Saturday, May 10, 2014

স্মৃতির পাতায় ভাষাসৈনিক আজাহার উদ্দিন খোকন আহম্মেদ হীরা

স্মৃতির পাতায় ভাষাসৈনিক আজাহার উদ্দিন
খোকন আহম্মেদ হীরা
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html
মহান একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে চলতি বছর বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া ডিগ্রী কলেজ প্রাঙ্গণে চার দিনব্যাপী ‘একুশে বই মেলা’ আয়োজন করা হয়। এ উপলক্ষে ভাষা আন্দোলন ও ভাষাসৈনিকদের নিয়ে প্রকাশ করা হয় ‘হৃদয়ে একুশ’ স্মরণিকা।
স্মরণিকার সম্পাদক মাহিলাড়া কলেজের অধ্যক্ষ ফিরোজ ফোরকান আহমেদ স্যার আমাকে বরিশালের একজন ভাষাসৈনিকের সাক্ষাতকার গ্রহণ করে স্মরণিকায় প্রকাশ করার পরামর্শ দেন। সহকর্মী এম. মিরাজ হোসাইনকে ভাষাসৈনিকের কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি জানালেন, ভাষাসৈনিক এ.কে.এম আজাহার উদ্দিনের নাম। এক বিকেলে মিরাজ ভাই আর আমি গেলাম ভাষাসৈনিক এ.কে.এম আজাহার উদ্দিনের নগরীর দক্ষিণ আলেকান্দা মহল্লার রুমিবাগের বাসায়। বাসার কলিং বেল চাপতেই বেরিয়ে এলেন ভাষাসৈনিকের চতুর্থ পুত্র এ. আর মোহাম্মদ আলী। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আজাহার উদ্দিনের কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি আমাদের বাসার ভেতরে নিয়ে বসতে দিলেন। তখন পাশের রুমে শষ্যাশায়ী ছিলেন ভাষাসৈনিক আজাহার উদ্দিন।
কিছু সময় পর এ.আর মোহাম্মদ আলী তার গর্বিত পিতা আজাহার উদ্দিনকে ধরাধরি করে আমাদের কাছে এনে বসালেন। আমাদের পরিচয় দিয়ে কোন কথা বলার আগেই আজাহার উদ্দিন কাঁপা কাঁপা স্বরে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময়ের তাঁর সকল কাহিনীর বর্ণনা এবং যুদ্ধপরবর্তী তাঁর ভাবনা সম্পর্কে বলতে লাগলেন। প্রায় দু’ ঘণ্টার আলাপচারিতার মূল অংশই ছিলÑ তিনি (ভাষাসৈনিক আজাহার উদ্দিন) প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলেন ৫২’র ভাষা আন্দোলনের বিজয়ের মাধ্যমে। এরপর মাত্র ১৯ বছর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে জীবনবাজি রেখে ৯ মাস ঐক্যবদ্ধ বীরত্বপূর্ণ লড়াই করে ১৯৭১ সালে তিনিসহ বাংলার অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা ছিনিয়ে এনেছিলেন সবুজে রক্তে লাল বিজয় পতাকা। জাতির এক বিরল বিজয় অর্জনের পাশাপাশি জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ নামের একটি রাষ্ট্র। কিন্তু এরপর ’৭৫ পরবর্তী সময় থেকে একের পর এক ছন্দপতন ঘটতে থাকে। ছন্দপতনের সেই ধারাবাহিকতায় গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ ঘটে। কিন্তু জনতান্ত্রিক গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সাম্য ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার যে চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল এ.কে.এম আজাহার উদ্দিনের কাছে তা কেবল অধরাই থেকে যায়।
বায়ান্ন’র ভাষা সৈনিক, একাত্তরের রণাঙ্গন কাঁপানো বীর মুক্তিযোদ্ধা কাঁপা কাঁপা স্বরে বলেন, ‘কত সুন্দর দেশ বাংলাদেশ। দেশের মানুষ সুন্দর না হলে- দেশ সুন্দর হবে না। এ দেশটাকে সুন্দর করে সাজাতে হবে। চেষ্টা কখনও বৃথা যায় না। দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন প্রাণপণ চেষ্টা করেই ৫২’র ভাষা আন্দোলনে মায়ের ভাষা ও ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে সবুজে রক্তে লাল স্বাধীনতার বিজয় পতাকা ছিনিয়ে এনেছি।’
নতুন প্রজন্মের মাঝে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্ব ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে ভাষা সৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আজাহার উদ্দিন বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের কাছে আমার একটাই দাবি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি উদার, উন্নত শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়তে একনিষ্ঠভাবে তোমরা দেশ গড়ার কাজ করবে। তোমরা শুধু একটি কথাই ভাববে, দেশ আমাদের-জাতি আমাদের। সুজলা-সুফলা-শস্য শ্যামলা এ দেশটাকে তোমাদের সুন্দর করে সাজাতে হবে। ’
সাক্ষাতকারটি গ্রহণের সময় ক্ষোভের সঙ্গে ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আজাহার উদ্দিন আরও বলেন, আমাকে নিয়ে লিখলে তা পড়বে কে? এসব লেখা পড়ার পাঠক এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বয়সের ভার ও রোগাক্রান্ত শরীর নিয়ে আজাহার উদ্দিন ওই সময় আকস্মিকভাবে উচ্চঃস্বরে বলে ওঠেন, ‘এখনও মঞ্চে উঠে গলা ফাটিয়ে কথা বলার ইচ্ছা জাগে, কিন্তু শোনার মানুষ নাই। এছাড়া সাধ থাকলেও এখন আর আমার সাধ্য নেই; সময় একদম ফুরিয়ে এসেছে। দেশটাকে আর নতুন করে সাজাতে পারলাম না, এটাই আমার দুঃখ’Ñ বলেই অনেকটা নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলেন ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এ.কে.এম আজাহার উদ্দিন।
বরিশাল নগরীর দক্ষিণ আলেকান্দা মহল্লার বাসিন্দা মেছের আলী হাওলাদারের ৩ পুত্র ও ২ কন্যার মধ্যে সবার ছোট আজাহার উদ্দিন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩২ সালে। ১৯৫২ সালে তিনি ছিলেন বরিশাল নগরীর এ.কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তরুণ আজাহার উদ্দিন রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তৎকালীন সময়ে পুলিশী বাধা উপেক্ষা করে তাঁর নেতৃত্বে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে এ. কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণীর ৫৫০ জন শিক্ষার্থী রাজপথে মিছিল করে। তাঁরাই প্রথম ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ সেøাগান নিয়ে বরিশালের রাজপথে নামেন। এরপর রাজপথে নামেন বরিশাল বি.এম স্কুলসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। ১৯৫৫ সালে বরিশাল বি.এম কলেজ থেকে আজাহার উদ্দিন আই.এ পাস করেন। এরপর তার আর পড়াশোনা হয়নি।
পরবর্তীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন সাধারণ কর্মচারী হিসেবে আজাহার উদ্দিন কর্মস্থলে যোগ দেন। এরপর ১৯৬৫ সালের ৩১ জানুয়ারি তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন ভাষাসৈনিক আজাহার উদ্দিন। নিজেই গেরিলা বাহিনী তৈরি করে রণাঙ্গনে পাক সেনাদের সঙ্গে একাধিকবার সম্মুখ যুদ্ধ করেন। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে ছিনিয়ে আনেন স্বাধীনতার বিজয় পতাকা।
ব্যক্তি জীবনে আজাহার উদ্দিন রাষ্ট্রীয়ভাবে ৩১তম স্বাধীনতা পদক, একুশে চেতনা পদক, মেয়র পদকসহ অসংখ্য সম্মাননা পদকে ভূষিত হয়েছেন।
১৯৫৩ সালে ভাষাসৈনিক এ.কে.এম আজাহার উদ্দিন নিজ উদ্যোগে এলাকার যুব সমাজকে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন কিশোর মজলিশ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ওই সংগঠনের মাধ্যমেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এলাকার কিশোর, যুবক ও তরুণদের ঐক্যবদ্ধ করা হয় যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। এ সংগঠনের মাধ্যমেই স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও দেশ স্বাধীন করার মনোভাব করে গড়ে তোলা হয়েছিল। শুধু দেশ স্বাধীন করার কাজেই নয়; যুদ্ধ শেষে কিশোর মজলিশ নামের ওই সংগঠনটি দেশ গড়ার কাজেও গোটা দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে একমাত্র বৃহত্তম শিক্ষা কমপ্লেক্সে পরিণত হয়।
এ.কে.এম আজাহার উদ্দিনের মতে, এভাবেই দেশের প্রতিটি ক্লাব ও সংগঠনগুলোকে দেশ গড়ার কাজে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা পরিপূর্ণতা লাভ করবে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের স্মৃতিচারণ শেষে আজাহার উদ্দিন বলেছিলেন, দেশটাকে যে শত্রুমুক্ত করতে পেরেছিলাম, সে আনন্দেই নয় মাসের সকল দুঃখ কষ্ট ভুলে গিয়েছিলাম ‘জয় বাংলা’ নামের একটি সেøাগানেই।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৮ মে সন্ধ্যায় ভাষাসৈনিক আজাহার উদ্দিন (৮২) চিরবিদায় নেন। ৯ মে সকাল দশটায় ভাষাসৈনিকের প্রিয় প্রতিষ্ঠান কিশোর মজলিশ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে সর্বস্তরের জনতার শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন ও দুপুরে দ্বিতীয় জানাজা শেষে মরহুমের পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করে গভীর শোক ও শোকার্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

লেখক : সাংবাদিক

No comments:

Post a Comment