Saturday, May 3, 2014

নূর হোসেনের বাড়িতে অবশেষে অভিযান রক্তমাখা মাইক্রোবাস উদ্ধার ১১ জন আটক ৭ খুনের ঘটনায় গ্রেফতার দুই আইনজীবীদের ডাকে আজ নারায়ণগঞ্জে হরতাল

নূর হোসেনের বাড়িতে অবশেষে অভিযান

রক্তমাখা মাইক্রোবাস উদ্ধার ১১ জন আটক ৭ খুনের ঘটনায় গ্রেফতার দুই আইনজীবীদের ডাকে আজ নারায়ণগঞ্জে হরতাল

ইত্তেফাক রিপোর্ট ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭ জনকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেনের বাড়িতে অবশেষে গতকাল শনিবার অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। সেখান থেকে একটি রক্তমাখা মাইক্রোবাস (টয়োটা ব্রান্ডের হাইয়েস) ও চন্দন সরকারের ব্যবহূত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে ১১ জনকে। এছাড়া এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে অন্য এক অভিযানে আরো দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

নজরুলসহ ৭ জন অপহূত হওয়ার পর থেকেই নূর হোসেনকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। নূর হোসেনের বাড়িতে অভিযান চালাতে এত দেরি হলো কেন—জানতে চাইলে পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মুহিদ উদ্দিন বলেন, 'এত দিন আমার কাছে খবর ছিল না। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা অভিযান চালাই। আজ (শনিবার) ওই বাড়িতে কয়েকজন গোপনে বৈঠক করছে—এ রকম খবরের ভিত্তিতেই আমরা অভিযান চালাই।' 

এদিকে আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণের পর হত্যার প্রতিবাদে ও জড়িতদের গ্রেফতারের দাবিতে আজ রবিবার জেলা আইনজীবী সমিতি নারায়ণগঞ্জে পূর্ণ দিবস হরতাল ডেকেছে। বিএনপি, সিপিবি, বাসদ, সাংস্কৃতিক জোট ও আমরা নারায়ণগঞ্জবাসীসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন এই হরতালে সমর্থন জানিয়েছেন। হরতাল সফল করতে গতকাল সকালে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে আইনজীবীদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বলেন, 'আমরা চাই দেশ থেকে সব ধরনের গুম, অপহরণ বন্ধ হোক। এই নৃশংস ঘটনায় যারা জড়িত তারা গ্রেফতার হোক।'

যেভাবে অভিযান নূর হোসেনের বাড়িতে 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকাল ১০টার দিকে আকস্মিকভাবে নূর হোসেনের নারায়ণগঞ্জের শিমরাইলস্থ টেকপাড়ার বাড়িটি ঘেরাও করে পুলিশ। পরে সকাল এগারটার দিকে আশপাশের জেলা থেকে আনা দুই শতাধিক পুলিশের একাধিক টিম কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে বাড়িতে তল্লাশি শুরু করে। বেলা সোয়া ২টা পর্যন্ত তল্লাশি চলে। এ সময় বাড়ি থেকে মোট ১৬ জনকে আটক করা হয়। পরে অবশ্য ৫ জনকে ছেড়ে দিয়ে ১১ জনকে নিয়ে যায় পুলিশ। তবে নূর হোসেনকে পাওয়া যায়নি। তল্লাশিকালে গণমাধ্যম কর্মীসহ অন্য কাউকে ওই বাড়িতে ঢুকতে দেয়া হয়নি। 

দুপুর সোয়া দুইটার পর পুলিশ সুপার নিশ্চিত করেন যে, ওই বাড়ি থেকে রক্তমাখা একটি জামা, অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের ব্যবহূত মোবাইল ফোন ও রক্তমাখা সবুজ রংয়ের একটি মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো-চ ১৫-০৫৯৭) জব্দ করা হয়েছে। মাইক্রোবাসটির সামনের দিকের বামপার ভেতরের দিকে চেপে গেছে। দেখলে বোঝা যায় এটি কারো সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে। এছাড়া মাইক্রোবাসের ভেতরে কয়েকটি পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে। তিনি জানান, এগুলো পরীক্ষা করতে অভিযানের শেষ পর্যায়ে ঢাকা থেকে সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর হোসেনের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল নূর হোসেনের বাড়িতে পৌঁছে। তারা বিভিন্ন আলামত সংগ্রহসহ উদ্ধারকৃত শার্ট ও গাড়িটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন।

পুলিশ সুপার বলেন, নূর হোসেনের বাড়ি থেকে চন্দন সরকারের ব্যবহূত মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে। যে ১১ জনকে শেষ পর্যন্ত আটক করা হয়েছে তাদের মধ্যে একজন ওই মোবাইল ফোনটি ব্যবহার করেছে। পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। 

এসপি কার্যালয়ে ব্রিফিং

অভিযান শেষে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, ৭ জনকে খুনের অভিযোগে ২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ব্রিফিংয়ে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ওই বাড়ি থেকে একটি শার্ট উদ্ধার করা হয়েছে যার মধ্যে অনেক দাগ রয়েছে। সেটা আসলে রক্তের দাগ কি-না পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এছাড়াও নূর হোসেনের পাসপোর্ট খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি। 

আটক ব্যক্তিদের পরিচয় জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, 'তদন্তের স্বার্থে আমরা কিছু বলছি না। এজাহারভুক্ত আসামিকে কেন গ্রেফতার করতে পারলেন না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমরা খোঁজখবর করছি। তদন্ত চলছে।' আসামি বিদেশে পালিয়ে গেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমরা তেমনটি মনে করি না। তিনি দেশেই আছেন।' সবকিছুর জন্য কিছু সময় প্রয়োজন বলে জানান এসপি। 

প্রসঙ্গত গত রবিবার নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজন অপহূত হন। গত বুধবার বিকালে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন আরো একজনের লাশ নদী থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। লাশগুলো অপহূত সাতজনের বলে সনাক্ত করে তাদের পরিবার। 

নজরুল অপহরণের পরপরই তার স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নূর হোসেন এবং সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইয়াসিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন। এ ঘটনায় উত্তাল হয়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জ। মহাসড়কে বিক্ষোভ ছাড়াও বিক্ষুব্ধ জনতা নূর হোসেনের কার্যালয়, যাত্রা প্যান্ডেল, আসামি ইয়াসিনের পেট্রোল পাম্প ও বাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ ব্যাপক ভাংচুর চালায়। এক পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জের ডিসি, এসপি, র্যাবের সিও এবং সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানার ওসিসহ ৭ জনকে প্রত্যাহার করা। এরই মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার রাতে দোকান থেকে বাড়ি ফেরার পথে ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম সানারপাড় এলাকায় অপহূত হন। পরে শুক্রবার মধ্যরাতে পুলিশ সাভারের নবীনগর এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করে।

No comments:

Post a Comment