Wednesday, May 14, 2014

বাংলাদেশে সোনা চোরাচালান ॥ নিরাপদ রুট ০ দু’বছরে শাহজালালে আটক হাজার কেজি ০ দুবাই থেকে ঢাকায় আনলে কেজিতে লাভ ৩২ লাখ, ভারতে নিতে পারলে ৮০ লাখ টাকা ০ ব্যাগেজ রুল ছাড়া বৈধ আমদানির সুযোগ নেই ০ আমদানি নীতিমালা নেই, সোনানীতি দাবি ব্যবসায়ীদের

বাংলাদেশে সোনা চোরাচালান ॥ নিরাপদ রুট
০ দু’বছরে শাহজালালে আটক হাজার কেজি
০ দুবাই থেকে ঢাকায় আনলে কেজিতে লাভ ৩২ লাখ, ভারতে নিতে পারলে ৮০ লাখ টাকা
০ ব্যাগেজ রুল ছাড়া বৈধ আমদানির সুযোগ নেই
০ আমদানি নীতিমালা নেই, সোনানীতি দাবি ব্যবসায়ীদের
--------------
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
আজাদ সুলায়মান 
--------------
দুবাইয়ে এক ভরি সোনার (২৪ ক্যারেট) দাম বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩৮ হাজার টাকা। ঢাকায় এর মূল্য ৪২ হাজার টাকা। ভারতের বাজারে তার দাম আরও বেশি অর্থাৎ বাংলাদেশী মুদ্রায় ৪৮ হাজার টাকা। হিসাব অনুযায়ী এক ভরি সোনা দুবাই থেকে ঢাকায় আনলেই লাভ চার হাজার টাকা। ভারতে নিতে পারলে লাভ দাঁড়ায় ভরিপ্রতি ১০ হাজার টাকা। দুবাই থেকে এক কেজি সোনা ঢাকায় আনলে ৩২ লাখ টাকা এবং ভারতে নিলে লাভ ৮০ লাখ টাকা। হঠাৎ দেদার সোনা চোরাচালানের এটাই প্রধান কারণ। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে চোরাই পণ্যের বিনিময় মূল্য। দক্ষিণ এশিয়ার গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল বাংলাদেশের বিভিন্ন রুটে চোরাচালানের অন্যান্য পণ্যের বিনিময় হিসেবেও সোনা ব্যবহৃত হয়। যেমন ভারত থেকে যখন ফেনসিডিল আসে সেটার মূল্য পরিশোধ করা হয় সোনা দিয়ে। এভাবে মাদক, অস্ত্র ও জঙ্গী অর্থায়নেও ব্যবহৃত হচ্ছে সোনা। এ কারণে সোনার দাম বাড়লেও এর চোরাচালান থামবে না। 
শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ বলছে, যতদিন মাদক, মুদ্রা পাচার, সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ থাকবে ততদিন সোনার ব্যবহার চলবে। গত দু’বছরে ঢাকায় চোরাই সোনা আটক করা হয়েছে এক হাজার কেজি। টাকার অঙ্কে এটা তেমন বেশি না হলেও, এতে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সোনা চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। জাতি হিসেবে এটা খুবই লজ্জার। আর অর্থনীতিতে কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়টি হুমকির মুখে। যেভাবে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে সোনা আনা হচ্ছে সেভাবে বড় ধরনের বিস্ফোরক দ্রব্য ও মারণাস্ত্র বিমানে করে আনা সম্ভব। এ ধরনের বেপরোয়া চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করা এখন রাষ্ট্রের কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনকণ্ঠের দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এ ধরনের তথ্য।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বৈধভাবে শুল্ক পরিশোধ করে সোনা আমদানিতে তেমন লাভ থাকে না। তাতে ব্যবসায়ীরা বৈধ আমদানিতে আগ্রহ হারিয়ে বেছে নিচ্ছে ব্যাগেজ রুল। যার অর্থ হচ্ছে- প্রতিদিন মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা যাত্রীদের মাধ্যমে ব্যাগেজ রুলে সোনা আনা হচ্ছে। পরে তাদের কাছ থেকে সোনা ব্যবসায়ীরা সোনা কিনে নেয়। গত দু’বছর ধরে এভাবেই চলছে দেশীয় সোনার মার্কেট। ঢাকা কাস্টমস হাউস জানিয়েছে, গত এক বছরে এক রতি সোনাও আমদানি হয়নি। তাতেই প্রমাণিত হয় দেশের শীর্ষ সোনা ব্যবসায়ীরা বিকল্প পথে সোনা আনছে। সোনা শুধু কারখানায় ব্যবহারের জন্য চোরাচালান হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা ও জঙ্গী অর্থায়নের জন্যও সোনা ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন এক কোটি টাকা এক দেশ থেকে অন্য দেশে বহন করা যতটা কঠিন, সমপরিমাণ সোনা বহন ততটা সহজ। 
সোনা ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশে প্রতিবছর সোনার চাহিদা কমপক্ষে পাঁচ টন। সোনার এ বিশাল চাহিদা মেটানোর জন্য গত এক বছরে বৈধ পথে এক রতি সোনাও আমদানি করা হয়নি। তাহলে এ শুল্ক বিভাগ তথ্য প্রমাণাদি দিয়ে বেশ জোরেই বলছে- চাহিদার কিছু অংশ বৈধ পথে ব্যাগেজ রুলে আনা হচ্ছে। সেটার পরিমাণ কিছুতেই বছরে দুই হাজার কেজির বেশি হবে না। এ হিসেবে বাকি সব সোনার একমাত্র উৎস চোরাচালান। তবে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সভাপতি বলছেন, মোট চাহিদার পঁচাত্তর শতাংশই দেশী উৎসের সোনা, যা প্রতিবছর হাতবদল হচ্ছে। বাকি সোনা আসছে ব্যাগেজ রুলে। দেশীয় চাহিদা মেটানো ছাড়াও প্রতিবেশী ভারতের বর্তমান চাহিদা মেটানোর জন্যই চোরাচালানের হার বেড়েছে অবিশ্বাস্য পরিমাণে। দেশে সোনা আমদানির কোন নীতিমালা নেই। তাই বাড়ছে বিকল্প উপায়ে সোনা সংগ্রহ। চোরাচালান রুখতে হলে অবিলম্বে সোনা নীতি করতে হবে। 
একই অভিমত ব্যক্ত করে দেশের শীর্ষ স্থানীয় সোনা ব্যবসায়ী কাজী সিরাজুল ইসলাম বলেন, শুধু সোনানীতি না থাকায় আজ এত সঙ্কট এত ঝামেলা হচ্ছে। যেমন ভারতের ব্যবসায়ীরা সোনা সংগ্রহ করে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। ব্যবসায়ীরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সোনার চাহিদা অনুযায়ী টাকা জমা দেন। তারপর ব্যাংক আমদানি করে সেটা রিসিট রেখে ব্যাবসায়ীদের কাছে হস্তান্তর করে। ঢাকায় শীর্ষ সোনা ব্যবসায়ীদের জন্য এ ধরনের কোন সুযোগ নেই। তাদের সোনা সংগ্রহ করতে হয় প্রচলিত পদ্ধতিতে। তাঁতীবাজারের কিছু সোনা ব্যবসায়ী দেশের প্রায় ২৪ ক্যারেট সোনা সরবরাহ করে থাকেন। তাদের কাছ থেকে নগদ টাকায় সোনা কিনতে হয়। এখন তাঁতীবাজারের ব্যবসায়ীরা কোথা থেকে এ সোনা আনছেন সেটা আামাদের জানা নেই। কিছু সোনা তাঁরা দেশী মার্কেট থেকে হাতবদল পদ্ধতিতে আনছেন। এটাকে বলা হয় বুলিয়ন পদ্ধতি। তাঁদের কাছে থাকা সোনার উৎস বৈধ না অবৈধ- সেটাও আমাদের কাছে অজানা। কাজেই একটা সোনা নীতি হওয়া খুবই জরুরী। চোরাচালানের বর্তমান চিত্র প্রমাণ করে বিষয়টি এখন জায়েজ হয়ে গেছে। সরকার ও প্রশাসনের নির্লিপ্ততা দেখে মনে হয় চোরাচালান কোন অপরাধ নয়। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ কারণেই বাংলাদেশ এখন সোনা চোরাচালানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ট্রানজিটে পরিণত হয়েছে। চোরাচালান ছাড়াও গত এক বছরে বাজারে যে সোনা বেচাকেনা হয়েছে তা থেকে আদায়কৃত ভ্যাট ও রাজস্বের পরিমাণ আরও হতাশজনক। জুয়েলার্স সমিতির দেয়া হিসাবের সঙ্গে ভ্যাট আদায়ের বিপরীতে বিক্রীত সোনার পরিমাণেও দেখা যায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
চোরাচালানিরাই জানিয়েছে, বিমানবন্দরে যে পরিমাণ সোনা ধরা পড়েছে; তা চোরাচালানের দশ ভাগের এক ভাগ। গত জুনে ধরা পড়া এ যাবতকালের সর্ববৃহৎ ১২৪ কেজি চালানের চেয়েও আরও অনেক বড় চালান বিমানবন্দরের সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে নিয়ে বের হয়ে গেছে মে মাসে। ওই চালানে সাড়ে পাঁচ মণ সোনা আনা হয়। বাংলাদেশ বিমানের একটি এয়ারবাসের কার্গো হোলের ভেতরে লুকিয়ে আনা হয় ওই চালান। তা খালাস করা হয় বিমানের প্রকৌশল হ্যাঙ্গারে। দুবাই থেকে আনা সে চালান অনায়াসেই বিমানবন্দর পার হয়ে যাওয়ায় চোরাচালানিরা উৎসাহিত হয়ে পরের চালান আনে এবং ঘটনাক্রমে সেটা ধরা পড়ে যায়। শাহজালাল বিমানবন্দরে গত এপ্রিলের পর থেকে ধরা পড়া বড় বড় চালানের গন্তব্য ছিল ভারত। ধরা পড়া কজন ক্যারিয়ার জনকণ্ঠকে জানিয়েছে, শাহজালাল থেকে বের করে সে সোনা সড়কপথে নেয়া হয় বেনাপোল শার্শা সীমান্ত পথে। সেখান থেকে কলকাতায় হয়ে সড়কপথেই সোনা যাচ্ছে জয়পুর, রাজস্থান ও মুম্বাইসহ অন্যান্য এলাকায় অবস্থিত কারখানায়।
সোনা যাচ্ছে কোথায়
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যে দেখা যায়, ধরা পড়া সোনার চালানগুলোর গন্তব্য ভারতে। সেখানে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম সোনা ও মণিমুক্তা দিয়ে তৈরির অলঙ্কার শিল্প-কারখানা। এই শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশাল অবকাঠামো। এসব কারখানায় বছরে চাহিদা কমপক্ষে এক হাজার টন সোনা। ভারতের পরই চীন হচ্ছে বৃহৎ স্বর্ণালঙ্কার ও মণিমুক্তা তৈরির কারখানা। মূলত এ দুটো দেশের উৎপাদিত স্বর্ণালঙ্কার দিয়েই মেটানো হচ্ছে সারাবিশ্বের চাহিদা। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গেও রয়েছে সোনার কারখানা। ভারতের জয়পুর, মুম্বাই ও সুরাটের কারখানায় বছরে কমপক্ষে হাজার টন সোনার চাহিদা রয়েছে। এ সোনা ব্যবহৃত হয় অলঙ্কার শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে। যা এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। 
জানা যায়, ভারতে সোনার ওপর অস্বাভাবিক করারোপ করায় শিল্প কারখানাগুলো চরম সঙ্কটে পড়ে। এতে আমদানি প্রবাহ একেবারে কমে যায়। বৈধভাবে আমদানি করে আনা সোনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কারখানাগুলো বেছে নেয় বাঁকা পথ। শুধু কর ফাঁকি দেয়ার জন্য আমদানিকারকরা আমিরাত থেকে চোরাই পথে সোনা আনার জন্য বেছে নেয় বাংলাদেশ। ওরা খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারে, দুবাই থেকে অনায়াসে সোনা কিনে তা ঢাকা হয়ে ভারতে নেয়া যথেষ্ট সহজসাধ্য ও নিরাপদ। এ কারণেই শাহজালালে সোনা ধরার চিত্র এতটা ভয়াবহ। এ ছাড়া এ পর্যন্ত বেশ কয়েক ভারতীয় নাগরিককে সোনাসহ ধরা হয়েছে। তারা এখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। 
দুবাই থেকে আকাশপথে বাংলাদেশের বিমানবন্দর হয়ে চালান ভারতে নেয়ার জন্য প্রথমেই গড়ে তোলা হয় একটি সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেট সদস্য থাকে বিমানের পাইলট, ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার, ক্লিনার, নিরাপত্তা বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা, সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তাকর্মী, কাস্টমসের কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি। একই সিন্ডিকেটের সহায়তায় দুবাই থেকে প্রায় ১৮টি চালান আনা হয় গত বছর এপ্রিল থেকে জুন মাসে। 
দুবাই থেকে ঢাকা 
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বড় চালানের বেশিরভাগই আসছে দুবাই থেকে। সৌদি আরব মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকেও কিছু সোনা আসছে। অন্য দেশ থেকে আসা চালানগুলো খুব বেশি বড় নয়। তবে দুবাই থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়। এ সিন্ডিকেটে রয়েছে কলকাতা, দিল্লী ও মুম্বাইয়ের কয়েক মারোয়ারী ব্যবসায়ী। প্রশ্ন হচ্ছে, টয়লেটের দেয়াল কেটে ভেতরে সোনা ঢোকানো এবং বের করার সঙ্গে কারা কারা জড়িত। সাধারণ যাত্রীর পক্ষে এমনভাবে কিছুতেই সোনা ঢোকানো বা বের করা সম্ভব নয়। এটা টেকনিক্যাল কাজ। উড়োজাহাজ যখন হ্যাঙ্গারে নেয়া হয়, তখনই এ সোনা বের করে নেয়া হয়।
এ ব্যাপারে বিমানের এক পরিচালক জনকণ্ঠকে বলেন, দুবাইয়ের বিমান কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ছাড়া কিছুতেই এত বড় চালান উড়োজাহাজে তোলা সম্ভব নয়। দুবাইয়ে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজ যে প্রতিষ্ঠানই করুক কী পরিমাণ পণ্য জাহাজে উঠবে তার হিসাব ও দায়ভার সেখানকার বিমান কর্মকর্তাদের। শুল্ক বিভাগ থেকে জানানো হয়, দুবাইয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি খতিয়ে দেখে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। 
বিমান প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এ ধরনের চোরাচালানে জড়িত। উড়োজাহাজের ভেতরে কী ধরনের মালামাল লোড-আনলোড করা হয় তা নিরাপত্তা বিভাগের লোকজন সর্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখে। দুবাই থেকে ঢাকা পর্যন্ত সব কিছুই বিমানের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীর তত্ত্বাবধানেই থাকে। বিমানের নিরাপত্তা বিভাগের কয়েক কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁরা সন্তোষজনক কোন জবাব দিতে পারেননি। তাঁদের গতিবিধিও নজরদারিতে রয়েছে। সর্ববৃহৎ ১২৪ কেজি সোনা চোরাচালানের ঘটনা তদন্তে প্রকৃত হোতাদের অবশ্যই বের করা হবে। তদন্তে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে তা এখনই প্রকাশ করা যাচ্ছে না। 
এ ব্যাপারে র‌্যাব-১ অধিনায়ক লে. কর্নেল কিসমত হায়াত বলেছেন, বিমানবন্দর থেকে পিছু নিয়ে মগবাজারে গিয়ে সোনাসহ আটক বিমান নিরাপত্তাকর্মী কামরুলসহ চারজনকে আটকের পর তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তখন তাঁরা ১২৪ কেজি সোনার চালানের সঙ্গে কারা কারা জড়িত সে ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন।
দু’চালানের যোগসাজশ
গত বছরের বড় চালান ছিল ১২৪ কেজির। এ বছরের বড় চালান ১০৬ কেজি। শুল্ক গোয়েন্দারা জানান, দুটো চালানেরই যোগসাজশ রয়েছে। দুটো চালানই খালাস করা হতো হ্যাঙ্গারে। জড়িতও ছিল সেই সিন্ডিকেট। শুল্ক গোয়েন্দাদের একটি উচ্চ কমিটি এসব তদন্ত করতে সম্প্রতি দুবাই সফর করেছে। তারা সেখানে বিমান কর্মককর্তাসহ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তদন্ত কমিটির এক সদস্যের অভিমত দুবাইয়ে বিমানের কর্মকর্তাদের অজান্তে এত বড় চালান উড়োজাহাজে তোলা সম্ভব নয়। একইভাবে ঢাকায় বিমানের নিরাপত্তা বিভাগের শীর্ষ কর্তাদেরও সন্দেহের শীর্ষে রেখেছে তদন্ত কমিটি। বিমানবন্দর থানার ওসি (তদন্ত) সফিকুল ইসলাম মোল্লা জানান, ১২৪ কেজি সোনা আর ১০৬ কেজি সোনার চালানের সঙ্গে বিমানের সিন্ডিকেট জড়িত। বার বার তারাই এ কাজ করছে। 
পুলিশ জানায়, গত মাসে ১০৬ কেজি সোনার যে চালান ধরা পড়েছে তা হ্যাঙ্গারে খালাস করার পরিকল্পনা ছিল। যাত্রীরা ‘অরুণ আলো’ উড়োজাহাজ থেকে নেমে যাওয়ার পর পরই সে সোনার চালান খালাস করতে যায় আনিস ও নিয়াজসহ কজন মেকানিক। তখনই তারা হাতে নাতে ধরা পড়ে। শুল্ক গোয়েন্দা মহাপরিচালককে সেদিন সকাল নয়টা থেকে অরুণ আলোতে অভিযান চালানোর সময়ও তাকে বার বার বিমান থেকে তাড়াতাড়ি অভিযান শেষ করার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছিল। টানা চারঘণ্টা তল্লাশির পর শেষ মুহূর্তে টয়লেটে দেখা যায় সোনার খনি।
গ্রেফতারের পর বিমান মেকানিক আনিস বিমানবন্দর থানায় বসে জনকণ্ঠকে জানান, এ সোনা খালাস করা হতো হ্যাঙ্গারে। তাঁর বিভাগীয় কর্মকর্তা মাসুদ ছাড়াও লিটন, আবু, পিন্টু, পলাশ, সানাউল্লাহ, দিরাজ, সুফিয়ানসহ কজন এসব চোরাচালানে জড়িত। আনিস আরও জানান, এ চালান ধরা পড়ার দু’সপ্তাহ আগে বিমানবন্দরের হাবিব হোটেলে তাঁকে ডেকে নেন মাসুদ। মাসুদই তাঁকে সেখানে লিটন ও পারভেজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। সেদিনই তাঁকে দায়িত্ব দেয়া হয় আনিসকে এ চালানে সহযোগিতা করার জন্য। আনিস জানান, বিমান প্রকৌশল বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অজান্তে কিছুতেই হ্যাঙ্গারে সোনা খালাস করা সম্ভব নয়। আর উড়োজাহাজের টয়লেট কেটে সোনা লুকানোর মতো ভয়ঙ্কর ঝুঁকিপূূর্ণ কাজ করাটাও শুধু নিচের লেভেলের মেকানিক বা ক্লিনারের পক্ষে সম্ভব নয়। এতে বিভাগীয় প্রধানের দায়-দায়িত্ব নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। 
নেপথ্য নায়ক কারা 
বার বার এত বড় বড় চালান কারা আনছে এর নায়ক কারা এটাই এখন বড় প্রশ্ন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শুল্ক মহাপরিচালক মইনুল খান বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল হোতা বা ক্যারিয়ার ধরা পড়ছে না। যে কজন ধরা পড়ছে তারা সোনার মালিক নয়। ওরা পেশাদার ক্যারিয়ার বা বহনকারী। ওরা শুধু স্টেশন টু স্টেশন ক্যারিয়ার। এ ব্যবসা করে তারা একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পায়। দুবাই থেকে সোনা কেনার টাকাও পাচার করা হচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। বিমানবন্দর থানার ওসি শাহ আলম বলেন, এখন পর্যন্ত বড় কোন গডফাদার ধরা পড়েনি। গত সপ্তাহে রোগী সেজে দুজন যাত্রীকে সোনাসহ আটক করা হয়। তারা এ সোনার মালিক হলেও বড় চালানের মালিকরা বরাবরই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
নিরাপদ বাহন বিমান
এ পর্যন্ত বড় বড় চালান সবই আসছে বিমানের ফ্লাইটে। গত বছরের মে মাসে আনা ১২৪ কেজি সোনা আসে বিমানের এয়ারবাসে। এ বছরও গত মাসে ১০৬ কেজির বিশাল চালান আসে নতুন বোয়িং অরুণ আলোতে। দুটো উড়োজাহাজের লক্ষ্য ছিল বিমানের হ্যাঙ্গার। সেখানে নেয়ার আগেই চালান দুটো ধরা পড়ে। ১২৪ কেজির ঘটনায় থানায় কোন মামলা না হলেও ১২৩ কেজির চালানে হাতেনাতে একজনকে ধরা হয়। তাঁর নাম আনিস উদ্দিন। তাঁকে রিমান্ডে নেয়ার পর পুলিশকে তিনি জানান, বিমানের হ্যাঙ্গারে কর্মরত তাঁর বিভাগীয় প্রধান মাসুদই তাঁকে এ চালান খালাস করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ঘটনার পর থেকে মাসুদ পলাতক থাকলেও ধরা হয়েছে নিয়াজ নামে আরও একজনকে। আনিস জনকণ্ঠকে জানান, হ্যাঙ্গারের কয়েক মেকানিক ও প্রকৌশলী দীর্ঘদিন ধরেই বিমানের ফ্লাইটে সোনা চোরাচালানে জড়িত। হ্যাঙ্গারপ্রধানের রহস্যজনক উদাসীনতায় এখানকার কজন চিহ্নিত কর্মচারী ও কর্মকর্তা এ কাজে লিপ্ত। বিমানবন্দর থানার ওসি শাহ আলম জানান, মূলত মাসুদকে ধরা গেলে ১০৬ কেজি সোনার প্রকৃত গডফাদারের পরিচয় জানা যাবে। তাঁকে ধরার জন্য নওগাঁয় চালানো হয়েছে অভিযান। এ চালান ধরা পড়ার দিন পনেরো আগে হাবিব হোটেলে বসে মাসুদ আনিসকে পরিচয় করিয়ে দেন সোনার মালিক পারভেজ ও লিটনকে। তাঁরা উত্তরায় থাকেন। ইসমাইল নামে আরও এক স্মাগলার এখন পলাতক। প্রশ্ন উঠেছে বিমান কেন নিরাপদ বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ সম্পর্কে শুল্ক বিভাগের মহাপরিচালক মইনুল খান বলেন, বিমানের হ্যাঙ্গারে কর্মরত একশ্রেণীর মেকানিক ও ক্লিনার ফ্লাইটের ভেতরে যাতায়াতের সুযোগ পায়। তারা যে কোন অজুহাতে ফ্লাইটে প্রবেশের দরুন টয়লেটের ভেতর থেকে সোনা সরানোর সুযোগ পায়। এ কারণেই এই প্রথমবারের মতো বিমানের উড়োজাহাজ অরুণ আলোকে জব্দ করা হয়েছে। শুল্ক আইনের ধারায় রয়েছে, চোরাই পণ্য যার কাছে বা যে বাহনে পাওয়া যাবে সেটাও জব্দ করা যায়। তদন্তে প্রমাণিত হলে এক্ষেত্রে অরুণ আলো বাজেয়াফত করা হতে পারে। এ জন্যই বিমান নিরাপদ বাহন।

No comments:

Post a Comment