তারকাকে দেখতে ছুটলেও, গ্রামের ভরসা আচারিয়ায়
প্রসূন ভট্টাচার্য: বাঁকুড়া, ৩রা মে — একজনের কাছে ছুটে আসা সমস্যার কথা জানাতে। আরেক জনের কাছে ছুটে যাওয়া এক ঝলক দেখতে। একজন বলছেন, গরিবের রুটি-রুজির জন্য ভোট চাইতে এসেছি। আরেকজন প্রয়াত মায়ের নাম করে বলছেন, আমি তাঁর মেয়ে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন বলে বাঁকুড়ায় ভোটে দাঁড়িয়েছি। বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রের মুখ্য দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর ভোটপ্রচারের এটাই চিত্র।
১৯৮০সাল থেকে টানা ৯বারের বিজয়ী সাংসদ সি পি আই (এম)-র বাসুদেব আচারিয়া গত দু’মাস ধরে বাঁকুড়ার গ্রামের পর গ্রাম চষে ফেলেছেন। প্রতিদিন সকাল সাতটার মধ্যে বেরিয়ে পড়ছেন, গ্রামে গ্রামে ঘুরছেন। পার্টিকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলছেন। শনিবার সকালে ছাতনার জিড়রাতে গিয়ে দেখলাম— নতুন কিছু নয়, লোকসভায় যে রাজনৈতিক কথা বলে তিনি গরিব মানুষের রুটি-রুজির দাবি জানান, সেই কথাই গ্রামের মানুষের সামনেও অল্প কথায় সারছেন। বলছেন, গরিবের জন্য সরকারের বিকল্প নীতির প্রয়োজনের কথা। সাংবাদিকরা যাকে ‘খবর’ বলি তেমন কিছু নেই। কিন্তু তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই গ্রামবাসীরা তাঁকে ছেঁকে ধরলেন নানা সমস্যা নিয়ে। কারোর আর্থিক সমস্যা, কারোর চিকিৎসার সমস্যা, কারোর ছেলেমেয়ের পড়াশোনার সমস্যা। একের পর এক গ্রাম, যেখানেই বাসুদেব আচারিয়া যাচ্ছেন, মানুষের সমস্যার কথা শুনছেন। সাধ্যমতো সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছেন।
তাঁর বিরুদ্ধে লড়তে নামা তারকা অভিনেত্রী তৃণমূল প্রার্থী মুনমুন সেনের অবশ্য এই সমস্যা নেই। ৪৩ডিগ্রি সেলসিয়াসের বাঁকুড়ায় গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর ঝক্কি তিনি নেননি। মূলত রোড শো’র ওপরেই নির্ভর করে আছেন। মানুষ তাঁর জন্যও আসছেন, ছুটে ছুটেই আসছেন। তবে সমস্যার কথা বলতে নয়, পর্দার নায়িকাকে বাস্তবে এক ঝলক দেখতে। মুনমুন সেন চলেছেন প্রচার গাড়িতে হাত নাড়তে নাড়তে, সঙ্গে দুই কন্যা রাইমা এবং রিয়া সেনকেও দেখা গেছে। গঞ্জ এলাকায় কিছু সভাও করেছেন তৃণমূল প্রার্থী। কিন্তু প্রচার বলতে কোনো রাজনৈতিক কথা নেই। মনোনয়ন জমা দিয়েছেন তিনি শ্রীমতি দেববর্মা নামে। তৃণমূলের দেওয়াল লিখনে তাই ব্র্যাকেটে তাঁর পরিচিত নাম লিখে দিতে হচ্ছে। আর তিনি নিজে সভায় গিয়ে বলছেন, ‘আমি সুচিত্রা সেনের মেয়ে। উত্তম-সুচিত্রা জুটির সুচিত্রা সেন। মায়ের মৃত্যুর সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি আমাদের অনেক সহায়তা করেছেন। তাঁর কথাতেই আমি বাঁকুড়াতে ভোটে প্রার্থী হয়েছি। আপনাদের সমর্থন চাই কিন্তু।’
প্রার্থী হিসাবে নাম ঘোষণার পরেই সাংবাদিকদের কাছে অবশ্য মুনমুন সেন কোনোরকম রাখঢাক না করে স্বীকার করে নিয়েছিলেন, ‘আমি রাজনীতির কিছু বুঝি না। তবে সবাই সাহায্য করছে শিখে নেবো।’ রাজনীতির কী শিখবেন? ‘জনসংযোগ’। মুনমুন সেন উত্তর দিয়েছিলেন। তবে রাজনৈতিক দলের ‘কর্মীসভা’ আর ‘কর্মচারীদের সভা’ যে এক নয়, সেটা তিনি এখনই গুলিয়ে ফেলছেন। চটজলদি শেখার বিপদ আর কি!
সেই মুনমুন সেন প্রচারে বেরোচ্ছেন পুলিসের বেষ্টনী নিয়ে। চারপাশে তৃণমূল কর্মীদের হুড়োহুড়ি, লোকজনের ছবি তুলতে চাওয়া সব কিছু সামাল দিতে গিয়ে পুলিস জেরবার। এসব তো তাও তারকার বিড়ম্বনা বলে চালানো যায়। কিন্তু মুনমুন সেনের প্রচার গাড়ি যাবে বলে রাস্তা ধুয়ে দেওয়া? যে বাঁকুড়ার মানুষ গ্রীষ্মকালে জলকষ্টে ভোগেন, রাস্তার ধারের কল থেকে লম্বা লাইন দিয়ে জল সংগ্রহ করেন গ্রামবাসীরা, সেই বাঁকুড়া জেলার গ্রামে এমন দৃশ্য আগে কখনও দেখেননি গ্রামবাসীরা। মেজিয়ার গ্রামের রাস্তা দিয়ে মুনমুন সেন যাওয়ার সময় যাতে ধুলোয় কষ্ট না পান, তার জন্য তৃণমূলের পঞ্চায়েত থেকে রাস্তায় জল ঢেলে ভিজিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাস্তা ধুতে দেখা গ্রামবাসীরাই বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করছেন, ইনি বাঁকুড়ার সাংসদ নির্বাচিত হলে এখানকার মানুষের যন্ত্রণার জীবনকে ফিরে দেখার জন্য আবার আসবেন তো?
বাসুদেব আচারিয়া বলছেন, আমি এই কেন্দ্র থেকে পরপর ৯বার জিতেছি। কিন্তু দুঃখের কথা হলো, প্রতিবারই যিনি হারেন তিনি আর ফিরে আসেন না। পরেরবার আবার নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীকে দেখি। গত ২০০৯সালে সুব্রত মুখার্জি এসেছিলেন, হেরেছিলেন, আর আসেননি। এবার যিনি এসেছেন, তিনিও হয়তো আর আসবেন না।
লোকসভা কেন্দ্র হিসাবে এই কেন্দ্রটি অবশ্য ডিলিমিটেশনের পরে অনেকটাই পালটে গেছে। আগে বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রের বেশিরভাগ বিধানসভা কেন্দ্রই পুরুলিয়া জেলার অন্তর্ভূক্ত ছিল। ২০০৯সাল থেকে বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে কেবল পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুর রয়েছে। ২০১১সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের নিরিখে বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে রানীবাঁধ, রাইপুর ও তালডাংরা বামফ্রন্টের হাতে। রঘুনাথপুর, শালতোড়া, ছাতনা, বাঁকুড়া তৃণমূল ও কংগ্রেস জোটের হাতে গিয়েছিল। এবার কংগ্রেস ও তৃণমূল আলাদা লড়ছে। কংগ্রেস কি আলাদা লড়ে ভোট পাবে? কংগ্রেস প্রার্থী নীলমাধব গুপ্তের প্রচার দেখে তেমন কিছু আশা করার নেই। এমনিতেও কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি, জনসমর্থন কিছুই এখানে প্রায় নেই। সবই ভেঙে তৃণমূলে চলে গিয়েছে। গতবার সুব্রত মুখার্জি কংগ্রেস-তৃণমূলের জোট প্রার্থী হিসাবে মাত্র ৩৭শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। বাসুদেব আচারিয়া পেয়েছিলেন প্রায় ৪৮শতাংশ ভোট। আর বি জে পি-র রাহুল সিনহা পেয়েছিলেন ৪.৩৩শতাংশ ভোট। কিন্তু এবার বি জে পি তাদের ভোট অনেক বাড়বে বলে আশা করছে। তারা প্রার্থী করেছে বাঁকুড়া শহরের চিকিৎসক ডাঃ সুভাষ সরকারকে।
- See more at: http://ganashakti.com/bengali/breaking_news_details.php?newsid=1780#sthash.8L0aDdmd.dpuf১৯৮০সাল থেকে টানা ৯বারের বিজয়ী সাংসদ সি পি আই (এম)-র বাসুদেব আচারিয়া গত দু’মাস ধরে বাঁকুড়ার গ্রামের পর গ্রাম চষে ফেলেছেন। প্রতিদিন সকাল সাতটার মধ্যে বেরিয়ে পড়ছেন, গ্রামে গ্রামে ঘুরছেন। পার্টিকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলছেন। শনিবার সকালে ছাতনার জিড়রাতে গিয়ে দেখলাম— নতুন কিছু নয়, লোকসভায় যে রাজনৈতিক কথা বলে তিনি গরিব মানুষের রুটি-রুজির দাবি জানান, সেই কথাই গ্রামের মানুষের সামনেও অল্প কথায় সারছেন। বলছেন, গরিবের জন্য সরকারের বিকল্প নীতির প্রয়োজনের কথা। সাংবাদিকরা যাকে ‘খবর’ বলি তেমন কিছু নেই। কিন্তু তাঁর কথা শেষ হতে না হতেই গ্রামবাসীরা তাঁকে ছেঁকে ধরলেন নানা সমস্যা নিয়ে। কারোর আর্থিক সমস্যা, কারোর চিকিৎসার সমস্যা, কারোর ছেলেমেয়ের পড়াশোনার সমস্যা। একের পর এক গ্রাম, যেখানেই বাসুদেব আচারিয়া যাচ্ছেন, মানুষের সমস্যার কথা শুনছেন। সাধ্যমতো সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছেন।
তাঁর বিরুদ্ধে লড়তে নামা তারকা অভিনেত্রী তৃণমূল প্রার্থী মুনমুন সেনের অবশ্য এই সমস্যা নেই। ৪৩ডিগ্রি সেলসিয়াসের বাঁকুড়ায় গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর ঝক্কি তিনি নেননি। মূলত রোড শো’র ওপরেই নির্ভর করে আছেন। মানুষ তাঁর জন্যও আসছেন, ছুটে ছুটেই আসছেন। তবে সমস্যার কথা বলতে নয়, পর্দার নায়িকাকে বাস্তবে এক ঝলক দেখতে। মুনমুন সেন চলেছেন প্রচার গাড়িতে হাত নাড়তে নাড়তে, সঙ্গে দুই কন্যা রাইমা এবং রিয়া সেনকেও দেখা গেছে। গঞ্জ এলাকায় কিছু সভাও করেছেন তৃণমূল প্রার্থী। কিন্তু প্রচার বলতে কোনো রাজনৈতিক কথা নেই। মনোনয়ন জমা দিয়েছেন তিনি শ্রীমতি দেববর্মা নামে। তৃণমূলের দেওয়াল লিখনে তাই ব্র্যাকেটে তাঁর পরিচিত নাম লিখে দিতে হচ্ছে। আর তিনি নিজে সভায় গিয়ে বলছেন, ‘আমি সুচিত্রা সেনের মেয়ে। উত্তম-সুচিত্রা জুটির সুচিত্রা সেন। মায়ের মৃত্যুর সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি আমাদের অনেক সহায়তা করেছেন। তাঁর কথাতেই আমি বাঁকুড়াতে ভোটে প্রার্থী হয়েছি। আপনাদের সমর্থন চাই কিন্তু।’
প্রার্থী হিসাবে নাম ঘোষণার পরেই সাংবাদিকদের কাছে অবশ্য মুনমুন সেন কোনোরকম রাখঢাক না করে স্বীকার করে নিয়েছিলেন, ‘আমি রাজনীতির কিছু বুঝি না। তবে সবাই সাহায্য করছে শিখে নেবো।’ রাজনীতির কী শিখবেন? ‘জনসংযোগ’। মুনমুন সেন উত্তর দিয়েছিলেন। তবে রাজনৈতিক দলের ‘কর্মীসভা’ আর ‘কর্মচারীদের সভা’ যে এক নয়, সেটা তিনি এখনই গুলিয়ে ফেলছেন। চটজলদি শেখার বিপদ আর কি!
সেই মুনমুন সেন প্রচারে বেরোচ্ছেন পুলিসের বেষ্টনী নিয়ে। চারপাশে তৃণমূল কর্মীদের হুড়োহুড়ি, লোকজনের ছবি তুলতে চাওয়া সব কিছু সামাল দিতে গিয়ে পুলিস জেরবার। এসব তো তাও তারকার বিড়ম্বনা বলে চালানো যায়। কিন্তু মুনমুন সেনের প্রচার গাড়ি যাবে বলে রাস্তা ধুয়ে দেওয়া? যে বাঁকুড়ার মানুষ গ্রীষ্মকালে জলকষ্টে ভোগেন, রাস্তার ধারের কল থেকে লম্বা লাইন দিয়ে জল সংগ্রহ করেন গ্রামবাসীরা, সেই বাঁকুড়া জেলার গ্রামে এমন দৃশ্য আগে কখনও দেখেননি গ্রামবাসীরা। মেজিয়ার গ্রামের রাস্তা দিয়ে মুনমুন সেন যাওয়ার সময় যাতে ধুলোয় কষ্ট না পান, তার জন্য তৃণমূলের পঞ্চায়েত থেকে রাস্তায় জল ঢেলে ভিজিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাস্তা ধুতে দেখা গ্রামবাসীরাই বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করছেন, ইনি বাঁকুড়ার সাংসদ নির্বাচিত হলে এখানকার মানুষের যন্ত্রণার জীবনকে ফিরে দেখার জন্য আবার আসবেন তো?
বাসুদেব আচারিয়া বলছেন, আমি এই কেন্দ্র থেকে পরপর ৯বার জিতেছি। কিন্তু দুঃখের কথা হলো, প্রতিবারই যিনি হারেন তিনি আর ফিরে আসেন না। পরেরবার আবার নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীকে দেখি। গত ২০০৯সালে সুব্রত মুখার্জি এসেছিলেন, হেরেছিলেন, আর আসেননি। এবার যিনি এসেছেন, তিনিও হয়তো আর আসবেন না।
লোকসভা কেন্দ্র হিসাবে এই কেন্দ্রটি অবশ্য ডিলিমিটেশনের পরে অনেকটাই পালটে গেছে। আগে বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রের বেশিরভাগ বিধানসভা কেন্দ্রই পুরুলিয়া জেলার অন্তর্ভূক্ত ছিল। ২০০৯সাল থেকে বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে কেবল পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুর রয়েছে। ২০১১সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের নিরিখে বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে রানীবাঁধ, রাইপুর ও তালডাংরা বামফ্রন্টের হাতে। রঘুনাথপুর, শালতোড়া, ছাতনা, বাঁকুড়া তৃণমূল ও কংগ্রেস জোটের হাতে গিয়েছিল। এবার কংগ্রেস ও তৃণমূল আলাদা লড়ছে। কংগ্রেস কি আলাদা লড়ে ভোট পাবে? কংগ্রেস প্রার্থী নীলমাধব গুপ্তের প্রচার দেখে তেমন কিছু আশা করার নেই। এমনিতেও কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি, জনসমর্থন কিছুই এখানে প্রায় নেই। সবই ভেঙে তৃণমূলে চলে গিয়েছে। গতবার সুব্রত মুখার্জি কংগ্রেস-তৃণমূলের জোট প্রার্থী হিসাবে মাত্র ৩৭শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। বাসুদেব আচারিয়া পেয়েছিলেন প্রায় ৪৮শতাংশ ভোট। আর বি জে পি-র রাহুল সিনহা পেয়েছিলেন ৪.৩৩শতাংশ ভোট। কিন্তু এবার বি জে পি তাদের ভোট অনেক বাড়বে বলে আশা করছে। তারা প্রার্থী করেছে বাঁকুড়া শহরের চিকিৎসক ডাঃ সুভাষ সরকারকে।
No comments:
Post a Comment