Tuesday, May 13, 2014

বরিশালে টোকেন বাণিজ্য সব যানবাহনকে চাঁদা দিতে হয়, পুলিশ ও শ্রমিক নেতাদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি

বরিশালে টোকেন বাণিজ্য
সব যানবাহনকে চাঁদা দিতে হয়, পুলিশ ও শ্রমিক নেতাদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি
http://www.dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=14&dd=2014-05-14&ni=172793
খোকন আহম্মেদ হীরা, গৌরনদী থেকে ॥ টোকেন মানির মাধ্যমে প্রতিমাসে ২০ লাখেরও অধিক টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বরিশাল নগরীতে চলমান তিন চাকার যানবাহন থেকে। ব্যস্ততম এ নগরীতে বৈধর চেয়ে অবৈধ যানবাহনের সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি। অবৈধ যানবাহন চলাচল করতে হচ্ছে পুলিশ ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের মাসোহারা দিয়ে। পুলিশের সার্জেন্ট থেকে শুরু করে সর্বস্তরের টোকেন মানির মাধ্যমের এ চাঁদার টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। পুলিশ ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের হাত থেকে রেহাই পেতে বৈধ যানের মালিকদেরও প্রতিমাসে টোকেন মানির মাধ্যমে চাঁদা দিতে হচ্ছে। ফলে অবৈধ যানবাহনের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় নগরীর সড়কগুলোতে যানবাহন ব্যবস্থাপনায় চরম অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। বেড়ে গেছে তীব্র যানযটেরও। বিষয়টি দেখার যেন কেউ নেই।
একাধিক যানবাহনের মালিকরা অভিযোগ করেন, অবৈধ যান চলাচলের জন্য কতিপয় পুলিশ প্রশাসনকে মাসিক নির্ধারিত টাকার বিনিময়ে মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনের টোকেনে বিশেষ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এতে বৈধ গাড়ির মালিকরা হয়রানির সম্মুখীন হলেও অবৈধ গাড়ির মালিকরা টোকেন দেখিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। সে সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তারাও প্রতিমাসে পকেটে ভরছে চাঁদাবাজির লাখ লাখ টাকা। অবৈধ থ্রি হুইলার নিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সূত্রমতে, পুলিশের শীর্ষ ও মাঝারি পর্যায়ের কতিপয় কর্মকর্তারা মালিক সমিতি এবং শ্রমিক সংগঠনের নির্ধারিত টোকেনে অবৈধ গাড়ি চলাচল করার অনুমোদন দেয়ায় প্রতি মাসে চাঁদাবাজির মাধ্যমে তাদের আয় হচ্ছে ২০ লাখ টাকারও অধিক। খোদ মাহেন্দ্র, আলফা, অটো রিকশা সমিতির নেতৃবৃন্দ সম্প্রতি বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটিতে থ্রি-হুইলারের অবৈধ যান চলাচলের জন্য পুলিশ প্রশাসনের একাংশকে দায়ী করে এর মাধ্যমে কর্মকর্তাদের লাভবান হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু তার পরেও পরিস্থিতি পাল্টায়নি।
বর্তমানে বৈধ গাড়ির সংখ্যার দুই থেকে তিন গুণ অবৈধ গাড়ি চলাচল করলেও পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করছেন। আর মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের পক্ষে এক শ্রেণীর দালালরা পুলিশ প্রশাসনের কাছ থেকে টোকেনের অনুমোদন নিয়ে এ অবৈধ গাড়ি চলাচলে সহায়তা করছে বলে বৈধ গাড়ির মালিকরা অভিযোগ করেন। পুলিশ ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের হাত থেকে রেহাই পেতে বৈধ যানের মালিকদেরও প্রতিমাসে আড়াই থেকে ৩শ’ টাকা করে টোকেন মানি দিতে হচ্ছে। পুলিশের সার্জেন্টরা যে টোকেন মানি নিয়ে লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চালাতে দিচ্ছে তার প্রমাণপত্র দেখিয়েছেন গোলাম রাব্বানী অটোরিক্সার চালক বাবুল মিয়া। তার নোট বুকে সার্জেন্ট সঞ্জীবের নাম এবং তার মোবাইল নম্বর (০১৭১৬-০১৬৪৭৭) দেয়া রয়েছে। মোবাইলে কল করে নিশ্চিত হওয়া গেছে এটা সার্জেন্ট সঞ্জীবেরই নম্বর। এমনি করে লাইসেন্সবিহীন গাড়ির চালকদের প্রত্যেকের কাছে ট্রাফিক সার্জেন্টদের মোবাইল নম্বর দেয়া রয়েছে মাসোহারার প্রমাণস্বরূপ। মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ জানান, বৈধ অটোরিক্সার অন্তত দুইগুণ কোন ধরনের নাম্বার ছাড়াই পুলিশকে ‘চাঁদা’ দিয়ে চলাচল করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মালিক সমিতির একাধিক সদস্যরা জানান, অবৈধ দু’হাজার থ্রি হুইলার থেকে প্রতিমাসে ১ হাজার টাকা করে মাসিক ২০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এর সিংহভাগ পুলিশ কর্মকর্তারা পেলেও টাকা ওঠানোর দায়িত্বে নিয়োজিত শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও চাঁদার টাকার ভাগ পেয়ে থাকে।
তাঁরা আরও জানান, বর্তমানে বৈধ গাড়ির মালিকরা হয়রানির হাত হতে মুক্তি পেতে ৩শ’ টাকা মাসিক চুক্তি করে নিয়েছেন। মালিক সমিতির সম্পাদক পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে নিজেই এ বিষয়টি তদারকি করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অবৈধ গাড়ি থেকে মাসিক চাঁদা সংগ্রহের জন্য মালিক ও শ্রমিক সংগঠন এবং পুলিশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দালালদের নগরীর নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ডে বসে প্রকাশ্যেই টোকেন দিয়ে চাঁদা উত্তোলন করতে দেখা গেছে।
পুলিশী বিট বা টোকেন মানির অভিযোগ অস্বীকার করে নগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) আবু রায়হান মোঃ সালেহ বলেন, অবৈধ গাড়ির বিষয়ে আমাদের অবস্থান কঠোর। তিনি আরও বলেন, নগরীতে মাসে আড়াই থেকে ৩শ’ অবৈধ গাড়ি আটক করে আইন অনুযায়ী জরিমানা করা হয়। তাই কোন রকম সুবিধা নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি চ্যালেন্স ছুড়ে দিয়ে বলেন, বিট বা টোকেন মানির বিষয়ে আমার কাছে কেউ প্রমাণ দিতে পারলে তার সকল অভিযোগ মাথা পেতে নেয়া হবে। বিআরটিএর উপপরিচালক উত্তম কুমার বড়ুয়া জানান, অটোর সঙ্গে কৌশল করে রিক্সার নাম ব্যবহার করায় এর লাইসেন্স বিআরটিএ দিতে পারছে না। এজন্য সিটি কর্পোরেশন রিক্সাভুক্ত করে নিজেই টোকেন দিয়ে থাকে। আর অনুমোদন না থাকায় মাহিন্দ্রার লাইসেন্স নতুন করে দিতে পারছে না বিআরটিএ। যার ফলে অবৈধভাবেই চলছে এসব যানবাহন। এগুলো দেখার বিষয় ট্রাফিক বিভাগের।

No comments:

Post a Comment