Saturday, May 3, 2014

সুশীল মোদীরই ভরসা নেই নরেন্দ্র মোদীর ‘লহরে’

সুশীল মোদীরই ভরসা 
নেই নরেন্দ্র মোদীর ‘লহরে’

অরূপ দাস

সমস্তিপুর : ২রা মে—‘মোদী হাওয়া’ কতটা বাস্তব বিহারে? আদৌ কি এমন লহর বা ঢেউ আছে যাতে ওই রাজ্যের ৪০টি আসনে মোদী একাই ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারেন বি জে পি-কে? তথাকথিত ‘ওপিনিয়ন পোল’-গুলি অনেক কথা বলেছে অবশ্য। কর্পোরেট প্রভাবিত সংবাদমাধ্যমের বৃহৎ অংশ বিহারে ‘মোদী’র বি জে পি-কে পারলে সব আসনেই জিতিয়ে দেয়। 

এই সব ‘ওপিনিয়ন পোল’ যে অনেকটাই পক্ষপাতদুষ্ট, শহুরে শিক্ষিতদের থেকে নেওয়া মতামতের উপর নির্ভর করা পরিসংখ্যান— তা এখন অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গেছে। তার উপর বিহার, উত্তর প্রদেশের মতো জাতপাতভিত্তিক রাজনীতি, বহু সংখ্যক বড় বা মাঝারি দলের ভোটে অংশগ্রহণ থাকলে ওইসব হিসাব-নিকেশ ধোপে টেকে না।

মিডিয়া যাই বলুক, এ পর্যন্ত ভোট হয়ে যাওয়া আসনগুলিতে খুব ভালো ফলের আশা করছেন না স্বয়ং সুশীল মোদী-সহ বি জে পি নেতারাই। এ কারণেই বাকি আসনগুলিতে, যেখানে আগামী দুই দফায় ভোট হবে তাতে দলীয় কর্মীদের কোমর বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বস্তুত, গত বুধবার হয়ে যাওয়া ভোটেও এমন নির্দেশ ছিল। এরই সঙ্গে নেমে পড়েছেন আর এস এস স্বেচ্ছাসেবকরাও। তাঁদের বলা হয়েছে, গ্রামে ভোটারদের কাছে গিয়ে বলতে হবে যে নরেন্দ্র মোদীকে আটকাতে কীভাবে আর জে ডি, কংগ্রেস, জনতা দল (ইউ)—সবাই মিলে ‘দুষ্টচক্র’ গড়ে তুলেছে।

আসলে নরেন্দ্র মোদীর নাম নিয়েই যত মুশকিল। একথা হাড়ে হাড়ে এখন বুঝতে পারছেন বিহারের বি জে পি নেতারা। বহুধা জাতপাতে বিভক্ত বিহারে যে স্রেফ হিন্দুত্ব দিয়ে ভোট হয় না তা উপলব্ধি করতে পারছেন অন্তত বি জে পি-র রাজ্যের নেতারা। একারণেই বি জে পি নেতা সুশীল মোদী জনসভায় বলে বেড়াচ্ছেন, নীতীশকুমার কোনো নীতির বা আদর্শের ভিত্তিতে নয়, স্রেফ নিজের রাজনৈতিক উচ্চাশা হাসিল করতে বি জে পি সঙ্গ ত্যাগ করেছেন। তাঁর দাবি, নীতীশের সঙ্গে আর এস এস-র সম্পর্ক সেই ১৯৬৭ থেকে। আর নীতীশ এন ডি এ-র সঙ্গেও ছিল সেই ১৯৯৮ সাল থেকে।

আর জে ডি প্রধান লালুপ্রসাদের সভায় কাতারে কাতারে মানুষের ভিড় করা দেখে কপালে ভাঁজ পড়েছে বি জে পি নেতাদের। এইসব দেখে বি জে পি বিধায়ক তথা রাজ্যের বিরোধী দলনেতা নন্দকিশোর যাদব বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘‘এখন পর্যন্ত যে কটা আসনে ভোট হয়েছে তাতে ৮০শতাংশ যাদব ভোট পাবে আর জে ডি। বাকি ২০শতাংশ আসতে পারে বি জে পি-র পক্ষে।’’ দলের নিচুতলা থেকে পাওয়া ভোট প্রবণতার খবরাখবর যাচাই করেই তিনি একথা বলছেন, এমন কথা সাংবাদিকদেরই বলেছেন। 

প্রাথমিক ভাবে মনে হচ্ছে, যাদবদের পাশাপাশি রাজ্যে বসবাসকারী ২৬শতাংশ মুসলমান ভোটারদের প্রথম পছন্দ আর জে ডি-কংগ্রেস-এন সি পি জোট। একথা শুধু বি জে পি নয়, বুঝতে পারছেন নীতীশকুমারও। বোধহয় সেকারণেই জনসভায় নীতীশ আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসাবে বেছে নিয়েছেন তাঁর একসময়ের বন্ধু এখন শত্রু লালুপ্রসাদকে। জনসভায় বলছেন, ‘‘মানুষ এখন চাঁদে পৌঁছে গেছে। আর একজন এখনও লন্ঠন (আর জে ডি-র প্রতীক) নিয়ে ঘোরাফেরা করছে। তীর (জনতা দল ইউ-র প্রতীক) দিয়ে বিঁধুন লণ্ঠনকে। ওই লণ্ঠন হলো পিছিয়ে পড়ার প্রতীক।’’ রাজনৈতিক মহল কিন্তু বলছে এখনও পর্যন্ত এগিয়ে আছে লালুপ্রসাদের জোটই। অনেকটা পিছিয়ে বি জে পি বা নীতীশকুমার। সংখ্যালঘুদের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে এ কথা: ফের বিধানসভা ভোট হলে আমরা হয়তো নীতীশকুমারকেই ভোট দেবো। কিন্তু এখন আমাদের প্রধান কাজ মোদীকে আটকানো। বিহারে একাজ একমাত্র লালুপ্রসাদ যাদবের নেতৃত্বাধীন জোটই পারবে।

মোদী ইতোমধ্যেই ২৪টি সভা করে ফেলেছেন বিহারে। যদি প্রধানমন্ত্রী হয়েই গেছেন তাহলে বিহারের প্রত্যন্ত মহকুমা শহরেও কেন সভা করতে হচ্ছে মোদীকে? বি জে পি নেতারা এর অবশ্য কোনো সদুত্তর দিতে পারছেন না। বি জে পি-র জাতীয় সাধারণ সম্পাদক সৌদান সিং পাটনায় ঘাঁটি গেড়েছেন। ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ওখানেই থাকবেন বলে জানা গেছে। নজরদারি চালাবেন গোটা ভোট পর্বে। দলের কয়েকজন বিধায়ক ভোটে এবার সেভাবে গা লাগিয়ে খাটছেন না। সম্ভবত একারণেই দলের কর্মীদের ভরসা না করে সঙ্ঘ পরিচালিত সরস্বতী শিশু মন্দির এবং বনবাসী কল্যাণ পরিষদের কর্মীদের নামিয়ে দেওয়া হয়েছে বাজারে। এতদিন এঁরা আড়াল থেকে হিন্দুত্বের প্রচার চালাতেন। এখন সরাসরি মোদীকে প্রধানমন্ত্রী বানানোর প্রচারে শামিল হয়ে পড়েছেন তাঁরা।

হিসাব বলছে, বিহারে বি জে পি-র সরাসরিভাবে ৯টি আসনে জেতার সম্ভাবনা আছে। বাকি হয়তো আরও কয়েকটা আসন আসতে পারে শেষ মুহূর্তের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, রাজনৈতিক টানাপড়েনে। গতবার ১২টি আসন পেয়েছিল বি জে পি। ৯টি আসন বলতে পাটনা সাহিব, আরা, বক্সার, পূর্ণিয়া, বাঁকা, শিওহর, মহারাজগঞ্জ, সারান এবং পশ্চিম চম্পারণ। নওয়াদা, আরারিয়া, কাটিহার এবং বেগুসরাইয়ে বি জে পি প্রবল আক্রমণাত্মক প্রচার চালালেও খুব লাভ হবে বলে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। নওয়াদায় ভোট হয়ে গেছে, আর জে ডি ভালো করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আবার বেগুসরাই পেতে পারে সি পি আই অথবা আর জে ডি। বি জে পি-র জোট শরিক রামবিলাস পাশোয়ানের এল জে পি জেতার মতো অবস্থায় আছে দুটি আসনে। এক, রামবিলাসের নিজের কেন্দ্র হাজিপুর এবং আরেক তাঁর ভাই রামচন্দ্র পাশোয়ানের সমস্তিপুর। তবে জিতবেই তা হলফ করে বলা যাচ্ছে না। রামবিলাসের ছেলে চিরাগের জয়ের সম্ভাবনা প্রায় নেই।

আর জে ডি-কংগ্রেস জোট প্রায় ২২টি আসনে জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করে ফেলেছে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। এর মধ্যে পাটলিপুত্রে লালুপ্রসাদের মেয়ে মিসা ভারতী, আরারিয়ায় তসলিমুদ্দিন, মধুবনীতে আবদুল বারি সিদ্দিকী, এম এ এ ফতমী দ্বারভাঙায়, রঘুবংশ প্রসাদ সিং বৈশালীতে রয়েছেন। উজিয়ারপুরে সি পি আই (এম) প্রার্থী রামদেব ভার্মার সঙ্গে জোর লড়াই হতে পারে আর জে ডি-র অলোক মেহতার। কংগ্রেস পেতে পারে সাসারাম, আওরাঙ্গাবাদ, সুপৌল এবং কিষানগঞ্জ। এন সি পি-র তারিক আনোয়ারের কাটিহারে জেতার সম্ভাবনা প্রবল। সামগ্রিকভাবে আর জে ডি জোট আরও ভালো ফল করলে আশ্চর্যের কিছু থাকবে না।

তুলনায় কিছুটা কোণঠাসা জনতা দল (ইউ)। নীতীশকুমারের দল এবার জোট বেঁধেছে সি পি আই-র সঙ্গে। অবশ্য ‘ওপিনিয়ন পোল’ বিশেষজ্ঞরা যেভাবে নীতীশকুমারকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন প্রতিপন্ন করেছেন ততটা খারাপ অবস্থা মোটেই নীতীশের নয়। উলটে যত ভোট গড়াচ্ছে তত পরিস্থিতি ক্রমশ ভালো হচ্ছে নীতীশের—বলছেন ভোট বিশেষজ্ঞরাই। তবে সেই জাতপাতের অঙ্কেই আটকে যাচ্ছেন তিনি। কুর্মি এবং মহাদলিতদের ভোটের গ্যারান্টি ছাড়া আপাতত তেমন বলার মতো কিছু নেই নীতীশের পক্ষে। এছাড়া মহিলাদের ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে মনে করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ছাত্রীদের সাইকেল দেওয়া, মহিলাদের সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত রাজ্য সরকারের কিছু কর্মসূচী বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।

এরই সঙ্গে নিজেদের সীমিত ক্ষমতা নিয়ে সম্পূর্ণ এককভাবে লড়ছে সি পি আই (এম)। খাগাড়িয়া, দ্বারভাঙা, উজিয়ারপুর এবং পশ্চিম চম্পারণ আসনে লড়ছে পার্টি। উজিয়ারপুর বামপন্থীদের বিশেষত সি পি আই (এম)-র শক্ত ঘাঁটি। সি পি আই নীতীশকুমারের সঙ্গে জোট গড়ে লড়ছে বেগুসরাই এবং বাঁকা আসনে।
- See more at: http://ganashakti.com/bengali/news_details.php?newsid=55611#sthash.Wby9yLv4.dpuf

No comments:

Post a Comment