Sunday, May 4, 2014

হুইলচেয়ারে বসে রোগী সেজে সোনা চোরাচালান

হুইলচেয়ারে বসে রোগী সেজে সোনা চোরাচালান
স্টাফ রিপোর্টার ॥ দীর্ঘ চার ঘণ্টার ভ্রমণ শেষে ফ্লাইটের দরজা খুলতেই তিনি দেখতে পান দুজন দাঁড়ানো। সামনেই একটি একটি হুইলচেয়ার। কোন বাক্যব্যয় ছাড়াই রাজ্জাক সাহেব গিয়ে বসলেন হুইলচেয়ারে। বিমান অপারেটর উজ্জ্বল ও আনোয়ার হুইলচেয়ার ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যান ইমিগ্রেশনে। হুইলচেয়ারে থাকায় স্বভাবই মুহূর্তেই ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ। তারপর দ্রুত কাস্টমস হল দিয়ে গ্রীন চ্যানেল পার হওয়ার পথে। ঠিক তখনই তাকে চ্যালেঞ্জ করে বসে-শুল্ক গোয়েন্দারা। সতর্কতার সঙ্গেই তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, সঙ্গে স্বর্ণ আছে কিনা। রাজ্জাক হাঁফাতে হাঁফাতে দেখালেন- তিনি ঠিকমতো শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছেন না। অসুখেই প্রাণ ওষ্ঠাগত। এমন বয়োবৃদ্ধ অসুস্থ মানুষ আবার স্বর্ণ আনে কী করে? কিন্তু গোয়েন্দারা নিশ্চিত তাঁর কাছেই রয়েছে সোনার বার। ব্যস কোন কথা নেই। মুহূর্তেই তাঁর তলপেটে গোয়েন্দার হাত। তাতেই পিলে চমকালো। একে একে বেরিয়ে এলো ছয়টি বার। সব এক কেজি ওজনের বার। অর্থাৎ ছয় কেজি সোনা। যার দাম তিন কোটি টাকা।
শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমন এক অবিশ্বাস্য কায়দায় আনা হয় সোনার চালান। তাঁকে যখন কাস্টমস হলে জিজ্ঞাসা করা হয় তখন বের হয়ে আসে একের পর এক সব চাঞ্চল্যকর তথ্য।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক মইনুল খান বলেন, অদ্ভুত ঘটনা। জীবনে এমন দেখিওনি, শুনিওনি। পঞ্চাশোর্ধ এমন একজন রোগী যিনি-বার্ধক্যজনিত রোগে ন্যুব্জ, তার পক্ষে এমন নিখুঁত চোরাচালানে জড়িত হওয়া এটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়।
এমন একজন বৃদ্ধকে কেন সন্দেহ করা হলো। এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আরও চমকপ্রদ কাহিনী। শুল্ক গোয়েন্দা দফতরে রবিবার সকালে খবর আসে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সে একজন যাত্রী আসবে। তার নাম আব্দুর রাজ্জাক। বয়স পঞ্চাশোর্ধ। রোগাকৃতির। তার শরীরে কয়েক কেজি স্বর্ণের বার লুকানো রয়েছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতেই গোয়েন্দারা তন্নতন্ন করে খোঁজ চালায়। মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের সকালের ফ্লাইট অবতরণ করতেই শুরু হয় অনুসন্ধান। বোর্ডিং ব্রিজ থেকে ইমিগ্রেশন পর্যন্ত প্রত্যেক যাত্রীকে দেখা হয় খুব কাছ থেকে। কোথাও মেলেনি কাক্সিক্ষত যাত্রীর। শেষ পর্যন্ত গ্রীন চ্যানেলের কাছাকাছি যেতেই চোখে পড়ে রাজ্জাকের।
মাইনুল খান বলেন, হুইলচেয়ারের ওই যাত্রী গ্রীন চ্যানেল পার হয়ে প্রায় বের হয়েই গিয়েছিলেন। আনোয়ার ও উজ্জ্বল নামের দুজন অপারেটর হুইলচেয়ার ঠেলছিলেন। তখনই শুল্ক গোয়েন্দারা তাঁকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, সঙ্গে সোনা আছে কিনা। তিনি বেশ জোর গলায় পাল্টা জবাব দেন, না সোনা থাকবে কেন। দেখছেন না আমি একজন অসুস্থ। এ অবস্থায় কী সোনা আনা যায় বলে যুক্তি দেখালেন। আসলেই তো। এমন একজন তাও কিনা হুইলচেয়ারে বসা। তাকে তো চার্জ করাও একটা অমানবিক ব্যাপার ছাড়া আর কিছু নয়।
কিন্তু পেশাদার গোয়েন্দাবৃত্তির কাছে মানবিক যুক্তি ব্যাখ্যার কোন মূল্য নেই। গোয়েন্দারা জানেন, অপরাধীরা যুগ যুগ ধরে তাদের কৌশল পাল্টেছে। এমন পেশাদারিত্ব মনোভাব থেকেই তার শরীরে হাত ফেলে। তলপেটে হাত দিতেই শক্ত কিছু একটা মনে হয় গোয়েন্দাদের। মুহূর্তেই তা বের করে আনা হয়। এভাবে একে একে বের করে আনা হয় ছয়টি বার। একেকটির ওজন এক কেজি। মোট ছয় কেজি। তখন তো উপস্থিত গোয়েন্দাসহ অন্য যাত্রীরা স্তম্ভিত। এ কী কা-! এই বয়সে এসেও এমন অপকর্ম।
কাস্টমস হলে তাঁকে দেখার ভিড় জমে। তাঁদের তিনজনকেই ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তখন রাজ্জাক স্বীকার করেন, তিনি একজন পেশাদার সোনা চোরাচালানি। তাঁর বাসা ৭৭৭ কাজীপাড়া মিরপুর।
মহাপরিচালক মইনুল খান জানান, অনেক তথ্য বেরিয়ে আসছে। পাসপোর্ট থেকে দেখা যায়, রাজ্জাক গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ৩৪ বার সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশ ভ্রমণ করেছেন। প্রতিবারই তিনি এভাবেই হুইলচেয়ারে বসে রোগী সেজে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েছেন। যে দুইজন হুইলচেয়ার ঠেলে নেয়ার দায়িত্ব পালন করেছেন তারাও সহযোগী বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করার পর জানা যাবে। এর আগেও এরাই হুইলচেয়ার ঠেলার দায়িত্ব পালন যদি করে থাকে তাহলে এটা আরও সুপরিকল্পিত বলে বিবেচিত হবে।
রাতে জানা যায়, রাজ্জাককে বিমানবন্দর থানায় পাঠানো হয়েছে। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাঁকে আজ রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। 
http://www.allbanglanewspapers.com/janakantha.html

No comments:

Post a Comment