর্চায় এক অনন্য প্রভাবক ব্যক্তিত্ব, মিশেল ফুকোর এ আহ্বান- ‘আমার ভূমিকা হলো এবং তা হয়ত বাড়িয়ে বলা হবে- মানুষকে দেখানো যে, তারা যেটুকু অনুভব করে তার চেয়েও তারা বেশি স্বাধীন।’
মানুষ হিসেবে আমাদের বাড়তি কিছু সুযোগ-সুবিধা রয়েছে ... শুধু আত্ম স্বার্থ চরিতার্থ করাই নয়, অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদনের প্রতি সবিশেষ মনোযোগ, সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালনীয়। সর্বজীবের প্রতি মানবিক কর্তব্য পালনের জন্য কারও নির্দেশের অপেক্ষায় থাকাটাও অনেক সময় অমানবিক। আমরা মানুষ হিসেবে মঙ্গলকর কর্তব্য পালন করব এটা মানুষের ধর্ম। স্মরণ করতে পারি, এ বিষয়ে তথাগত বুদ্ধ বলেছেন : ‘মা’ যেভাবে সকল আপদ-বিপদ থেকে নিজের সন্তানকে অপার মৈত্রীবন্ধনে বুকে জড়িয়ে রাখে, রক্ষা করে তোমরাও সেইরূপ মৈত্রীভাবে সকল জীবের প্রতি পোষণ করিও।
বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত জনবহুল একটি দেশ। পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ আমাদের এই মাতৃভূমি। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার কারণে আমাদের সামগ্রিক অবস্থায় বিশেষ প্রভাব রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে যদি দেখি বৌদ্ধরা কখনও ধর্মীয় উম্মাদনায় আস্থাশীল নয়, তারা জ্ঞানের বাহনে চড়ে এ জীবনযাপন করতে আগ্রহী। এ দেশ চার শ’ বছর বৌদ্ধরা শাসন করে (পাল রাজাগণ) যাকে ঐতিহাসিকগণ বাংলার স্বর্ণযুগ বলেই মত দেন। পালদের রাজত্বকালে সকল ধর্মের সহাবস্থান বাংলার যে কোন সময়কে ম্লান করে দিয়ে আজও সোনার মতো ঔজ্জ্বল্য ছড়াতে থাকে। আমরা বুদ্ধের এ কথা কখনও ভুলি না যে কর্ম সু ও কু ফলদায়ী, যার যার কর্ম স্ব স্ব অবস্থানে ভোগ করবে। জীব মাত্রেই কর্মের অধীন। তাই জোর করে ধর্মের বাণী বা ব্যক্তিগত মত বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে কারও ওপর প্রতিষ্ঠা করতে পারি না। প্রত্যেকেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। তবে, মতামতের ভিত্তিতে তা খণ্ডনও করা যায়। জ্ঞানদৃষ্টি বা মানবিক দৃষ্টিকোণ, যেখান থেকেই বলি না কেন দেখা যাচ্ছে যে, ধর্ম বা মতবাদ মানা না মানা ব্যক্তির স্বতন্ত্র ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে কিন্তু ভিন্ন ধর্ম, মত ও পথের মানুষের সহাবস্থান নিরাপদ, সুনিশ্চিত করতে হবে।
ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান ছাড়াও এই ছোট্ট দেশটিতে রয়েছে নানা দেব-দেবীতে বিশ্বাসী অসংখ্য ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী যাদের প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা আলাদা কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভাষা, ধর্মবিশ্বাস, জীবনাচরণ ইত্যাদি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি সংখ্যালঘু এসব সম্প্রদায় সেই প্রাচীনকাল থেকেই মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। মসজিদ, মন্দির, বিহার, গির্জার পাশাপাশি উপাসনালয় রয়েছে নানা ধর্মবিশ্বাসীদের। মন্দিরের শাঁখ কিংবা কাঁসর ঘণ্টার আওয়াজ যেমন কখনও অন্যান্য ধর্মের লোকের কানে বেসুর ঠেকেনি তদ্রƒপ মসজিদের আজানের ধ্বনিও ভিন্ন মতালম্বীর কানে বিকট ঠেকেনি। বৌদ্ধদের বন্দনাগীতি, খ্রীস্টানদের ভজনা ও নৃত্যগীত যে কাউকেই প্রীত করে। পীড়িত করে এসবের মাঝে যখন অপ্রত্যাশিতভাবেই ঐক্যতানে ছেঁদ পড়ে তখন বিপন্ন বোধ করি।
আমাদের ভুলে গেলে উচিত হবে না, এদেশের মানুষের কাছে নানান ধর্ম ও মতবাদ আসার আগেও আমাদের পূর্বপুরুষরা ছিল, আমরা তাদেরই উত্তরাধিকারী হয়ে ধর্ম ও মতের বিভক্তিতে রক্ত আর সংস্কৃতির বিচ্ছেদ করতে পারি না। এটা যথাযোগ্য অনুধাবন না করতে পারলে কোন জাতি সে যতই সমৃদ্ধশালী হোক না কেন, সময়ের পরিক্রমায় ধ্বংস তার অনিবার্য। ভিন্ন মত ও পথের বিচিত্র, বৈচিত্র্য মানুষ পৃথিবীতে অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে, ভবিষ্যতে থাকবে এটা স্বাভাবিক মেনেই সকলের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের, বন্ধুর বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে, এমন গুণাবলীই উত্তম ধর্ম মানুষের।
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক- বুদ্ধ পূর্ণিমার পবিত্র দিনের প্রার্থনা।
লেখক : উপাধ্যক্ষ,
আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার, মেরুল বাড্ডা, ঢাকা।
No comments:
Post a Comment