Friday, May 9, 2014

উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে আসন বাড়াতে সব দলই মরিয়া

উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে আসন বাড়াতে সব দলই মরিয়া
কাওসার রহমান ॥ উত্তরপ্রদেশই দিল্লীর মসনদের ভাগ্য নিয়ন্তা। তাই শেষ রাউন্ডের যুদ্ধে প্রায় সব দলই মেরুকরণের রাজনীতি উস্কে দিয়ে নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে চাইছে। মোদির কাছে এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উত্তর প্রদেশ ও বিহারের মতো গো-বলয়ের দুটি রাজ্যেই আসন বাড়ানো তাঁর সব থেকে বড় লক্ষ্য। এখনও পর্যন্ত এই দুই রাজ্যে যে সব আসনে ভোট হয়েছে, সেখানকার খবর খুব সুখকর নয়। এ কারণেই মরিয়া হয়ে উঠেছেন বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি। বিজেপিও এখন বারানসীসহ উত্তর প্রদেশে বাকি আসনগুলোতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে।
দলের শীর্ষ নেতাদের মতে, ‘মোদি হাওয়া ঠিকই কিন্তু সেই হাওয়া ভোট ব্যাংকে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা হুবহু বোঝা খুবই দুষ্কর।’ বিজেপির আশা, হাওয়া যদি ঠিকমতো কাজ করে তাহলে উত্তর প্রদেশে আসনসংখ্যা ৫০ পেরিয়ে যাবে, তা না হলে ৩০ এর নিচে। সে কারণেই শেষ দফার ভোটে সব দলই মরিয়া হয়ে উঠেছে।
আগামী ১২ মে শেষ দফার নির্বাচন। আর এর মধ্য দিয়ে দেড় মাসব্যাপী নয় দফা নির্বাচনের দীর্ঘ আয়োজনের সমাপ্তি ঘটছে। শেষ দফায় মাত্র তিনটি রাজ্যে নির্বাচন হচ্ছে। রাজ্যগুলো হলো পশ্চিমবাংলা, বিহার ও উত্তর প্রদেশ। এর মধ্যে পশ্চিমবাংলায় ১৭ আসনে, বিহারে ৬ আসনে এবং উত্তর প্রদেশে ১৮ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সবমিলিয়ে শেষ দফায় নির্বাচন হবে ৪১ আসনে।
শেষ পর্বে এসে বিজেপি নেতারাও স্বীকার করছেন, মুলায়ম-মায়াবতী যেমন নিজ নিজ রাজনীতি করছেন, বিজেপিকেও জাতপাত বা ধর্মের জিকির তুলে যতটা সম্ভব, হাওয়া তোলার চেষ্টা করে যেতে হবে। বিরোধীদের অভিযোগ, বারানসীতে এসে মেরুকরণের রাজনীতি করতে চেয়েছিলেন মোদি। আর তাঁর সভা বাতিল করে উত্তর প্রদেশের অখিলেশ সরকার নিজেরা মেরুকরণের ফায়দা নিতে চেয়েছেন। মোদির চাই হিন্দু ভোট। আর মুলায়মের মুসলিম ভোট।
কোন রাখঢাক না করে ঠিক এই কথাটাই বৃহস্পতিবার মায়াবতী বলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ‘মোদিকে আটকানো আর শহরজুড়ে মোদির দাপট- গোটাটাই বিজেপি আর সমাজবাদী পার্টির গড়াপেটা।’ মোদিকে রোখার দৌড়ে সমাজবাদী পার্টির প্রধান এগিয়ে যাওয়ায় আজ নড়েচড়ে বসেছেন লালুপ্রসাদও। ১৯৯০ সালে যিনি লালকৃষ্ণ আদভানীকে সমস্তিপুরে গ্রেফতার করেছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশ। এ রাজ্যের আসন সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি। এখানে ৮০টি আসন রয়েছে। ফলে এ রাজ্যের রাজনীতিও বেশ জটিল। বিশেষ করে, দুটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল এ রাজ্যের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠায় সর্বভারতীয় দলগুলোর পক্ষে এ রাজ্যের হিসাব মেলানো কঠিন।
উত্তর প্রদেশের রাজধানী শহরের কথাই যদি বলা হয়, তাহলে দেখা যাবে এ আসনের ভবিষ্যত নিয়ে তেমনভাবে কেউই মাথা ঘামাতে নারাজ। কারণ এ আসনটি সর্বভারতীয় দলের জন্য নিরাপদ নয়। এ আসনে লড়ছেন? বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি রাজনাথ সিং। তবু লখ্নৌ নিয়ে কেউই আগবাড়িয়ে কিছু করতে বা বলতে চান না।? সবাই অনেক বেশি চিন্তিত কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির সরকার গড়ার জন্য গরিষ্ঠতার হিসেবনিকেশ করতে।? বিধানসভা মার্গে বিজেপির সদর দফতরে সবাই বসে গরিষ্ঠতার অঙ্ক হিসেব করছেন।?
বিজেপি দফতরে গিয়ে দেখা হলো মুখপাত্র অনিতা আগরওয়ালের সঙ্গে।? তিনি বললেন, বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের এই তিক্ততা থাকবে না।? মমতাজীর সমর্থন পাওয়ার কথা ধরে নিয়েই বিজেপি এগোচ্ছে।? মুসলিমদের সমর্থনের জন্য তৃণমূল বিজেপির হাত ধরতে চায় না বলে যে কথা শোনা যাচ্ছে, তার মীমাংসা হয়ে যাবে কেন্দ্রে মোদি সরকার গঠন হলে।? রাজ্য বিজেপির এই মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের নেতা রাজনাথ সিংয়ের অঙ্ক খুবই পজিটিভ।? তিনি মনে করেন, ভোটের পর মমতা, জয়ললিতা, মায়াবতী- তিনজনই এনডিএকে সমর্থন করবেন।?
যে লালজি ট্যান্ডন গতবার লখ্নৌ থেকে জিতেছিলেন, তাঁকে এবার এ আসনে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। মূলত অটলবিহারী বাজপেয়ীর নির্বাচনী আসন ছিল এই লখে।? বাজপেয়ীর নির্বাচনের সময় প্রচারের বা সংগঠনের কাজে সর্বাধিনায়ক ছিলেন লালজি।? বাজপেয়ী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে যাওয়ার পর বিজেপি লালজিকেই লখ্নৌয়ের টিকেট দেয় এবং তিনি লোকসভায় নির্বাচিতও হন।? এবার লখ্নৌ নিয়ে গোড়া থেকেই ছিল গুঞ্জন।? কথা উঠেছিল মোদির দাঁড়ানো নিয়েও।? বারানসীর পাশাপাশি লখ্নৌ থেকেও মোদি লড়ার কথা ভেবেছিলেন।? কিন্তু লখ্নৌ ততটা নিরাপদ আসন নয় বলেই মোদি ঝুঁকি নিতে চাননি।?
গতবার গাজিয়াবাদ থেকে লোকসভায় জিতেছিলেন রাজনাথ।? বিজেপির পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, এবার দাঁড়ালে গাজিয়াবাদ থেকে রাজনাথ হেরেও যেতে পারেন।? সে জন্যই গাজিয়াবাদ থেকে লখ্নৌ চলে আসেন রাজনাথ।?
লখ্নৌ লোকসভা আসনে বিজেপির সংগঠনের অবস্থা ভাল নয়।? লখ্নৌ লোকসভা আসনের অন্তর্গত পাঁচটি বিধানসভা আসনের মধ্যে মাত্র একটি বিজেপির হাতে।? গত বিধানসভা নির্বাচনে লখ্নৌ পূর্ব বিধানসভা আসন থেকে জেতেন কলরাজ মিশ্র।? বাকি চারটি আসনেই বিজেপি প্রার্থীরা হেরে যান।? জেতেন কংগ্রেস, বহুজন সমাজ পার্টি ও সমাজবাদী পার্টির প্রার্থীরা।? লখ্নৌ লোকসভা বা তার অন্তর্গত কোন বিধানসভা আসন থেকে রাজনাথ সিং কখনও নির্বাচনে জেতেননি।? মোহনা থেকে লড়ে হেরেছিলেন।? তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে লড়েছিলেন লখ্নৌয়ের কাছে হায়দরগড় বিধানসভা আসন থেকে? এবং জিতেও ছিলেন।
লখেœৗ লোকসভা আসনে রাজনাথ সিংয়ের বিরুদ্ধে লড়েছেন কংগ্রেসের রীতা বহুগুণা যোশি, বহুজন সমাজ পার্টির নকুল দুবে ও সমাজবাদী পার্টির অভিষেক মিশ্র।? বিজেপি এখানে প্রচার করেছে, কেন্দ্রে মোদি সরকার হলে উত্তর প্রদেশেও সরকার বদলাবে।? আকারে-ইঙ্গিতে মোদি নিজেও বক্তৃতায় উত্তর প্রদেশে ৩৫৬ ধারা জারি করার কথা বলছেন।? বিজেপি এ নিয়ে প্রচারে নেমেই দেখতে পেয়েছে, সমাজবাদী পার্টি এ বিষয়টিকে ইস্যু করে ফেলেছে।? ফলে বিজেপি এখন সব সভায় মোদির কথার ব্যাখ্যা দিচ্ছে।? বলছে, উনি উত্তর প্রদেশের সরকার ফেলে দেয়ার কথা বলেননি।? আসলে কাউকেই অখিলেশের সরকার ফেলতে হবে না।? অখিলেশের সরকার নিজের কর্মের দরুনই ভেঙ্গে পড়বে।?
উত্তর প্রদেশে যে কয়েকটি দল লোকসভা ভোটে লড়ছে বা লড়েছে, তাদের সবারই সাংগঠনিক অবস্থা প্রায় সমান সমান।? এ পরিস্থিতিতে বিজেপি তাকিয়ে আছে মোদি হাওয়ার দিকে। আর বাকি তিন দল উত্তর প্রদেশে চিরপরিচিত জাতিগত সমীকরণের দিকে।?
তবে কংগ্রেস নেতারা এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, কংগ্রেসের ভোট উত্তর প্রদেশে মোটেই তেমন কিছু কমবে না।? বিভিন্ন সমীক্ষক দলকে দিয়ে সমীক্ষা করিয়ে স্বয়ং রাহুল গান্ধী আশ্বস্ত যে, গতবারের ২১টি আসনের আশপাশেই এবারও থাকবে কংগ্রেস।? এর চেয়ে কমবে না।? অন্যদিকে বিজেপি মুখপাত্র অনিতা আগরওয়াল ডেকে-হেঁকে বলছেন, তাঁরা ৪৫-৫০টির মতো আসন পাবেন।? যদিও জানা গেল, বিজেপি বারকয়েক অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা করেছে।? তাতে উত্তর প্রদেশে মোট ৮০টি আসনের মধ্যে এখনও তারা ২৫ এর বেশি উঠবে বলে কোন সমীক্ষাই মনে করছে না।? এ অবস্থায় বিজেপি সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে আছে পশ্চিম উত্তর প্রদেশের ওপর।? মুজফ?ফরনগরের দাঙ্গার ফলে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ হবে বলে আশা করছে বিজেপি।? স্পষ্টই বিজেপি নেতারা বলছেন, মূল্যবৃদ্ধি আর বেকারির পাশাপাশি দাঙ্গার কারণে বিজেপি এবার বেশি ভোট পাবে।

No comments:

Post a Comment