চাষে সঙ্কট, কৃষক-ঘরে মেয়ের বিয়ে দিতে চাইছে না কেউ, আক্ষেপ মেরুদণ্ডী গ্রামে
প্রবীর দাস : অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত গোটা কৃষক সমাজ। সেই সাথে নতুন আরো একটি সমস্যা এখন কৃষকের ঘরে ঘরে। কী সেই সমস্যা? বসিরহাট ১নং ব্লকের সংগ্রামপুর-শিবাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের মেরুদণ্ডী গ্রামের বাসিন্দা সুবোধকুমার বিশ্বাস বলেন, নতুন সমস্যাটি হলো সামাজিক সমস্যা।
সুবোধকুমার বিশ্বাস কৃষকনেতা, লিজে চাষাবাদও করেন। একসময় শিক্ষকতা করতেন। ভেবেছিলেন শিক্ষকতা ছেড়ে পৈতৃক যেটুকু জমি আছে তাতে চাষাবাদ করবেন। রাজ্যে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে তখন বামফ্রন্ট সরকার। মোটামুটি লাভজনক ছিল চাষবাস, সমাজে কৃষকের একটা সম্মানও ছিল। এখন আর তা নেই।
সামাজিক সমস্যাটি কেমন? জবাবে বললেন, কৃষকের ঘরে এখন আর কেউ মেয়ে বিয়ে দিতে চাইছে না। সম্পন্ন কৃষকের ঘরে শিক্ষিত ছেলে। চাষে লাভ নেই। কী খাওয়াবে মেয়েকে? একজন সরকারী ডি গ্রুপের ছেলের যে সম্মান, সেই সম্মানটুকুও নেই কৃষকের ঘরের শিক্ষিত ছেলের!
ইছামতী নদীর একপাড়ে বসিরহাট শহর। অপর পাড়ে সংগ্রামপুর শিবাটি গ্রাম পঞ্চায়েত। ইছামতী ব্রিজ পেরিয়ে সংগ্রামপুর, কামারডাঙা। এরপর শরৎ খাল ব্রিজ পেরিয়ে মেরুদণ্ডী গ্রাম। পার্শ্ববর্তী আদানি, শিবাটি গ্রাম। তার উত্তর-পূর্বদিকে এগিয়ে গেলে বাদুড়িয়া ব্লকের পিয়ারা, চিংড়ে, গন্ধর্বপুর। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সবজিচাষই এখানকার প্রধান জীবিকা। গ্রামগুলিতে ১লক্ষ মানুষের বাস। সর্বমোট জমির পরিমাণ ১লক্ষ বিঘার কিছু কম-বেশি। এখানকার সবজি বলতে আলু, কুমড়ো, লঙ্কা, পটল, ঢেঁড়স, বেগুন, ঝিঙেসহ নানান বৈচিত্র্যের সবজি চাষ হয়। বসিরহাট, কাটিয়াহাট, শারেস্তানগর হাটগুলিতে পাইকারি দরে সবজি বিক্রি করেন গ্রামগুলির কৃষকরা। সেই সবজি বসিরহাট শহর পেরিয়ে চলে যায় সুন্দরবনাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায়, এমনকি কলকাতাতেও যায়। চাহিদা যথেষ্ট। উৎপাদনও কম হয় না। কিন্তু শেষে লাভের কড়ি ঘরে তোলাই দায় হয়ে পড়ে।
মেরুদণ্ডী গ্রামে কথা হচ্ছিল অনিল মণ্ডল, সুচিত্রা মণ্ডল, গোপাল তরফদার, সুজয় সরদার, উদয় সরদার, কালিপদ সরদারদের সাথে। এঁদের আয় বলতে মূলত সবজিচাষ। ধান চাষ, পাট চাষে লাভ নেই। সেসব চাষ এখন ছেড়েই দিয়েছেন। বছরের খোরাকি হিসাবে ধান চাষ আর জ্বালানির জন্য অল্প কিছু পাট চাষ করেন।
এঁদেরই মধ্যে ৫৮বছর বয়সী অনিল মণ্ডল ১৫বছর বয়স থেকে চাষবাসে যুক্ত। পৈতৃক জমির পরিমাণ খুবই কম। লিজে জমি নিয়ে ফসল ফলান। ৩বিঘা জমি লিজে নিয়েছেন। বিঘাপ্রতি (ডাঙা জমি) বছরে ৭হাজার টাকা দিতে হবে জমির মালিককে। বিলেন জমি বিঘা প্রতি বছরে সাড়ে চার হাজার টাকা। ২৫কাঠায় ধান চাষ বাদে বাকি জমিতে বেগুন, পেঁপে, লঙ্কার চাষ করেছেন। সেচের খরচ, কীটনাশক, সার, বীজ কিনে লাভ তো পড়ে থাক আসল টাকাই উঠছে না। স্ত্রী সুচিত্রা সংসার সামলে তাঁকে সাহায্য করছেন। কারণ জনমজুর ২২০টাকা। এদিকে বৃষ্টির দেখা নেই। ডিজেল ৬২টাকা লিটার। ৭এম এল কীটনাশক (এক ব্যারেল) ১১০টাকা। সুফলা সার ১৭টাকা কেজি (আগে ছিল ৮টাকা), ডি এ পি ২৬টাকা কেজি (আগে ছিল ১২টাকা), ১০-২৬আগে ছিল ৯টাকা কেজি এখন ২৩টাকা। এরপর আছে ভ্যান ভাড়া দিয়ে হাটে মাল নিয়ে যাওয়ার খরচ। ৫কাঠা জমিতে বেগুন চাষ করেছেন, ১৫কাঠায় লঙ্কা, ৬কাঠায় পেঁপে, বাকি জমিতে ঢেঁড়স, কুমড়ো ইত্যাদি। বেগুনে প্রথম চালানে লাভ দিয়েছে। নতুন করে বেগুন গাছ লাগিয়ে তাতে ফুল আসতে দেরি হচ্ছে। পোকা লেগে যাচ্ছে গাছে। প্রতিদিন কীটনাশক দিতে পারলে ভালো হয়। কিন্তু তার খরচ অনেক বেশি। বাজারে ১৫-১৬টাকার বেশি দাম দেবে না। অথচ এখন বাজারে বেগুন কিনতে হচ্ছে ৩০-৪০টাকা। মধ্যস্বত্ত্বভোগী (ফড়ে) লাভের কড়ি ঘরে তুলছে। সার, কীটনাশক, ডিজেল, জলসেচের পাম্পসেট ভাড়া সব বাকি থেকে যাচ্ছে।
—তাহলে কেন চাষ করছেন? —কী করবো? অন্য উপায় যে নেই। বয়স হয়েছে অন্য কোথাও গিয়ে কাজ করতে তো পারবো না। তবে যা অবস্থা চাষী বোধহয় আর বাঁচবে না। এমনই শোনা গেল কালীপদ সরদারের গলায়। বললেন, প্রতিমুহূর্তে একটাই চিন্তা দাম পাবো তো? মহাজনী ঋণ শোধ দিতে পারবো তো? ৮কাঠা জমিতে পটল চাষ করেছেন। অন্যবারের তুলনায় এবার ফলন কম। বৃষ্টি নেই। ঘুঘু বোম্বাই পটল। বাজারে চাহিদা আছে। পাইকারি ১৫-১৬টাকা দরে বেচে তবুও কিছুটা লাভ। কিন্তু এরপরে যখন সব জমিতে পটল চাষ শুরু হবে এবং তা বাজারে উঠবে তখন আর দাম থাকবে না। মূল্যবৃদ্ধির বাজারে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। পরিবারের ছেলেরা আর গ্রামে থেকে চাষবাস করছে না। চলে যাচ্ছে কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লি, মাদ্রাজে। সেখানে জনমজুরি খেটে যা পয়সা আয় করে তা সংসারে পাঠালে তবে সংসারটা চলে। চাষে লাভ নেই বলে চলে যাচ্ছে স্থানীয় ইটভাটায় কাজ করতে। কৃষকের দিকে লক্ষ্য নেই এই সরকারের। গতবছর ৭কাঠা জমিতে লঙ্কা চাষ করেছিলাম। খরচ হয়েছিল ৬হাজার টাকা। ২০০টাকাও ঘরে তুলতে পারিনি। এমতবস্থায় সরকার যদি পাশে না দাঁড়ায় কৃষক বাঁচবেন কী করে? সুজয় সরদার সবজি চাষের পাশাপাশি মুরগির পোলট্রি তৈরি করেছিলেন। তার লাভের টাকাও ঢুকে গেছে সবজি চাষে। জমি ফেলে না রেখে তারা চাষ করছেন লাভ হবে না জেনেও। তবু মনে আশা, যদি এবার পয়সা পাই। তা হলে বাঁচার উপায় কী?
এঁদের সবার একটাই কথা— জিনিসপত্রের দাম কমানোর সাথে সাথে কৃষিতে সরকার ভরতুকি বাড়িয়ে চাষের যন্ত্রপাতি, সার, কীটনাশক, বীজ, ডিজেলের দাম কমাক। ফিরে আসুক আগের সেই অবস্থা। নতুবা খাদ্য সঙ্কটে পড়বো আমরা সবাই। বাড়বে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই।
- See more at: http://ganashakti.com/bengali/breaking_news_details.php?newsid=1807#sthash.5MyOD0Tr.dpufসুবোধকুমার বিশ্বাস কৃষকনেতা, লিজে চাষাবাদও করেন। একসময় শিক্ষকতা করতেন। ভেবেছিলেন শিক্ষকতা ছেড়ে পৈতৃক যেটুকু জমি আছে তাতে চাষাবাদ করবেন। রাজ্যে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে তখন বামফ্রন্ট সরকার। মোটামুটি লাভজনক ছিল চাষবাস, সমাজে কৃষকের একটা সম্মানও ছিল। এখন আর তা নেই।
সামাজিক সমস্যাটি কেমন? জবাবে বললেন, কৃষকের ঘরে এখন আর কেউ মেয়ে বিয়ে দিতে চাইছে না। সম্পন্ন কৃষকের ঘরে শিক্ষিত ছেলে। চাষে লাভ নেই। কী খাওয়াবে মেয়েকে? একজন সরকারী ডি গ্রুপের ছেলের যে সম্মান, সেই সম্মানটুকুও নেই কৃষকের ঘরের শিক্ষিত ছেলের!
ইছামতী নদীর একপাড়ে বসিরহাট শহর। অপর পাড়ে সংগ্রামপুর শিবাটি গ্রাম পঞ্চায়েত। ইছামতী ব্রিজ পেরিয়ে সংগ্রামপুর, কামারডাঙা। এরপর শরৎ খাল ব্রিজ পেরিয়ে মেরুদণ্ডী গ্রাম। পার্শ্ববর্তী আদানি, শিবাটি গ্রাম। তার উত্তর-পূর্বদিকে এগিয়ে গেলে বাদুড়িয়া ব্লকের পিয়ারা, চিংড়ে, গন্ধর্বপুর। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সবজিচাষই এখানকার প্রধান জীবিকা। গ্রামগুলিতে ১লক্ষ মানুষের বাস। সর্বমোট জমির পরিমাণ ১লক্ষ বিঘার কিছু কম-বেশি। এখানকার সবজি বলতে আলু, কুমড়ো, লঙ্কা, পটল, ঢেঁড়স, বেগুন, ঝিঙেসহ নানান বৈচিত্র্যের সবজি চাষ হয়। বসিরহাট, কাটিয়াহাট, শারেস্তানগর হাটগুলিতে পাইকারি দরে সবজি বিক্রি করেন গ্রামগুলির কৃষকরা। সেই সবজি বসিরহাট শহর পেরিয়ে চলে যায় সুন্দরবনাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায়, এমনকি কলকাতাতেও যায়। চাহিদা যথেষ্ট। উৎপাদনও কম হয় না। কিন্তু শেষে লাভের কড়ি ঘরে তোলাই দায় হয়ে পড়ে।
মেরুদণ্ডী গ্রামে কথা হচ্ছিল অনিল মণ্ডল, সুচিত্রা মণ্ডল, গোপাল তরফদার, সুজয় সরদার, উদয় সরদার, কালিপদ সরদারদের সাথে। এঁদের আয় বলতে মূলত সবজিচাষ। ধান চাষ, পাট চাষে লাভ নেই। সেসব চাষ এখন ছেড়েই দিয়েছেন। বছরের খোরাকি হিসাবে ধান চাষ আর জ্বালানির জন্য অল্প কিছু পাট চাষ করেন।
এঁদেরই মধ্যে ৫৮বছর বয়সী অনিল মণ্ডল ১৫বছর বয়স থেকে চাষবাসে যুক্ত। পৈতৃক জমির পরিমাণ খুবই কম। লিজে জমি নিয়ে ফসল ফলান। ৩বিঘা জমি লিজে নিয়েছেন। বিঘাপ্রতি (ডাঙা জমি) বছরে ৭হাজার টাকা দিতে হবে জমির মালিককে। বিলেন জমি বিঘা প্রতি বছরে সাড়ে চার হাজার টাকা। ২৫কাঠায় ধান চাষ বাদে বাকি জমিতে বেগুন, পেঁপে, লঙ্কার চাষ করেছেন। সেচের খরচ, কীটনাশক, সার, বীজ কিনে লাভ তো পড়ে থাক আসল টাকাই উঠছে না। স্ত্রী সুচিত্রা সংসার সামলে তাঁকে সাহায্য করছেন। কারণ জনমজুর ২২০টাকা। এদিকে বৃষ্টির দেখা নেই। ডিজেল ৬২টাকা লিটার। ৭এম এল কীটনাশক (এক ব্যারেল) ১১০টাকা। সুফলা সার ১৭টাকা কেজি (আগে ছিল ৮টাকা), ডি এ পি ২৬টাকা কেজি (আগে ছিল ১২টাকা), ১০-২৬আগে ছিল ৯টাকা কেজি এখন ২৩টাকা। এরপর আছে ভ্যান ভাড়া দিয়ে হাটে মাল নিয়ে যাওয়ার খরচ। ৫কাঠা জমিতে বেগুন চাষ করেছেন, ১৫কাঠায় লঙ্কা, ৬কাঠায় পেঁপে, বাকি জমিতে ঢেঁড়স, কুমড়ো ইত্যাদি। বেগুনে প্রথম চালানে লাভ দিয়েছে। নতুন করে বেগুন গাছ লাগিয়ে তাতে ফুল আসতে দেরি হচ্ছে। পোকা লেগে যাচ্ছে গাছে। প্রতিদিন কীটনাশক দিতে পারলে ভালো হয়। কিন্তু তার খরচ অনেক বেশি। বাজারে ১৫-১৬টাকার বেশি দাম দেবে না। অথচ এখন বাজারে বেগুন কিনতে হচ্ছে ৩০-৪০টাকা। মধ্যস্বত্ত্বভোগী (ফড়ে) লাভের কড়ি ঘরে তুলছে। সার, কীটনাশক, ডিজেল, জলসেচের পাম্পসেট ভাড়া সব বাকি থেকে যাচ্ছে।
—তাহলে কেন চাষ করছেন? —কী করবো? অন্য উপায় যে নেই। বয়স হয়েছে অন্য কোথাও গিয়ে কাজ করতে তো পারবো না। তবে যা অবস্থা চাষী বোধহয় আর বাঁচবে না। এমনই শোনা গেল কালীপদ সরদারের গলায়। বললেন, প্রতিমুহূর্তে একটাই চিন্তা দাম পাবো তো? মহাজনী ঋণ শোধ দিতে পারবো তো? ৮কাঠা জমিতে পটল চাষ করেছেন। অন্যবারের তুলনায় এবার ফলন কম। বৃষ্টি নেই। ঘুঘু বোম্বাই পটল। বাজারে চাহিদা আছে। পাইকারি ১৫-১৬টাকা দরে বেচে তবুও কিছুটা লাভ। কিন্তু এরপরে যখন সব জমিতে পটল চাষ শুরু হবে এবং তা বাজারে উঠবে তখন আর দাম থাকবে না। মূল্যবৃদ্ধির বাজারে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। পরিবারের ছেলেরা আর গ্রামে থেকে চাষবাস করছে না। চলে যাচ্ছে কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লি, মাদ্রাজে। সেখানে জনমজুরি খেটে যা পয়সা আয় করে তা সংসারে পাঠালে তবে সংসারটা চলে। চাষে লাভ নেই বলে চলে যাচ্ছে স্থানীয় ইটভাটায় কাজ করতে। কৃষকের দিকে লক্ষ্য নেই এই সরকারের। গতবছর ৭কাঠা জমিতে লঙ্কা চাষ করেছিলাম। খরচ হয়েছিল ৬হাজার টাকা। ২০০টাকাও ঘরে তুলতে পারিনি। এমতবস্থায় সরকার যদি পাশে না দাঁড়ায় কৃষক বাঁচবেন কী করে? সুজয় সরদার সবজি চাষের পাশাপাশি মুরগির পোলট্রি তৈরি করেছিলেন। তার লাভের টাকাও ঢুকে গেছে সবজি চাষে। জমি ফেলে না রেখে তারা চাষ করছেন লাভ হবে না জেনেও। তবু মনে আশা, যদি এবার পয়সা পাই। তা হলে বাঁচার উপায় কী?
এঁদের সবার একটাই কথা— জিনিসপত্রের দাম কমানোর সাথে সাথে কৃষিতে সরকার ভরতুকি বাড়িয়ে চাষের যন্ত্রপাতি, সার, কীটনাশক, বীজ, ডিজেলের দাম কমাক। ফিরে আসুক আগের সেই অবস্থা। নতুবা খাদ্য সঙ্কটে পড়বো আমরা সবাই। বাড়বে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই।
No comments:
Post a Comment