Saturday, May 10, 2014

আজ বিশ্ব 'মা' দিবস

আজ বিশ্ব 'মা' দিবস

ইত্তেফাক রিপোর্ট
আজ মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার, বিশ্ব মা দিবস। পৃথিবীর সবচেয়ে দৃঢ় সম্পর্কের নাম 'মা'। সবচেয়ে পবিত্র ও মধুর শব্দের নাম 'মা'। যদিও মাকে ভালোবাসা-শ্রদ্ধা জানানোর কোন দিনক্ষণ ঠিক করে হয় না- তবুও মাকে গভীর মমতায় স্মরণ করার দিন আজ।

মায়ের প্রতি ভালোবাসার কথা লিখে কিংবা বলে বোঝানো যদিও কষ্টকর তবুও আপ্রাণ চেষ্টা যতটুকু মাকে ভালোবাসা যায়। শিশুকালে মা সন্তানের চোখের আড়াল হলেই, কেঁদে বুক ভাসায় শিশু। তখন মা সহজেই বুঝে নেন, 'মাকে ছাড়া সন্তানের করুণ অবস্থা'। কিন্তু সন্তানরা বড় হলে লেখাপড়া কিংবা কাজের তাগিদে দূরে চলে যায়। মা তখন একলা বাড়িতে থাকেন আর সন্তানের আগমনের দিনগুনেন। মা তখন চাইলেও তার বুকের ধনকে কাছে রাখতে পারে না। মা সে কষ্টের কথা মুখ ফুটে কখনো বলেনও না; সন্তান যদি কষ্ট পায় সে কথা ভেবে। 

সময়ের ব্যবধানে দূরন্ত কৈশোরের মতো মাকে হয়তো আর ক্ষণে ক্ষণে জড়িয়ে ধরা হয় না। মা হয়তো ভাবেন... 'সন্তান বড় হয়েছে, মায়ের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে'। মায়ের বুকটা হয়তো হাহাকার করে। সন্তানকে একটু জড়িয়ে ধরতে। মায়ের সেই আবেগী প্রত্যাশা আজ একবার পূরণ করুন। সব শঙ্কা ঝেড়ে ফেলে মাকে জড়িয়ে ধরে বলুন- 'মাগো তোমাকে ভালোবসি সবচেয়ে বেশি।' 

জীবনের চরম সংকটকালে পরম সান্ত্বনার স্থল হিসেবে যার কথা প্রথম মনে পড়ে তিনি মমতাময়ী মা। মা প্রথম পৃথিবীর রং-রূপ-শব্দ-গন্ধ-চেনান-দেখান-শেখান। ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে 'মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশ্ত।' যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকগণ মা বন্দনা করে কত ভালোবাসাই না ঝরিয়েছেন। আব্রাহাম লিংকন মাকে স্মরণে এনে বলেছিলেন, 'আমি যা কিছু পেয়েছি, যা কিছু হয়েছি, অথবা যা হতে আশাকরি তার জন্য আমি আমার মার কাছে ঋণী'। ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিং বলেছেন, 'মাতৃত্বেই সকল মায়া-মমতা ও ভালবাসার শুরু এবং শেষ।' 

জগতে মায়ের মতো এমন আপনজন আর কে আছে! তাই প্রতি বছর এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয় প্রিয় মায়ের মর্যাদার কথা। মাকে বন্দনা করে কবি কামিনী রায় তার 'কত ভালবাসি মা' কবিতায় লিখেছেন—'জড়ায়ে মায়ের গলা শিশু কহে আসি,-/মা, তোমারে কত ভালোবাসি!/"কত ভালোবাস ধন?" জননী শুধায়।/"এ-ত বলি দুই হাত প্রসারি' দেখায়।/ তুমি মা আমারে ভালোবাস কতখানি?/মা বলেন "মাপ তার আমি নাহি জানি।"/"তবু কতখানি, বল।"/"যতখানি ধরে/তোমার মায়ের বুকে।" 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো আজ বাংলাদেশেও দিবসটি নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পালন করা হবে। মা দিবস প্রথম উদযাপিত হয় গ্রিস ও রোমে। প্রাচীন গ্রিকরা তাদের দেবতা গ্রিককের মা রিয়ার সম্মানে উদযাপন করতো বসন্ত উত্সব। ১৬ শতকে যুক্তরাজ্যে 'মাদারিং সানেড' নামে একটি দিবস পালিত হতো; যুক্তরাষ্ট্রে এ দিবসটি প্রচলন হয় শান্তিকামী জুলিয়া ওয়ার্ড হোর উদ্যোগে ১৮৭২ সালে। এরই ধারাবাহিকতায় মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর স্বীকৃতি ও প্রসার ঘটে ১৯১৪ সাল থেকে। 

বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে ডেভেলপমেন্ট অরগানাইজেশন অব দি রুরাল পুওবর'-ডর্প মনে করে, দারিদ্র্য দূরীকরণে পিছিয়ে থাকা দেশ হিসেবে আমাদের দেশে মা দিবস পালনের যৌক্তিকতা অনেক। মা দিবসে সভা, সমাবেশ, সেমিনারের মাধ্যমে মায়েদেরকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু আমরা কখনো ভাবি না আমাদের দেশের দরিদ্র মায়েদের অবস্থানের কথা। আমাদের দেশের দরিদ্র মায়েদের কথা চিন্তা করে ২০০৫ সালের বিশ্ব মা দিবস থেকে বেসরকারি সংস্থা ডর্প-এর প্রতিষ্ঠাতা এএইচএম নোমান দেশে দরিদ্র মায়েদের জন্য 'মাতৃত্বকালীন ভাতা' প্রদান কার্যক্রম প্রবর্তন করেন। পাশাপাশি তিনি মাতৃত্বকালীন ভাতা সরকারিভাবে চালু করার দাবি করেন। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে সরকার মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদানের উদ্দোগটি জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করে। দিবসটি উপলক্ষে দেশব্যাপী বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে দৈনিক ইত্তেফাক ও বেসরকারি সংস্থা ডরপ যৌথভাবে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে 'বাজেট ভাবনাঃ সংগ্রামে উন্নয়নে দ্রারিদ্র্য বিমোচনে মা' শীর্ষক আলোচনাসভার আয়োজন করেছে। আজাদ প্রডাক্টস প্রতি বছরের ন্যায় রত্নগর্ভামাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সকাল ১০টায়, আজাদ প্রডাক্টস ভবনে।

ভালো আছেন বীরেনের মা

জিয়ানগর (পিরোজপুর) সংবাদদাতা, আহাদুল ইসলাম শিমুল জানিয়েছেন, আজ বিশ্ব মা দিবস। কিন্তু বীরেন্দ্রনাথ মজুমদারের কাছে প্রতিদিনই যেন মা দিবস। প্রতিটি সন্তানই জীবনের চরম সংকটকালে যাকে প্রথম স্মরণ করেন তিনি হলেন মমতাময়ী মা। তাই মায়ের প্রতি সম্মান দেখাতে আর বিশ্বের প্রতিটি সন্তানকে মাতৃভক্তিতে আকৃষ্ট করতে বীরেন্দ্রনাথ মজুমদার প্রতিনিয়ত মা'কে ঝুড়িতে করে বয়ে বেড়াচ্ছেন। দীর্ঘ জরাজীর্ণ পথ একটি ঝুড়িতে করে মাকে মাথায় নিয়ে এখনও প্রতি মাসে জিয়ানগরে ডাক্তার দেখাতে যান বীরেন। পুল-সাঁকো কিংবা ভাঙা রাস্তার কঠিন পথ পাড়ি দিতে এতটুকু কষ্ট হয় না তার। মায়ের খাওয়া-দাওয়া, কাপড় ধোয়া ও গোসল করানো সবই করেন স্বযত্নে। মায়ের গোসল শেষে নিজে গোসল সেরে মায়ের পূজা করেন। এমনকি পূজা শেষে মায়ের পা ধোয়া পানি পান করেন বীরেন। এরপর খাবার তোলেন নিজ মুখে। তার এই মাতৃভক্তিতে মুগ্ধ সবাই। মায়ের একটু অবহেলা হয়ে যায় এই ভয়ে ৪৩ বছর পার করেও বিয়ের পিঁড়িতে বসা হয়নি বীরেনের। 

মা ঊষা রাণী বলেনঃ আমি ওরে বার বার কইছি বাবা তুই বিয়া কর। কিন্তু আমার কথা শোনে নাই। মা ভক্ত বীরেনের একটাই কথাঃ যদি বিয়া করি মায়রে দেখবে কে? চারপাশের অনেককেই দেখছি কেউ মায়ের সেবা করে না। একশ এগারো বছরের ঊষা রাণী মজুমদার এ প্রতিবেদককে বলেন, বিশ্বের সব ঘরে যেন বীরেনের মত ছেলের জন্ম হয়।

'দৈনিক ইত্তেফাকে' ২০১৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত "মায়েরে মাথায় নিয়া হাঁটতে মোর কষ্ট অয় না" শিরোনাম প্রকাশের পর বীরেন চলে আসেন আলোচনায়। সারাদেশ থেকে ফোন আসে ইত্তেফাক অফিসে। বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে সহায়তা করার চেষ্টা করেন বীরেনকে। এমনকি প্রবাসী বাঙালিরাও যোগাযোগ করেন। জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান 'ইত্যাদি' এসে কড়া নাড়ে অজ পাড়া গা পূর্ব চণ্ডিপুর গ্রামে বীরেনের বাড়ির দরজায়। ইত্যাদির অনুষ্ঠানে প্রচার হয় মায়ের প্রতি মমত্ববোধের সেই কাহিনী। তুলে দেয়া হয় নগদ এক লাখ টাকার চেক। 

বৃদ্ধা মাকে শিশুর মত বুকে আগলে রাখতে গিয়ে বিসর্জন দিয়েছেন নিজের জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া। বীরেনের একটাই চাওয়া- এ বিশ্বে যেন কোন সন্তান জীবিত থাকতে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয়।

No comments:

Post a Comment